ডা. মুনিম রেজা

ডা. মুনিম রেজা

এমডি রেসিডেন্ট, চাইল্ড এন্ড এডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রি, বিএসএমএমইউ।


১০ মে, ২০১৮ ১১:২১ এএম

চিকিৎসক যখন রাষ্ট্রনায়ক

চিকিৎসক যখন রাষ্ট্রনায়ক
চিকিৎসা পেশার বাইরে গিয়ে মাহাথির জড়িয়েছেন রাজনীতিতে এবং জয় করেছেন অসংখ্য মানুষের হৃদয়।

স্বাভাবিকভাবে ধরে নেয়া হয় যে একজন চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসাতেই সারাজীবন পার করে দিবেন। প্রায় সকল ক্ষেত্রে সেটাই হয়। কিন্তু কখনো কখনো এর ব্যতিক্রমও ঘটে। আর এই ব্যতিক্রমের ফলাফলও কিছুক্ষেত্রে হয় যুগান্তকারী। এমনই এক যুগান্তকারী, ব্যতিক্রমী চিকিৎসক হচ্ছেন ডা. মাহাথির মোহাম্মাদ। যিনি প্রথমবার টানা ২২ বছর ক্ষমতায় থাকার পরে, দীর্ঘদিনের বিরতি দিয়ে ৯২ বছর বয়সে আবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন।

অভিনন্দন ডা. মাহাথির মোহাম্মাদ!

চিকিৎসা পেশার বাইরে যেয়ে মাহাথির জড়িয়েছেন রাজনীতিতে এবং জয় করেছেন অসংখ্য মানুষের হৃদয়। এই মানুষেরা টানা ২২ বছর তাদের প্রিয় দেশের পরিচালনার ভার দিয়েছিলেন তার উপর। সফলতার সাথেই সেই ভার বহন করেছেন তিনি। মাহাথির প্রথম ক্ষমতায় আসেন ১৯৮১ সালে এবং অবসরে যান ২০০৩ সালে। তিনি যখন অবসর নেন তখন তিনি ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশীদিন ক্ষমতায় থাকা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী।

অবসর নিলেও রাজনীতির বাইরে বেশিদিন থাকতে পারেননি। নিজ দলের নেতৃত্বের সাথে মতবিরোধ হওয়ায় তিনি ২০১৬ সালে Malaysian United Indigenous Party গঠন করেন। আর এই দলকে সাথে নিয়েই এবার ১৪তম জাতীয় নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে ষষ্ঠবারের মত প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন।

ক্ষমতাকালীন ২২ বছরে মাহাথির মালয়েশিয়াকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়। মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নতি তার অন্যতম অবদান। কৃষি নির্ভর অর্থনীতিকে তিনি শিল্প নির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত করেন। বিমান, টেলিযোগাযোগ খাতসহ অন্যান্য সরকারি খাতকে বেসরকারি খাতে দিয়ে দেন, ফলে কর্মজীবীদের কর্মসংস্থানের অবস্থা অনেক উন্নত হয়। ক্ষমতায় থাকাকালীন মালয়েশিয়াকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিনত করার জন্য তিনি ২০২০ নাগাদ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেন যার পুরোটা বাস্তবায়ন না হলেও মালয়েশিয়াকে এগিয়ে নিতে বড় ভুমিকা রেখেছে।

মালয়েশিয়ান এই মহানায়ক ১৯২৫ সালে জন্মেছিলেন এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। মাহাথির ছোটথেকেই পড়াশুনায় বেশ ভালো ছিলেন।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলেজ বন্ধ থাকাকালীন তিনি কিছুদিন কফি ও নাস্তা বিক্রির কাজও করেছিলেন। বিশ্বযুদ্ধ শেষে তিনি আবার পড়াশুনায় ফিরে আসেন। ১৯৪৬ সালে কিং এডওয়ার্ড কলেজ অফ মেডিসিনে ভর্তি হন। পাশ করার পরে সরকারী চাকরীতে যোগ দেন। এরপরে ১৯৫৬ সালে নিজ ব্যাচমেট সিতি হাসমাহকে বিয়ে করেন এবং সরকারি চাকরি ছেড়ে নিজস্ব প্রাকটিস শুরু করেন নিজ শহর আলোর সেতারে এবং ভালো সুনাম অর্জন করেন।সেই অঞ্চলে তখন তিনিই ছিলেন একমাত্র মালয় চিকিৎসক।

ছাত্র অবস্থা থেকেই অল্পবিস্তর রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও ১৯৫৯ সালে ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন দলে জড়িত হয়ে সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৬৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রথমবারের মত নিজ এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

রাজনৈতিক চড়াই উৎরাই মাহাথীরকেও পার করতে হয়েছে। ১৯৬৪ সালে নির্বাচিত হওয়ার পরের টার্মেই ১৯৬৯ সালে তিনি পরাজিত হন। সেবছর মালয় ও চায়নিজদের মধ্যে জাতীগত সংঘাত হয় এবং অনেক মানুষ নিহত হয়। তখন মাহাথির মালয় সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা করতে না পারার অভিযোগে, তার নিজ দল থেকেই নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী আবদেল রহমানের তীব্র সমালোচনা করেন। ফলশ্রুতিতে  ১৯৬৯ সালের শেষের দিকে তাকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়। 

পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে তাকে আবার দলে ফিরিয়ে নেয়া হয়। দলে ফেরার পরে ১৯৭৪ সালেই শিক্ষামন্ত্রী নির্বাচিত হন। শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন তার কাজের উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি সীমিত করে দেয়া এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।

লেখালেখিও করেছেন মাহাথির। মালয় - চায়নিজ জাতীগত সংঘাতের পরে, মালয় সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা নিয়ে লেখা তার প্রথম বই The Malay dilemma বের হয় ১৯৭০ সালে। বইতে তৎকালীন সরকারের কড়া সমালোচনা থাকায় প্রকাশের পরপরই নিষিদ্ধ হয়। পরে মাহাথির ক্ষমতায় আসার পরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। বলা হয় যে এই বই তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী আবদেল রহমানের পদত্যাগের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

সবমিলিয়ে প্রায় ১৬টি বই লিখেছেন মাহাথির। এর মধ্যে আত্নজীবনীমূলক লেখার A Doctor in the House বইটা বিশ্বব্যাপী আলোড়িত হয়। বইটা বাংলাতেও অনুদিত হয়েছে।

মাহাথির মোহাম্মাদের পুরা রাজনৈতিক জীবনই প্রশংসিত নয়। বিশেষকরে নিজ দলে তার নেতৃত্বের প্রতিযোগীদের দমন করার জন্য তিনি সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন অনেক। তার শাসনামলে গনতন্ত্রকে সীমিত করে স্বৈরাচারী হয়ে উঠার অভিযোগও তোলা হয় তার বিরুদ্ধে। তবে এসবকিছু ছাপিয়েই তিনি হয়ে উঠেছেন আধুনিক মালয়েশিয়ার রুপকার ।

৯২ বছর বয়সে আবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে বর্তমান দুনিয়ার সবচেয়ে বয়স্ক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন তিনি। একজন চিকিৎসক থেকে রাষ্ট্রনায়ক হওয়া মাহাথির মুহাম্মাদ শুধু মালয়েশিয়া নয়, এই পৃথিবীর ইতিহাসের একজন অন্যতম সফল চরিত্র হিসাবে স্বমহিমায় ভাস্বর থাকবেন অনাদিকাল।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
করোনা ছড়ায় উপসর্গহীন ব্যক্তিও
একদিনেই অবস্থান বদল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার

করোনা ছড়ায় উপসর্গহীন ব্যক্তিও