ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার,
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
প্যাথলজি বিভাগ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ।


২৯ মে, ২০১৮ ১১:৩৭ এএম

মেডিকেলে কম্পিউটারের শখ

  • মেডিকেলে কম্পিউটারের শখ
  • মেডিকেলে কম্পিউটারের শখ

যতদূর মনে আছে কম্পিউটার শব্দটা আমি প্রথম শুনেছি ১৯৮০ সনে। তখন আমি এমবিবিএস প্রথম বর্ষের ছাত্র। ডাইনিংয়ে বসে টেলিভিশনে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখছিলাম। উপস্থাপক ছিলেন আনিসুল হক (ঢাকা উত্তরের প্রয়াত মেয়র)।

তিনি কোন একটি সংখ্যা তত্ত্বের কথা বলছিলেন যা কিনা কম্পিউটার দিয়ে হিসাব করে দেখা হয়েছে। এতবড় হিসাব মানুষের দ্বারা করা কঠিন। এমন একটা যন্ত্রের প্রতি আমার আরও জানতে আগ্রহ হল। এর যেখানেই একটু আধটু কম্পিউটার নিয়ে পত্রিকায় লিখা হত আমি পড়তাম।

জানুয়ারি ১৯৯২ সনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে প্রভাষক হয়ে প্যাথলজি বিভাগে প্রবেশ করলাম। এর আগে উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে ছিলাম। অধ্যক্ষ ছিলেন অধ্যাপক মোফাখখারুল ইসলাম স্যার। খুব সম্ভব তখন ভাইস প্রিন্সিপ্যাল কেউ ছিলেন না।

প্রিন্সিপাল স্যারের রুমের বিপরীত দিকের রুমে দরজায় লিখা ছিল ‘কম্পিউটার রুম, দরজা বন্ধ রাখুন এসি চলছে।’

বুঝতে পারলাম এবার কম্পিউটার দেখার সুযোগ এসেছে। আনিস ভাইয়ের কাছে জিজ্ঞাসা করলাম-
-কম্পিউটার রুম সবসময় তালামারা থাকে, কখন খোলা হয়। ওখানে সবসময় এসি চলে নাকি?
-ওটা একমাত্র চালাতে পারে সাইদুল ইসলাম স্যার। তিনি জাপান থেকে পিএইচডি করা। তিনি ওই দেশ থেকে কম্পিউটার চালনা শিখেছেন। ওনাকে ছাড়া আর কেউ পারেন না। চাবি শুধু ওনার কাছেই।
-এসি চলে কেন?
-কম্পিউটারের ব্রেইন মানুষের থেকেও পাওয়ারফুল। ওটাকে সবসময় ঠাণ্ডা রাখতে হয়।
-সারা কলেজে তো মাত্র দুইটি এসি আছে। একটি প্রিন্সিপ্যাল স্যারের রুমে আরেকটি কম্পিউটার রুমে।
-আসলে ওটা ছিল ভাইস প্রিন্সিপাল রুম। এখন তো ওই পদে কেউ নেই।

আমি মাঝে মাঝে ওই রুমের পাস দিয়ে হেঁটে যাই এই আশায় যে কোন দিন হয়ত আমার সামনেই দরজা খুললে দরজার ফাঁকে এক পলক দেখে নিব।

একদিন দেখি তালা খোলা। দরজা একটু ফাঁক হয়ে আছে। আমি চুপিসারে চোরের মত ফাঁক দিয়ে তাকালাম। দেখলাম ১২ ইঞ্চি সাদাকালো টেলিভিশনের মত একটি জিনিস। তার সামনে একজন খাটো স্যার ফূর্তিতে নড়াচড়া করছে। মনিটরের পর্দার উপর একেক দিক থেকে একেকটি প্যারাট্রুপ আসছে, তিনি নিচে একটি বোর্ডে বুতাম টিপছেন, সাই সাই করে গুলি বের হচ্ছে, আর প্যারাট্রুপ পরে যাচ্ছে।

ভাবলাম এটা আবার কেমন কম্পিউটার। আসলে তিনি তখন প্যারাট্রুপার গেম খেলছিলেন। যতবড় পিএইডিই হোন খেলার নেশা প্রায় সবার আছে। খেলাও সব জায়গায় আছে। কম্পিউটার দেখা হল। দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণ হল। আমি যে দেখেছি তা কেউ দেখল না। আর দেখতে আগ্রহও হল না।

জুলাই ১৯৯৩ সনে পিজিতে ভর্তি হলাম এম ফিল (প্যাথলজি) পড়তে। পিজির তখন নাম ছিল আইপিজিএমআর, এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে আমাদের ল্যাবে একটি কম্পিউটার ছিল ওইটার মতই। খুশী হলাম এবার এটা ব্যবহার করার সুযোগ পাব।

ওটা শুধু যারা থিসিস পার্টে তারাই ব্যবহার করার সুযোগ পান। আমাদের এক ব্যাচ আগে ছিলেন আমাদের কামরুল ভাই (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য বিদায়ী ভিসি কামরুল হাসান)। তিনি এবং তার ব্যাচের সৈয়দ ভাই, নুরুল ইসলাম ভাই আমাকে কম্পিউটারে টাইপ করা ও প্রিন্ট করা শিখায়েছেন। মাউস ছিল না। ফ্লাট সিপিউ এর উপর মনিটর বসানো ছিল। সামনে একটা ছোট কীবোর্ড। সাইডে একটা ডট প্রিন্টার।

ফ্লপি ডিস্কে ডাটা সেইভ করে রাখতাম। ডস অপারেটিং সিস্টেম ছিল। ওয়ার্ড স্টার দিয়ে ফাইল কম্পোজ করতাম। এরো টিপে পয়েন্টার সরাতাম। ট্যাগ দিয়ে লেখা বোল্ড ও ইটালিক করতাম। এভাবেই আমরা আমাদের থিসিস বই টাইপ করে প্রিন্ট করেছি।

একবার এক মজার কাণ্ড হয়ে গেল। দুপুর ১ টার সময় ছয়তলা থেকে পাচতলার রুমে এসে হন্ত দন্ত হয়ে আমাদের ব্যাচের নব কুমার এসে বললেন ‘কম্পিউটার এর কীবোর্ড চুরি হয়ে গেছে। ’

আমি ও হারুন বসেছিলাম সেখানে। আমরা একই ব্যাচের। সমসাময়িক এমবিবিএস। নব কুমার সলিমুল্লাহ, হারুন ঢাকা আর আমি ময়মনসিংহ মেডিকেলের গ্রাজুয়েট। নব কুমার সাহা এখন সিলেট এম এ জি ওসমানী এবং হারুন অর রশিদ খান শিল্পী সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক।

যাইহোক, আমরা তিনজন দৌঁড়িয়ে কম্পিউটার রুমে গেলাম। লিফটের দরজার সাথেই কম্পিউর রুম। ধারণা হল লিফট দিয়েই হয়ত চোর কীবোর্ড নিয়ে সাচ্ছন্দ্যে নিচে নেমে গেছে।

আমাদের ধারণা ছিল, এই কীবোর্ডের দাম প্রায় ৬০/৭০ হাজার টাকা হতে পারে। হারালে আমাদের তিনজনকেই শেয়ার করতে হবে। মাথা গরম হয়ে গেল। তিনজন তিন গেইটের দিকে দৌড়ালাম। ততক্ষণে চোর গেইট দিয়ে বের হয়ে হয়তো বাসে উঠে চম্পট দিয়েছে।

দশ মিনিট পর তিনজনই বিফল হয়ে ফিরে এলাম। নব কুমারের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আমি আশ্বাস দিলাম ‘টেনশন কইরেন না, আমরা তিন জনই এটার দাম শেয়ার করব।’

শিল্পী বললেন ,‘তাড়াতাড়ি কামাল স্যারকে জানানো দরকার’।

কামাল স্যারকে আমরা বাঘের চেয়েও ভয় পেতাম। তিনি ছিলেন সহকারী অধ্যাপক। পরে তিনি অধ্যাপক ও বিভাগের চেয়ারম্যান হন। বিশ্বখ্যাত হিস্টোপাথলজিস্ট। সার্ক একাডেমি অব প্যাথলজি এর চেয়ারম্যান। তিনি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল। তখন বিভাগীয় প্রধান ছিলেন অধ্যাপক বি আর খান স্যার। শিখাতেন বেশী কামাল স্যার। শাসন করতেন বেশী কামাল স্যার, বন্ধুও ছিলেন কামাল স্যার।

আমরা কামাল স্যারকে খুঁজলাম। তিনি বি আর খান স্যারের সাথে কথা বলছেন। অনুমতি নিয়ে ভিতরে ঢুকলাম।কামাল স্যার বললেন
- কী সমস্যা?
-(নব) আমাদের কীবোর্ডটা কিছুক্ষণ আগে চুরি হয়েছে, স্যার।
-কিভাবে হল?
-স্যার, প্রিন্ট করতে গিয়ে কাগজ শেষ হয়েছিল। আমার সাথে কেউ ছিল না। আমি দরজা খোলা রেখে নিচ তলায় গিয়েছিলাম কাগজ আনতে। এর মধ্যেই চোর এসে চুরি করে লিফট দিয়ে নেমে চম্পট দিয়েছে। আমরা তিনজন তিন গেইট পর্যন্ত গিয়েছিলাম। ধরতে পারিনি।
-কেন দামী জিনিস রেখে দরজা খোলা করে চলে যাবেন? যান এটা কিনে দিবেন।
-স্যার, তবুও স্যার, আরেকটু চেষ্টা করে দেখি ধরতে পারি কিনা। যাই?
-যান।
আমরা ঘুরে ফিরে যাচ্ছিলাম। স্যার ডাকলেন
- দাঁড়ান।
আমরা ঘুরে দাঁড়ালাম। দেখলাম কীবোর্ডটা টেবিলের উপর। হয়ত এতখন ড্রয়ারে রাখা ছিল।
- নিয়ে যান। আর কখনো এমন অসতর্ক হবেন।

আমরা কীবোর্ড নিয়ে বের হলাম। বাইরে এসে হাসি আর চেপে রাখতে পারলাম না।

ফিক ফিক করে কিক কিক করে হাসি বেরিয়ে পড়ল। নিচ তলায় গিয়ে কিছুক্ষণ ফ্রি স্টাইলে হেসে নিলাম। পরে মার্কেটে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখি একটা নতুন কীবোর্ডের দাম মাত্র দুইশত টাকা। শোনে থার্ড রাউন্ড হেসে নিলাম। এখন ২১ বছর পরও একটি নতুন কীবোর্ডের দাম দুইশত টাকাই!

করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক

এক বছর প্রয়োগ হবে সেনা সদস্যদের দেহে

চীনে করোনার প্রথম ভ্যাকসিন অনুমোদন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত