ডা. মুনিম রেজা

ডা. মুনিম রেজা

এমডি রেসিডেন্ট, চাইল্ড এন্ড এডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রি, বিএসএমএমইউ।


১৩ মে, ২০১৮ ০৩:২৬ পিএম

কিভাবে হলো মাদার ডে?

কিভাবে হলো মাদার ডে?

বহু আগে থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় মাদারস ডের মত দিন নানা নামে পালিত হয়ে এসেছে। তবে এটা জনপ্রিয় হয়ে উঠে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাদারস ডে নামে একটি দিনকে ছুটির দিন ঘোষণা করা হয় এবং নানা ভাবে উৎযাপন করা হয়।

আমেরিকায় ১৯০৫ সালে Anna Jarvis নামে এক ভদ্রমহিলা তার মায়ের সপ্ন পূরণ এবং অসমাপ্ত কাজ শেষ করার মাধ্যমে মাকে সম্মান জানানোর লক্ষ্য নিয়ে মাদারস ডে কে একটি স্বীকৃত ছুটির দিন ঘোষণা করার জন্য প্রচারনা শুরু করেন।

পরবর্তীতে ১৯১৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মাদারস ডে কে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এজন্য Anna Jarvis প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে লিখেন ‘এই দিনটা আমাদের দেশের একটা বড় পারিবারিক দিবস হবে, যে দিনে ছেলে মেয়েরা তাদের মা বাবা ও পরিবারকে সম্মান জানাতে পারবে। আর এর মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হবে এবং পারিবারিক জীবনের গুরুত্ব বাড়বে।’

পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে এই দিনটিকে পালন করতে থাকে। এখানে কয়েকটি দেশের কথা তুলে ধরা হল।

আরব বিশ্ব
এক বিধবা মা তার সারা জীবনের প্রচেষ্টায় ছেলেকে ডাক্তার বানান। ডাক্তার হওয়ার পরে ছেলে বিয়ে করে এবং মাকে ফেলে চলে যায়। এই ঘটনা নাড়া দেয় মুস্তফা আমিন নামে এক মিসরীয় সাংবাদিককে। পরে তার প্রচেষ্টায় প্রথম মিসরে মাদারস ডে শুরু শুরু হয়। 

অস্ট্রেলিয়া
জ্যানেট হেইডেন নামে এক ভদ্রমহিলা অনেক একাকি ও পরিত্যাক্ত মায়ের সাথে সাক্ষাতের পরে তাদের দুর্দশা দেখে তাদের জন্য কিছু করার কথা অনুভব করেন।পরে এসব মায়েদের অনুদান ও পুরস্কার দেয়া এবং তাদের উৎফুল্ল করার জন্য তিনি লোকাল স্কুল ছাত্র ও ব্যাবসায়িদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন। এভাবেই সেখানে চালু হয় মাদারস ডে।

চীন
চিনে মাদারস ডে চালু হয় দরিদ্র মায়েদের সাহায্য করা এবং তাদের স্মরণ করার জন্য।

ফ্রান্স
আশংকাজনক নিম্ন জন্মহারের কারণে ১৮৯৬ ও ১৯০৪ সালে ফ্রান্সে জাতীয়ভাবে বড় পরিবারের মায়েদের সম্মানিত করার ব্যাবস্থা করা হয়। ১৯০৬ সালে দশ জন মাকে ‘High Maternal Merit’ পুরস্কার দেয়া হয় যাদের নয়টি করে সন্তান ছিল। ১৯২০ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই দিনটিকে স্বীকৃতি দেয়া হয় বড় পরিবারের মায়েদের জন্য।

জার্মানি
পারিবারিক বন্ধন হ্রাস পাওয়ার কারনে জার্মানিতে শুরু হয় মাদারস ডে। ১৯২৫ সালে মাতৃত্বকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়। তারপর থেকে এ দিনটিকে মায়েদের অধিক সন্তান নিতে উৎসাহিত করার দিন হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৩৮ সালে অধিক সন্তান নিতে উৎসাহিত করার জন্য জার্মান সরকার, কমপক্ষে চারটি সন্তান আছে এমন মায়েদের পুরস্কার দেয়ার ব্যাবস্থা করে।

উপরের কয়েকটা দেশের মাদারস ডে পালনের কারন লক্ষ্য করলে যেগুলো পাওয়া যায়, তা হচ্ছে-
১. পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা
২. পারিবারিক জীবনের গুরুত্ব তুলে ধরা
৩. মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা
৪. আশ্রমে থাকা পরিবারহীন ও দরিদ্র মায়েদের সহযোগিতা করা 
৫. কম জনসংখ্যা হারের দেশগুলোতে অধিক সন্তান গ্রহনে মায়েদের উদ্বুদ্ধ করা।

সবগুলো পয়েন্টকে একসাথে করে বলা যায় যে, ভঙ্গুর পারিবারিক জীবনকে রক্ষা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি করাই ছিল মাদারস ডের প্রাথমিক উদ্দেশ্য। কিন্তু এই উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। বরং এই দিনটি হয়ে উঠে ব্যবসা বানিজ্যর একটি অন্যতম উপলক্ষ্য। বলা হয় যে, আমেরিকায় যত ব্যাবসায়িকভাবে সফল উৎসব আছে, মাদারস ডে তার মধ্যে অন্যতম।

ফলশ্রুতিতে যে Anna Jarvis এর উদ্দ্যগে মাদারস ডে স্বীকৃতি লাভ করে সেই আনা জারভিস নিজেই হতাশ হয়ে পড়েন এবং মাদারস ডে পালনের বিরোধিতা শুরু করেন। এরকম দিন চালু করার জন্য তিনি খুব অনুতপ্ত হন। তিনি এরকম একটি মহৎ উদ্যোগকে ব্যাবসায়িকভাবে ব্যাবহার করার জন্য এত অনুতপ্ত হন যে তিনি তার সকল সম্পত্তি এবং সারাটা জীবন এটা বন্ধ করার আন্দোলনে ব্যয় করেন। এটা করতে যেয়ে ১৯৪৮ সালে এক বিক্ষোভ থেকে শান্তি বিনষ্টের অভিযোগে গ্রেফতার পর্যন্ত হন। এবং শেষ পর্যন্ত ঘোষণা দেন, আমি অনুতপ্ত যে আমি এটা শুরু করেছি।

শেষ পর্যন্ত আনা জারভিসের আন্দোলন সফল হয়নি। বরং মাদারস ডে ব্যাবসায়ীদের জন্য একটা আশির্বাদ স্বরুপ বিশ্বব্যাপি উৎসবমূখর দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। সম্পতি এটার ঢেউ বাংলাদেশেও লেগেছে। বিশেষকরে বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের তরুন প্রজন্মের কেউ কেউ এই দিনটিকে বেশ সোৎসাহে পালন করছে।  

তবে বাংলাদেশে এই দিবসটি পশ্চিমের দেশগুলোর মত জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি। জনপ্রিয় না হওয়ার কিছু কারন আছে। তারমধ্যে একটা বড় কারন হচ্ছে ধর্মীয় মূল্যবোধ।এদেশের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। আর ইসলামে মায়েদের অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা বিশেষভাবে সংরক্ষিত। ভালো মুসলিম মানেই সে তার মায়ের ব্যাপারে যত্নশীল। এ অবস্থায় মায়ের প্রতি দিবসকেন্দ্রীক ভালোবাসার প্রকাশকে তারা ভালো নেয়না। তাদের বক্তব্য যে, মায়ের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্ত্ব প্রতিটা সময়ের জন্য, কোন বিশেষ দিনের জন্য নয়।

দ্বিতীয় কারণটা হচ্ছে, আবহমান কাল থেকেই এদেশে পারিবারিক বন্ধন বেশ শক্তিশালী, যদিও এদেশের পারিবারিক বন্ধন এখন হুমকির মুখে আছে। এদেশের অগনিত মা তার সন্তানের ফ্যামিলিতে সম্মানের সাথে থাকতে পারেন না। কিছু মা আছেন, সন্তান যাদের পরিত্যাগ করেছে। আবার জীবনের অতিরিক্ত ব্যস্ততাও অনেক সন্তানকে তার মা বাবার সরাসরি পরিচর্চার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখছে। শুধু স্ত্রী- সন্তানদের নিয়ে ছোট পরিবার গঠনের আইডিয়া, শহুরে ব্যস্ততা, পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অস্থিরতা ইত্যাদি  যৌথ পরিবারকে ভেংগে দিচ্ছে এবং বৃদ্ধাশ্রমের আইডিয়াকে ধিরেধিরে জনপ্রিয় করে তুলছে। আগে যেমন পরিবারের সবাই একসাথে থাকত, এখন আর সবাই একসাথে থাকতে চায় না।বরং বাবা মা কে সাথে রাখাটা কেউ কেউ উটকো ঝামেলা মনে করে।

জনপ্রিয় না হওয়ার আরও একটি উল্লেখযোগ্য কারন হচ্ছে ব্যবসায়ীরা এই সেক্টরে বড় আকারে বিনিয়োগকে এখনো লাভবান মনে করছে না।যেদিন তারা মনে করবেন যে এখানে টাকা ঢাললে কাজ হবে, সেদিন থেকে মাদারস ডের প্রচার প্রচারনা অনেক বেড়ে যাবে।লেখালেখি, বিজ্ঞাপন, নাটক, কলাম ইত্যাদি সব মাধ্যমে একযোগে শুরু হবে মাদারস ডে পালনের আবশ্যকতার প্রচারনা। আর এসব প্রচারণা যে জনগনকে মাদারস ডে পালনে অনেক প্রভাবিত করবে তা বলায় বাহুল্য। ক্ষয়িষ্ণু পারিবারিক মূল্যবোধের চলমান এই সময়ে দাঁড়িয়ে তাই বলা যায় এখন না হলেও  ভবিষ্যতে মাদারস ডে এদেশে জনপ্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

সবশেষে বলতে চাই, মায়েরা আমাদের জন্য যা করেছেন তার বিনিময়ে কোন কিছুই যথেষ্ট নয়। মায়ের প্রতি সার্বক্ষণিক ভালবাসা, যথাযথ সম্মান প্রদান ও দায়িত্ত্বপালনই কেবলমাত্র মায়েদের প্রতি আমাদের ঋনের কিছুটা শোধ করতে পারে। এখন আমাদেরকেই ঠিক করতে হবে আমাদের ভুমিকা কি হবে।

আমাদের মায়েরা কখনোই আমাদের ভালোবাসা বঞ্চিত না হোক, আমাদের দ্বারা অসম্মানিত না হোক, আমাদের দায়িত্ত্ব অবহেলার স্বীকার না হোক, এই প্রত্যাশা করি।

দাবি পেশাজীবী সংগঠনের, রিট পিটিশন দায়ের

‘বেসরকারি মেডিকেলের ৮২ ভাগের বোনাস ও ৬১ ভাগের বেতন হয়নি’

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
স্ফিগমোম্যানোমিটার
ইন্সট্রুমেন্ট রিভিউ

স্ফিগমোম্যানোমিটার