ডা. জামান অ্যালেক্স

ডা. জামান অ্যালেক্স

বিসিএস মেডিকেল অফিসার


২৫ মে, ২০১৮ ০২:৪০ পিএম

জারিনকে বাঁচাতে দুটো প্রস্তাব

জারিনকে বাঁচাতে দুটো প্রস্তাব

মৃত্যু বিষয়টা চিকিৎসকদের বোধ হয় খুব একটা আন্দোলিত করে না। অবশ্য যে জিনিসটা প্রায় প্রতিদিন দেখতে হয় সেটা কাউকে আন্দোলিত করার কথাও না। ঢের উদাহরণ দিতে পারি যেখানে কিছুক্ষণ আগে ডেথ ডিক্লেয়ার করে তার কিছুক্ষণ পর রুমে ঢুকে টিভির রিমোট টিপাটিপি করে চ্যানেল চেঞ্জ করছি।বাইরে হয়তো তখন মৃত লোকটির স্বজনদের আহাজারির শব্দ শেনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে নিজেকে তাই খুব হৃদয়হীন বলে মনে হয়।

তবে এই কঠিন হৃদয়কে সবসময় কঠিন রাখতে পারি নাই। ডিএমসিতে আমি যখন মেডিসিন ডিপার্টমেন্টে  ট্রেনিং করতাম তখন আমার স্ত্রী ট্রেনিং করতো একই হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক্সে। মাঝে মাঝে হেঁটে নিজের ডিপার্টমেন্ট থেকে শিশু বিভাগের ওয়ার্ডে যেতে হতো। 

ডিএমসির শিশু বিভাগের ওয়ার্ডে তখন কাঁচঘেরা একটা রুম ছিল। সেখানে যে সমস্ত শিশুরা বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সারে আক্রান্ত তাদের কেমোথেরাপী দেয়ার জন্য রাখা হতো। মাঝে মাঝে ওয়াইফের সাথে সে রুমটাতে ঢুকতাম, ও কেমোথেরাপী দিতো। ও বলতো, 'জানো, এ বাচ্চাগুলোর বেশীরভাগই মারা যাবে, বেশীরভাগেরই কেমোথেরাপী শিডিউল শেষ করার টাকা নেই...'

বাচ্চা বাচ্চা রোগীগুলোকে ও যখন কেমোথেরাপী দিত তখন কোন কোন বাচ্চা কেমোথেরাপীর যন্ত্রণায় তারস্বরে কান্নাকাটি করতো, কোন কোন বাচ্চা শূন্য দৃষ্টি নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকতো, তবে সেই চোখে একটা স্পষ্ট প্রশ্ন থাকতোঃ 'তোমরা আমাদের এত কষ্ট দাও কেন?'... আমি বেশীক্ষণ ঐ ওয়ার্ডে থাকতে পারতাম না। যন্ত্রণায় কাতর বাচ্চাগুলোর চোখ আমাকে তাড়িয়ে বেড়াতো। ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে বুকের ভেতর আটকে থাকা গুমোট কষ্টটাকে ছুটি দিতে হতো...

দুই.

আচ্ছা হঠাৎ মৃত্যু নিয়ে, ক্যান্সার নিয়ে কথা বললাম কেন? কারণটা বলি। মেয়েটির নাম জারিন তাসনিম রাফা। মেডিকেলের ফিফথ্ ইয়ারে পড়ে, খুব দ্রুতই হয়তোবা ডাক্তার হয়ে যেতো। "যেতো" বলছি কেন? কারণ মেয়েটার জীবন আর আমাদের মত স্বাভাবিক নেই...

হঠাৎ মেয়েটি একদিন জানতে পারে সে ব্লাড ক্যান্সারে( Acute Myeloid Leukaemia) আক্রান্ত। চিকিৎসা শুরু হলো, ব্লাড দেয়া হলো, কেমোথেরাপী দেয়া হলো। একসময় তাকে জানানো হলো যদি সে বাঁচতে চায় তবে তার Bone marrow transplant ছাড়া আর কোনো গতি নেই। মুহূর্তেই তার পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গেলো। সে বাঁচতে চায়, তবে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করার মত এত টাকা (৮০ লাখ) তার পরিবার বহন করতে অক্ষম...

তিন.

ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর এদেশে এটা একটি কমন চিত্র। কমন চিত্র হবার পরও যে মেয়েটাকে আমি চিনি না সেই জারিন তাসনিম রাফাকে নিয়ে আমি কথা বললাম কেন? সে একটা মেয়ে বলে? নাকি সে মেডিকেল শিক্ষার্থী, আমার স্বগোত্রীয় বলে?

বিষয়টা আসলে এগুলোর কোনটাই না। জারিন তাসনিম রাফা নামের মেয়েটি ব্যতিক্রম। সে একটা ফাইটার, সে একজন জাত যোদ্ধা। বিষয়টি খোলাসা করি...

চিন্তা করেন তো, একদিন হঠাৎ জানতে পারলেন আপনি ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত, আপনার মনের অবস্থাটা তখন কেমন হবে? অধিকাংশ মানুষ এ খবরটা জানার পরপরই একবার মারা যায়, এ মারা যাওয়াটা মানসিক, মানসিক মৃত্যুটা কন্টিনিউ করে দৈহিক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।দৈহিক মৃত্যুর আগে যে মানসিক মৃত্যু, সেটা জারিন তাসনিম মানতে চায় না। এখানেই অন্যান্যদের সাথে জারিন তাসনিম রাফার পার্থক্য...

যখনই মেয়েটার রক্ত লাগছে সে চিৎকার করে বলছে তার রক্ত লাগবে, আমরা ছুটে যাচ্ছি তার রক্তের ব্যবস্থা করার জন্য। যখন মেয়েটার Platelet কমে ১০,০০০ হচ্ছে, সে আবারও ফেসবুকে সেটার জানান দিচ্ছে, তার বন্ধুরা Platelet ম্যানেজ করছে। তার Bone marrow transplant করার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকার দরকার, সে চিৎকার করে সবাইকে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে বলছে। টাকার জন্য যেখানে ধ্বর্ণা দেবার দরকার সেখানেই সে ধ্বর্ণা দিচ্ছে। বুদ্ধি করে প্রাইম মিনিস্টারের উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠিও লিখেছে...

আমি বসে বসে এসব দেখি আর মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, 'আহারে! বেঁচে থাকার জন্য মেয়েটার কতই না আকুতি, কত চেষ্টাই না মেয়েটা করছে...' আমি কিন্তু মেয়েটাকে মনে মনে এপ্রিশিয়েট করি, মরার আগে মরতে যে নারাজ তাকে যদি আপনারা জাত যোদ্ধা না বলেন তবে কাকে বলবেন?...

চার.

কয়েকদিন আগে মেয়েটার একটা স্ট্যাটাস নজরে পড়লো-

"O Allah Subhanatawala!!!! Show me your miracle! Give me back my previous normal life!!! Oh Allah nothing is impossible to you! I want to survive!"

মানুষের বেসিক ইনস্টিংক্ট হচ্ছে সে যখন মৃত্যু অবধারিত বুঝতে পারে তখন সে একটা মিরাকলকে প্রত্যাশা করে। বাস্তবতা হচ্ছে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সেই মিরাকলটা আসে না।

মেয়েটার জন্য এদেশের বড় কারো মন গলবে বলে মনে হয় না। কারণ, মেয়েটা আমার, আপনার মত সাধারণ ঘরের একটি মেয়ে। সাধারণ ঘরে আমরা যারা জন্মগ্রহণ করে সবসময় সাধারণদের কাতারে থাকি তাদের জন্য বড় মানুষেরা সহসা কখনো মিরাকল দেখাতে চান না।

তারা মিরাকল দেখাক বা না দেখাক, আমরা সাধারণরা মিলে কিন্তু একটা মিরাকল তৈরি করতে পারি।Let me clear my voice: Sometimes miracle must be created...

পাঁচ.

আমি সুস্পষ্টভাবে দুইটি প্রস্তাব রাখছি-

এক.

রোযার মওসুম চলছে। চিকিৎসকদের ইফতার মাহফিলে ওষুধ কোম্পানিগুলো হাজার-লাখ টাকা খরচ করবে। এই টাকাগুলো ওষুধ কোম্পানিগুলোকে এভাবে খরচ করতে না দিয়ে সে টাকাটা জারিনের অ্যাকাউন্টে দিয়ে দেয়ার অনুরোধ করা যায় না? এতে করে ইফতার মাহফিলের সৌন্দর্য কি কমবে?

আমরা যারা চিকিৎসক আছি তারা কি কোম্পানিগুলোকে মোটিভেট করতে পারি না যাতে তারা মেয়েটিকে সাহায্য করে? ১৫ হাজার কোটি টাকার ওষুধের বাজার আমরা চিকিৎসকরা ইনডিরেক্টলি কন্ট্রোল করি, ৮০ লাখ টাকা সেখানে একটা মামুলী সংখ্যা হবার কথা।

দুই.

সামনে ঈদ। চাকুরীজীবী যারা তারা সবাই বেতন, বোনাস পাবো, শপিং মল গুলোতে অনেক কেনাকাটা হবে। ৫০০ টা টাকা আমরা প্রত্যেকে বরাদ্দ রাখতে পারি না এই মেয়েটির ওন্য? স্রেফ মাত্র ৫০০ টা টাকা? আমাদের কিন্তু তেমন কোন ক্ষতি হবে না, তবে একটা মেয়ের জীবন বেঁচে যাবে। মানুষের জন্য মানুষ যদি এতটুকু না করে তবে সে কেমন মানুষ? 

মৃত মানুষের ফেসবুক আইডিতে কখনো গিয়েছেন? আমি গিয়েছি, প্রোফাইল পিকচারের নীচে ছোট করে লেখা থাকে "Remembered"...আমি মাঝে মাঝে এই প্রোফাইলগুলোর টাইমলাইনে ঘোরাঘুরি করি, অদ্ভুত লাগে, বিষন্নতায় মনটা ছেয়ে যায়। জারিন তাসনিম রাফার আইডিটাকে আমরা নিশ্চয়ই "Remembered" দেখতে চাই না!

জারিন তাসনিম রাফাকে যারা সাহায্য করতে চান তারা কিভাবে সেটা করবেন সেটার সুবিধার্থে কমেন্টে একটি ছবি যোগ করে দিলাম। মেয়েটির প্রোফাইল থেকে এটি নেয়া হয়েছে...

ছয়.

একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। প্রতিটি ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলে এক বা একাধিক Collateral ঘটনা/ইস্যু পাওয়া যায়। জারিনের ঘটনা থেকে একটা ব্যাপার কিন্তু পরিষ্কার। চিকিৎসকরা অসুখে বিসুখে আর্থিক বিপদে পড়লে তাদেরকে সাহায্য করার জন্য কাউকে কিন্তু খুঁজে পাওয়া যায়নি, হয়তো ভবিষ্যতেও কাউকে পাওয়া যাবে না। ৩৩ তম বিসিএসের সানজানা'র কথা নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চিকিৎসকদের একটি সংগঠন দাঁড় করানো উচিত যারা চিকিৎসকদের কাছ থেকেই একটা ফান্ড রেইজ করবে যার মাধ্যমে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে আর্থিক বিপদে পড়া চিকিৎসকগণ উপকৃত হবেন। এ সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানটি সময়ের দাবী, আমাদের প্রয়োজনেই একে আজ বা কাল বাস্তব রূপ দিতে হবে...

সাত.

জারিন মেয়েটার বয়স কত? ২২ বা ২৩ বা ২৪? এরকমই হবে হয়ত । এই বয়সী একটা মেয়ের চিন্তা ভাবনা জুড়ে কি থাকতে পারে বলে আপনাদের ধারণা?

আমি বলে দেই। কয়দিন পর মেয়েটির চিকিৎসক হবার কথা। মেয়েটির কল্পনায় ছিল এপ্রোন পড়ে, গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে হাসপাতালের এক বেড থেকে আরেক বেডে ছুটে চলার চিত্র। তার পরিবার পরিজন নিয়ে আনন্দে থাকার চিত্র। হয়তো তার কল্পনায় জীবনসঙ্গী হিসেবে কোন রাজপুত্রের ছবিও আঁকা ছিলো...

হয়তো তার কল্পনায় ছিলো সেই রাজপুত্রের সাথে জোৎস্নাস্নাত কোন রাতে হাত ধরাধরি করে পাশাপাশি হেঁটে যাবার চিত্র। কিংবা অঝোর বৃষ্টির নবধারাজলে তার কাল্পনিক রাজপুত্রের সাথে রিকশায় হুড তুলে ঘুরে বেড়াবার কোন কাল্পনিক স্বর্গীয় দৃশ্য!

আফসোস! মেয়েটির কাল্পনিক দৃশ্যপটে এই ছবিগুলো কিন্তু এখন আর নেই। হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে সে এখন মৃত্যুর প্রহর গুণছে। সময় কিন্তু খুব বেশী নেই, প্রতিটা মুহূর্ত মূল্যবান। এখানে আমাদের অনেক কিছু করার ছিলো এবং আছে।

আমরা মেয়েটিকে বাঁচানোর একটা চেষ্টা কিন্তু করতে পারি, আমাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারি। তাতে আমার বা আপনার দৃশ্যত কোন লাভ নেই। দৃশ্যমান লাভ দিয়ে অবশ্য সবসময় সব কিছু বিবেচনা করা ঠিক না। মেয়েটি বেঁচে গেলে জোৎস্নাস্নাত ফিনিকছটা রাতে তার জীবনসঙ্গী রাজপুত্রের সাথে হাতে হাত ধরে পাশাপাশি হেঁটে যাবে--এ দৃশ্যের আবেদন অপার্থিব। এ দৃশ্য কিন্তু আমাকে আনন্দিত করে, উদ্বেলিত করে। আপনাকে করে না? 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না