ডা. কাওসার উদ্দিন

ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


৩১ মে, ২০১৮ ০২:১০ পিএম

'তুই এখন যাবি কই, মর্গে না হাসপাতালে?'

'তুই এখন যাবি কই, মর্গে না হাসপাতালে?'

মেডিকেল কলেজে প্রফেসর মিজান স্যার ছিলেন আমাদের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক। এর কারণ ছিল সব কিছুতে স্যারের অত্যধিক কড়াকড়ি ও বাড়াবাড়ি শাসন। মেডিকেলে ভর্তি হয়েই দু’জন স্যারের বেশ নাম ডাক শুনি। যারা ছিলেন আমাদের জন্য দুঃস্বপ্ন, যাদের কাছে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করাটা ছিল আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মত। 

এই দু'জন হলেন ফরেনসিকের প্রফেসর মিজান স্যার ও কমিউনিটি মেডিসিনের প্রফেসর জব্বার স্যার। আজকের গল্প সদ্য প্রয়াত প্রফেসর মিজান স্যারকে নিয়েই।

ফার্স্ট প্রফ শেষে থার্ড ইয়ারে উঠেই পরিচয় ঘটে মিজান স্যারের সাথে। ফার্স্ট ও সেকেন্ড ইয়ার পর্যন্ত আমাদের ক্লাশ শুরু হত সকাল ৯ টায়। কিন্তু থার্ড ইয়ার থেকে সেটা হয় সকাল ৭ টায়। আর মিজার স্যারও বেছে বেছে সকাল ৭ টার ক্লাশটাই নিতেন। এর আগে ৯ টায় ক্লাশ থাকায় বেশ বেলা পর্যন্ত ঘুমানোর অভ্যাস ছিল, মিনিট পাঁচেক আগে উঠে তড়িঘড়ি করে দাঁত ব্রাশ করে ক্লাশে দৌড়াতাম, ৫-১০ মিনিট দেরি হলেও খুব একটা ঝামেলা হত না। 

কিন্তু এখন কী হবে আমাদের! তো মিজান স্যার যথারীতি সকাল ৭ টার আগেই ক্লাশে চলে আসতেন। তার ফরেনসিক ক্লাশের পার্সেন্টেজের মূল্য ছিল হীরের চেয়েও দামি। কম থাকলে পরীক্ষায় বসা একেবারেই অসম্ভব। আর তার ক্লাশে সাপ্লি দিয়ে বেঁচে যাওয়াটা এভারেস্ট জয়ের শামিল! তাই যে যতই ঘুমকাতুরে হোক না কেন, সবাই ঠিক সময়মত ঝিমাতে ঝিমাতে স্যারের ক্লাশে হাজির হতাম। 

তখন শীতের সকাল। ৭টা মানে সূর্য মাত্র উঠেবে উঠবে, চারপাশ তখনও অন্ধকার থাকতো। এর মধ্যেই সবাই এসে লেকচার গ্যালারিতে বসেছি। স্যার ৭টা বাজার ৫ মিনিট পরই দরজা লাগিয়ে দিলেন। তার অল্প কিছুক্ষণ পরই কোন এক মস্ত সাহসীর আগমন এবং দরজায় ঠকঠক শব্দ। স্যার আস্তে আস্তে দরজা খুলে বের হলেন। পুরো গ্যালারিতে পিনপতন নীরবতা, কিছুক্ষণ কোন সাড়াশব্দ নেই, স্যারেরও কোন খোঁজ নেই। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল দেরি করে আসা বন্ধুটিকে স্যার তাড়া করে তবেই এসেছেন!

স্যার অনেক বেশি নিয়ম মেনে চলতেন। পড়াতেন খুব ভাল, এক কথায় অসাধারণ। এলকোহল পড়ানোর সময়, পান করে কেউ মাতাল হলে যেভাবে কথা বলে- স্টেজে দাঁড়িয়ে সেভাবেই অভিনয় করে দেখাতেন। পরীক্ষায় সময় স্যারের চোখে চোখ রেখে তাকানো যেত না। কোন কিছু না পারলে, স্যরি বলা যেত না। ভুলক্রমে স্যরি বললে, ব্যাঘ্র কন্ঠে উত্তর আসতো, এটা কি নাটক ড্রামা?' 

পরীক্ষায় স্যার প্রশ্ন করতেন, 'কাউকে মেরে গলায় রশি বেধে ঝুলিয়ে রাখলাম, এটা কী সুইসাইড না হোমিসাইড?' স্যারের টোপে পা দিয়ে যে দুর্ভাগা হোমিসাইড বলতো তার জন্য অপেক্ষা করতো আরো ৬ মাসের নির্বাসন। স্যার অল অর নান ল ফলো করতেন। ভাইভাতে হয় পাশ করাবেন, আর ফেল করালে এমন মার্ক দিতেন যে এক্সটার্নাল অনার্স দিয়েও সেটাকে আর পাশ বানাতে পারতো না।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁর প্রশ্নও ছিল বিচিত্র। যেমন- এক ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'এই তোর বাড়ি কই? 
ভাই: ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ। 
স্যার: বল বাংলাদেশের আর কোথায় কালিগঞ্জ আছে, পারলে পাশ!

মিজান স্যার বেশ নীতিবান মানুষ ছিলেন। আজিমপুর কোয়ার্টার থেকে রিকশায় করে প্রতিদিন ঠিক টাইমে কলেজে এসে হাজির হতেন। স্যারের স্ত্রী গাড়িতে চড়ে অফিসে আশা যাওয়া করলেও, স্যার সব সময় রিকশাতেই চড়তেন। শুনেছি স্যার নাকি জীবনে দুবার তার শ্বশুর বাড়িতে গিয়েছেন। তাঁর মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন নাকি এক দিনের নোটিশে। একবার কোন এক কারণে এক পুলিশ কর্মকর্তা তার পা ধরে মাফ চাইলে তিনি ডিপার্টমেন্ট এর অন্য সব স্যারদের ডেকে দিয়ে সেটা দেখিয়েছিলেন। কিছুটা ক্ষ্যাপাটে আর পাগলাটে থাকলেও স্যার বেশ সৎ ও সাহসী ছিলেন। 

স্যার কেমন পাগলাটে ছিলেন, তার একটি গল্প বলি। স্যার একবার সিএনজিতে করে মহাখালী থেকে ঢাকা মেডিকেল আসবেন। স্বভাবতই সিএনজি ড্রাইভার স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ গুণ ভাড়া চাইলো। স্যারও কোন প্রকার উচ্চবাচ্য না করে সিএনজিতে চড়ে বসলেন।

সিএনজি যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে পৌছাল, স্যার নেমেই জিজ্ঞেস করলেন, 'তুই এখন যাবি কই, মর্গে না হাসপাতালে?' স্যারের হুংকারে সিএনজি ওয়ালা মিটারের ভাড়া রেখে সে দফায় রক্ষা পেয়েছিল, তা না হলে ব্যাটাকে মর্গে না হোক হাসপাতালে যেতে হত!

এমন অসংখ গল্প আর অম্লমধুর স্মৃতিকথা আছে মিজান স্যারকে নিয়ে, আজ যা শুধুই ইতিহাস। স্যারের জন্য দোয়া রইলো, ফি আমানিল্লাহ।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না