ঢাকা      সোমবার ২২, অক্টোবর ২০১৮ - ৬, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. আব্দুর রব

মেডিকেল অফিসার, বিসিএস (স্বাস্থ্য)। 

এফসিপিএস-২ ট্রেইনি (সার্জারি)।

 সাবেক শিক্ষার্থী, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ। 


তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর হাতে সরকারি হাসপাতাল জিম্মি

এক রোগীকে আমরা ছুটি দিলাম। সে যাবে না, বেড নাকি সে কিনেছে পাঁচশ টাকায়। সরকারি হাসপাতালে এই কেনা বেচাটা করে ওয়ার্ডবয় আর আয়ারা। ইমার্জেন্সি থেকে আমার এক আত্মীয়কে তিন তলায় ট্রলি দিয়ে তুলে দিয়েছে এবং নিয়েছে চারশত টাকা। কাজটা করেছে ইমার্জেন্সির আয়া। টাকা দিবেনতো ট্রলি মিলবে নইলে মিলবে না। 

আউট ডোরের AC বিহীন ওটিতে চোখ কান বুজে গরমে দাড়িয়ে আমরা একের পর এক ওটি করে দেই। আর বাইরে গিয়ে দাদুরা রোগী প্রতি বিজনেস করে পকেট ভরে আসে। নাম হয় ডাক্তার টাকা খেয়েছে। ইমার্জেন্সি ওটির বাইরে দুই দফা টাকা দেওয়া নেওয়ার পর রোগী পোস্ট অপারেটিভ রুমে যাবে এর আগে নয়। অপারেশনের আগে রোগী শেভ করেছে তো মরেছে, টাকা ছাড়তে হবে নইলে ছয় সেন্টিমিটার চুল নিয়ে রোগী ওটি টেবিলে হাজির হবে। এসব ক্ষেত্রে রোগী জানে ডাক্তার টাকা নেয়। আরো বড় করে জানে সরকারি হাসপাতালেও টাকা দিতে হয়।

মিডফোর্ডে এক ঘটনা: অপারেশনের পরে রোগী আমাদের সম্মানিত স্যারকে ১২ হাজার টাকা সাধছে, সে নাকি বিশ হাজার টাকা দিতে পারবে না বলে। স্যার তো হতবাক। সরকারি হাসপাতালে আবার টাকা কিসের? পরে শুনেছেন আমাদের এক কর্মচারী স্যারকে দিবে বলে অপারেশন বাবদ বিশ হাজার টাকা চেয়েছে। ঘটনার ভয়াবহতায় আমাদের ডায়রিয়া হবার মত অবস্থা।

গাইনীর অবস্থা আরো খারাপ। ওখানে বেসরকারি খালা নামে অদ্ভুদ এক সিস্টেম আছে। রোগীর যাবতীয় খোজ খবর ও দেখাশুনা হাসপাতালের বাইরে থেকে আসা খালারা করে। বিনিময়ে টাকা নেয়। আমরা ইন্টার্ন থাকার সময় সেই সময়কার ডিরেক্টর স্যার এদেরকে ঝেটিয়ে হাসপাতাল ছাড়া করেছিল। এতদিন বাদে শুনেছি আবার এসে জুটেছে।

লেবার ওয়ার্ড ও অবস ওটিতে যেটা হয় সেটা পুরোপুরি সার্কাস। প্রতিটি বাচ্চা বের হবে আর ন্যুনতম পাঁচ শত টাকা দিতে হবে। রোগীর লোক মরা গরীব হলেও রক্ষা নাই, প্রয়োজন হলে পরনের কাপড় বিক্রি করে দিতে হবে। নরম্যাল ডেলিভারি ও সিজার মিলে যদি প্রতিদিন চল্লিশটা বাচ্চা পয়দা হয় তো টাকা পয়দা হবে গড়ে বিশ হাজার। বিরাট বিজনেস। টাকার ভাগ বাটোয়ারার ব্যাপারটা অবশ্য ভাল জানি না।

যে প্রফেসরের অধীনে কাজ করি, উনি একজন ফিমেল সার্জন। কর্মচারীরা বিভিন্ন ফিমেল রোগীকে আত্মীয় পরিচয়ে ম্যাডামের রুমে এনে দেখিয়ে যায়। অথচ আমি নিজে তাদের বাইরে গিয়ে টাকা নিতে দেখেছি। রোগীরা জানে টাকাটা ম্যাডাম নিচ্ছেন।

রোগীর Enema দিতে গেলেও প্রতিবার ন্যূনতম তিনশ টাকা দিতে হবে। আমাদের সিস্টেমটা এতটাই জঘন্য হয়েছে যে ভাবতে গেলেও আপনার মাথাব্যথা করবে। অথচ যে ডাক্তাররা অপারেশন করে বা ওয়ার্ডে পড়ে থেকে ঘামে ভিজে রোগী দেখে এর বেশিরভাগই অবৈতনিক।
 
উপরের ঘটনাগুলো আমার নিজের মেডিকেলের, মিটফোর্ডের। ঘটেছে আমার ও আমাদের সাথে। অথচ একটা রোগী নিয়ে আমরা ডাক্তাররাই যে ভোগান্তিতে পড়ি, রিতিমত ঘেমে যাই। সেখানে অশিক্ষিত দরিদ্র আর গ্রাম থেকে আসা আনাড়ি মানুষজনের অবস্থাটা কি হবে?

ঢাকা মেডিকেলের অবস্থা আরো করুন। ওয়ার্ডবয় ও আয়ারা নিজেদেরর ডিউটি বাইরে থেকে আসা তিন চার জন বেসরকারি আয়া বা মামা দিয়ে করাবে এবং নিজেরা ডিউটিতে আসবে না। এই বেসরকারি মামাগুলো সারাদিন যে টাকা আয় করবে তার একটা অংশ আবার মূল চাকুরীরত ওয়ার্ডবয়কে আনুপাতিকহারে দিতে হবে। সে নিজে বাসায় ঘুমাবে নইলে অন্য কোন প্রাইভেট ক্লিনিকে সেই সময় ডিউটি করবে। এই নিয়োগ পেতে তাকে ক্ষেত্রবিশেষ পাঁচ ছয় লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে এবং সে সেটা উশুল করে নিবে। 

উপরের ঘটনাগুলো এদেশের শীর্ষ দুইটা মেডিকেলের হাসপাতাল প্রশাসনের চিত্র। অন্য সকল মেডিকেলের অবস্থা হয়ত আরো খারাপ। অথচ সারা দেশ থেকে হত দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত রোগীগুলো শেষ আশ্রয় হিসেবে বিপুল আশা নিয়ে এখানে আসে। একটা রোগী ইমার্জেন্সিতে আসলেতো প্রথমেই টাকা দিয়ে তাকে একটা ট্রলি নিতে হবে। এরপর ওয়ার্ডে যেয়ে টাকা দিয়ে সীট নিতে হবে। বেডশীট, বালিশ পেতে তাকে আর এক দফা টাকা খসাতে হবে। 

এরপর Enema,saline,catheter বহু কিছুর জন্য টাকা গুনতে হবে। অথচ মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে রাষ্ট্র তার উপরোক্ত প্রত্যেকটা সেবা ফ্রী ব্যবস্থা করেছে এবং এ জন্য লোক নিয়োগ করেছে। প্রজাতন্ত্রের চাকুরি হিসেবে তাদের এ কাজগুলো পারিশ্রমিক ছাড়া করতে হবে। অথচ টাকাটা তারাই নিচ্ছে। দুর্নাম হচ্ছে হাসপাতালের, ডাক্তারদের, সরকারের, সর্বোপরি আমাদের এই প্রিয় মাতৃভুমির চিকিৎসা ব্যবস্থার।

টাকাখোর এই গোষ্ঠীর নাম তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। ঢাকা মেডিকেলে এই গোষ্ঠী সংখ্যায় এদেশে সর্ববৃহৎ। পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থা এদের কাছে জিম্মি। আমরা ডাক্তাররা খুবই অসহায়। এদের কিছুই বলতে পারব না। এদের কর্মচারী ইউনিয়ন আছে, ক্লাব আছে, নেতা আছে এবং বেসিরভাগই ক্ষমতাসীন দলের। কিছু বললে আন্দোলনে হাসপাতাল অচল হয়ে যাবে। ক্ষেত্রবিশেষে আমরা হামলার শিকার হতে পারি এবং হয়েছে বহুবার। আমি নিজে আমি এবং আমার বন্ধুরা মার খেয়েছি, অপমানিত হয়েছি। তাই যারা নিরীহ ডাক্তার, এদেরকে ম্যানেজ করে চলে। এদেরকে এদের মত ছেড়ে দিয়েছে। তাছাড়া কি করার আছে? 

অথচ সকল সময়ে হাসপাতাল অব্যবস্থাপনার জন্য ডাক্তারদের দায়ী করা হচ্ছে। টিভি পত্রিকায় ডাক্তারদের ভিলেন বানানো হচ্ছে। রোগীরা আড়ালে অথবা প্রকাশ্যে গালি দিচ্ছে। মনে করা হচ্ছে সবকিছুর মূলে রয়েছে ডাক্তার। অথচ চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থায় যদি দশ ধরনের মানুষ প্রয়োজন হয় তো ডাক্তার এখানে ঐ দশ জনের একজন।

রোগী আসলে আমরা দেখে এক্সামিন করে ওষুধ লিখে দেই। এই ওষুধ থাকে আর একজন কর্মচারীর কাছে, বেডশীট থাকে আর একজনের কাছে, ট্রলি, খাবার দাবারসহ অন্যান্য সেবা এই কর্মচারীদের কাছে থাকে। এরা এখান থেকে দুর্নীতি করলে একদিকে সেবার মান শুন্য হয়, রোগীর ভোগান্তি বাড়ে, হাসপাতালের দুর্নাম হয়। এবং সত্যিকারে এই ঘটনাটাই ঘটছে, ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে এদের ওপর ডাক্তারদের কোন কন্ট্রোল নাই। 

আমার প্রশ্ন হচ্ছে- আমাদের কি কিছুই করার নেই? এই দুর্বৃত্ত গোষ্ঠীর ওপর হাসপাতাল প্রশাসন, পরিচালক, ইউনিটের প্রফেসর, সিএ, রেজিস্ট্রার কারো কোন প্রভাব নেই। এরা অটোনোমাস? এদের নিজেদের মত চলে? এমন কিছু কি করা যায় না যেখানে যবাবদিহিতা আছে, অন্যায়ের শাস্তি আছে? 

অন্য অনেক সরকারি অফিসে হয়ত এর থেকেও বেশি কিছু হচ্ছে, হয়রানি বেশি হচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসা সেবাতো আর দশটা সেবার মত নয়! কোন পরিস্থিতিতে মানুষ হাসপাতালে আসে সেটাতো বিবেচনায় নিতে হবে। 

প্রিয় এই দেশটা নিয়ে আমরা অনেক আশাবাদী। হয়ত সব একদিন ঠিক হয়ে যাবে। প্রশ্ন হচ্ছে কতদিন পরে?
 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ভেঙে যাচ্ছে!

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ভেঙে যাচ্ছে!

মেডিভয়েস রিপোর্ট : শীগ্রই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ভেঙে পুনর্গঠিত হচ্ছে। বিভক্ত হয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা…

‘বাচ্চাকে দুধ দিতে হবে না, সকালে দেখবা আমি কী করি’

‘বাচ্চাকে দুধ দিতে হবে না, সকালে দেখবা আমি কী করি’

মেডিভয়েস রিপোর্ট : সারারাত বাচ্চাটি দুধের জন্য কান্নাকাটি করছিল। ওই মেয়ে ফোনে…

সিসিডি কোর্সে ভর্তির ফল প্রকাশ

সিসিডি কোর্সে ভর্তির ফল প্রকাশ

সার্টিফিকেট কোর্স অন ডায়াবেটোলজি –সিসিডির ২৯ তম (জানুয়ারি–জুন সেশনে) ব্যাচে ভর্তির জন্য নির্বাচিত…

তৃতীয় প্রফের পর একবছর পূর্ণ না হলেও দিতে পারবে ফাইনাল প্রফ

তৃতীয় প্রফের পর একবছর পূর্ণ না হলেও দিতে পারবে ফাইনাল প্রফ

মেডিভয়েস ডেস্ক:  মেডিকেলের তৃতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় পাস করার পর একবছর পূর্ণ হওয়ার…

হাসপাতালে এসেই ‘মৃত’ সাপ জীবিত!

হাসপাতালে এসেই ‘মৃত’ সাপ জীবিত!

মেডিভয়েস রিপোর্ট : সাপের কামড় খেয়ে রোগী এসে ভর্তি হলো হাসপাতালে। সেই রোগীর…

ন্যাশনাল ডিবেট ক্যাম্পেইন-১৮ চ্যাম্পিয়ান পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ

ন্যাশনাল ডিবেট ক্যাম্পেইন-১৮ চ্যাম্পিয়ান পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ

মেডিভয়েস ডেস্ক: ন্যাশনাল ডিবেট ক্যাম্পেইন-১৮ এর সংসদীয় বিতর্কে পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ সিলেট…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর