অধ্যাপক ডা. সালমা আফরোজ

অধ্যাপক ডা. সালমা আফরোজ

সাবেক বিভাগীয় প্রধান, হেমাটোলজি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ। 


১০ মে, ২০১৮ ০২:২৪ এএম

যে স্মৃতি ভুলে যাওয়া সম্ভব না

যে স্মৃতি ভুলে যাওয়া সম্ভব না

বৃষ্টি হলেই আমার বাবার কথা মনে পরে। আমার খুব ঠাণ্ডা লাগতো গলা ব্যাথা হতো। তাই আমাকে সবসময় ব্যাগে একটা ছোট তোয়ালে রাখতে বলতেন যেন পা ভিজে গেল্ মুছতে পারি।

আমি যা করতাম তাই পছন্দ করতেন তিনি। মাঝে মাঝে শখের রান্না করতাম। খেয়ে চোখ দিয়ে পানি পরলেও রান্নার খুব প্রশংসা করতেন।

একবার ইলেকট্রিকাল ফিউজ ঠিক করলাম আমাকে ইলেকট্রিকাল জিনিয়াস বললেন। এসব নিয়ে মাঝেমাঝে ভাইবোনদের ঠাট্টা সহ্য করতে হতো।

ডাক্তারি ভর্তি নিয়ে একটু ঝামেলা হলো। আব্বা নিজে ১৯৩৮ সালে অর্থনীতিতে অনার্স করে ছিলেন তাই চাইতেন আমিও ওই বিষয়ে পড়ি।

শীতের সময় যখন ৭টার ক্লাসে যেতাম দেখতেন পায়ে মোজা আর গলায় মাফলার আছে কিনা। রিকশায় উঠিয়ে হুড টেনে দিতেন। রিকশা শক্ত করে ধরতে বলতেন।

এমবিবিএস ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষার আগে খুব টেনশন, তখন পাসের হার খুব কম।

আব্বা বললেন, ওনাদের গ্রামে দুজন ডাক্তার ছিলেন। একজন নিয়মিত পাস করা আর অন্য পাঁচবারে পাস করেছে। রোগী দ্বিতীয় জনেরই বেশি হতো। সবাই বলতো জ্ঞান তারই বেশি।

এত বুঝালেন তিনি। মনে হতে থাকল, ফেল করাই ভাল। আসলে পাস না করলে যেন কষ্ট না পাই তারই চেষ্টা। এখন মাঝে মাঝে ছাত্রদের আত্মহত্যার কথা শুনলে মনে হয়, এমন সাহস দেয়া অভিভাবক দরকার।

এমবিবিএস পাশ করার পর বিয়ে হয়ে গেল। বিসিএস পাস করলাম। নানা কারণে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করা হচ্ছিল না। আব্বা পাস করার ৭/৮ বছর পর একদিন বললেন,‘এখন এমবিবিএস সাধারণ বিএস পাসের মত হয়ে গিয়েছে। আমি চাই তুমি একটা ডিগ্রি কর।’

সেই কথা মনে খুব আলোড়ন তুললো। আমি পড়তে আরম্ভ করলাম। আব্বার শরীরটা বেশি ভাল যাচ্ছিল না। আল্লাহর কাছে চাইলাম আব্বা যেন অন্তত ডিগ্রিটা দেখে যেতে পারেন। কারণ এফসিপিএস পাস করা কঠিন ছিল।

আল্লাহ আমার ইচ্ছা পূরণ করলেন।  

পাস করার পর চট্টগ্রাম বদলি হলাম। পড়াশোনা ও বদলির কারণে আব্বার থেকে একটু দূরত্বে চলে গেলাম। আব্বার শরীর খারাপ হতে থাকল।ওখান থেকে ডাক্তারদের দেখাতে বলতাম, বিভিন্নজন বিভিন্ন কথা বলতেন।

আব্বা কিছুতেই ভাল হচ্ছিলেন না। একবার ঢাকায় এসে আব্বাকে পরীক্ষা করে লিম্ফনোড পেলাম। কিন্তু সেদিন রাত্রেই আমাকে ফিরে যেতে হোল। ৮/১০ দিনের মাথায় বাসা থেকে ফোন। আব্বা কাউকে চিনতে পারছেন না, কথাও বলছেন না কিন্তু ইশারায় আমাকে ফোন করতে বলে রিসিভার চাইলেন শুধু বললেন "বাবু তুমি আস"। পাগলের মত ছুটে আসলাম।

আব্বাকে দেখে আমি কাঁদতে লাগলাম কয়েকদিনে বিছানার সাথে মিশে গিয়েছিল। আমি আব্বার দিকে বুঝতেই সবাই জিজ্ঞাসা করল আমাকে চিনেছে কিনা? উত্তরে বলল ‘ওকে চিনব না? ওতো আমার ভীষণ প্রিয়’।

এরপর তিন সপ্তাহ কিভাবে পার হলো জানি না। আব্বার secondaries ধরা পড়ল। Primary পাওয়া গেল না। খুব কষ্ট জ্ঞান অজ্ঞান অবস্থার মধ্যে কাটল কয়টা দিন। আব্বার জ্বর হলে আমাকে বলতনে,‘তুমি কপালে হাত দিলে আমার অসুখ ভাল হয়ে যায়।’

সেই আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাত রেখে কোন আরামই দিতে পারলাম না। আব্বা চলে গেলেন। অর্থাৎ, আমি পাস করার ২ বছর পর আব্বা মারা গেলেন।

আব্বা ইন্তেকাল করেছেন ১৯ বছর। আজ তার মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতিদিনই তাকে অনেক মনে পড়ে।আব্বা আমাকে ভীষণ ভালবাসতেন। প্রত্যেকদিনই অনেকবার আব্বার কথা মনে হয়। আব্বার ভালবাসা স্নেহ আদরের স্মৃতি ভোলা সম্ভব না। দোয়া করি আল্লাহ যেন আব্বাকে জান্নাতবাসী করেন।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত