ঢাকা      মঙ্গলবার ২৩, অক্টোবর ২০১৮ - ৮, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী



আমির আজম

সাবেক ইন্টার্ন চিকিৎসক, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। 


অণুগল্প

জীবন-মৃত্যু

ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে রাস্তায় হাঁটছে ডা. তমাল। উৎসুক জনতা তাকিয়ে আছে তার দিকে। স্যুট কোট পরা একজন ডাক্তার এভাবে বৃষ্টিতে ভিজবে, এটা যেন কিছুতেই মানতে পারছেন না তারা। হুমায়ুন আহমেদের হিমু টাইপের কেউ হলে হয়তো বিষয়টা মানা যেত। গায়ে থাকবে হলুদ পাঞ্জাবি। পা জুতা বিহীন। বৃষ্টিতে ভিজে চলছে উদ্দেশ্যহীন।

ডা. সাহেবের অবশ্য এইদিকে কোন মনোযোগ নেই। এমনকি পকেটে মানিব্যাগ, দামী মোবাইলটা ভিজে যে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সেদিকেও ভ্রুক্ষেপ নেই। তার মন পড়ে আছে হাসপাতালে।

দুই.

হাসপাতালের বেড। মা ও ছেলে একসাথে বসে আছে। মায়ের বয়স ৪০-৪৫ আর ছেলেটার হবে ১৫-১৬। মা ছেলেকে ভাত খাইয়ে দিচ্ছে আর কী নিয়ে জানি গল্পগুজব করছে। মজাদার কোন বিষয় হবে হয়তো। কিছুক্ষণ পরপরেই তাদের হাসির শব্দ পুরো ওয়ার্ডে ছড়িয়ে পড়ছে।

সেদিকে তাকিয়ে আছে ডা. তমাল। তাদের হাসি।দেখে তারও হাসার কথা ছিল। কিন্তু পারছে না। কী নিখুঁত অভিনয় করে যাচ্ছে মা ও ছেলে দুজনেই।

ডা. তমাল। প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক উপজেলা সদর হাসপাতালে পোস্টিং হয়েছে। হাসপাতালে অনেক সীমাবদ্ধতা। রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষা করার কোন ব্যবস্থা নেই। পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর। দালালদের দৌরাত্ম্য।

আর রোগীরাও জানি কেমন। ডা. সাহেব যা বলবে তার উল্টাটা করার জন্যই ব্যস্ত হয়ে থাকে। যাকে বলবে আপনার তেমন কোন সমস্যা নেই। ওষুধ দিচ্ছি, বাড়িতে গিয়ে খাবেন। সে জোরজবরদস্তি করে ভর্তি হবে। আর যাকে বলবে আপনার সমস্যাটা জটিল, কয়েকদিন ভর্তি হয়ে থাকেন। সে কিছুতেই ভর্তি হবে না। বাড়িতে যাবেই।

এরকম হাজারো অস্বস্তি নিয়ে চলছে তার জীবন।

তিন.

মায়ের সমস্যাটা জটিল। দুইটা কিডনিই নষ্ট। বড় হাসপাতালে নিতে হবে। ডায়ালাইসিস করতে হবে। অনেক ঝক্কিঝামেলার বিষয়। এত ছোট ছেলাটার পক্ষে এত কিছু সামাল দেয়া সম্ভব না। তাই গত দশদিন থেকে এ হাসপাতালেই পড়ে আছে। বলা চলে গত দশদিন থেকে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।

মাঝে মাঝে ছেলেটা আসে। কথা বলে ডাক্তারের সাথে :

- স্যার, একটা অনুরোধ করবো?

- করো।

- মায়ের সমস্যাটার কথা মাকে বলিয়েন না।

- কেন?

- কষ্ট পাবে খুব। সারাজীবন অনেক কষ্ট করছে। এই শেষ সময়ে আর কষ্ট দিতে চাই না।

- আচ্ছা ঠিক আছে বলবো না।

.

মায়ের সাথেও কথা হয় কখনো কখনো।

- ডাক্তার সাহেব, একটা কথা বলি।

- জ্বী বলুন।

- আমার এই অসুখটার কথা আমার ছেলেটাকে বলিয়েন না।

- কেন?

- বাপ মরা ছেলে। অনেক কষ্ট করে। এই শেষ সময়ে তার কষ্ট আর সহ্য করতে পারবো না।

- কিন্তু একদিন তো জানবেই।

- যখন মারা যাবো, তখন জানলে জানবে। আমি তো আর দেখতে পাবো না।

- আচ্ছা ঠিক আছে বলবো না।

 

চার.

দুপুর প্রায় আড়াইটা বাজে। ডা. তমাল ব্যাগ গোছাতে থাকেন। দ্রুত বাড়ি যেতে হবে। আজকে ছোটখাটো একটা প্রোগ্রাম আছে বাড়িতে।

হঠাৎ শোনে বাইরে হট্টগোল। একটা এক্সিডেন্টের রোগী আসছে। রোড এক্সিডেন্ট।

রোগীর দিকে তাকাতেই ধকধক করে উঠে ডা. তমালের বুক। এ তো সেই ১৫-১৬ বছরের ছেলেটা।

তাড়াতাড়ি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। বুঝতে পারে সময় শেষ। বেঁচে নেই।

ওয়ার্ডে মায়ের দিকে তাকায়। কেমন যেন ছটফট করছে। হয়তো ছেলের জন্যে অপেক্ষা করছে। কখন ওষুধ নিয়ে আসবে? কখন দুজন একসাথে ভাত খাবে?

চিন্তা করতে পারছে না সে। ডিউটি টাইম শেষ। ব্যাগটা ঘাড়ে নিয়ে বেরিয়ে আসে হাসপাতাল থেকে।

পাঁচ.

বৃষ্টিতে ভিজছে ডা. তমাল। ভাবছে। এতক্ষণে হয়তো ছেলের মৃত্যুর সংবাদ জেনে গেছে মা। মৃত্যু সংবাদ কার শোনার কথা, আর কে শুনবে? কিভাবে সহ্য করবেন তিনি?

কেন এরকম হয় মানুষের জীবনে? হঠাৎ মনে পড়ে যায় কালজয়ী একটা বাক্য। জীবন-মৃত্যুর ফয়সালা আসমানে হয়, জমিনে নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মুলারিয়ান এজেনেসিস: প্রকৃতির অবিবেচক খেয়াল ও প্রমিতির কান্না

মুলারিয়ান এজেনেসিস: প্রকৃতির অবিবেচক খেয়াল ও প্রমিতির কান্না

প্রমিতি, বয়স- ১৬। এইচএসসি ১ম বর্ষে পড়ে। প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল প্রজাপতির মতো। যখন কথা…

ইন্টার্ন ডাক্তারদের আবার কষ্ট আছে নাকি?

ইন্টার্ন ডাক্তারদের আবার কষ্ট আছে নাকি?

আপনার বেতন কত? ছোটবেলায় শুনেছিলাম এ প্রশ্ন করা নাকি বেয়াদবি! সেই ভয়ে…

সব মৃত্যুই দুঃখের, সুখের কোন মৃত্যু নেই!

সব মৃত্যুই দুঃখের, সুখের কোন মৃত্যু নেই!

তখন আমি সিওমেক হাসপাতালের ইন্টার্ন। মেডিসিন ওয়ার্ডে রাউন্ড দিচ্ছেন প্রফেসর ইসমাইল পাটোয়ারি…

‘কেটা ফের জানতোক যে, পিঁপিয়া খাল্যে ছ্যালা ধলো হয়?’

‘কেটা ফের জানতোক যে, পিঁপিয়া খাল্যে ছ্যালা ধলো হয়?’

এক সদ্য গর্ভবতী রোগীকে কাঁচা পেঁপে খেতে নিষেধ করলাম। - আনারস আর কাঁচা…

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা

ফাঁকিবাজির মহান ব্রত নিয়ে ইন্টার্নি শুরু করেছিলাম। আমি জন্মগত ভাবেই ফাঁকিবাজ। সবাই…

‘বুকের ভিত্রে চ্যাংনা চ্যাঁও চ্যাঁও করে’

‘বুকের ভিত্রে চ্যাংনা চ্যাঁও চ্যাঁও করে’

ডাক্তার- আপনার সমস্যা কী? রোগী- বুকের ভিত্রে চ্যাংনা চ্যাঁও চ্যাঁও করে। ডাক্তার-…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর