ডা. আসিফ রহমান কনক

ডা. আসিফ রহমান কনক

ইন্টার্ন চিকিৎসক

হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


১৩ মে, ২০১৮ ১০:৩৯ এএম

রোহিঙ্গা শিবিরে মানবসেবার যাত্রার গল্প 

রোহিঙ্গা শিবিরে মানবসেবার যাত্রার গল্প 

গত এক বছর ধরে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বেশ আলোচনা সমলোচনা চলছে। হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল রেড ক্রিসেন্টের হওয়ায়, এখানকার চিকিৎসকদের হয়েছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইন্টারন্যাশনাল রেড ক্রিসেন্টের বিদেশী চিকিৎসকদের সাথে কাজ করার সুযোগ। দেশের সেই ক্রান্তিকালে ঐ অসহায় রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন এই নব্য চিকিৎসকরা। 

সেপ্টেম্বর মাসে হলি ফ্যামিলির ইন্টার্নি কো অর্ডিনেটর ডা. নজরুল ইসলাম স্যার বলে রেখেছিলেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাওয়ার কথা। সে অনুযায়ী ১৩ জন ইন্টার্নি ডাক্তারের লিস্ট করা হল। ৪ অক্টোবর, ২০১৭ তারিখে আমাদের অধ্যক্ষ স্যার হঠাৎ আমাদের ১৩জন ডাক্তারকে কনফারেন্সে ডেকে পাঠালেন। কনফারেন্সরুমে দীর্ঘ মিটিং শেষে আমরা কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে অবহিত হলাম।  

- কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালংয়ে নরওয়েজিয়ান রেড ক্রস ও ফিনিশীয় রেড ক্রসের সার্বিক তত্বাবধানে ১০০ বেডের একটি হাসপাতাল নির্মিত হচ্ছে। 
- হাসপাতালের অবস্থান পাহাড়ের উপর একটি রবার বাগানের মধ্যে।
- আমাদের আগামী এক মাস সেখানে থেকে হাসপাতালের আউটডোরে রোগী দেখতে হবে। সাথে যে কোন জরুরি মেনেজমেন্ট তো থাকছেই। 
- আমাদের থাকা, খাওয়া ও সম্মানীর দায়িত্ব বর্তেছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ওপর। 
- আগামীকালই সেখানে পৌছে নিজ দায়িত্বে স্যারের কাছে রিপোর্ট প্রদান করতে হবে। 

স্যারের কথা অনুযায়ী পরদিনই শুক্রবার সকালে আমরা গ্রীনলাইনে চেপে বসলাম। জীবনে প্রথম এভাবে কোথাও পরিবার ছাড়া যাচ্ছি। আগামী ১মাস কোথায় থাকবো, কেমন থাকবো জানা নেই। এই চিন্তা করতে করতেই টের পেলাম বাসের চাকা নড়তে শুরু করেছে। 

যাত্রা পথে প্রায় ৭ প্যাকেট চিপ্স, লান্ঞসহ নানা হাবিজাবি খেয়ে ১৪ ঘন্টা পর আমরা কক্সবাজারের হলিডে মোড়ে আমাদের জন্য নির্ধারিত হোটেল ‘সিলভার শাইনে’ উঠি। রুম দেখে ভাল লাগল, দুজন থাকা যায়। যে যার রুমে খেয়ে নিলাম, তারপর ঘুম। 

পরদিন সকাল বেলায় আমরা স্থানীয় রেডক্রিসেন্ট এর অফিসে মিটিং করি নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের ডাক্তার, মিডওয়াইফদের সাথে। এরই মাঝে জানতে পারি ১০০ বেডের সেই হাসপাতালের নাম ERU Hospital(EMERGENCY RESPONSE UNIT HOSPITAL) যেটি তখনও সম্পূর্ন নির্মিত হয়নি। তাই আমাদের অপেক্ষা করতে বলা হলো আরও এক সপ্তাহ।  

আমরা অপেক্ষার মাঝে সারাদিন ঘুরতাম কক্সবাজার শহরে। লাবনী বীচ, সুগন্ধা বীচ, কলতলী বীচ, ইনানী বীচ সবকটাই ঘুরলাম। বার্মিজ মার্কেটে গিয়ে টুকটাক কেনাকাটা সেরে নিলাম। এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। হঠাৎ একদিন ডাক এলো ডিউটির। সকাল সকাল বেরিয়ে গেলাম। মেরিন ড্রাইভ রোড ধরে এগোতে থাকলাম। এক পাশে সমুদ্রের গর্জন আরেকপার্শে নীরব পাহাড়। কুতুপালংয়ে আমাদের ERU hospital-এ পৌছালাম। হাসপাতাল পরিদর্শন করলাম। তারপর অফিসিয়াল নির্দেশ মোতাবেক সবগুলো রোহিঙ্গা শিবির ঘুরে দেখলাম টেকনাফ পর্যন্ত। রাতে ফিরলাম, পরদিন থেকে ডিউটি শুরু। 

প্রথম ডিউটি 
আউটডোরে গিয়ে দেখি সুন্দর করে সাজানো টেবিল। সমগ্র আউটডোর, হাসপাতাল সবই তাবুর ভিতরে। আমার জন্য নির্ধারিত টেবিলে বসলাম। রোগী আসা শুরু হল। প্রথম কয়েকজনের সময় আমার শিক্ষক ডা. রাশেদ স্যার সাথে ছিলেন। তারপর আমি একা রোগী দেখতে লাগলাম। জানিনা কেন, আধা ঘন্টার মধ্যেই নিজের ভেতর বেশ শক্ত দায়িত্ববোধ অনুভব করলাম। যখন মনে হল, এটা আমার মানবিক, নৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। ক্যারিয়ারের একদম শুরুতেই এমন একটা দায়িত্ব! যেভাবে হোক নিজের সর্বোচ্চ টুকু দেয়ার প্রতিজ্ঞা করলাম নিজের কাছে। 

একের পর এক নানুষ আসতে লাগল। বেশিরভাগই মায়ানমারের আর্মি কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে দেশ ছেড়েছে। এদের কেউবা মানসিক ভারসম্য হারিয়ে ফেলেছে। ছোট বাচ্চাগুলি আর বয়স্কদের অবস্থা একদম নাজুক ছিল। আমার সাথে স্থানীয় একজন ট্রান্সলেটর ছিল। রোহিঙ্গাদের ভাষা অনুবাদ করে দেওয়ার জন্য। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত কাজ চলল। মাঝে হয়ে গেল দুপুরের খাবারের পালা। সন্ধ্যা ৬টায় নাইট শিফ্টের ডাক্তাররা চলে আসলে তাদের ডিউটি বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় নিলাম। হোটেলে ফেরার পথে গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়তাম ক্লান্ত হয়ে। 

নাইট ডিউটি
কয়েকদিন ডিউটির পর আসল আমার নাইট ডিউটির পালা। যথাসময়ে পৌছালাম ও নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, কানাডার ডাক্তাররা আর আমি মিলে রাউন্ড দিলাম। তাদের কাছ থেকে শিখলাম, নিজস্ব মতামতও দিলাম। শেখা, জানা ও জানানোর ছিল অনেক কিছু। রাত ১০ টায় কাজ শেষ। কিন্তু ঐদিনই রাত ১১টায় এলো দুর্ঘটনার শিকার দুই রোগী। দুজন বয়স্ক লোক। কপালে সেলাই দিলাম ৮টা। এখানে বলে রাখি, রাতে আমাদের ঘুমানোর কোন ব্যবস্থা ছিল না। সারা রাত রোগীদের তাবুর বাইরে চেয়ারে বসে থাকতে হতো। পাহাড়ী নির্জন এলাকা, ম্যালেরিয়ার প্রকোপ চারদিকে। ঠান্ডা কুয়াশার ভিতর চোখে পড়ল শেয়ালের আনাগোনা। কান পাতলে খানিক দূরেই কিছু নড়ে ওঠার শব্দ। সেগুলো বন্য হাতি। মিথ্যা বলবো না, কিছুটা ভয় লাগতো কিন্তু। 

আমরা ডিউটি অফের দিনগুলোতে নিজেরা ঘুরতাম। রাতের বেলাতে ঝড়ের সমুদ্র দেখেছি। অপূর্ব সুন্দর প্রকৃতি। খাবার খেয়েছি শুঁটকি, চিংড়ি, লৈটাফ্রাই। আমি এবং আমার সম্মানিত কলিগ ডাক্তার সাফিকা বেশ কিছু জায়গায় ঘুরে বেড়ালাম। ওনার বাবা পুলিশ অফিসার হওয়াতে বাড়তি নিরাপত্তাও মিললো। দেখতে দেখতে পুরা একটা মাস শেষ হয়ে গেল। পুরা সময়টাতে ফোনে বাবা মাও খুব সাহস দিয়েছেন। বলতেন, ‘অনেক ভাল কাজে গিয়েছিস বাবা।’ এ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।
 
ডিউটির শেষ দিনে, এতদিন যাদের সাথে কাজ করেছি তাদের থেকে বিদায় নিলাম। ডাক্তার লাটা, ডাক্তার কিম, ডাক্তার মার্টিন, ডাক্তার ভিদার, ক্রিস্টিন, মিন্ননা, এ্যানি সবাই আমাকে ধন্যবাদ জানালো। যদি সুযোগ থাকে রেডক্রসের হয়ে কাজ করার আহবান জানালেন তারা আমাদের। সম্মান ব্যাপারটা যে কত সুন্দর ঐদিন টের পেয়েছিলাম। এক মাসের কষ্ট সার্থক মনে হচ্ছিল।

এই শহর, এই মানুষ, সমুদ্র, পাহাড়, ERU hospital, দেশী ও বিদেশী কলিগ সবার কথা ভাবতে ভাবতেই বাংলাদেশ বিমানের ১১টার ফ্লাইটে ওঠে বসলাম। ‘ভাল থেকো কক্সবাজার বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে’ মনে মনে এটাই বলছিলাম।  

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত