ঢাকা      সোমবার ২২, অক্টোবর ২০১৮ - ৬, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. মিথিলা ফেরদৌস

বিসিএস স্বাস্থ্য

সাবেক শিক্ষার্থী, রংপুর মেডিকেল কলেজ। 


আম্মার প্রতি আমার ভালবাসার প্রকাশ শুধুই বিরক্তি!

মায়ের প্রতি সবার আবেগ উচ্ছ্বাস দেখে আমিও উৎসাহিত হয়ে মাকে ফোন দিলাম। 
- তিনি ফোন ধরেই বলেন, শোনো তুমি কি অমুক ডাক্তারকে চিনো?
- চিনি। কেন কি হইছে?
- হাসপাতালে একটা গরীব রোগী আছে দেখতে বলতে পারবা।
- না পারবো না। বলে ফোন রেখে দিলাম। 

মেজাজ খারাপ। তার এসব আবদারের সীমা নাই। অসহ্য। ডাক্তারদের এত অনুরোধ রাখতে হয় যে, অনেক সময় বাবা মায়ের জন্যে অনুরোধ করতেই খারাপ লাগে। আর আমার মায়ের প্রতিদিনের এসব বায়নায় আমি বিরক্ত। যেহেতু ওরা ওখানে থাকে তাই কিছু পরিচিত ডাক্তারদের শুধু বাবা মায়ের জন্যেই ফোন করি, বেশি ফোন করলে তারাও আর ফোন ধরতে চায় না, স্বাভাবিক। বাস্তবতা বুঝে দেখেন।

এরপর আলতাফ ফোন করে বলতেছে-
- ঈদের টিকিট যাওয়া আসা ৪৮,০০০ টাকা লাগবে। তুমি কি করবা?

আবার আম্মাকে ফোন করলাম;
- ঈদের আগে কয়দিন থেকে গেলে সমস্যা আছে?
- ঈদে আসবানা মানে? যেভাবেই পার ঈদে আসতেই হবে। আমরা কি একা একা ঈদ করবো নাকি?
- প্রাকটিকাল ব্যাপারটা বোঝো। ফোন কেটে দিছে।

এই হচ্ছে মা দিবসের শুভেচ্ছা বিনিয়ম। বাস্তবতা কত যে কঠিন, অনেক কিছু চাইলেও করা যায় না।

আমার মা হচ্ছে প্রবল আবেগপ্রবণ মহিলা। আমি তাঁর বাস্তববাদী ফাজিল টাইপের মেয়ে। সে আমারটা বোঝে না, আমিও তাঁরটা বুঝিনা। মায়ের প্রতি ঘটা করে আমার ভালবাসা দেখানোই হয় না। ছোটবেলা থেকেই এই চলে আসতেছে।

কালকের আরেকটা উদাহরণ; আমার ছোট খালা ফোন করে বলে-
- জানিস, ছোট্ট আপা তোর মামাকে ক্লিনিকে দেখতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। তোকে মনে হয় বলে নাই।
- না তো খালা কিছুতো বলে নাই। সে এই শরীরে কেন রোগী দেখতে গেছে?

ফোন কেটেই আম্মাকে ফোন;
- তুমি মাথা ঘুরায় পড়ে গেছো বলোনি কেন?
- কে বলছে তোমার আব্বা? আমি এত্তবার মানা করছি।

ফোনের মধ্যেই শোনা যাচ্ছে, আব্বাকে আম্মা বলতেছে- 
- তুমি কেনো ওকে বলতে গেছো?
- আব্বা ফোন ধরে বলে, আমি তোমাকে বলছি?
- না, তুমি বলো নাই। কিন্তু তুমি বলো নাই কেন?
- তোমার আম্মা নিষেধ করছে।
- আম্মাকে দাও ফোন। আম্মা ফোন ধরলো না। আব্বা ফোন কেটে দিয়েছে।

রাগে মাথা গরম হয়ে গেল। সমস্যা গুলা যতক্ষন পারে বলে না, যখন বলে তখন খুব খারাপ অবস্থা। আমার কত টেনশন নিয়ে বাঁচতে হয়। কতবার বলি, চলে আসো। আমি সারাক্ষণ ভয়ে থাকি। আসবে না। ইগো। ছেলে হলে আসতো কিনা জানি না।

আমার মা পৃথিবীর সবার দুঃখ, কষ্টের টেনমন নিয়া নিজেই অসুস্থ হয়ে পরে। সে অসুস্থ হলে, দুনিয়ার কোন মানুষ আর তার খবর রাখে না।

মাঝে মাঝে জরুরী ঔষধ কিছু প্যাক করে পাঠাই। কয়দিন পর শুনি, রাতে গ্যাস্ট্রিকে কষ্ট পাইছে। ঔষধ কিনতে যাইতে পারেনি, দোকান বন্ধ ছিল। 
- আব্বাকে চুপ করে জিজ্ঞেস করি। সব দান করছে তাই না?
- তা আর বলতে হয়?

শুধু তাই না, আত্মীয় স্বজনের অপারেশন হলে নাইট ডিউটি পরে আমার মায়ের। খাবার সাপ্লাইয়ের দায়িত্বও আমার মায়ের। তাদের নিজের পোলাপান তাদের গেস্টের মত এসে দেখা করে যায়। অথচ আমার মায়ের অপারেশন তাদের বেশির ভাগ অনুপস্থিত।

বিরক্ত হয়ে পারবারিক ভাবে আমি আর আব্বা, আম্মার নাম দিয়েছিলাম মাদার(আম্মার নাম)। আমি চিরকাল আম্মার এইসব কর্মকান্ডে বিরক্ত। আম্মাকে নিয়ে কয়েক ভলিউম লিখে শেষ করা যাবে না। আম্মাকে নিয়ে আমি আরও লিখবো আমার ছেলের জন্যে। অনেক কিছুই লেখার আছে।

একেকজনের ভালবাসার প্রকাশ একেকরকম, আম্মার প্রতি আমার ভালবাসার প্রকাশ বিরক্তি নিয়েই করি।

সবশেষে একটা কথাই বলবো, আমি আজ যা, তা আমার মায়ের এইসব পূর্ণের ফল। আমার নিজের যোগ্যতায় এখানে আসার কথা ছিল না। মায়ের জন্যে দোয়া করবেন। আমিও করি সবার মায়ের জন্যেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চান্স না পেলে এখন মেডিকেলে পড়ে!

ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চান্স না পেলে এখন মেডিকেলে পড়ে!

মেইড ইন চায়না এখন শুধু জিনিসপত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। শুরু হয়েছে হিউম্যান রিসোর্স…

মুলারিয়ান এজেনেসিস: প্রকৃতির অবিবেচক খেয়াল ও প্রমিতির কান্না

মুলারিয়ান এজেনেসিস: প্রকৃতির অবিবেচক খেয়াল ও প্রমিতির কান্না

প্রমিতি, বয়স- ১৬। এইচএসসি ১ম বর্ষে পড়ে। প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল প্রজাপতির মতো। যখন কথা…

সব মৃত্যুই দুঃখের, সুখের কোন মৃত্যু নেই!

সব মৃত্যুই দুঃখের, সুখের কোন মৃত্যু নেই!

তখন আমি সিওমেক হাসপাতালের ইন্টার্ন। মেডিসিন ওয়ার্ডে রাউন্ড দিচ্ছেন প্রফেসর ইসমাইল পাটোয়ারি…

ইন্টার্ন ডাক্তারদের আবার কষ্ট আছে নাকি?

ইন্টার্ন ডাক্তারদের আবার কষ্ট আছে নাকি?

আপনার বেতন কত? ছোটবেলায় শুনেছিলাম এ প্রশ্ন করা নাকি বেয়াদবি! সেই ভয়ে…

‘কেটা ফের জানতোক যে, পিঁপিয়া খাল্যে ছ্যালা ধলো হয়?’

‘কেটা ফের জানতোক যে, পিঁপিয়া খাল্যে ছ্যালা ধলো হয়?’

এক সদ্য গর্ভবতী রোগীকে কাঁচা পেঁপে খেতে নিষেধ করলাম। - আনারস আর কাঁচা…

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা

ফাঁকিবাজির মহান ব্রত নিয়ে ইন্টার্নি শুরু করেছিলাম। আমি জন্মগত ভাবেই ফাঁকিবাজ। সবাই…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর