ঢাকা      মঙ্গলবার ২২, মে ২০১৮ - ৮, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ - হিজরী



সাদিয়া শবনম হেমা

কনসালট্যান্ট, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা

(প্রাক্তন ইউএনডিপি, বাংলাদেশ কর্মকর্তা)


যারা বিদেশ যাচ্ছেন তাঁরা কি ফ্রি চিকিৎসা করে আসছেন?

আমি ডাক্তার না, আগেই বলে নিলাম। এখন আমি আমার মনে যা আছে তাই বলবো। আমি মনে করি, সব পেশাতেই ভাল খারাপ দুই ধরনের লোক আছে, আমরা সেটা সবাই জানি। তাই ওই প্রসঙ্গে না গিয়ে শুধু ফি এর প্রসঙ্গে আসি। ডাক্তারি অবশ্যই সেবামূলক পেশা (সকল পেশাই আসলে কোন না কোন ভাবে সেবামূলক), তার মানে এই নয় সেইটা ফ্রি হবে; কারণ ডাক্তাররাও মানুষ, তাঁদের পরিবার আছে, খরচ আর সবার মতই আছে। 

অনেক কষ্ট ও খরচ করে একজন ডাক্তার হওয়া যায়। ডাক্তারের নাম ডাক ও পজিশন (সিনিয়র-জুনিয়র ইত্যাদি) হিসেবে ফি নির্ধারিত হয়। স্কয়ারে একজন ডাক্তার ১০০০ টাকা ফি নেন। কারণ তার কিছু অংশ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও পান। সেটা তাঁরা পেতে পারেন কারণ সেটা তাঁর ব্যবসা, ব্যবসা অর্থ এটা তাঁর জীবিকা।

সেবার বিনিময়েই কিন্তু তিনি তার মূল্য নিচ্ছেন, শুধুমাত্র বসে থেকে নয়। যার ১০০০টাকা দেওয়ার সমস্যা তিনি কিন্তু ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে বা অন্য সরকারি হাসপাতালে অল্প টাকায় সেবা নিতে পারেন। তার জন্য সেই সুযোগ আছে, কাজেই ১০০০ টাকা ফি নেওয়া ডাক্তারকে তার গালাগালি করার দরকার আছে কী? 

আমার চেনা প্রায় প্রতিটি ডাক্তারকে আমি কয়েকটা কাজ করতে দেখেছি। 

এক. তাঁরা নিজ গ্রাম বা এলাকায় মাসে একবার হলেও দল বেঁধে গিয়ে ফ্রি সার্ভিস দেন। 

দুই. কোন গরিব অসহায় রোগী আসলে নিজের কাছে থাকা কোন ওষুধ ফ্রিতে দিয়ে দেন, ফি কমিয়ে নেন এবং পারলে উলটা কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দেন। 

আমি আমার বাচ্চাকে একটা জেনারেল হাসপাতালে দেখাই। সেই ডাক্তারকে আমি দেখেছি গরিব এক বাচ্চার চিকিৎসায় খরচ বেশি হয়ে যাচ্ছে বলে চিন্তিত ও বিমর্ষ হয়ে আছেন। ডাক্তাররা খারাপ, ডাক্তাররা চামার ইত্যাদি বলে যারা গলা ফাটাচ্ছেন তারাই আবার একটা হাঁচি দিলেও ডাক্তারের কাছে দৌড়াচ্ছেন। 

আমাদের দেশের ডাক্তাররা ভাল না এসব কথা বলে যারা বিদেশ যাচ্ছেন তাঁরা কি ফ্রিতে চিকিৎসা করে আসছেন? বাইরের দেশগুলোতে ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার পেইন সম্পর্কে জানেন? তাঁদের ফি যে আর সব পেশার লোকের চাইতে অনেক বেশী সরকারিভাবেই তা জানেন?

আমি এমন অনেককে চিনি যারা সঠিক সময়ে ডাক্তারের কাছে যান না। রোগ পুষে রেখে যখন তা নিরাময়ের উর্দ্ধে যায় বা কমপ্লিকেটেড হয়ে যায়, তখন গিয়ে ভাল না হতে পারলে ডাক্তারের গোষ্ঠী তুলে গালাগালি করেন। আবার অনেকে আছেন ডাক্তারের দেওয়া চিকিৎসার ওপর আবার নিজেরা ডাক্তারি করেন, ওষুধের মাত্রা নিজেরাই ইচ্ছামত কমান বাড়ান তারপর ভাল না হলে ডাক্তার খারাপ। 

ডাক্তারের খারাপ আচরণ নিয়ে অনেক লেখালেখি চেঁচামেচি হয়। আমরা নিজেরা গিয়ে কোন টোনে কিভাবে ডাক্তারের সাথে বা ডাক্তারের সহকারির সাথে কথা বলছি, সিরিয়াল আগে নেওয়ার জন্য অন্যায়ভাবে চিল্লাচিল্লি করছি, তার কথা চেপে যাই।

ডাক্তাররা গলা কেটে আমাদের সব টাকা নিয়ে গিয়ে কোটিপতি হয়ে যাচ্ছেন এটা আমরা সবাই বলতে ভালবাসি। ডাক্তারের যে সরকারি হাসপাতালে একটা বসার জায়গাও নাই, অসুস্থ লাগলে রেস্ট নেওয়ার ব্যবস্থা নাই, বাথরুমের ব্যবস্থা নাই, ভালভাবে খাওয়ার জায়গা নাই, পলিটিক্যাল কূটকচালিতে প্যাঁচে পড়ার অভাব নাই; তারপরেও যে সেখানে ডাক্তারকে পাওয়া যায়, তারপরেও যে সেখানে অনেকেই সফলতার সাথে চিকিৎসা পেয়ে সুস্থ হয়ে ফেরত আসেন, সফল অপারেশন হয়, যে ফেলে দেওয়া বাচ্চার ৩ কূলে কেউ নাই সেও সেবা পায় ও জীবন ফিরে পায়- সেগুলোর কথা আমাদের বলা দূরে থাক, ভাবতেও কষ্ট লাগে!

কারণ আমরা বাঙালি। আমরা নিজে কী করি, কী করি না এসব নিয়ে চিন্তা করার চাইতে অন্যদের খারাপ কি আছে তা নিয়ে গল্প করতে ভালবাসি। চারদিকে ভাল কী হচ্ছে, তা দেখার চাইতে কী হল না তাই নিয়ে উজ্জীবিত হতে ভালবাসি; তবে কেন হল না তা ভাবি না।

একটা বাণী দিয়ে লেখা শেষ করি (বাণী আমার না) সবাই বিশ্ব পরিবর্তনের জন্য অনেক কাজ করতে চায়, কিন্তু নিজেকে কেউ পরিবর্তন করতে চায় না।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর হাতে সরকারি হাসপাতাল জিম্মি

তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর হাতে সরকারি হাসপাতাল জিম্মি

এক রোগীকে আমরা ছুটি দিলাম। সে যাবে না, বেড নাকি সে কিনেছে…

কারো পোস্টিং লন্ডন, কারো প্যারিসে! 

কারো পোস্টিং লন্ডন, কারো প্যারিসে! 

সরকারি চাকরির এক বছর পূর্ণ হল আজ! আমার অনুভূতিগুলো মিশ্র। ভাল লাগা…

প্রথম কর্মস্থলে যোগদানের গল্প 

প্রথম কর্মস্থলে যোগদানের গল্প 

সময়টা ১৯৮৮ সালের ২ জুলাই।  পোস্টিং অর্ডার হাতে পেয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার পথ…

ভূড়িওয়ালা ডাক্তারদের কি পছন্দ হয় না?

ভূড়িওয়ালা ডাক্তারদের কি পছন্দ হয় না?

ইদানিং আউটডোরে দেখছি মায়েরা কোলের বাচ্চাটাকে নিয়ে এসে বসতে না বসতেই, কিছু…

কী করলে মেডিকেল আঙিনা স্বাগত জানাবে তোমাকে?

কী করলে মেডিকেল আঙিনা স্বাগত জানাবে তোমাকে?

ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করায় ব্রত ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যাটা দিনদিন বেড়েই চলছে। কেননা…

চিকিৎসকরা প্রতিটি মুহূর্ত চ্যালেঞ্জ নিয়ে চিকিৎসা করেন

চিকিৎসকরা প্রতিটি মুহূর্ত চ্যালেঞ্জ নিয়ে চিকিৎসা করেন

স্যার, আমার মা কি ভালো হবে? কোন রিস্ক নাই তো?  রোগী জ্বর…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর