ডা. কাওসার উদ্দিন

ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


২০ মে, ২০১৮ ১১:৫৯ এএম

ডায়াবেটিস রোগীদের রোজা ও হাইপোগ্লাইসেমিয়া

ডায়াবেটিস রোগীদের রোজা ও হাইপোগ্লাইসেমিয়া

রমজান মাসে মুসলিমদের সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখার আদেশ করা হয়েছে। তবে অসুস্থতাজনিত কারণে রোজা রাখার ক্ষেত্রে শিথিলতা আছে। পবিত্র কুরআনে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘আর তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে তারা অন্য সময় তা পূর্ণ করে নেবে।’(সূরা বাকারা: ১৮৫)

সেই হিসেবে ডায়াবেটিস রোগীদের রোজা রাখার ক্ষেত্রে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে তারা চাইলে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম কানুন মেনে সিয়াম সাধনা করতে পারেন। রোজা রাখার ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস রোগীদের ৩টি বিষয় সম্পর্কে খেয়াল রাখতে হবে।

১। ডায়াবেটিস সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান রাখা। যেমন: কমে গেলে কি হতে পারে, বাড়লে কি হতে পারে। এমন কিছু হলে প্রাথমিকভাবে কী করণীয় এবং কোন ধরণের বিশেষ সেবা গ্রহণ করতে হবে।
২। নিয়মিত বা জরুরী প্রয়োজনে ব্লাড গ্লুকোজ চেক করার সুযোগ আছে কিনা। বাসায় গ্লুকোমিটার আছে কিনা।
৩। রোগী যে ওষুধ গুলো খায় বা ইনসুলিন নেয়, সেগুলো রমজানের রুটিনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা। ওষুধ পরিবর্তন করতে হলে রোজার কমপক্ষে ১ মাস আগেই সেটি করতে হবে, যাতে করে নতুন ওষুধগুলো শরীরের সাথে খাপ খেয়ে নিতে পারে এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট সময় পায়।

প্রচলিত Baiphasic ও Rapid acting insulin ইঞ্জেকশন এবং মুখে খাওয়ার ওষুধের মধ্যে Insulin Secretagogues (Sulphonylureas) যেমন: Glimepiride, Gliclazide ও Glipizide গুলো Hypoglycaemia করে অর্থাৎ গ্লুকোজ কমিয়ে দেয়। রমজান মাসে Fasting এর জন্য রক্তে গ্লুকোজ এমনিই কিছুটা কমে যায়, তার ওপর উপরের ওষুধগুলো যেহেতু হাইপোগ্লাইসেমিয়া করে, তাই এসব ওষুধ গ্রহণকারী রোগীদের খুব সতর্ক থাকতে হবে। রোজা রাখা অবস্থায় কখনো হাইপোগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে, রোজা ভেঙে ফেলতে হবে।

এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের প্রতি অতিশয় দয়ালু।’ (সূরা নিসা: ২৯)

Sulphonylurea- Glimepiride সকালে ১ বেলা খেলে, রোজার সময় সেটি সেহরিতে খাবে। আর Gliclazide দিনে দুবেলা খেলে, রোজার সময় সেটি সেহরি ও ইফতারে খাবে। যেহেতু এই ওষুধগুলো হাইপো করে, তাই সেহরিতে একটু আগেভাগে ওঠে ওষুধটা খেতে হবে যাতে ৩০ মিনিট পর সেহরি খাওয়ার মত যথেষ্ট সময় হাতে থাকে। আর ইফতারিরর সময় হালকা কিছু দিয়ে ইফতারি করে, এরপর ওষুধটা খেয়ে তার ৩০ মিনিট পর ভারী ইফতারি করতে হবে।
- Biphasic Insulin এর ক্ষেত্রে উপরের ওই একই নিয়ম।
- কিন্তু যারা ৩ বেলা Rapid acting insulin নেয়, তাদের ক্ষেত্রে সেটি চেঞ্জ করে উপরের নিয়মে সেহরি ও ইফতারে ২ বেলা Biphasic insulin দেওয়া যেতে পারে।

Insulin এর ক্ষেত্রে আর একটি ভাল অপশন Long acting insulin, যা প্রতিদিন সন্ধ্যায় ১ বার নিলেই হয়, আবার হাইপোগ্লাইসেমিয়াও করে না। তাই যারা Biphasic বা Rapid acting insulin নেয়, রমজান মাসে তাদের জন্য একটি ভাল বিকল্প হল এই Long acting insulin. তবে প্রবলেম হল- এর দাম বেশি, সহজলভ্য নয়, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় নেয় বেশি।

রমজান মাসে আর একটি ভাল অপশন হল GLP-1 agonists যেমন Exenatide,Liraglutide. এগুলোও ইনসুলিনের মত injectable ওষুধ। Insulin এর বিকল্প হিসেবে এগুলো দেওয়া যায়। এগুলোর সুবিধা হল, এরা Glucose dependent insulin secretagogue. গ্লুকোজ বাড়লেই কেবল এরা insulin secretion বাড়ায়, তাই তারা হাইপোগ্লাইসেমিয়া করে না; অন্যদিকে insulin এর মত তারা weight gain ও করে না, তাই মোটা রোগীদের ক্ষেত্রে সহজেই এদের ব্যবহার করা যায়।

আর যারা injectable agent নিতে চায় না, আবার sulphonylurea ব্যবহারে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি আছে, তাদের জন্য মুখে খাওয়ার ওষুধের মধ্য সবচেয়ে ভাল হল incretin mimetics (DPP-4 inhibitors) যার মধ্যে আছে sitagliptin, vildagliptin, linagliptin ইত্যাদি। GLP-1 agonist এর মত এরাও glucose dependent insulin secretagogue, অর্থাৎ রক্তে গ্লুকোজ বাড়লে insulin secretion বাড়ায়, তাই এদের ক্ষেত্রেও হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার ঝুঁকি নেই।

উপরের আলোচনা থেকে একটি বিষয় ক্লিয়ার, আর সেটি হল- রমজানে ডায়াবেটিস রোগীদের অন্যতম ঝুঁকি হল হাইপোগ্লাইসেমিয়া!

রোজা রেখে তাই-
- হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয় এমন ড্রাগ খুব সতর্কতার সাথে ব্যবহার করা।
- সবচেয়ে ভাল হয় DPP-4 inhibitors বা GLP-1 agonists এর মত incretin mimetics ব্যবহার করা যারা হাইপো করে না।
- আর একটা বিষয় যা আমরা সবাই জানি, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে প্রধান দুটি নিয়ামক হল Diet ও Discipline. রমজান মাসে Diet control করতে যেয়ে যেন ইফতারির পর রাতের খাবার মিস না হয়। আর Discipline maintain করতে যেয়ে যেন দিনের বেলায় অতিরিক্ত exercise করা না হয়। কারণ meal skipping ও strenuous exercise দুটোই হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

পৃথিবীর সকল অসুস্থ মানুষ সুস্থ হয়ে উঠুক এবং চিকিৎসকরা সেই সুস্থতার আস্থাশীল নিয়ামক হিসেবে কাজ করুক এই কামনায় শেষ করছি। ধন্যবাদ সবাইকে।

Ref: Davidson's, ADA guidelines, CCD, Lectures, (ডায়াবেটিস এর ডিটেইলস ট্রিটমেন্ট লেকচার লিংক কমেন্টে থাকবে)

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না