ঢাকা      মঙ্গলবার ২১, মে ২০১৯ - ৬, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


রোগী কথন

বয়ঃসন্ধির অমোঘ ঢেউ

তখন ফোর কি ফাইভে পড়ি। সবকিছুতেই অপার কৌতুহল। চোখ গোল গোল করে ভাবি, এটা কি? ওটা কেনো এমন? এটা কেনো না? সব জানতে ইচ্ছা করে। সব। আপনারও নিশ্চয় এমন কিছু জানতে ইচ্ছা করতো? কী করতো না? নিশ্চয় করতো। প্রতিটা শিশুই অপার আগ্রহ নিয়ে জানতে চায়, সে কোত্থেকে এলো? কেমন করে এলো? কী উত্তর দেই আমরা? ঠিকঠাক দেই কী?

আমরা বউচি খেলছিলাম, এমন সময় কেউ একজন চিৎকার করে বলল, এই তোর পিছনে এটা কি? রক্ত! কেটে গেছে মনে হয়! আনোয়ারা, যাকে উদ্দেশ্য করে বলা, সে কাঁপতে লাগল রীতিমতো! আমরা হতবুদ্ধি হয়ে রইলাম। কিছুই বুঝতে পারিনি কিভাবে ও ব্যাথা পেলো। আর এত্ত রক্তই এলো কোত্থেকে? তবে বড় দু-একজনের ফিসফিসানি আর ওর মায়ের শাসানিতে বুঝলাম, ও আর আমাদের সাথে খেলতে পারবে না সহজে। হয়েছিলও তাই। আমরা খেলতাম আর ও তৃষিতের মতো তাকিয়ে থাকত। যদি বলতাম, আয় খেলবি। তখন ও বলত, ‘মায় কইছে আমি নাকি বড় হয়ে গেছি। আমার খেলন বন্ধ। তোরা খেলগা।’

বলতে বলতে ওর গলা বুজে আসত। ধুর, বড় হওয়া তো বিরক্তিকর! আমি বড় হতে চাই না। কিন্তু আমাকেও যে বড় হতেই হলো। আপনাকেও তো, তাই না? ঠিকঠাক কথাটা ঠিকঠাক শুনে, জেনে বড় হয়েছি কি? বেড়ে ওঠাটা আরো একটু সহজ হতে পারত কী?

বর্ষায় খাল বিল সব পানিতে ভরে যেতো। আমাদের বাড়িগুলো ভেসে থাকতো দ্বীপের মতো। নতুন পানিতে দল বেঁধে আমরা গোসলে নামতাম। সে এক অদ্ভুত গোসল। পানিতে উদবেড়ালের মতো ডুবাতে ডুবাতে কখন যে ঘন্টা দুয়েক চলে যেতো বুঝতেই পারতাম না। নিজেরা না বোঝলেও, রক্ত জবা চোখ আর বরফ ঠোঙা শক্ত হাত পা দেখে বাবা মায়েরা ঠিকই বোঝতেন। ফলে উত্তম মধ্যম পিঠে ভালোই পরত। অবশ্য সেসব কিছুকে আমরা অমোঘ নিয়ম ধরে নিতাম। কিছু মানে করতাম না। বাবা মায়েরা শাসন না করলে আর থাকল কী? তাদের একটা দায়িত্ব আছে, না?

তেমনি এক গোসল উৎসবে মাকসুদার চিৎকার। নিজের বুকে এক হাত রেখে সমানে লাফাচ্ছে আর কাঁদছে। তার নাকি বুকে ফোঁড়া হয়েছে।

‘এই দেখ দেখ, সুপারির মতো শক্ত।’

‘আরেহ, তাইতো! আহারে বইন, কান্দিস না।’

খোদা! ভাগ্যিস আমার এমন হয়নি। মনেমনে শুকরিয়া করছি।

নাহ্, আমার সে শুকরিয়া বেশিদিন লাষ্টিং করেনি। কোনো মেয়েরই মনে হয় করে না। আফসোস না করে বরং এক সময় ওড়নায় অভ্যস্ত হতে শিখে যায়। কে না জানে, আপনা মাংসে হরিণা বৈরী? মেয়েরা এ ব্যাপারে দারুণ! মডিফিকেশনে তারা ওস্তাদ জন্মগতভাবে। দ্বিমত থাকলে হাত তোলেন তো দেখি ভাইসব, ভগিনীগণ।

আমাদের নৈমিত্তিক সব খেলায় আনোয়ারা, মাকসুদা, জুলেখা, মমতাজরা যেমন থাকত, তেমনি থাকত রাসেল, রবিন, জুয়েলরাও। কোনদিন ভিন্নতা কাজ করেনি। না মনে, না মননে। পুতুল বিয়েতে নীরা যদি বরের মা হতো। অবলিলায় রবিন হতো বরের বাপ। অথচ বরের মা বাপ যে সত্যি সত্যি ভাইবোন এটা আমাদের বিন্দু মাত্র চিন্তার কারণ হতে পারত না। মাথায়ই আসত না। অথচ একদিন সত্যিই শুভর কন্ঠে চমকে ওঠলাম। ওর ফিনফিনে স্বর কখন যে ভরাট মেঘ গর্জনে পরিবর্তিত হয়েছে কে জানে? এদিকে আমরাও আস্তে আস্তে ভিন্ন রকম হতে থাকি। নিজের স্বর অচেনা লাগে। নিজের শরীর অচেনা লাগে। বয়োঃসন্ধি!

মারাত্মক দুর্জয় অবস্থার নাম বয়োঃসন্ধি! চিরপরিচিত শামিন আর শাম্মিয়াদের মাঝে বিভাজন তখন সূক্ষ গোঁফের রেখা আর ওড়নায় সীমাবদ্ধ নয়। রীতিমতো ভারত পাকিস্তানের বর্ডারের সংবিধিবদ্ধ সতর্কতা সর্বত্র। বেচারা আমরা তখন দিশেহারা। নাটের গুরু হরমোন ইস্ট্রোজেন আর টেস্টোস্টেরন নাড়ে কলকাঠি, দোষ পড়ে আমাদের। বড়দের মতো আচরণ করলে বলে, ইঁচড়ে পাকা ছোটদের মতো হলে বলে, ন্যাকা।

বয়ঃসন্ধিতে ক্ষণে ক্ষণে মুড চেঞ্জ হতো। এই মনে হতো, ভাল্লাগেনা। আমার কেমন একলা লাগে। মন কেমন কেমন করে। এটা জানতে ইচ্ছা করে। ওটা ভাঙতে ইচ্ছা করে। নিজের শরীর অচেনা লাগে। বুকে ব্যাথা করে। ধরফর করে। চিনচিন রিনরিন ফিনফিন সবই করে। ভুল করতে ইচ্ছে করে। শুদ্ধতার জন্যও মন পোড়ে। দুঃখ ভালো লাগে। মনে হয় কী যেনো নাই, কী যেনো নাই। ফুল ভালো লাগে। পাখি ভালো লাগে। ও বাড়ির ছেলের তাকানো ভাল লাগে। পাশের বাড়ির মিরাকে না দেখলে পাগল পাগল লাগে। বড়দের শাসনে রাগ লাগে। মায়ের বকুনিতে অভিমান লাগে। আকাশ সমান অভিমান নিয়ে মরে যেতে ইচ্ছা করে। হুম। সত্যি বলছি।

মরে যাওয়া আর বেঁচে থাকার মতো দুটো ভিন্ন এই আবেগীয় স্রোতের সংঘর্ষের নাম বয়োঃসন্ধি। বয়োঃসন্ধির এই বানের জলে কতজন যে ডুবে যায়! আবার ডুবতে ডুবতে ভেসেও যায়। যদি সঠিক শিক্ষাটা পায়।

বয়ঃসন্ধি কি?
দশ থেকে চৌদ্দ বছর বয়সটাকে বয়ঃসন্ধি বলে। এই সময়টা হলো কৈশোর এবং যৌবনের সংযোগ কাল। একেবারে অস্থির সময় যাকে বলে।

বয়ঃসন্ধিতে কী হয়?
ছেলে ও মেয়েদের শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তন শুরু হয়। কন্ঠস্বর পরিবর্তন হয়। পিউবিক হেয়ার, এক্সিলারি হেয়ার ডেভেলপ করে। ছেলে বাচ্চাদের গালে সূক্ষ গোঁফের রেখা দেখা দেয়। মেয়েদের মাসিক বা ঋতুস্রাব হয়। অপজিট সেক্সের প্রতি আগ্রহ জন্মে।

কেনো এমন হয়?
এটা অমোঘ নিয়ম। হবেই। ইস্ট্রোজেন (মেয়ে), প্রোজেস্টেরন এবং টেস্টোস্টেরন (ছেলে) নামক হরমোনের প্রভাবে এই পরিবর্তন সাধিত হয়।

বয়ঃসন্ধিকে বলা হয় সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। রবিঠাকুর বলছেন, তেরো চৌদ্দ বছরের মতো বালাই আর নাই। আসলেই নাই। এই সময়টাতে বাবা মাকে তার সন্তানের পাশে থাকা উচিৎ। ধৈর্য্য ধরে তাদেরকে এই আশ্চর্য পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে শেখানো উচিৎ। আমাদের সন্তানেরা যেনো পুরুষ কিংবা নারী হওয়ার পূর্বে ঠিকঠাক মানুষ হয়ে ওঠে। এই হোক আমাদের চাওয়া। কেননা, মানুষ হলে সব হয় আর অমানুষ হলে সব যায়।

বিঃদ্রঃ- শৈশব, কৈশোর, বয়োঃসন্ধি এবং মানব মানবীর জীবন চক্রে ডুবে যাওয়া, ভেসে থাকা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে লিখব। যা পরবর্তীতে আমাদের সন্তানদের জন্য গাইড হিসেবে কাজে লাগবে। বাবা মা হিসেবে আমরা হয়তো থাকবো না, কিন্তু আমাদের রেখে যাওয়া দিক নির্দেশনা ওদের বাতিঘর হয়ে পথ দেখালেও দেখাতে পারে। ওরা যেনো ভুলটা না শেখে শুধু এটুকুই চাওয়া। খুব কী বেশি চাওয়া?

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

৩৯তম বিসিএসের পোস্টমর্টেম

৩৯তম বিসিএসের পোস্টমর্টেম

দেশের সকল খাতের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্যসেবাকেও যুগোপযোগী করে তুলতে অপ্রতুল জনবলের বিষয়টি…

৩৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডারদের দাবি, বিপক্ষ মতের যুক্তিখণ্ডন

৩৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডারদের দাবি, বিপক্ষ মতের যুক্তিখণ্ডন

যুক্তি-১ বিপক্ষ মতের কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, একসঙ্গে এত চিকিৎসক নিয়োগের…

নিরাপত্তাহীনতায় কর্মস্থল বদল

নিরাপত্তাহীনতায় কর্মস্থল বদল

যায় দিন ভাল, আসে দিন খারাপ! জানি না আর কি কি খারাপ…

শিশুদের উচ্চ রক্তচাপঃ এক অবহেলিত অধ্যায়

শিশুদের উচ্চ রক্তচাপঃ এক অবহেলিত অধ্যায়

শিশুদের রক্তচাপ মাপতে গেলেই রোগীর বাবা-মা সবসময়ই যে প্রশ্নটি করেন সেটি হল…

‘প্রধানমন্ত্রীর স্বদিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়োগবঞ্চিত নন-ক্যাডার চিকিৎসকরা’

‘প্রধানমন্ত্রীর স্বদিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়োগবঞ্চিত নন-ক্যাডার চিকিৎসকরা’

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার আগের দুই মেয়াদে আওয়ামী…

দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বাস্তবতা ও আমার কিছু অভিজ্ঞতা

দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বাস্তবতা ও আমার কিছু অভিজ্ঞতা

আমার মা ২ সপ্তাহ আগে মারা গেছেন। উনি গত আড়াই বছর ধরে…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর