ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


১০ মে, ২০১৮ ১২:৫৬ পিএম

কিংকর্তব্যবিমূঢ় 

কিংকর্তব্যবিমূঢ় 

ঘটনাটি বেশ আগের। সবে ইন্টার্ন শেষ করেছি। অফুরন্ত অবসর। কয়েকটা ক্লিনিকে অফার ছিল কিন্তু এতো কমার্শিয়াল আর ব্যস্ত ভাল লাগল না। হঠাৎ আমার মেডিকেলেরই এক সিনিয়র ভাই ঢাকার লাগোয়া এক জেলায় নতুন ক্লিনিকে সপ্তাহে একদিন অর্থাৎ চব্বিশ ঘন্টার একটা ডিউটির সন্ধান দিলেন। ছিমছাম ঝামেলা মুক্ত দশ বেডের একটি ক্লিনিক।

হিসেব করে দেখলাম সপ্তাহে একটা ডিউটি হলে মাসে চারদিন, বাকী ছাব্বিশ দিন ফ্রী। ঢাকা মেডিকেলের ইন্টার্ন হোস্টেলে থাকছি সুতরাং খরচ কম। যা আসবে তা দিয়ে দিব্বি আরো কিছুদিন থেকে খেয়ে বিসিএস ও উচ্চতর পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া যাবে। তাছাড়া জুনিয়র ব্যাচ আসেনি, আরো ক’দিন ইন্টার্ন হোস্টেলে থাকা যাবে। হোস্টেলের অর্ধেক রুমই খালি। লোভনীয় অফারটি রাখা যায়। আমি থাকতাম চারতলায় বা'পাশের কর্নারের রুমে। সেখান থেকে নিচে জহির মামাদের ক্যান্টিন গুলোর চায়ের পেয়ালার ছন্দময় টুং টাং চামচের বাড়ি অনায়াসে কানে আসতো। সে মধুর ছন্দময় আওয়াজ আবার শীতের রাতের শুনশান নিরবতায় নিশ্চিত পাশের বুয়েট, আলিয়া মাদ্রাসা আর বদরুন্নেসা মহিলা কলেজের হোস্টেলের বাসিন্দাদের জিহ্বাগ্রে লালা উৎপাদন করতো।

যাহোক এভাবে চলে যাচ্ছিল দিনগুলো। ২৪তম বিসিএস এর প্রিলিমিনারির জন্যে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে রুমে রুমে। বাংলার আদি ইতিহাস থেকে অস্ট্রেলিয়ানদের আদিবাস, সেক্সপিয়ারের ট্রাজেডি নাটক গুলোর নাম থেকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের রচনাবলী সব ঠোটস্থ, তুড়ি মেরে বলার মতো। 

একদিনের একটা ডিউটি শেষ করে এসে বসে বসে প্রিলির জন্যে পড়া কেমন যেনো বোরিং লাগছিল। ভাবলাম বিকেলে ঘন্টা দুয়েকের জন্যে একটা চেম্বারে দেখলে মন্দ হয় না। মেডিসিনের কেইসগুলোর ওপর প্রেক্টিস থাকবে আবার বোরিং ও কাটবে। এছাড়া আরো টুকটাক নগদ নারায়ণ হবে, সেটাই বা মন্দ কি। 

তাই সপ্তাহে আরো দু'দিন বের করলাম কোথাও চেম্বার করতে। পেয়েও গেলাম, কাছে।

মফস্বল শহরের পুরাতন এক চেম্বার। এটা একজন পল্লি চিকিৎসকের ফার্মেসী কাম চেম্বার। সপ্তাহে তার জন্যে কঠিন হয় এ রকম আট দশটা কেইস জমিয়ে রাখতেন আর আমি এগুলো দু'দিন যেয়ে দেখে দিতাম। আসা যাওয়ার ভাড়া, হাত-খরচ মুটোমুটি সব ভালোই চলত। বড় কথা নিজেকে কেমন জানি পুরোদস্তুর ডাক্তার ডাক্তার লাগত। প্রাইভেট ক্লিনিকে ডিউটি করতে গেলে নিজেকে তেমন ডাক্তার বলে মনে হতো না, চাকুরিজীবী লাগত। কেবল ফলো আপ আর প্রফেসর স্যারদের কথামত ঔষধ এদিক সেদিক করা। নিজেদের প্রেসক্রাইভের সুযোগ নেই। 

অথচ আমাদের ইন্টার্ন করার সময় ছিল, পরিস্থিতি ছিল সম্পুর্ন বিপরীত। আগে নিজে নিজে প্রেসক্রাইভ করতে হতো, পরে স্যারেরা রাউন্ডে এসে বেডে বেডে, জনে জনে জিজ্ঞেস করতেন, আর শিখিয়ে দিতেন।

তো এরকম এক বিকেলে পল্লীর চেম্বারে বসে আসি। তেমন রোগী নেই। ফার্মেসীর ছোট একটা ছেলে বলল, ‘স্যার কাকা (পল্লী চিকিৎসক) এক টেলিফোন করে একজন রোগী পাঠালেন, তারা আসছেন। খুব ভিআইপি। পাঠাবো?’

আমি বসে বসে টেক্সট বই পড়ছিলাম। বললাম, পাঠাও।

রোগী মেয়ে। বয়স ষোল কি সতেরো। সবে ইন্টারে পড়ে। তাকে নিয়ে আসছেন মা বাবা। চেম্বারে ঢুকেই তিনি মেয়ের বাবাকে বললেন, ‘তুমি বাইরে যাও। আমি একটু একা কথা বলব ডাক্তারের সাথে।’ মেয়ের বাবা বেরিয়ে গেলে তিনি বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব আমার মেয়েটির সমস্যা, ক'দিন থেকে তার পেটে ব্যাথা, বমি আর চাকার মত কি যেনো একটা লাগছে।’

পেটে ব্যথা, খাবার অরুচি আর পেটে চাকার মত লাগা এই সিমটমগুলো নিয়ে আমাদের দেশে প্রায়ই রোগী আসেন। কিন্ত এক্সামিন করলে তেমন কোন চাকা টাকা পাওয়া যায় না। দেখা যায় এদের বেশীর ভাগই পেপটক আলসার এর পেশেন্ট। 

আমিও সেরকম কিছু একটা মনে করে যথারীতি পরীক্ষা করতে গেলাম মেয়েটিকে। স্যারেরা বলতেন, ‘লাম্পের অভিযোগ করলে পালপেশন এক্সামিন মাস্ট। হেলা করে উড়িয়ে দেয়া যাবেনা।’ 

এক্সামিনেশনে মা ও মেয়ের কথাই ঠিক, একটা চাকা হাতে লাগল। সেটা ফিক্সড না, মোবাইল। বেশ বড়সড়। মনে মনে ইউরেকা ইউরেকা বলে মাকে বললাম, ‘খালা ঠিকই বলেছেন, একটি বড় চাকা আছে।’ তবে ভয়ের কারণ নেই, রকটা সনো করা লাগবে।

এ বয়সে সাধারণত ওভারিয়ান সিস্ট হয়ে থাকে। মেয়ের মাকে বললাম, ‘দ্রুত এই আলট্রাসাউন্ড করে আসেন।’ 
ভাবলাম গাইনীতে রেফার করার আগে নিজে একটু কনফার্ম হই। তারাও চাইছিলেন সব দ্রুত হোক।

মা আর মেয়ে আলট্রা রিপোর্টসহ আসলেন। এবার সাথে বাবা আসেননি। গাড়ির ড্রাইভারকে চেম্বার থেকে বের হয়ে যেতে বলে তিনি আমার হাতে রিপোর্ট দিলেন। 

আমি রিপোর্টটা হাতে নেই। চোখ বুলিয়েই চমকে উঠি।
Comments: A case of 30 week+pregnancy!

মেয়ের নাম, বয়স রোগীর সাথে মিলিয়ে আবার কনফার্ম করি। কারণ রিপোর্টে অনেক সময় প্রিন্টিং মিসটেক হয়। 

একবার কলেসিসটেকটমি করা এক পেশেন্টের আলট্রা রিপোর্টে,‘সাইজ অব গল ব্লাডার উইথিন নরমাল রেঞ্জ পেয়েছিলাম।‘ তাড়াতাড়ি সংশ্লিষ্ট ডায়াগনস্টিক ও সনোলজিস্ট ভাইকে ফোন দেই, যাহোক সেটা প্রিন্টিং মিস্টেক ছিল।

কিন্তু এখানে এরকম কিছুই না। মাকে জিজ্ঞেস কিরলাম, ‘সে কি ম্যারিড?’ 
তিনি বললেন, ‘না’। তাহলে! 

মেয়ে তাকান মায়ের দিকে আর মা তাকান মেয়ের দিকে। কোন কথা নেই কারো মুখে। আমি তাকাই দুজনের দিকে। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমার হাত পা অবশ হয়ে যাচ্ছিল। জীবনে এরকম অবাক হইনি, হইনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমাকে এরকম একটা দৃশ্যের সাক্ষী হতে হবে কল্পনাই করতে পারিনি। 

চোখের সামনে যেন হিন্দি সিনেমা দেখছিলাম। ঐ যে প্রীতিজীনতার কুমারি মাতা বিষয়ক সেই সিনেমাটা। মা বললেন, এখন কি করা যায় ডাক্তার সাহেব? তিনি খুব যে অবাক তা মনে হল না। কিছুটা দোদুল্যমান ছিলেন।

মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি ব্যাপার, এই চাকাতো তুমি আরো আগেই টের পাওয়ার কথা, পাওনি? এতো দেরিতে কেন?
সে বলল, ‘পেয়েছি। বুঝিনি কিছুই।’ তার নিষ্পাপ চাহনি তাই বলছিল।

মাকে বললাম, যার সাথে সম্পর্ক তার সাথে বিয়ের ব্যবস্থা করেন। 
তিনি বললেন, এ সম্ভব নয়।

ছেলেটিকে গতমাস আগে হাতেনাতে ধরে মেরে তাড়িয়ে দিয়েছেন। নাচ, নাকি গানের টিচার ছিল। আমার এখন ঠিক মনে নেই সেটা। 
আমি বললাম, তাকে যেভাবেই পারেন খুজে আনেন। যা হবার হয়েছে। বিয়েই এর একমাত্র সমাধান।

তিনি বললেন, এ কোন ভাবেই সম্ভব নয়, বাচ্চা নষ্ট করা যাবে না? যত টাকা লাগুক ডাক্তার সাহেব। আমাদের মান সম্মান এখন বাঁচাতে হবে।
আমি বললাম, এ কোন ভাবেই সম্ভব না এখন। একেতো মেয়ের বয়স কম, দ্বিতীয়তো এসব করলে মেয়েটি মারা যেতে পারে। 

তিনি বললেন, শুনেছি ওষুধ দিয়ে এর চেয়েও বড় বাচ্চা নাকি নষ্ট করা যায়। আপনি বোধ হয় জানেন না। আপনি জানেন না, সেটা বলেন।
আমি বললাম, হ্যাঁ। সরি, আমি জানি না, আপনারা যেতে পারেন।

যাবার সময় খেয়াল করলাম মেয়েটির নিষ্পাপ চোখ বেয়ে ঝরছে জল তার চোখের জল বলছে সে নির্দোষ।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না