ডা. ফাহিম উদ্দিন

ডা. ফাহিম উদ্দিন

ইন্টার্ন চিকিৎসক

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।


১৯ মে, ২০১৮ ১২:০২ পিএম
তরুণ ডাক্তারের উদ্যোগ

অসহায় গরিব রোগীদের পাশে দাঁড়াতে পারেন আপনিও

অসহায় গরিব রোগীদের পাশে দাঁড়াতে পারেন আপনিও

আমি ছোটবেলা থেকেই খুবই সফ্ট মাইন্ডেড। কারো সাথে সম্পর্ক নষ্ট হলে, মনোমালিন্য হলে, কাউকে কষ্ট দিয়ে ফেললে আমার নিজেরই খুব খারাপ লাগে। আমার ভুল থাকলে আমি ক্ষমা চেয়ে নেই। কিন্তু তারপরেও দু-একজন মানুষ থাকেন যাঁদের এভয়েড করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না আসলে এবং সেটা তাঁদের কারনেই। ভেতরে ভেতরে খারাপ লাগলেও একরকম বাধ্য হয়েই এভয়েড করি।

সেই জায়গা থেকে রোগীদের সাথে আমি কখনোই রাগারাগি করতে পারি না। হসপিটালের গরীব অসহায় রোগীদের জন্য আমার খুবই মায়া লাগে। নিজের কষ্ট হলেও মানুষদের একবারের জায়গায় কয়েকবার বুঝিয়ে দেই, যা আমার সাথের অনেকেই করতে চায় না। জানি তারপরেও অনেক সময় খারাপ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হবে। জানি না কতদিন ধরে রাখতে পারবো! 

আমি জানি, আমার মত এরকম আরো কিছু মানুষ আছেন। তাই আমার ছোট্ট দু-তিনটি অভিজ্ঞতাসহ আমার একটা প্ল্যান শেয়ার করছি।

তখন শীতকাল ছিল। একদিন সন্ধ্যার পর অন্ধকার একটা রোড দিয়ে লাইব্রেরীর দিকে যাচ্ছিলাম। একজন বৃদ্ধ রিক্সাচালক হঠাৎ রিক্সা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন, খুব শ্বাস কষ্ট হচ্ছিল। প্রথমে দূর থেকে বুকে হাত দেয়া অবস্থায় দেখে তাড়াতাড়ি কাছে গেলাম, হার্ট এটাক ভেবে। পরে শুনলাম, উনার অ্যাজমার সমস্যাটা বেড়ে গেছে কিছুদিন হল।

বললাম, ঔষধ খান না?
- বললেন, টাকার জন্য ইনহেলার কিনতে পারছেন না। একজন ঔষধের দোকানদারের কাছে বাকিতে কিনতে চেয়েছেন, দেয়নি। (এমন ভনিতা করে দিনে দুপুরে অনেকে ভিক্ষা চায় হয়তো, কিন্তু উনি সেরকম নয়, বরং আমি নিজেই জিজ্ঞেস করে জেনেছি)। ঐ অবস্থায় আপনারা দশ জন যা করতেন, আমিও তাই করেছি। মানুষটার কষ্ট দেখে মানিব্যাগের সবচেয়ে বড় নোটটা বের করে হাতে দিলাম। মানুষটা আমাকে সজোরে কাঁদতে কাঁদতে যেই দোয়া করে দিলো, লক্ষ-কোটি টাকা দিয়েও আমি তা কিনতে পারবো না। টাকা দিয়ে মূল্যায়নই করা যাবে না।

আরেকবার, এক গরীব মহিলা রোগীর এক হাত অবশ হয়ে যাচ্ছিলো একটা রোগে। সঠিক চিকিৎসার জন্য বিভাগীয় শহরে পাঠানো দরকার কিন্তু তাঁর রোগ হওয়ার পর তাঁর স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় আর্থিক সহযোগীতা করার মত কেউ নেই। আপনাদের দশ জনের মত ঠিক উপরের কাজটাই করলাম। কান্নাভেজা চোখ মুছতে মুছতে যে দোয়া করে দিলেন, তা বলার মত নয়।

আরেকবার এক গরীব মহিলা রোগীর ফুসফুসে ক্যান্সার সাসপেক্ট করা হল পেরিফেরিতে। চিকিৎসার জন্য বিভাগীয় শহরে যেতে বলা হয়েছে, কিন্তু যাওয়ার টাকা নেই। এদিকে কাশির জন্য খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। আপনাদের আর দশ জনের মত উনার ক্ষেত্রেও আমি একই কাজ করলাম। অনেক দোয়া করে দিলেন।

আরেকবার আমাদের হসপিটালের বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে এক বাচ্চা আসে কারেন্টে পুড়ে গিয়ে। তার এক হাত কেটে ফেলা হয়। আর্থিক অবস্থা একেবারেই খারাপ ছিল না, কিন্তু দীর্ঘদিনের চিকিৎসার খরচ চালাতে না পেরে বাচ্চার মা এখন মানুষের কাছে হাত পেতেছেন। বাচ্চার চিকিৎসার জন্য দুই-তিন জনের কাছ থেকে টাকা তুলে তার মায়ের হাতে দিলাম। তাঁর চোখের জ্বলের প্রতিটি ফোঁটায় মিশে থাকা দোয়াকে কখনো টাকা দিয়ে মূল্যায়নের সাহস করি না।

আবার, আমাদের পেডিয়েট্রিকস ওয়ার্ডে একটা বাচ্চা ভর্তি ছিল, দু’দিন ধরে অজ্ঞান। দূরবর্তী জেলা থেকে রেফার করায় এখানে এসে ভর্তি হয়েছেন। দিন মজুর বাবা হসপিটালে চলে আসায় ঘরের আয় রোজগার বন্ধ। বাচ্চার চিকিৎসার ঔষধ কেনার জন্য ইন্টার্ন ডাক্তাররা কিছু সাহায্য করেছেন। কথার প্রসঙ্গে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, কী খেয়ে থাকেন? উত্তর দিল, এক বেলা খেলে আরেক বেলা না খেয়ে, কোনোরকমে পাউরুটি খেয়ে থাকতে হয়। কারণ আয় রোজগার বন্ধ। খুব খারাপ লাগলেও আমি সেদিন কোনো সাহায্যই করতে পারিনি।

আরেকবার, এক লোক (সম্ভবত দিনমজুর) হসপিটালে ভর্তি ছিল। সম্পূর্ণ চিকিৎসা শেষ হওয়ার আগেই বাড়ি চলে যেতে চাচ্ছেন। বুঝিয়ে বললাম, এখন যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে না। আরো কিছুদিন থাকার জন্য বললাম। উনি তখন উত্তর দিলেন, উনার পরিবারকে কে খাওয়াবে! এরপর আর কিছু বলার ছিল না আমার।

এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই হয়ত আছে। সবসময় নিজের পক্ষে যথোপযুক্ত সাহায্য করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কিন্তু অনেক জন মিলে কাজটা করলে আর গায়ে লাগবে না।

আমার এক আত্মীয়(ডাক্তার) এর ব্যাক্তিগত একটা ফান্ড আছে এরকম গরীব অসুস্থ রোগীদের জন্য। আমি একটা গ্রুপ খোলার চিন্তাভাবনা করছি অনেকদিন থেকে। বেশি না, ৫০ জন বা বড় জোর ১০০ জন মেম্বার হলেই চলবে। আমরা প্রতিমাসে মাত্র ১০০ টাকা করে দিবো গরীব রোগীদের ফান্ডে। টাকা তোলার সুবিধার্থে ৬ মাসের টাকা অগ্রীম তোলা হবে বিকাশ/রকেটে/ডিবিবিএল একাউন্ট (এক সাথে ৬০০ টাকা), বছরে ১২০০ টাকা। অর্থাৎ ৫০ জন মেম্বার হলে প্রতি ৬ মাসে ৩০,০০০ টাকা। বছরে ৬০,০০০ টাকা। টাকা খরচের আপডেট গ্রুপে দেয়া হবে, সম্ভব হলে ছবিসহ। গ্রুপ মেম্বাররা অনেক দূরে থেকেও সাহায্য করতে পেরে একটা আত্মিক প্রশান্তি পাবেন। আর অসহায় মানুষের যে দোয়া পাবেন তা নিয়ে বলার কিছু নেই। উনারা ভিক্ষুক নয়, মিসকিন। অনেক কষ্ট হলেও, কারো কাছে হাত পাততে লজ্জা পান।

জানি তারপরেও ডাক্তারদের অনেকে কসাই বলে গালি দেয়/দিবে। সেক্ষেত্রে একটাই কথা, সবকিছুর বিনিময় হয়ত দুনিয়াতে পাওয়া যাবে না। কিছু পাওনা না হয় পরকালের জন্য জমা থাকুক।

বাংলাদেশের যেকোনো হসপিটালের যেকোনো অসহায় রোগীর জন্য আমরা পাশে দাঁড়াবো ইনশাআল্লাহ। খুব বেশি মেম্বার রাখার ইচ্ছে নেই, যাঁরা মন থেকে আগ্রহী শুধু তাঁরাই জানাবেন। শুধু তাঁদেরকেই এড করবো। সংখ্যায় কম হোক সমস্যা নেই, ছোট্ট ফান্ড দিয়েই আমরা যতটুকু পারি গরীব অসহায় রোগীদের সাহায্য করবো ইনশাআল্লাহ।

বি:দ্র: শুধু ডাক্তার নয়, যেকোনো পেশার মানুষ এই গ্রুপে থাকতে পারেন চাইলে।

যোগাযোগ: ডা. ফাহিম উদ্দিন (Fahim Uddin)

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না