ডা. সাইফুদ্দীন একরাম

ডা. সাইফুদ্দীন একরাম

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ


১০ জুন, ২০১৮ ১০:২৫ এএম
সিয়াম এবং স্বাস্থ্য 

যুগে যুগে রোজা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা

যুগে যুগে রোজা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা

রোজা শব্দের অর্থ হচ্ছে দিন। আর আরবীতে এর নাম সাওম বা সিয়াম। এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল পানাহার এবং ভোগ-বিলাস থেকে বিরত থাকার নাম রোজা। যেহেতু দিনের শুরু থেকে শেষাংশ পর্যন্ত এটা পালন করা হয়, এজন্য একে রোজা বলা হয়। ইসলামী বিধান অনুসারে, প্রতিটি সুস্থ-সবল মুসলিমের জন্য রমজান মাসের রোজা রাখা অবশ্য পালনীয়।

রোজার প্রাথমিক ইতিহাস সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। অনেক পণ্ডিত মনে করেন আদিম যুগের মানুষ স্বভাবত ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর থাকতেন। তারা মনে করতেন এভাবে না খেয়ে ক্ষুধা-পিপাসায় দিন যাপন করলে তাদের সেই আহার্য বস্তু মৃত প্রিয়জনদের নিকটে পৌঁছে যায়। অবশ্য এমন ধারণার সঙ্গে অনেকেই একমত হতে পারেননি।

পবিত্র কুরআন শরীফে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম বিধিবদ্ধ করা হয়েছে, যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।‘-(সূরা বাকারাহ; আয়াতঃ ১৮৩) অর্থাৎ আমাদের পূর্বপুরুষদের ওপরেও ধর্মীয় বিধান হিসেবে রোজার নির্দেশনা ছিল এবং এ সম্পর্কে প্রমাণ পাওয়া যায়।

হযরত আদম (আঃ)-এর রোজাঃ 
বিভিন্ন বিবরণে বলা হয়েছে, হযরত আদম (আঃ) নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পরে তাঁর ভুল বুঝতে পেরে তিনি তওবা করেছিলেন। কিন্তু ৩০ দিন পর্যন্ত তাঁর তওবা কবুল হয়নি। এই ঘটনার স্মরণে তাঁর সন্তানদের উপরে ৩০টি রোজার বিধান দেওয়া হয়।

হযরত নূহ (আঃ)-এর রোজাঃ 
হযরত নূহ (আঃ)-এর যুগেও সিয়ামের প্রচলন ছিল। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি ১লা শাওয়াল ও ১০ জিলহজ ছাড়া সারা বছর রোজা রাখতেন।

হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর রোজাঃ 
হযরত নূহ (আঃ)-এর পরে বিখ্যাত নবী ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)। তাঁর সময়ে ৩০ দিন সিয়াম পালনের প্রচলন ছিল বলে কেউ কেউ লিখেছেন।

কাছাকাছি সময়ে বেদের অনুসারী ভারতের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ব্রত বা উপবাস পালনে প্রথার বর্ণনা রয়েছে। প্রত্যেক চান্দ্র মাসের ১১ তারিখে তাদের মধ্যে একাদশীর উপবাস পালন করার নিয়ম রয়েছে।

হযরত দাউদ (আঃ)-এর রোজাঃ 
হযরত দাউদ (আঃ) রোজা রাখতেন এবং তা অত্যন্ত বিখ্যাত। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় রোজা হযরত দাউদ (আঃ)-এর রোযজা।’ জানা যায় তিনি একদিন রোজা রাখতেন এবং একদিন বিনা রোজায় থাকতেন। অর্থাৎ হযরত দাউদ (আঃ) বছরের অর্ধেক সময়ই রোজা রাখতেন।

ইহুদী এবং খ্রীষ্টানদের রোজা: 
ইবাদত হিসেবে ইহুদীরাও রোজা পালন করতেন। হযরত মূসা (আঃ) কুহে তুর পর্বতে চল্লিশ দিন অভুক্ত অবস্থায় পার করেছেন। এজন্য হযরত মূসা (আঃ)-এর অনুসারীগণ সেই ঘটনার স্মরণে চল্লিশ দিন রোজা রাখতেন। তাদের ওপর চল্লিশতম দিনে রোজা রাখা আবশ্যিক ছিল। এটা তাদের সপ্তম মাসের (তাশরিন) দশম তারিখ পড়ত। এজন্য এই দশম দিনকে আশুরা বলা হতো। আশুরার দিনেই হযরত মূসা (আঃ)-কে তওরাতের ১০ আহকাম দান করা হয়েছিল। এজন্য তওরাত কিতাবে আশুরার দিনে রোজা পালন করার উপর তাগিদ দেয়া হয়েছে।

খ্রীষ্টান ধর্মেও রোজা পালনের বিধান রয়েছে। হযরত ঈসা (আঃ) চল্লিশ দিন পর্যন্ত জঙ্গলে অবস্থান করে রোজা রেখেছেন। হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) হযরত ঈসা (আঃ)-এর সমসাময়িক ছিলেন। তিনিও রোজা রাখতেন এবং তার অনুসারীদের মধ্যে রোজা রাখার রীতির প্রচলন ছিল।

গ্রীক অর্থোডক্স খ্রীস্টানদের মধ্যে ১৮০ থেকে ২০০ দিন উপবাস করার প্রচলন রয়েছে। প্রধানত তারা বড়দিনের আগে ৪০ দিন উপবাস পালন করেন; ইস্টারের আগে ৪৮ দিন উপবাসে থাকেন; আবার আগস্ট মাসে ১৫ দিন উপবাস পালন করেন। তবে তাদের উপবাসের প্রকৃতির মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে। সবচেয়ে বড় পার্থক্য হচ্ছে মুসলমানদের রোজার মতো তারা উপবাসের সময় সকাল-সন্ধ্যা একেবারে কিছু না খেয়ে থাকেন না। 

এসময়ে তারা মাছ, মাংস, ডিম, জলপাইয়ের তেল ইত্যাদি খাওয়া থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু রুটি, ফল, সবাজি, শিম, ডাল, বাদাম ইত্যাদি খেয়ে থাকেন। বলা যায় তারা উপবাসের দিনগুলিতে মূলত নিরামিষ জাতীয় খাবার খেয়ে থাকেন। মোটের ওপর তাদের উপবাসের ফলে শর্করা গ্রহণের পরিমাণ বাড়ে; কিন্তু প্রোটিন, সম্পৃক্ত চর্বি এবং ট্রান্সফ্যাট খাওয়ার পরিমাণ কমে যায়। ভিটামিন এবং অন্যান্য খনিজ উপাদান গ্রহণের পরিমাণ কমবেশী একই থাকে। ফলে উপবাসের পরে তাদের শরীরের ওজন কমে যায়, রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে যায় এবং সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বাইবেলভিত্তিক ড্যানিয়েলপন্থী খ্রীস্টানগণ সাধারণত ২১ দিন উপবাস পালন করেন; তবে অনেক সময় তারা ১০ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত উপবাস পালন করে থাকেন। এই সময়ে তারা কোন প্রাণীজ প্রোটিন, শোধিত শর্করা, চা-কফি, মদ, খাবারের রং ইত্যাদি গ্রহণ করেন না। কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণে ফলমূল, সবজি, শিম, বাদাম এবং তৈলজাতীয় খাবার গ্রহণ করেন। 

সুতরাং বলা যায় তাদের উপবাসও মূলত নিরামিষ ভোজন। তবে অর্থোডক্সদের চেয়ে একটু কঠোর। ফলে এই উপবাসের ফলে তাদের শরীরেও গ্রীক অর্থোডক্সদের মতোই পরিবর্তন দেখা যায়।

আরববাসীরা ইসলাম ধর্ম প্রচলনের পূর্বেও রোজা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। মক্কার কুরাইশগণ তখনও ১০ মুহররম আশুরার দিনে রোজা রাখতেন এবং ওই দিনে খানা কাবার ওপর নতুন গিলাফ চড়ানো হতো। মদীনায় বসবাসকারী ইহুদীরা পৃথকভাবে আশুরা উৎসব পালন করতেন। অর্থাৎ ইহুদীরা নিজেদের গণনানুসারে সপ্তম মাসের ১০ম দিনে রোজা রাখতেন।

বিগত দুই দশকে স্বাস্থ্যের ওপর বিভিন্ন ধর্মীয় উপবাসের মত রোজার প্রভাব নিয়েও বিস্তর গবেষণা করা হয়েছে। রমজান মাসের রোজার প্রভাব সম্পর্কে মিশ্র ফলাফল পাওয়া গিয়েছে। এর পিছনে অবশ্য কারণ রয়েছেঃ 
১. রোজার সময়ের দৈর্ঘ্য ঋতুভেদে পরিবর্তন হয়; 
২. রোজাদারদের মধ্যে ধূমপানের হার এবং বিভিন্ন ওষুধ সেবনের কারণে অনেক ফলাফলে পার্থক্য হয়; 
৩. দেশ এবং প্রকৃতিভেদে খাবারের অভ্যাসের মধ্যেও অনেক পার্থক্য রয়েছে। 
সার্বিকভাবে দেখা যায় রোজার সময় ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেড়ে গিয়েছে কিংবা একই রকম রয়েছে। হিসেবে দেখা যায় রমজান মাসে ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ কিছুটা কমলেও, সৌদি মুসলিমদের ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা বেড়েছে। একই ভাবে অধিকাংশ গবেষণার ফলাফলে রোজার সময় শর্করা, চর্বি-তেল, প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। এমনকি রোজার সময় ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের মাত্রাও বেড়ে যায়। 

ফলে রোজার পরে অনেকের ওজন বেড়ে গিয়েছে কিংবা অপরিবর্তিত রয়েছে; রক্তের কোলেস্টেরল, গ্লুকোজ এবং অন্যান্য বিষয়ে আশাব্যাঞ্জক পরিবর্তন ঘটেনি। এর কারণ হিসেবে গবেষকগণ মূলত রোজাদারদের সেহরি এবং ইফতারিতে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নির্বাচনের ব্যর্থতাকে চিহ্নিত করেছেন। 

এজন্য স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

তথ্যসূত্রঃ Trepanowski JF, Bloomer RJ. The impact of religious fasting on human health. Nutr J. 2010 Nov 22; 9:57.

মেডিভয়েসকে বিশেষ সাক্ষাৎকারে পরিচালক

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শতাধিক করোনা বেড ফাঁকা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে