ঢাকা      মঙ্গলবার ২২, মে ২০১৮ - ৮, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ - হিজরী



রওশন আখের

মেডিকেল স্টুডেন্ট,

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ,ঢাকা।


আত্মহত্যার কারণ ও সমাধান

ইদানিং আত্মহত্যার পরিমাণ খুব বেড়ে গেছে।বিশেষ করে বোর্ড পরীক্ষা গুলোর রেজাল্ট পরবর্তী আত্মহত্যা, মেডিকেলে ডিপ্রেশনে থেকে আত্মহত্যা, পারিবারিক সমস্যা কিংবা প্রেমজনিত সমস্যায় পড়ে আত্মহত্যা দিনকে দিন বেড়েই চলছে! এরকম চলতে থাকলে আত্মহত্যা একটা ট্রেন্ড হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে, যেটা খুব একটা ভয়ানক বিষয়! আপনি আত্মহত্যার কারণগুলো একটু নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করলেই নিচের বিষয়গুলো উদঘাটন করতে পারবেন।

১. সফলতার চরম নেশা:
জীবনে প্রত্যেক মানুষই সফল হতে চায়, এটা মানুষের একটা স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য বলতে পারেন। তবে এই সফল হওয়ার নেশা এত চরম মাত্রায় পৌঁছায় গেছে যে, সফল হতে না পারলে সে জীবনের আর কোন মূল্য নেই; এমন মানসিকতা আমাদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সফল না হতে পারলেই জীবনের প্রতি আর মায়া কাজ করেনা আমাদের! তখন জীবনকে নিঃশেষ করতে ন্যূনতম সময় নেই না!

২. সফলতা মানেই বড় প্রফেশন:
আমরা সফলতা মানেই বড় কোন প্রফেশনকে মনে করি। অথচ জীবনে সফলতা মানে শুধু বড় প্রফশনে যাওয়া নয় বিষয়টাকে আমরা মুখে স্বীকার করলেও অন্তর দিয়ে মেনে নিতে পারি না!

৩. ভোগ-বিলাসময় সমাজ:
আমরা জীবনকে শুধু ভোগ-বিলাসের জন্য ভাবতে শুরু করেছি। 'যে যত বেশি ভোগ-বিলাস করতে পারে সে তত বেশি সুখী' বিষয়টাকে আমরা অন্তরে গেথে নিয়েছি। ফলশ্রুতিতে আমরা ভোগ-বিলাসময় জীবনে সফল হতে শিক্ষা নামক হাতিয়ারকে মাধ্যম হিসাবে বেছে নিয়েছি। যে যত ভালো প্রফেশনে যাবে সে তত বেশি রোজগার করবে, তার জীবন তত ভোগ-বিলাসিতায় অতিবাহিত হবে; এরকম মানসিকতার জন্য আমরা যখন পড়ালেখায়, ব্যবসায়িক কিংবা কর্মময় জীবনে সফল হতে পারি না তখন জীবনকে নিরর্থক ভাবতে শুরু করি! ফলে তখন জীবনকে শেষ করতে কোন কিছুই আর বাধা হিসাবে চোখের সামনে ভাসতে দেখা যায়না! মনে হয় এ জীবন রাখার চেয়ে না রাখাই ভালো!

৪. অভিভাবকদের মানসিকতা:
বর্তমান আমরা কাগজে কলমে শিক্ষিত হলেও মনের দিক দিয়ে শিক্ষিত হতে পারিনি! শিক্ষাকে আমরা একটা গেইম হিসাবে নিয়েছি, আর সেই গেইমের হিরো হিসাবে নিজের ছেলে মেয়েকে লাগিয়ে দেই উইন হওয়ার জন্য। যখন গেইম জিততে পারে না তখন নিজের ছেলে মেয়েকে এতটা ভর্ৎসনা করি যে তাদের জীবনকে অর্থহীন হিসাবে তুলে ধরি তাদের সামনে!

৫. কষ্ট সহ্য করার মানসিকতার অভাব:
মানব মন এতটা দূর্বল সেটা আমরা উপস্থাপন করি আমাদের কিছু হতাশার মাধ্যমে! জীবনে চলার পথে শত সহস্র বাধা, দুঃখ-কষ্ট আসবে এটা খুব স্বাভাবিক। এই কষ্টগুলোকে সফলতার সিঁড়ি হিসাবে পছন্দ করতে আমরা রাজি নই! আমরা জীবনকে সফলতার চূড়ায় দেখতে চাই বিনা কষ্ট ক্লেশে! জীবনে কষ্ট সহ্য করার মানসিকতা আজও আমাদের ভিতর প্রতিষ্ঠিত হয়নি!

৬. ধৈর্য্য ধরার মানসিকতার অভাব:
বইয়ের পাতায় কিংবা পরীক্ষার খাতায় অধ্যবসায়ী জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ধৈর্য্যকে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে নিজের জীবনে সেটাকে প্রাধান্য দিতে পারিনা আমরা! যেকোন কাজে অল্পতেই ধৈর্যহীন হয়ে পড়ি, সময় নিতে চাই না আমরা সফলতার দ্বারপ্রান্তে যেতে! ফলে সহজে সফলতা আমাদের ধরা দেয় না, আর যেটা জীবনকে করে তোলে অতিষ্ট!

৭. পারিবারিক ও সাংসারিক কলহ বৃদ্ধি:
দিনদিন আমাদের সমাজে পারিবারিক ও সাংসারিক কলহ বেড়েই চলছে। এর কারণগুলোর ভিতর হিসাবে নিজের আত্মমর্যাদাবোধকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া আর অন্যের মতকে প্রাধান্য না দেওয়া সবচেয়ে বড় কারণ। স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতাবোধ বর্তমান নারীদের একটা বড় ধরনের অসুখ বলা যায়। আর স্ত্রীকে দাসী হিসাবে ভাবার মানসিকতা এখনও আমাদের পুরুষদের গেল না!

৮. আবেগকে বেশি প্রশ্রয় দেওয়া:
বর্তমান প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি আবেগকেন্দ্রিক। এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী মিডিয়াকেই করা যায়। আবেগ নির্ভর আর প্রেম-ভালোবাসা কেন্দ্রিক নাটক সিনেমা গুলো এখন টিনেজ ছেলেমেয়েদের কাছে সহজলভ্য করে এদের আবেগকে উসকে দেওয়া হয় শতগুণে! এরা প্রতিটা কাজে নিজের আবেগ দিয়ে ভাবে, বিবেকের দংশন আর হয় না কখনও!

৯. অসামজিক কর্মকান্ড বৃদ্ধি:
দিনদিন অসামাজিক কর্মকান্ড বেড়েই চলছে, যেটা ভয়ানক একটা বিষয়।বিশেষ করে আরো ভয়ানক বিষয় হলো এসব অসামাজিক কর্মকান্ড যখন ব্ল্যকমেইলের কারণ হয়ে যায়!

১০. উদাসীন জীবনযাপন:
আমরা অধিকাংশ মানুষ উদাসীন ভাবে জীবনযাপন করি।জীবনের উদ্দেশ্য কী ও কেন এটা উপলব্ধি করি না! সময়ের স্রোতে সবার সাথে তাল মিলিয়ে জীবনকে ভাসিয়ে দেই উদাসীনতার সাগরে! ফলে হতাশা সহজেই আমাদের শিকার করে ফেলে!

১১. অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা করা:
অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা করার প্রতিযোগিতা শুরু হয় সেই ছোট বেলা থেকে। ক,খ কিংবা A,B শিখাতেই বাবা মা বলে দেখো ঔ যে বাবুটা কত সুন্দর পারে, তোমাকেও পারতে হবে। এই যে শুরু হয় তুলনা করার প্রতিযোগিতা যেটা চালু থাকে কবরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত।সৃষ্টিকর্তা সবাইকে সমান মেধা, যোগ্যতা দেননা এটা আমরা মানতেই চাইনা কোন কালে! আর এই তুলনামূলক ব্যবস্থাই সবচেয়ে বেশি হতাশাগ্রস্থ করে তোলে একটা মানুষের জীবনকে।

১২. পাশে পাওয়ার মত মানুষের অভাব:
আমাদের এখনকার সমাজে বন্ধু বান্ধবের অভাব হয় না, যেটা হয় প্রকৃত বন্ধু-বান্ধবের অভাব। আমাদের বন্ধুত্বগুলো শুধু মজা-মাস্তি আর ট্রিটের ভিতর সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে! বন্ধু মানে যে সুখে দুঃখে কাধে কাধ রেখে চলা এটা বর্তমান সময়ে খুব কম দেখা যায়। একই সাথে চলা বন্ধুর ভিতরটা আমরা কম জনই উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। সবচেয়ে বড় বন্ধু বাবা-মাকেই আজ আমরা কর্ম ব্যক্ততার ফলে দুঃখের সময় কাছে পাইনা!

১৩. ধোকাবাজদের স্বার্থপর ধরণী:
সুন্দর ধরণীতে ধোকাবাজদের সংখ্যা দিনদিন বেড়ে চলেছে।নিজের স্বার্থ উদ্ধার করতে আমরা মানুষের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে দ্বিধাবোধ করি না আজকাল!

১৪. জীবনের অর্থ না বুঝতে পারা:
আমরা জীবনের অর্থ বুঝতে ব্যর্থ অধিকাংশ মানুষই। আমরা জীবনকে শুধু কর্ম, উন্নতি আর উপভোগের বিষয় হিসাবে ধরে নিয়েছি! জীবন সৃষ্টিকর্তার এক সুন্দর নিয়ামত এটা আমরা ভুলে যাই হার হমেশায়! সুন্দর এই নিয়ামতকে ভালো কিছু কাজে ব্যয় করার মাঝে জীবনের সফলতাকে ধরে নিতে পারিনি আজও আমরা!

১৫. সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা না করা:
আমরা কোন কাজে সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা করতে পারি না।নিজেকে এত বেশি কর্মঠ হিসাবে ভাবি যে সফল হতে শুধু নিজের মেধা, যোগ্যতাকে ভাবতে থাকি। সৃষ্টিকর্তা যেকোন কিছু করতে পারেন এই বিশ্বাসটা আমাদের ভিতর নিগূঢ় হতে পারেনি! ফলে বিপদে মসিবতে সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা করতে পারি না, চাই ও না! জীবনে সৃষ্টিকর্তা যা করেন তা ভালোর জন্যই করেন এটা দু একবার মুখে বললেও বেশিক্ষণ তার মর্যাদা রাখতে পারি না!

১৬. আত্মহত্যার পরিণতি না বিশ্বাস করা:
আত্মহত্যা মহাপাপ এটা মুখে বললেও যারা আত্মহত্যা করে আমার বিশ্বাস তারা এটা মন থেকে মানতে পারেনা। আত্মহত্যা করলে পরজীবনে যে কত নির্মম হয় এই বিষয়টা আমাদের অনেকের হয়ত জানা নেই। আত্মহত্যা করলে পরজীবনে বারবার সেভাবেই সাজা দেওয়া হবে; এটা জানলে মনে হয় না কেউ আত্মহত্যা করার সাহস পাবে।

সমাধান:

১. জীবনে সফল হতে হবে তবে সেটাকে জীবনের চেয়ে বেশি মূল্য দেওয়া যাবে না।

২. বড় প্রফেশনে যাওয়া মানেই সফলতা এমন মানসিকতা থেকে সরে আসতে হবে।প্রতিটা কাজের ভিতর থেকে সেটাকে সফলতা হিসাবে মেনে নিতে হবে।

৩. জীবনকে শুধু ভোগ-বিলাসিতায় নিমজ্জিত করা যাবে না। সাধ্যের মধ্যে জীবনকে কল্পনা করতে হবে।

৪. অভিভাবকদের বিকৃত মানসিকতা থেকে সরে আসতে হবে। সন্তানদের জীবনকে গেইম হিসাবে না নিয়ে তাদেরকে তাদের সাধ্যমত কাজে লাগাতে হবে।

৫. কষ্ট করার মানসিকতা তৈরী করতে হবে আমাদের। কষ্ট ছাড়া সফল হওয়া যায় না, কষ্টকেই সফলতার সিঁড়ি ভাবতে হবে।

৬. প্রতিটা কাজে ধৈর্য্যের পরিচয় দিতে হবে। ধৈর্য্য ছাড়া হতাশা বিহীন জীবন কখনও কল্পনা করা যায় না।

৭. পারিবারিক ও সাংসারিক জীবনে একে অন্যকে প্রাধান্য দিয়ে চলতে হবে।

৮. আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। সবসময় বিবেক দিয়ে ভাবতে হবে যে কাজ করা হচ্ছে সে কাজের ফলাফল কী হতে পারে।

৯. অসামাজিক কর্মকান্ড বন্ধ করতে ধর্মীয় শিক্ষার বিকল্প নেই।

১০. উদাসীন জীবনযাপন না করে লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে যেতে হবে।

১১. নিজেকে কখনও অন্যের সাথে তুলনা করা যাবে না।নিজের যেটুকু আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

১২. সবসময় পাশে পাওয়ার মত বন্ধু বান্ধব নির্বাচন করতে হবে।বিশেষ করে বাবা-মাকে সবচেয়ে কাছের বন্ধু হিসাবে নিতে হবে।

১৩. নিজের স্বার্থপরতাকে কখনও আগে দেখা যাবে না। মানুষের জন্য ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতা তৈরী করতে হবে।

১৪. জীবনের অর্থ মানে কী বুঝার অনুধাবন করতে হবে। শুধু খেলাম, পড়লাম, ঘুরলাম, ঘুমালাম এই কয়েকটা কাজের মধ্যে জীবনকে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। জীবন মানে সৃষ্টকর্তার মহৎ উদ্দেশ্যের ফল সেটা মাথায় রাখতে হবে।

১৫. প্রতিটা কাজে সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

১৬. আত্মহত্যা করলে পরজীবনে সৃষ্টিকর্তা অনুরূপভাবে বারবার শাস্তি দিবেন বিষয়টা জানা ও প্রচার করা জরুরি।

হয়ত বিষয়গুলোর গুরুত্ব পরিমাপ করে মানতে পারলে আত্মহত্যা অনেকাংশেই কমে যাবে।কিন্তু আদৌ তা সম্ভব হবে কিনা জানা নেই!

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ফিলিস্তিনি তরুণ চিকিৎসক হাইসামের গল্প

ফিলিস্তিনি তরুণ চিকিৎসক হাইসামের গল্প

হাইসাম আবু সুলতান। ফিলিস্তিনের এক বোকাসোকা টাইপ আবেগী ছেলে। নিজের দেশ ছেড়ে…

মুমূর্ষু রোগীর পাশে এ কেমন অসভ্যতা?

মুমূর্ষু রোগীর পাশে এ কেমন অসভ্যতা?

সকাল সকাল হাসপাতালে ঢুকে ইমার্জেন্সি ডিউটির দায়িত্ব হাতে নিয়েই বিপদে পড়লাম। ইমার্জেন্সি…

ঘুষ, দুর্নীতির চেয়েও মাদক মারাত্মক!

ঘুষ, দুর্নীতির চেয়েও মাদক মারাত্মক!

মধ্যরাতে পুলিশ এক যুবককে ধরে নিয়ে এলো হাসপাতালে। দা দিয়ে নিজেই তার…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর