ডা. জামান অ্যালেক্স

ডা. জামান অ্যালেক্স

বিসিএস মেডিকেল অফিসার


০৪ জুন, ২০১৮ ০১:০৬ পিএম

কানুদ বৃত্তান্ত

কানুদ বৃত্তান্ত

কলিংবেলের একটানা শব্দে হয়ে ঘুম থেকে উঠতে হলো। বাসায় আমি একা, যে হারে কলিং বেল বাজছে, না উঠে উপায়ও নেই। আলুথালু চেহারা নিয়ে দরজা খুলে দরজার পেছনে উদাম শরীর রেখে মাথা বাড়িয়ে দেখি পাশের ফ্ল্যাটের এক আঙ্কেল দাঁড়িয়ে আছেন। কাচুমাচু চেহারায় জানালেন যে, কাইন্ডলি তার বাসায় একটু যেতে হবে, ঘোরতর বিপদে আছেন।

মেজাজ খানিকটা খারাপ হলো। বাসার বাইরে যাওয়া মানে এখন আয়েশের ঘুম বাদ দিয়ে হাত মুখ ধোয়া এবং তারপর জামা কাপড় পড়ার হাঙ্গামার মাঝ দিয়ে আমাকে যেতে হবে। হাতেনাতে ধরা পড়ে গিয়েছি, না বলার উপায়ও নেই। অগত্যা রওনা দিতে হলো।

উনার বাসায় ঢুকে মেজাজ আরো খারাপ হলো। আঙ্কলের উঠতি যুবক ছেলে বিছানায় কাত হয়ে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছে। যা বুঝলাম পেটে লালপানি পড়েছে, আঙ্কেল আমার কাছে সরাসরি স্বীকার করলেন না, তবে জানাজানি হবার ভয়ে হাসপাতালে না যেয়ে বাসায় চিকিৎসা করাতে চান, একারণেই আমাকে ডেকে আনা। এসব জায়গায় কথা প্যাঁচায়ে লাভ নাই, চিকিৎসা শুরু করলাম।

একই বাসায় আবার আমাকে যেতে হয়েছিল। সেবার আঙ্কেলের স্ত্রী অসুস্থ, সেবারও বাসায় চিকিৎসা দিলাম। একই ফ্যামিলির পরপর দুজন সদস্যেকে বাসায় গিয়ে চিকিৎসা দিলাম। মাঝে মাঝে তাদের সাথে রাস্তাঘাটে দেখা হয়। একবারও হাসি দিয়ে দুইটা কথা বলতে দেখি নাই। সম্ভবত আবারও কোন একদিন অসময়ে চেহারায় কাচুমাচু ভাব এনে সেই আঙ্কেল আমাকে ডাকতে আসবেন এবং ভালো রকম সম্ভাবনা আছে যে বিরক্ত মুখে আবারো আমি তার সাথে সাথে রওনা হবো!

দুই.

আমি আমার জুনিয়র কাজিনদের সান্নিধ্য বেশ উপভোগ করি। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে প্রতিদিন বয়স বেড়ে একটু একটু করে অলঙ্ঘনীয় মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি--এ ভয়ঙ্কর সত্যটি কিছুক্ষণের জন্য হলেও জুনিয়র কাজিনদের সাথে হৈ-হুল্লোড় করে ভুলে থাকা যায়।

সে কাজিনদেরই একজন যখন ফোনে জানালো যে তার পরিচিত এক রোগীকে দেখে দিতে হবে, আমি ততক্ষণাৎ আমার শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার প্ল্যান বাতিল করে চেম্বারে রাতের বেলা ওই রোগীকে অ্যাটেন্ড করলাম এবং চিকিৎসা দিলাম। দিনটি ছিলো শুক্রবার, এইদিন রাতে আমি কোন চেম্বার প্র্যাকটিস করি না। কিন্তু কাজিনের পরিচিত রোগী বলে কথা। নিজের প্ল্যান বাতিল করে তাকে চিকিৎসা দিলাম।

ঠিক এক সপ্তাহ পর আমার সাথে আবার ওই রোগী দেখা করতে আসলেন। জানালেন তার পূর্বের সমস্যার সমাধান হয়েছে তবে বৃহস্পতিবার থেকে তার জ্বর আসা শুরু হয়েছে। তার ধারণা আমার ওষুধ খেয়ে তার পূর্বের সমস্যার সমাধান হলেও এখন ঐ ওষুধের কারণেই তার জ্বর এসেছে!

আমি মনে মনে কিছুটা দুঃখ পেলাম। Drug fever বলে একটা ব্যাপার কিন্তু আছে, কোন কোন ওষুধ যে জ্বর আনতে পারে সেটাও আমি জানি। কিন্তু আমি তো রোগীটিকে সেরকম কোন ড্রাগ প্রেসক্রাইব করি নাই। রোগীকে সেটা বুঝালাম, এই জ্বরের কারণ যে Infective -সেটাও বললাম। আমার সামনে মাথা দুলিয়ে তিনি আমার কথা ভালোই বুঝলেন। মানবিক কারণে এবং কাজিনের রেফারেন্সের কথা বিবেচনা করে দ্বিতীয়বার আমার সাথে সাক্ষাতে আমি কোন ভিজিট রাখি নাই। এই দ্বিতীয়বার ভিজিট না রাখাটাই আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো।

রোগী মশাই দুয়ে দুয়ে চার মেলালেন, ধারণা করলেন,আমার চিকিৎসার কারণে জ্বর এসেছে বলেই নাকি আমি ভিজিট নেই নাই। ফার্মেসিওয়ালার সাথে এক চোট হম্বিতম্বি করলেন, চেম্বারে আসতে আমার দেরি হয়েছে কেনো-সেটা নিয়েও উনাকে শাসিয়েছেন। আগেই বলেছি -ওইদিনটাতে আমি রাতে কোন চেম্বার করি না।

ঘটনা শোনার পর আমার খুব মন খারাপ হয়েছিলো। বেড়াতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত করে, যেদিন রাতে চেম্বার করি না সেদিন হাসফাঁস করে দৌড়ে চেম্বারে গিয়ে, বিনা ভিজিটে রোগী দেখাটা কি তবে আমার ভুল হয়েছে? কাজিনকে মেসেজ করতে হলো, তুমি আমার কাছে আর পেশেন্ট পাঠিয়ো না

তিন.

আমার প্যানপ্যানানি বাদ দেই। একটা ন্যাশনাল ইস্যু নিয়ে কথা বলি। আবুল বাজনদার। পেশায় ভ্যানচালক। Epidermodysplasia verruciformis নামে এক বিরল রোগ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি হলো। তার জন্য মেডিকেল বোর্ড করা হলো, দেশের বাইরে তার রক্তের নমুনা পাঠানো হলো, ২৫টি অপারেশন করা হলো। এগুলো সবই করা হয়েছে সম্পূর্ণ বিনা পয়সায়। দীর্ঘ দুই বছর হাসপাতালে পরিবার নিয়ে ফ্রি খাওয়া দাওয়াও চললো, গায়ে গতরে তিনি এখন ভ্যানচালক নাকি সাহেব- সেটা ঠাওর করাও ডিফিকাল্ট। কোন এক চিকিৎসক তার নিজের টাকা দিয়ে আবুল সাহেবকে বাড়িও বানিয়ে দিলেন।

হঠাৎ আবুল সাহেবের কী জানি কী মনে হলো। তিনি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গেলেন। সাংবাদিক সাহেবরা যখন আবুল সাহেবকে পালানোর কারণ জিজ্ঞেস করলেন, তখন চিকিৎসকদের ওপর বিষাদগার করে নিম্নরূপ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করলেন-

ক. সরকারি মোটা চালের ভাত তার মুখে রুচে না (ডক্টরস ক্যান্টিন থেকে তার জন্য চিকন চালের ভাতের সাময়িক ব্যবস্থা করা হয়েছিলো)।

খ. চিকিৎসকরা দুর্ব্যবহার করেন (যে রোগীর দায়িত্ব প্রাইম মিনিস্টার নিজে নিয়েছেন, সেখানে এ যুক্তি অচল)

গ.যে রুমে তিনি থাকেন, সেই রুমে নাকি এসি নাই, তাই সেখানে থাকতে তার কষ্ট হয়(মনে করিয়ে দিচ্ছি, আবুল বাজনদার পেশায় একজন ভ্যানচালক। অবশ্য ভ্যানচালক যে এসির নীচে থাকতে চাইতে পারবেন না-এরকম কোন আইন দেশে এখনও তৈরি হয় নাই)।

আবুল বাজনদারের চিকিৎসার সামগ্রিক দেখভাল করার দায়িত্ব ছিলো ডা. সামন্ত লাল সেন স্যারের ওপর। পালিয়ে গিয়ে আবুল মিয়া যখন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে সরগরম বক্তৃতা দিচ্ছেন তখন স্যারের উক্তি ছিল- This is what we got in return after we treated him over the past two years.

আমরা ছিলাম স্যারের ইন্টার্ন। কতটুকু দুঃখ নিয়ে ডা. সামন্ত লাল সেন স্যার একথা বলেছেন-সেটা আমরা ভালোই বুঝি!

চার.

"আল্লাহ বলছেন মানুষ হচ্ছে كنود কানুদ। কানুদ হচ্ছে এমন একজন, যার জন্য ভালো কিছু করা হলেও সে তা স্বীকার করে না। এরা সারাদিন বসে শুধু হিসেব করে তার কত অভাব, কত দুঃখ, কত কিছু পাওয়া হলো না। কিন্তু সে জীবনে কত ভালো কিছু পেয়েছে, সেগুলো নিয়ে ভেবে দেখে না...."

একটা আর্টিকেল পড়তে গিয়ে লেখাটা চোখে পড়েছিলো। সংগ্রহ করে রেখেছিলাম। প্রাসঙ্গিক, তাই সংগ্রহটা আপনাদের কাছে তুলে ধরলাম।

পাঁচ.

এই বাংলায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম শোনেননি এরকম শিক্ষিত মানুষ বোধ করি খুঁজে পাওয়া যাবে না। পরোপকারে উনি ছিলেন কিংবদন্তীতুল্য। জনসাধারণের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন দয়ার সাগর নামে। দরিদ্র, আর্ত ও পীড়িতরা কখনই তাঁর দ্বার থেকে শূন্য হাতে ফিরে যেত না। এমনকি নিজের চরম অর্থসংকটের সময়ও তিনি ঋণ নিয়ে পরোপকার করেছেন। এবার উনার একটা কাহিনী আপনাদের শোনাই-

বিদ্যাসাগরকে একবার জানানো হলো, বৈঠকখানার বাইরে কেউ একজন তাঁর নাম নিয়ে তাঁকে গালিগালাজ করছে। বিদ্যাসাগর স্মিতহাস্যে বলেছিলেন- ঠিকমত খবর নাও। নিশ্চয়ই একদিন না একদিন আমি তার উপকার করেছি

খবর নেয়া হলো। বের হলো সত্যিই বিদ্যাসাগর একবার তার উপকার করেছিলেন!

এ জাতি যে উপকারির অপকার করে, এ জাতির রক্তে যে নিমকহারামি বয়ে চলছে-সেটা ঈশ্বরচন্দ্র বোধ করি ভালোই জানতেন। কালজয়ী ব্যক্তিরা কালজয়ী কিন্তু এমনি এমনি হন না, তারা দূরদর্শী ছিলেন বলেই কালকে জয় করতে পেরেছিলেন।

 

ছয়.

লেখাটা শেষ করি।

(ইবলিশ বললো) আমি মানুষের কাছে আসবো: ওদের সামনে থেকে, ওদের পেছন থেকে,ওদের ডান দিক থেকে এবং ওদের বাম দিক থেকে। আপনি দেখবেন ওরা বেশিরভাগই কৃতজ্ঞ না

সুরা আ'রাফের কয়েকটি লাইন। পড়েছেন? বুঝেছেন? না বুঝলে আবার পড়ুন। লাইনগুলো ছিলো অভিশপ্ত হবার মুহূর্তে মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি ইবলিশের কতিপয় শপথবাক্য।

পুনশ্চ: দিনের পর দিন শত সহস্র মানুষের পাশে থেকে চিকিৎসাসেবা দেয়ার পরও যারা আমাদের প্রতি অকৃতজ্ঞতার ডালি খুলে পাপাত্মা ইবলিশের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন, তাদের প্রতি রইল আমাদের গভীর সমবেদনা।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত