ঢাকা      সোমবার ২২, অক্টোবর ২০১৮ - ৬, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী

আমার চিন্তা ভাবনা বই দ্বারা প্রভাবিত: ডা. মাহাথির মোহাম্মাদ

নির্বাচনের ঠিক কয়েকদিন আগে ডা. মাহাথির মোহাম্মাদ মালয়েশিয়ার একটি পত্রিকার সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনায় অংশ নেন। মেডিভয়েসের পাঠকদের জন্য আজ থাকছে, সাক্ষাৎকারটির অনুবাদ।

সাংবাদিক: এটা কি নিশ্চিত যে আপনি Langkawi থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন? 

মাহাথির: হয়তো। আমি এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। কারণ, আরো অনেক আসন থেকেও সবাই আমাকে নির্বাচন করার জন্য বলছে। তারা নিশ্চিত করে বলছে যে আমি জিতে যাবো, কিন্তু আমি এখনো সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারিনি।

এছাড়াও যেখানেই আমি নির্বাচন করতে চাই, সেখানেই নাজীব অনেক গিফট নিয়ে হাজির হয়। লোকজনের প্রত্যেককে ১০০০ রিংগিত দেওয়া হচ্ছে, কিচেন কুকার এবং অন্যান্য গিফট দেওয়া হচ্ছে। এজন্য আমি যখন বলি, এখানে নির্বাচন করবো, ওখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো, সে সব জায়গায়ই অনেক গিফট নিয়ে চলে যায়। এবং লোকজনও এজন্য আমার প্রতি কৃতজ্ঞ। তারা বলে, আপনি এখানে এসেছেন, তাই আমরা এতোকিছু পাচ্ছি।

সাংবাদিক: আপনি কোন আসনে নির্বাচন করবেন, সেটি কিভাবে ঠিক করবেন?

মাহাথির: আমার হারার সুযোগ নেই। তাই আমি এমন একটি আসন বেছে নিবো, যেখানে আমি অবশ্যই জিতবো।

সাংবাদিক: বিরোধীদলে থেকে নির্বাচন করার অনুভূতি কি একটু হলেও অন্যরকম না?

মাহাথির: বলতে পারেন, এটা খুবই অদ্ভুত। আগে যারা আমার নামে বাজে বলতো, আমিও যাদের নামে কথা বলতাম, তারা সবাই এখন আমার সাথে কাজ করছে। মজার বিষয় হচ্ছে তারা আমাকে তাদের লিডার হিসেবেও বেছে নিয়েছে। এটা একটি অবিশ্বাস্য বিষয় ছিলো। কিন্তু, তাদের সাথে এখন আমার ভালোই সম্পর্ক।

সাংবাদিক: এই যে ভালো সম্পর্কের কথা আমরা বলছি, সেটা কি ব্যক্তিগত পর্যায়েও ?

মাহাথির: হ্যাঁ, হ্যাঁ, ব্যক্তিগত পর্যায়েও। আমার সময়ে আমার বিরুদ্ধে তারা যেসব ব্যাপার নিয়ে অভিযোগ তুলতো, আমি বলবো, এখন তার অনেকগুলোর কারণ বুঝতে পারছি।

সাংবাদিক: বিরোধীদলের একতা কেমন? 

মাহাথির: অনেক বেশি। আমি অবাক হয়েছি যে তারা আমাকে মেনে নিয়েছে। তারা সবাই, বিশেষ করে লিডাররা। তাদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের লোক রয়েছে। চায়নিজ, জাপানিজ, ইন্ডিয়ান। এটা এককথায় অচিন্ত্যনীয় ছিলো। কিন্তু, তারা খুবই সতর্ক কারণ, আমাদের মূল উদ্দেশ্য একটাই, নাজিবকে হটাতে হবে।

সাংবাদিক: কোথায় কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে আপনি মনে করেন?

মাহাথির: জহর। জহর একটি দুর্গম দূর্গ। আর ওখানকার মানুষ ট্র্যাডিশনালি একটা দলই সাপোর্ট করে। জহরে অবস্থান তৈরি করা খুবই কঠিন হবে।

সাংবাদিক: এককালে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান আনোয়ার ইব্রাহীমের দলের সাথে যোগ দেওয়ার ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখছেন?

মাহাথির: তিনি যখন আমাকে মেনে নিয়েছিলেন তখনও তার মেয়ে আমাকে মেনে নেয়নি। সে আমার বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ আর্টিকেল লিখেছিলো। তাকে এটা বোঝানো হয়েছে যে আমরা একসাথে কাজ না করলে আমরা এই নির্বাচন জিততে পারবো না। আর যতো পার্থক্য আমাদের মধ্যে ছিলো, সব ভুলে যাওয়া শিখতে হবে। প্রথমত আমাকে অপোজিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে মেনে নিতে উনার অনেক কষ্ট হয়েছে। তারপর যখন আমার নাম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেওয়া হলো, তার সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সময় লেগেছে। অবশেষে তিনি বুঝতে পেরেছেন। আর মানুষও তাকে বলেছিলো যে, অন্য কাউকে দিয়ে আপনি জনগণের সমর্থন আদায় করতে পারবেন না। তাই সবকিছু মিলিয়ে বাস্তবতা মেনে নিয়েই তিনি আমার প্রতি সমর্থন দিলেন। 

আর আসলে তার উপরও আমার কোনো অভিযোগ নেই। তিনি এখনো আমার কারণে নয়, নাজিবের কারণেই জেলে আছেন। তাই আমি আর অতীত নিয়ে চিন্তা করতে চাই না। তিনি যা করেছিলেন, নাজীব যা করছে এটার মধ্যে তুলনা করা যায় না।

সাংবাদিক: সিঙ্গাপুর নিয়ে আপনার চিন্তা-ভাবনা কি?

মাহাথির: আপনারা জানেন, আমি সিঙ্গাপুরে পড়াশোনা করেছি। তাই আমি সিঙ্গাপুর সম্পর্কে ভালোই জানি। সিঙ্গাপুরের মানুষজন হচ্ছে শহরের মানুষ। শহরের মানুষরা গ্রামের মানুষদের থেকে একটু ভিন্নভাবেই আচরণ করে থাকে। গ্রামে আমরা সবাই সবাইকে চিনি, একে অপরকে বাসায় দাওয়াত দেই এবং সবাই সবার বাসায় যাই। কিন্তু যখন আমি সিঙ্গাপুর পড়াশোনা করছিলাম, আমি কোনোদিন কারো বাসায় দাওয়াত পাইনি। আমার সাথে সবার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। এখন পর্যন্ত ৪৭ ব্যাচের সবাই একে অপরের সাথে ক্লোজ। তারপরেও যখন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম, সেখানে সিঙ্গাপুরের ছাত্র আর মালয়েশিয়ান ছাত্রদের মধ্যে কিছুটা হলেও দুরত্ব ছিলো।

একবার আমি গার্লস হোস্টেলে যাওয়ার জন্য একটা ট্যাক্সি নিয়েছিলাম। ট্যাক্সি আমাকে কিচেন এরিয়ায় নামিয়ে দিয়েছিলো। কারণ, আমি মালয়েশিয়ান ছিলাম। কিছু কিছু বিষয়ে আমি খুব কষ্ট পাই, কিন্তু তার মানে এই না যে, সিঙ্গাপুর নিয়ে আমার কোনো বিদ্বেষ আছে। আমাকে অবশ্যই মালয়েশিয়ার পজিশন ধরে রাখতে হবে। এটা সত্যি যে, সিঙ্গাপুর অনেক উন্নতি করেছে। আমি বিশ্বাস করি আমরাও এরকম হতে পারবো। আমাদের সেরকম জনশক্তি রয়েছে।

সাংবাদিক: সিঙ্গাপুর নিয়ে আপনার ভাবনা কিভাবে প্রকাশ করবেন?

মাহাথির: আমি সবসময় আশা করেছি যে মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরের মতো হবে। নাজিবের কারণে আমার সব আশা শেষ হয়ে গেছে। আমরা খুব দ্রুত আগাচ্ছিলাম। উদাহরণ হিসেবে আপনি কুয়ালালামপুর কে দেখতে পারেন। এটা ১৯৮১ সালের কুয়ালালামপুর নয়। আজ এটা অনেক বড় শহর। সাত মিলিয়ন লোকের বসবাস এখানে। আমাদের এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য অনেক। তাই আমরা সিঙ্গাপুরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখি, মডেল হিসেবে দেখি। আমরা অবশ্যই করতে পারবো। আপনারা জানেন, আমি একটি শ্লোগান তৈরি করেছিলাম যে, "মালয়েশিয়া বলেহ" মানে 'আমরাও পারবো'। আমি মানুষকে বুঝিয়েছিলাম যে, আমরাও সিঙ্গাপুরের মতো হতে পারবো।

সাংবাদিক: হাই স্পীড রেল নিয়ে আপনি কি ভাবছেন?

মাহাথির: আমার মনে হয় হাই স্পীড রেল বিষয়টা আমাদের জন্য এখনো অকালপক্বতা। আমাদের দরকার হচ্ছে বর্তমান রেলের উন্নয়ন করা। আমরা যদি ১৮০ কি.মি. গতি করতে পারি, তাহলে এটাই যথেষ্ট। কারণ, দুরত্ব খুবই কম। এখানে চায়না বা জাপানের মতো নয়। ওখানে তো স্পীড ট্রেন থাকা সত্ত্বেও তিন ঘন্টা সময় ব্যয় হয়। কিন্তু এখানে কুয়ালালামপুর থেকে সিঙ্গাপুর, আধাঘন্টার পথ। তাই এটা নিয়ে আমাদের পরে চিন্তা করাই ভালো। আমি এখন বর্তমান লাইনগুলো ঠিক করার চিন্তা করবো, স্পিড বাড়াবো এটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে।

সাংবাদিক: আপনার ইয়াং লুকের রহস্য কি?

মাহাথির: অনেক মানুষ আমাকে এটা জিজ্ঞেস করে। আমি সবাইকে এই গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলি যে, বেশি খাবেন না। একবার মোটা হয়ে গেলে, আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া কষ্টসাধ্য। এটা আমার মায়ের পরামর্শ। আমার মা বলতেন, যখন খাবার অনেক লোভনীয়, থেমে যাও। নিজেকে সামলে রাখা খুবই কঠিন হতো। কিন্তু যখন আমি মেডিসিন পড়লাম,তখন বুঝতে পারলাম এটা কতো ভালো উপদেশ ছিলো। কারণ, যখন আমরা খাই, পাকস্থলী বড় হয়। আর নিয়মিত বেশি খাওয়া দাওয়া করলে এটা অনেক বড় হয়ে যায়। তারপর যখন যথেষ্ট খাওয়া হয়না, তখন প্রচন্ড ক্ষুধা লাগে। তাই আবার খেতে হয় এবং এভাবেই অনেক মোটা হয়ে যায়। আমি এসব বিষয়ে নিয়ম মেনে চলি। আমি আমার মায়ের উপদেশকে শ্রদ্ধা করি এবং মানুষকে বেশি খেতে মানা করি। মনে রাখবেন, যখনই দেখবেন খাবার খুবই মজাদার, দয়া করে নিজেকে থামানোর চেষ্টা করবেন। এটা খুবই কঠিন। কিন্তু কিছুদিন পরে সহজ হয়ে যাবে। কিছুদিন পরেই আপনি নিজের অনুভূতি কন্ট্রোল করা শিখে যাবেন।

সাংবাদিক: আমি আপনার চুলের ব্যাপারে বলছিলাম। এগুলা সবই আপনার জিনগত। তাই না?

মাহাথির: আমি স্বাস্থ্যবিধি মেনে জীবন যাপন করি। এর বাইরে আসলে আমি কিছু জানি না। আমি মনে করি আমি খুব বেশি দুশ্চিন্তা করি না। কিন্তু আবার মনে হয় আমার হৃদয় আমাকে বুঝে না। তাই আমাকে দুটো বাইপাস সার্জারী করতে হয়েছে। 
সবকিছুর পরে, জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নিয়ম মেনে চলা।

সাংবাদিক: আপনাকে কি স্টেম সেল ট্রিটমেন্ট নিতে হয়েছিলো? 

মাহাথির: না। কোনো ধরনের ইনজেকশন না। স্টেম সেলও না।

সাংবাদিক: আপনি কি আপনার সম্পর্কে কোন গুজব শুনেছিলেন? 

মাহাথির: হ্যাঁ, সবই শুনেছি। কিন্তু আমি কিছুই নেইনি।

সাংবাদিক: এটা শুধু শারীরিক ভাবে নয়, আপনি মানসিক ভাবেও অনেক ইয়াং। এটা কিভাবে সম্ভব হলো?

মাহাথির: আমি ছোটবেলায় অনেক বই পড়তাম। আমার চিন্তা ভাবনা বই দ্বারা প্রভাবিত হতো। আমি ব্রিটিশদের সম্পর্কে পড়েছিলাম। সাহসী হওয়া, বীরত্ব, সুশৃঙ্খল হওয়া এসব বিষয়ে আমি পড়েছি। সবকিছুই আমার উপর কাজ করে। আমি তরুণদের বলি, প্লিজ পড়ো। কিন্তু মানুষ এখন আর বেশি পড়াশোনা করে না। পড়লে আপনি অনেক কিছুই শিখতে পারবেন। আমি পর্যবেক্ষণ করি। অনেক কিছুই দেখি। মানুষ ট্রাভেল করে, কিন্তু দেখে না। আমি সবকিছুই দেখি। আমি যখন ট্রাভেল করি, তখন টাকাটা উসুল করে নিই।

সাংবাদিক: আপনার স্ত্রী (ডা. সিতি হাসমাহ মো. আলী) কি আপনাকে রাজনৈতিক পরামর্শ দেন?

মাহাথির: না। কোনো রাজনৈতিক পরামর্শ নয়। কিন্তু সে মানুষ হিসেবে অনেক সাপোর্টিভ। আমার সকল র‍্যালীতে সে উপস্থিত থাকে। আমি সবাইকে বলছি যে, আপনাকে সহ্য করতে হবে, ধৈর্য্য ধরতে হবে। প্রথম দিকে আমরা খুব ঝগড়া করতাম। পরে আমি বুঝলাম যে, ও ওর মতো, আমি আমার মতো। অবশ্যই এমন কিছু বিষয় রয়েছে যাতে আমরা একে অপরের প্রতি সন্তুষ্ট নই। কিন্তু পৃথিবীতে সবকিছু মিলিয়েই চলতে হয়। আমার ব্যাপারে বলতে বললে, আমি বলবো, আমি খুব বেশি আবেগে ডুবে থাকি না। আমি চিন্তা করি, সামনের বিষয়গুলো মূল্যায়ন করি। ভাবি যে, যতোদিন সে আমাকে মেনে নিয়ে আমার সাথে থাকবে, আমাকে ওর সাথে এভাবেই চলতে হবে।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


জীবন ও কর্ম বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ময়মনসিংহ মেডিকেলের শিক্ষার্থীই ভুটানের নতুন প্রধানমন্ত্রী

ময়মনসিংহ মেডিকেলের শিক্ষার্থীই ভুটানের নতুন প্রধানমন্ত্রী

ভুটানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছেন ময়মনসিংহ মেডিকেলের প্রাক্তন ছাত্র ডা. লোটে শেরিং।…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর