ডা. কাওসার উদ্দিন

ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


০১ জুন, ২০১৮ ০২:১৯ পিএম

নাপিতের ডাক্তারি বিদ্যা শেখার গল্প

নাপিতের ডাক্তারি বিদ্যা শেখার গল্প

এক গ্রামে এক নাপিত বাস করতো। সেই নাপিত লোকের চুল কাঁটতো আর শেভ করতো, পাশাপাশি সে ব্যাটা ছোটখাট অপারেশনও করতো! গ্রামের কারো ফোঁড়া হলে সোজা চলে যেত নাপিতের কাছে! নাপিত তার ক্ষুর দিয়ে ফোঁড়া কেটেকুটে লতাপাতার প্রলেপ লাগিয়ে রোগী বিদায় করতো! এতে ঝড়ে বক মরার মত দু'একটা রোগী ভালও হত! আর এভাবেই চতুর্দিকে নাপিতের নাম ছড়িয়ে পড়লো!

কিছুদিন পর সেই গ্রামে সত্যিকারের এক ডাক্তার এলেন পোস্টিং নিয়ে। কাছেই এক গ্রাম্য বাজারে চেম্বার খুলে বসলেন তিনি। চেম্বারের সামনে তার ডিগ্রিগুলো লিখে বড় একটা সাইনবোর্ডও লাগালেন। কিন্তু ডাক্তার সাহেব বসে বসে খালি মশাই মারেন, কারণ রোগী যায়না তার কাছে! কেনই বা যাবে? গ্রামের মানুষ মনে মনে ভাবে, 'নাপিতের কাছে গিয়ে চুল কাঁটার সাথে যদি ফোঁড়াও কাঁটা যায় তাহলে আর এমবিবিএস ডাক্তারের কি দরকার!'

ডাক্তার সাহেব তার চেম্বারের এহেন দুর্দশা দেখে এর কারণ অনুসন্ধান শুরু করলেন। খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারলেন গ্রামের সেই ফোঁড়া কাঁটা নাপিতের কথা! কী করা যায় সেটা নিয়েও ভাবতে লাগলেন। ভাবতে ভাবতে একদিন গিয়ে দেখা করলেন নাপিতের সাথে। যেয়ে বললেন, "আপনার তো বেশ নাম-ডাক! ছোটখাট অপারেশন আপনি বেশ সফলতার সাথেই করেন! ডাক্তারি না জেনেও আপনি যেভাবে ডাক্তারি করেন, সাথে যদি মেডিকেল বিদ্যা সম্পর্কে দু’এক মাসের ট্রেনিং নিতেন তাহলে আরো অনেক দূর যেতে পারতেন! মানুষ আরো বেশি উপকৃত হত আপনার মাধ্যমে!"

ডাক্তারের এ কথা শুনে নাপিত ভাবল, ' বুদ্ধি তো খারাপ না।' সে বলল, "ডাক্তার সাব, ভালা বুদ্ধি দিছেন। কিন্তু আমি তো লাইন ঘাট কিছু জানি না! আপনি যদি দয়া করে আমারে একটু শিখিয়ে পড়িয়ে দিতেন!" ডাক্তার বললেন, "অবশ্যই! এ জন্যই তো আপনার কাছে আসা! আপনি এক কাজ করবেন, প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমার চেম্বারে চলে আসবেন। আমি আপনাকে প্রতিদিন এক ঘন্টা করে ট্রেনিং দিব! আপনার যে অভিজ্ঞতা, তাতে ডাক্তারি বিদ্যা শিখতে দু'এক মাসের বেশি লাগবেনা! তবে একটা শর্ত আছে, এই সময়ের মধ্যে আপনি কোন ফোঁড়াটোড়া কাঁটতে পারবেন না।"

নাপিত রাজি হলো। আর পরদিন থেকে শুরু হল নাপিতের ডাক্তারি বিদ্যা শেখার ক্লাশ! চলল এক নাগাড়ে দু মাস! দু মাসের মাথায় ডাক্তার সাহেব নাপিতকে বললেন, "বেসিক ব্যাপারগুলো আপনি মোটামুটি সবই শিখে ফেলেছেন! আপাতত আর দরকার নেই! বাকি যা আছে সেটা আস্তে আস্তে শিখলেও চলবে!" নাপিত, ডাক্তার সাহেবকে সালাম দিয়ে খুশি হয়ে নাচতে নাচতে ফিরে গেল তার চেম্বার কাম সেলুনে!

আজ নাপিত ডাক্তারের প্রথম দিন! মনবল টগবগ করছে তার! মনে মনে সে ভাবছে, "এতদিন কিছু না বুইঝাই ফোঁড়া কাটছি। কিন্তু আজ আমি ডাক্তারি বিদ্যার জাহাজ! আমায় আর ঠেকায় কে!" হঠাৎ এক রোগীর আগমন! সমস্যা তার টু-ইন-ওয়ান! চুলগুলো বেশ বড় হয়েছে, সাথে বাম হাটুর বেশ খানিকটা উপরে বড় একটা ফোঁড়া! ক'দিন খুব যন্ত্রনা দিচ্ছে ফোঁড়াটা। তাই আজ সুযোগ বুঝে নাপিতের কাছে আসছেন এক ঢিলে দুই পাখি মারতে! অন্যদিন হলে নাপিত আগে চুল কাঁটে, পরে ফোঁড়া! কিন্তু নাপিত আজ উল্টোটা করবে বলে ঠিক করলো! সে তার চারজন নাপিত সহকারীকে বললো, "রুগীরে দে শোয়াইয়া! সাবলন, এন্টিবাটিক বাইর কর, গজ মজ যা আছে এক্ষুনি রেডি কর! কুইক...(ডাক্তারের কাছে ডাক্তারি শিখতে গিয়ে নাপিত দু'একটা ইংরেজিও শিখেছে!)

এবার শুরু হবে ফোঁড়া কাটার অপারেশন! রোগীকে চিত করে শোয়ানো হলো! চারজন নাপিত চেপে ধরেছে রোগীকে! সবকিছু আগের মতই ঠিকঠাক! ক্ষুর হাতে নাপিত আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে! প্রথমে হাত দিয়ে ফোঁড়ায় আলতো চাপ দিলো! তুলতুলে লুকলুকির মত হয়ে থাকা ফোড়াটির মুখ হলদে সাদা হয়ে আছে! অপারেশনের এক্কেবারে পারফেক্ট অবস্থা! নাপিত যেই না ছুরিখানা ফোঁড়ার উপর বসাতে যাবে, ঠিক তখনই তার মনে পড়লো সদ্য শেখা ডাক্তারি বিদ্যা! তার মনে হতে লাগল ফোঁড়াটা যেখানে তার ঠিক নিচেই কোন রগ-টগ আছে! ডাক্তার সাব কি সব ইংরেজি নাম টাম কইছিলো, সেগুলো তো আর মনে নাই, কিন্তু জিনিস তো ঠিকই আছে। ফোঁড়া কাটতে গিয়ে যদি রগ কেটে যায় তাহলে রোগীর অবস্থা খারাপ হইয়া যাইবে! এইসব চিন্তা মাথায় আসা মাত্রই অল্প বিদ্যার ভাঙা জাহাজ নাপিতের হাত কাঁপা শুরু হলো! ক্ষুর নিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে! বাকি সহকারীরা নাপিতের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো, 'অন্যদিন তো ‘ধর তক্তা মার পেরেক’ স্টাইলে অপারেশন চলে! কিন্তু আজ নাপিত বাবুর কী হলো!'

এভাবে মিনিট দু’য়েক যাবার পর নাপিত আবার অপারেশন করতে উদ্যত হল! যেই না ক্ষুর চালাতে যাবে, ঠিক তখনই তার আবার মনে পড়ে গেল, ডাক্তারের কাছে সে জেনেছে অপারেশন ঠিকঠাক মত না হলে পরবর্তীতে সেখানে ইনফেকশন হতে পারে, তখন পুরো অঙ্গটাই কেটে ফেলা লাগতে পারে। এতে অনেক সময় রোগী মারাও যেতে পারে। আর এমন ঘটনা ঘটলে, মামলা-মোকদ্দমা হয়ে তাকে জেলে পর্যন্ত যাওয়া লাগতে পারে! থরথর করে কাঁপতে লাগলো নাপিতের হাত! কাঁপতে কাঁপতে নাপিতের ক্ষুরখানা শেষমেশ মাটিতেই পড়ে গেল! অপারেশন আর হলনা!

এরপরের দিন নাপিতের কাছে তার এক পুরনো রোগী আসলো! কয়েকদিন আগে যার ফোঁড়া কেটেকুটে নাপিত লতাপাতা লাগিয়ে দিয়েছিল! সেই কাটা জায়গায় খারাপ ইনফেকশন হয়ে রোগীর এখন যায়যায় অবস্থা! অন্য সময় হলে নাপিত মুখের উপর বলে দিত, "ভগবান তোরে খারাপ রোগ দিছে, আমার এখন কিচ্ছু করার নাই, খোদারে ডাক...!" কিন্তু নাপিত আজ সেটা না বলে, রোগীকে বাজারের সেই এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে বলল!

মৃতপ্রায় সেই রোগী নিয়ে রোগীর লোকজন বাজারের সেই এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে হাজির হল! ডাক্তার দেখলেন রোগীর অবস্থা খারাপ, জ্ঞান কম, পালস বিপি নিভুনিভু। কোন রকম একটা ইনজেকশন দিয়ে রেফার করে দিলেন সদরে! পথে যেতে যেতে মৃতপ্রায় রোগী পটল তুলে ফেলল! রোগীর লোকজন মনে করল ব্যাটা ডাক্তারের অবহেলায় রোগী মরেছে! গ্রামের ক্যাডারবৃন্দ একজোট জয়ে ডাক্তারের চেম্বার ভাংচুর করল! ডাক্তারের হাড় হাড্ডি দু একটা ভেঙে ঘোষণা করলো 'ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু!'

পরদিন এক সাংবাদিক পত্রিকায় বড় বড় করে ছেপে দিলো 'ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু!' বুড়ো নাপিত চশমার ফাঁক দিয়ে পত্রিকায় খবর পড়ে আর হাসে! হাসতে থাকে এলাকার আরো কিছু হাতুড়ে ডাক্তার, যাদের অপচিকিৎসায় ছাই দিয়েছিলো ওই এমমিবিএস ডাক্তার। এতসব সহ্য করতে না পেরে সেই ডাক্তার চাকরি ছেড়ে সেখান থেকে চলে যান, সিদ্ধান্ত নেন বিদেশে পাড়ি জমানোর। আর এভাবেই একের পর এক হলুদ সাংবাদিকতার ফাঁদে পড়ে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় অসংখ্য ডাক্তারকে। অনেক মেধাবী ভিতশ্রদ্ধ হয়ে এ মহান পেশায় আসা বন্ধ করে দেন, দেশে তৈরি হয় মেধাবী চিকিৎসক সংকট!

সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না