ডা. আহমাদ হাবিবুর রহিম

ডা. আহমাদ হাবিবুর রহিম

লেখক, কলামিস্ট

বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ।


০৯ মে, ২০১৮ ০১:১৩ পিএম

ভেঙে ফেলা হচ্ছে প্রিয় ঘর!

ভেঙে ফেলা হচ্ছে প্রিয় ঘর!

জায়গাটা খুব বিখ্যাত কিছু না। বিলাইছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের জন্য বানানো একমাত্র ডরমিটরি। প্রথম যখন আসি ময়লা আবর্জনা আর নানা সীমাবদ্ধতায় জায়গাটাকে পুরোপুরি বাসযোগ্য বলা যাচ্ছিলো না ঠিক। যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েছি সাধ্যমত নিজেদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করবো তাই জায়গাটাকে কিছুটা ঘষামাজা করার সিদ্ধান্ত নিয়েই নেই আমি আর ডা. সেলিম ভাই মিলে।

এরপর ক্রমাগত চলেছে আমাদের একের পর এক স্বপ্নের সংযোগ। একবার জানালার রঙিণ পর্দা আনি। আরেকবার জীর্ণ সোফার ফোমে কভার জড়াই। ইলেক্ট্রিশিয়ান ডাকিয়ে এটা সেটা ঠিক করাই। সাপের ভয় কমাতে লোক দিয়ে বাইরের ঝোপ পরিষ্কার করাই। বাসার ভেতরের সব জঞ্জাল বের করে ফেলি। দফায় দফায় ঘরের ভেতরের চেহারা বদলাতে থাকে। এসব ছোটখাটো যোগ বিয়োগে আমাদের যে কী আনন্দ!

সোফার নীল কভারে স্টোর রুমের মতো নিষ্প্রাণ ঘরটি কিছুটা আভিজাত্যের ছোঁয়া পায়। সৌর বিদ্যুতের ক্ষীন আলো যেন আঁধারের মাঝে আশার সূর্য হয়ে জ্বলতে থাকে আমাদের চোখে। সিলিন্ডারের চুলা যেন শিখা অনির্বাণ! এমন করেই নানা প্রচেষ্টা আর উদ্যোগে এই অপরিসর জায়গাটাকে কেমন যেন বাসযোগ্য মনে হতে থাকে। মনের ভেতর থেকে আপন লাগতে থাকে জায়গাটা। প্রকাশহীন ভালবাসার অনুভূতি যেন আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে।

এই অরণ্যবাসে এ দেয়ালগুলোর কাছাকাছি যতোটা ছিলাম এতোটা কাছে বোধহয় আর কেউ ছিল না। এমনি করে গত একটি বছর ধরে এই টিনশেড বিল্ডিং ধীরে ধীরে মিশে গেছে আমাদের জীবনে।

নিষ্প্রাণ এই দেয়ালগুলো সাক্ষী হয়েছে আমাদের অসংখ্য নিঃসঙ্গ মুহূর্তের; দিনের পর দিন লোডশেডিং এর মাঝে সামান্য কূপির আলোয় অন্ধকার বিছানায় সাপের ভয়ে তটস্থ হয়ে এপাশ ওপাশ করা ক্ষণগুলোর, সাক্ষী হয়েছে কারও কাছে বলতে না পারা গোপন অনুভূতিগুলোর নীরব অশ্রু হিসেবে মিশে যাওয়া অজস্র ঘটনার। ভাললাগা ক্ষণগুলোতেও দেয়াল গুলো আমাদের পাশে ছিল।

নববিবাহিত এক চিকিৎসক দম্পতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম সে দেখেছে নিতান্ত নীরবতায়। ঘোর অন্ধকারে আটকে যাওয়া সময় কাটাতে আমরা দু'জন এটা সেটা নিয়ে কতো গল্প যে করেছি তার হিসেব নেই। নানা সংকটে একজন আরেকজনকে না চাইতেও শান্তনা দিয়েছি প্রতিনিয়ত। বিবাহিত জীবনের প্রথম বছরের এ স্মৃতি কখনো ভোলার নয়।

আমার আগেও এখানে থেকে গেছেন আরও অনেক চিকিৎসক। তাদের কাছে হৃদয়ে এর স্মৃতি কতোটা জাগরুক তা জানি না। তবে প্রথম প্রেমের মতো প্রথম কর্মস্থলের স্মৃতি ভোলাটা মনে হয় খুব সহজ হবে না।

মনে হতে পারে, বিলাইছড়ি থেকে চলে যাচ্ছি বলেই হয়তো আমার এ স্মৃতি চারণ। আসলে তা নয়। আমি থাকছি এখানেই। তবে ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে আমার প্রিয় এ ঘর। শীঘ্রই এখানে গড়ে উঠবে আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন বহুতল ভবন। পঞ্চাশ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের এক নতুন অবয়ব। পুরোনো জীর্নতাকে তাই বিদায় দিতেই হচ্ছে। বেশ দীর্ঘ সময়ের জন্যই বাস্তুহারা হতে হচ্ছে হাসপাতালের চিকিৎসক ও ডর্মে থাকা অন্য কর্মচারীদের।
 
বিদায়ের বেদনা কষ্টের। তবু তাতে যদি মহত্তর কোন কল্যাণ থেকে থাকে তাহলেতো তা মেনে নিতেই হবে। আমাদের সাময়িক কষ্টের বিপরীতে দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণ হোক বিলাইছড়ি বাসীর। ভাল থাকুক এ দুর্গম অঞ্চলের অসহায় মানুষেরা। সৃষ্টিকর্তা আমাদের আরও সুযোগ দিন নিজেদেরকে তাদের সেবায় নিয়োজিত করার। অজস্র শুভ কামনার আবাহনে টেনে দিচ্ছি আজকের লেখার সমাপ্তির পর্দা। 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত