ঢাকা      সোমবার ২২, অক্টোবর ২০১৮ - ৬, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


যেভাবে সহজে ধুমপান ছাড়বেন

একটি সিগারেট এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ থেকে ৮ সে.মি। এই ৭ বা ৮ সেঃমি দৈর্ঘ্যের সিগারেটের সবটুকু নিকোটিন গ্রহন করতে একজন ধুমপায়ীর জ্বলন্ত সিগারেট টিতে প্রতি ১০ সেকেন্ড অন্তর অন্তর মোট ৮ থেকে ১০বার টান দিতে হয়। এতে ৫ মিনিটে তিনি প্রায় ২ মিঃগ্রাম নিকোটিন এর সব টুকুই গ্রহন করেন ।

এই গৃহীত নিকোটিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট যাবৎ ধুমপায়ীর ব্রেইনে তার বিষক্রিয়া চালাতে থাকে। সিগারেটের ধোঁয়া নিঃশ্বাসে সাথে নেবার সেকেন্ডের মধ্যে তা অন্তঃ কেরোটিড ধমনী বা ইন্টারনাল ক্যারোটিড আর্টারী দিয়ে ব্রেইনের গুরুত্বপূর্ণ এরিয়া গুলোতে পৌছে যায় এবং তার বিষক্রিয়া শুরু করে।

সিগারেট এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকারক উপাদান নিকোটিন এর গঠন ধুমপায়ীর ব্রেইনের ডোপামিন নির্গমনকারী কোষগুলো গায়ে লেগে থাকা নিকোটিন -এসিটাইল কলিন রিসেপটরের সাথে জোট বেধে তার বিষক্রিয়া শুরু করে। ফললে ব্রেইনে অস্বাভাবিক পরিমানে ডোপামিন তৈরি হয়। এই ডোপামিন হরমোনের আরেক নাম "ভালোলাগা হরমোন" বা "আনন্দ হরমোন" যা মানুষের দেহে মনে ক্ষনিক পরিমান ভালোলাগা বা আনন্দ ফুর্তির আবহ তৈরি করে।

ডোপামিনের প্রভাবে ধুমপায়ি প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট কিছুটা প্রশান্তি ও ভালোলাগা অনুভব করেন। কিন্তু অল্প সময় পর ব্রেইনে নিঃসরিত এই ডোপামিন ফুরিয়ে যায় ফলে ধুমপায়ী পুনরায় অবসাধ, ক্লান্তি, অমনোযোগীতা, হতাশা বোধ করেন এবং তা থেকে মুক্তি পেতে তিনি পাগলের মতো সিগারেট খুঁজতে থাকেন।  এটাকে বলে নিকোটিন ডিপেনডেন্স। অর্থাৎ আনন্দের জন্যে তিনি সিগারেট এর প্রতি অযথা নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

এভাবে ভালোলাগার অনুভুতি বজায় রাখতে অর্থাৎ আর্টিফিশিয়ালি ডোপামিন নিঃসরণ নিরবিচ্ছিন্ন রাখতে সারাদিনে একজন নিকোটিন ডিপেনডেন্ট ধুমপায়ীর গড়ে ৩০ টির অধিক পরিমানে সিগারেটের স্টিক গ্রহন করতে হয়। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে "নিকোটিন ডিপেনডেন্স ডোপামিন ফ্ল্যাশ", বা "নিকোটিন নির্ভর "ডোপামিন নিঃসরন"।

নিকোটিনের টলারেন্সি বৈশিষ্ট্যের জন্য ধুমপায়ীকে ধীরে ধীরে সিগারেট গ্রহনের পরিমাণ বাড়াতে হয়। অর্থাৎ পুর্বে যে পরিমাণ সিগারেট খেলে আনন্দ, ফুর্তি বা ভালোলাগার অনুভুতি পেতেন, ক্রমাগত ধুমপানের ফলে তার ব্রেইনে এমন কিছু পরিবর্তন চলে আসে যে দিন দিন তাকে একই পরিমান আনন্দ পেতে আরো বেশি পরিমানে সেগারেট খেতে হয়।  অর্থাৎ প্রথম প্রথম একজন ধুমপায়ী যে পরিমাণ সিগারেট নিতেন মাস বা বছর পর দেখা তাকে তার চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ সংখ্যক সিগারেট নিতে হয়।

আর এভাবে ধুমপান করতে করতে সিগারেটে থাকা নিকোটিন ও অন্যান্য মারাত্মক রোগ ক্যান্সার, হাইপ্রেশার, ডায়াবেটিস এর উপাদানের ক্ষতিকারক বিষক্রিয়ায় ক্রমান্বয়ে ধুমপায়ীর ব্রেনের ডোপামিন নির্গমনকারী নিউরন এক সময় নিঃশেষ হয়ে যায় এবং ক্রমাগত ধূমপায়ী স্থায়ী ভাবে ডিপ্রেশন, তীব্র যৌন অক্ষমতা সহ আরো নানাবিধ মানসিক রোগ ও মরনঘাতী রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন।

এছাড়াও নিকোটিনের প্রভাবে দেহে এন্টিঅক্সিডেন্ট (E&C) ও এন্টি ক্যান্সার( A & B5) ভিটামিন কমে যায় ফলে ধুমপায়ীর সুস্থ ভাবে বেচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় এক যুগের অধিক কমে যায় এবং ফুসফুসসহ অন্যান্য অঙ্গ ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার ঝুঁকিও প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়ে যায়।

নিকোটিনের ডিপেনডেন্স, টলারেন্স ও এডিকশন বা নিকোটিন নির্ভরতা বৈশিষ্টের জন্য একজন ধুমপায়ীর পক্ষে ধুমপান ত্যাগ করা এক সময় কষ্টকর হয়ে পড়ে।  তবুও চাইলেই একজন ধুমপায়ী ধুমপান ত্যাগ করতে পারেন। এর জন্য প্রথমতঃ প্রয়োজন ধুমপান ত্যাগের প্রতিজ্ঞা।

দ্বিতীয়তঃ ধুমপায়ী সঙ্গীকে বর্জন করা।  যেহেতু ধুমপায়ীয় গায়ে লেগে থাকা নিকোটিনের গন্ধ আর সিগারেটের প্যাকেটের দৃশ্য ব্রেইনের হিপোক্যাম্পাল এবং নিউক্লিয়াস একুমবেন্স এরিয়া কে নিকোটিন নিতে পুনরায় স্টিমুলেশন বা তাগাদা দিবে।

তৃতীয়তঃ প্রয়োজন ১৫-২০ মিনিট পরপর সাপ্লিমেন্টারি ভিটামিন এ, ই ও সি সমৃদ্ধ ফল (কমলা লেবু বা লেবুর শরবত) খাওয়া, যেহেতু নতুন করে সিগারেট এর মাধ্যমে নিকোটিন না নেওয়ায় ১৫-২০ মিনিট পর নিকোটিন এর ঘাটতির জন্যে উইথড্রল সিম্পটম দেখা দেয় এতে ধুমপায়ী পুনরায় নিকোটিন নেবার জন্য তার ব্রেইন উদগ্রীব হয়ে যায়।

এভাবে একজন ধুমপায়ী ২-৩ সপ্তাহ সহ্য করে চললে তার জন্যে ধুমপান স্থায়ী ভাবে ত্যাগ করা যায়।  কারন ২ থেকে ৩ সপ্তাহ পর নিকোটিনের প্রতি আগ্রহ ব্রেইন থেকে প্রায় মুছে যায়, এবং ব্রেনের ডোপামিন নির্গমকারী কোষগুলো পুনরায় তার পুর্বের ন্যায় স্বাভাবিক পরিমাণ ডোপামিন নির্গমন করতে থাকে।

আরেকটি ব্যাপার লক্ষ রাখতে হবে একজন ধুমপায়ী ধুমপানের ফলে নিজে যে পরিমানে ক্ষতির সম্মুখীন হন, তার চেয়ে দ্বিগুণ পরিমানে ক্ষতির শিকার হন তার পাশে থাকা ব্যক্তি।  একে বলে পেসিভ স্মোকিং।  তাই নিজের অফিস, ঘরে, বেড রুমে, সহকর্মী, স্ত্রী, পুত্র কন্যাদের সামনে ধুমপান করে তাদের জীবন কে ক্যান্সার, ডায়বেটিস, ডিপ্রেশন সহ নানান রোগের জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবেন না।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা। ইসলাম ধর্মে পরিষ্কার বলা আছে যে দ্রব্য জীবন ধারনের জন্যে ক্ষতিকর এবং যে দ্রব্য আপনার মধ্যে আসক্তি বা নেশা তৈরি করে তা থেকে আপনাকে বিরত থাকতেই হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া অর্ণবের সফলতার গল্প 

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া অর্ণবের সফলতার গল্প 

গল্পটা অর্ণবের। পুরো নাম, ইশমাম সাকিব অর্ণব। আব্দুস সোবহান ও হাবিবুন নাহারের…

মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতায় নারীদের পাশে ডব্লিউএসআইএফ 

মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতায় নারীদের পাশে ডব্লিউএসআইএফ 

মানসিক স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। শারিরীক সুস্থতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি মানসিক সুস্থতাও…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর