ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

সাবেক প্রধান,
প্যাথলজি বিভাগ, 
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ
এবং 
শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, কিশোরগঞ্জ

সিনিয়র কনসালটেন্ট এন্ড চিফ
হাসপাতাল ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি,
কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ। 


০৯ মে, ২০১৮ ০১:১১ এএম

শব্দ দুষণের গল্প

শব্দ দুষণের গল্প

এসএসসি সার্টিফিকেট অনুযায়ী শওকত সাহেবের বয়স এখন ষাট বছর। তবে প্রকৃত বয়স তেষট্টির কম হবে না। গত বছরই অবসরে গিয়েছেন শওকত সাহেব। অবসরে যাবার পর থেকে তিনি আর ক্লিন সেইভ করেন না।

প্রথম তিনি দাড়ি রেখেছিলেন অমিতাভ বচ্চন স্টাইলে। তবলিগের বয়ানে তিনি শুনেছেন দাড়ি রাখতে হবে সুন্নত তরিকায়। নইলে দাড়ির ছওয়াব হবে না।
এরপর থেকে চাপদাড়ি রেখেছেন।

পেনশনের টাকা কিছু তুলে এক খণ্ড জমি কিনেছেন ময়মনসিংহ শহরে। ওিই জমি এখনই বাড়ি করার উপযোগী নয়। তাই ঢাকা- ময়মনসিংহ রোডের সাথেই একটা ভাড়া বাড়িতে থাকেন।

বাড়ির সাথে খালি প্লটে একটা বাড়ির পাইলিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে।

রাত দিন ২৪ ঘণ্টা শ্রমিকরা পাইলিং করছে। লম্বা লম্বা শাল কাঠ ঢুকানো হচ্ছে মাটিতে মেশিনের সাহায্যে। দ্রিম দ্রিম শব্দ করে।

মহল্লার বাড়ি ঘরের জানালা দরজা কেঁপে উঠে। অনেকের ঘুম ভেঙে যায়। শওকত সাহেব শুয়ে শুয়ে ভাবেন- "একদিন ইস্রাফিল ফেরেস্তা আল্লাহ্‌র আদেশে শিংগায় ফুঁ দিবেন। এর শব্দে প্রচণ্ড কাপুনি হয়ে সব সৃষ্টি চুরমার হয়ে যাবে।

কাজেই, সবচেয়ে কার্যকরী ধ্বংসকারী শক্তি হল শব্দ। মেশিনে শব্দ সৃষ্টি করে ডাক্তারগণ পেটের পাথর গুড়া করে বের করে আনেন।"

যাইহোক, শওকত সাহেব বাড়ির মালিকের নিকট কথাটা বললেন। বাড়ির মালিক কন্ট্রাক্টারকে বললেন। কিন্তু কাজ হলো না। বাড়ির মালিক আবাসিক এলাকার কল্যাণ কমিটির কাছে অভিযোগ দিলেন। মিটিং ডাকা হল। মিটিংয়ে কন্ট্রাক্টরকে ডেকে এনে সেক্রেটারি সাহেব বলে দিলেন "শুনেন, সকাল সাতটার আগে ও বিকাল পাঁচটার পর আপনার লোক পাইলিংয়ের কাজ করতে পারবেন না। "

কাজের কাজ হয়ে গেল।

রাস্তার ধারে এক তরুণ হুজুর মাইকে মসজিদের জন্য টাকা কালেকশন করেন। তাতে নিচ তলার এক এসএসসি পরীক্ষার্থীর পড়ায় ডিস্টার্ব হয়। শওকত সাহেব হুজুরকে বললেন
: এই ছেলে তুমি কোন পর্যন্ত পড়েছ?
: আমি এতিম পোলা। আমি পড়ি নাই।
: তাইলে টাকা কালেকশন করো কিভাবে?
: এটা আমি শিখে নিয়েছি।
: তুমি যে উচ্চ শব্দে মাইক বাজাচ্ছ তাতে মহল্লার অনেকের পড়ার ডিস্টার্ব হয়। খালি মুখেও তো টাকা চাইতে পার। মাইকের ভলিউম কমিয়ে রাখতে পারো।
: মোয়াজ্জিন যে মাইকে উচ্চ শব্দে আযান দেন তখন ডিস্টার্ব হয় না?
: আযানের সুর সুমধুর। এটা অল্পক্ষণ শুনি আমরা। তুমি তো সব সময় চিল্লা চিল্লি করে সাহায্য চেয়ে যাচ্ছ। তাই ডিস্টার্ব হচ্ছে।
: এই চাকরিটা করে সামান্য পেট চলার মত কিছু পাই। আমার পেটে লাথি দিয়েন না, স্যার।
: আচ্ছা ঠিক আছে। সাউন্ড কমিয়ে কালেকশন কর।

বাড়ির সাথে রাস্তার মোড়। লোকাল বাসগুলি যাবার সময় এই মোড়ে যাত্রী নামানোর জন্য একটু থামে। থামার আগে হাইড্রলিক হর্ন বাজায়।

পাশের বাসায় এক কলেজ পড়ুয়া ছেলে উচ্চশব্দে পপগান বাজায়। তাতে রাতদিনে শওকত সাহেবদের বাসার সবার কান শব্দে ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে।

ইদানিং বাসার সবাই এক ধরনের কানের সমস্যায় পড়েছেন। কোন কোন বাক্যের কোন কোন শব্দ তারা শুনতে পান না।

ডাক্তার দেখানোর পর তিনি জানতে পারেন যে শব্দ দুষনের কারনেই এমন হচ্ছে। কলেজে পড়ার সময় শওকত সাহেবও এমন করে টু ইন ওয়ানে গান শুনতেন। টু ইন ওয়ান ছিল এমন একটি যন্ত্র যা দিয়ে তিন ব্যান্ডের রেডিও শোনা যেত আবার ক্যাসেট টেপও বাজানো যেতো।

মাইকেল জ্যাকসনের গান উচ্চশব্দে না বাজালে শওকত সাহেব তৃপ্তি পেতেন না।

আরেকটু বেশি বয়সে তিনি আজম খানের পপ গান "ওরে মালেকা, ওরে সালেকা, ওরে ফুল বানু, পারলি না পারলি না বাচাতে" গানটি অনেক বাজাতেন উচ্চশব্দে। তারপর বাজিয়েছেন নগর বাউল জেমসের গান উচ্চশব্দে।

তবে বিয়ে করার পর আর পপ গান তিনি বাজান নাই। রবীন্দ্র সংগীত ও নজরুলগীতি তিনি জীবনে বেশিরভাগ সময় শুনেছেন।

তাছাড়া মালকৌস ও ভৈরবী শুরের উচ্চাঙ্গসংগীত তার প্রিয়। সেই পপ গানের শব্দ এখন তার বিরক্ত লাগে। এখন তিনি উচ্চশব্দে গান শুনেন না।

মাঝে মাঝে পাশের বাসার ছেলেটাকে একটু বলে কয়ে বুঝানো যায় কিনা এ নিয়ে ভাবেন। কিন্তু টেলিভিশনে একটি খবর দেখে সিদ্ধান্ত পাল্টিয়েছেন।

নিউজ ভিডিওতে দেখা গেল ঢাকায় কোন একটি ফ্লাটবাড়িতে একজন ৭৫ বছরের অবসর প্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা থাকেন। তিনি হার্টের রোগী। পাশের ফ্লাটের বাড়ি মালিকের মেয়ের বিয়ের হলুদের অনুষ্ঠান হচ্ছিল ওই বাড়িরই ছাদের মিনি কমিউনিটি সেন্টারে।

সেখানে উচ্চ শব্দে গান বাজাচ্ছিল ছেলে ছোকরারা। হার্টের রোগী অসহ্য হয়ে ছাদে গিয়ে প্রতিবাদ করেন উচ্চশব্দে গান না বাজানোর জন্য।

ছেলে ছোকরারা মালিকের কাছে বিচার দিলে মালিক রোগীকে নিচ তলার পার্কিংয়ে ডেকে নিয়ে বেদম প্রহার করেন। তাতে স্পটেই রোগীর মৃত্যু হয়। এই দৃশ্য দেখে শওকত সাহেবের সাহস কমে গেছে।

শওকত সাহেব ইদানিং মর্নিং ওয়াক করেন নিয়মিত। যৌবনকাল পর্যন্ত তার আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস ছিল না। কয়েক বছর আগে একদল তাবলিগ জামায়াতের লোক তাকে হেদায়ত করার পর আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস আসে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার শরীর দুর্বল হয়ে আসছে।

শরীরের জোড়াগুলি কেমন শক্ত হয়ে আসছে। আগের মতো সহজে ভাজ হতে চায় না। ডাক্তার দেখিয়েছেন। কিছুটা ডায়াবেটিস হয়েছে। চিনি জাতীয় খাবার এড়িয়ে যেতে উপদেশ দিয়েছেন। খাবারও সীমিত খেতে বলেছেন। চিনি ছাড়া লাল চা খান। প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০ মিনিট হাটতে বলেছেন।

শওকত সাহেবের স্ত্রীও ইদানীং মুটিয়ে গিয়েছেন। কাজ নেই। বসে বসে টিভিতে সিরিয়াল নাটক দেখেন। সিরিয়াল নাটকে বেশিরভাগই পারিবারিক ঝগড়া, কলহ, নির্যাতন ও ষড়যন্ত্র দেখানো হয়।

এসব দেখতে তার ভালই লাগে। মানুষ ঝগড়া দেখে মজা পায়। তাই দেখে।

শওকত সাহেব ভোরে উঠে মসজিদে ফজরের নামাজ পড়েন। তারপর কিছুক্ষণ কোরআন অর্থসহ পড়েন। পড়ে আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব অনুধাবন করেন।

পূর্বের অবিশ্বাসী অবস্থার কথা মনে করে অনুশোচনা করেন। আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা প্রর্থনা করেন। সকালে স্ত্রীকে নিয়ে হাঁটতে বের হন। পার্কে চল্লিশ পঞ্চাশ মিনিট হাটেন। হাঁটতে হাটতে গল্প করেন।

গল্পে গল্পে তাদের মহব্বত আরো গভীর হয়। আরো বেশী দিন বাঁচার ইচ্ছা হয় দুজনের।

ঈদের দিন বিকেলে শওকত সাহেব যাচ্ছিলেন মসজিদে।

রাস্তার পাশে ছেলে ছোকরারা উচ্চ শব্দে ইয়ো ইয়ো হানি সিং- এর পপ গানের সাথে লম্ফ ঝম্ফ করে ডাঞ্চ করছিল। রাস্তা দিয়ে তরুণ-তরুণীরা রঙ বেরঙ জামা পড়ে বেড়াচ্ছিল। ছেলেরা তাদের দেখে শিস দিচ্ছিল।

সামনে একটা সাদা রঙের হাতলওয়ালা প্লাস্টিকের চেয়ারে এলাকার ছেলে পুলেদের বড় ভাই কাল চশমা পড়ে বসা।

শওকত সাহেব ঈদের সাথে এই লম্ফ ঝম্ফের কি সম্পর্ক তা বুঝতে পারছিলেন না। ঝামেলায় না জড়িয়ে তিনি মসজিদে চলে গেলেন।

ঈদের পরদিন শওকত সাহেবের স্ত্রীর শরীরে একটু অলসতা এসে গেল। ফজরের নামাজ পড়ে তিনি একটা ঘুম দিলেন।

শওকত সাহেব একাই হাঁটতে বেড়োলেন। রাস্তা ফাঁকা। মানুষ জন কম। পার্কে প্রবেশ না করে শওকত সাহেব চওড়া রাস্তা দিয়ে হাটতে লাগলেন।

মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত চলে গেলেন। সরকারি হাসপাতালের বিপরীত দিকে রাস্তার ধারে অনেক বড় বড় প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার।

তিনি যাচ্ছিলেন মাঝের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে একা। একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিপা গলির মাথায় দুইটি সাউন্ড বক্স রাখা ছিল।

সাউন্ড বক্স থেকে উচ্চ শব্দে ইয়ো ইয়ো সিং-এর গান বাজছিল। ড্রামের শব্দে কান ঝালাপালা অবস্থা। নিশ্চয়ই হাসপাতালের অসুস্থ শিশুদের ঘুম ভেংগে গিয়েছিল ড্রামের শব্দে।

চিৎকার করে মায়ের বুকে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করছিল। হার্টের রোগীদের হার্ট বিট আরো বেড়ে গিয়েছিল সেদিন।

শত শত মানুষের সকালের আরামের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল।

শওকত সাহেবের মাথায় রাগ চেপে গেল। রাস্তার মোড়ে ইউটার্ন নিলেন। মনে মনে স্থির করলেন এবার প্রতিবাদ করবেন। যা আছে কপালে। হয়ত দেখা যাবে দশ বার জন তরুণ ড্রামের তালে তালে উগ্র ডান্স করছে।

শওকত সাহেব সেখানে প্রবেশ করবেন ঠাণ্ডা মাথায়। ডান হাত উঠিয়ে ইংগিত দিবেন। নাচ থামাবার। তারপর কানে আঙুল দিয়ে ইশারায় বলবেন গান বন্ধ করতে। হয়তো বড় ছোকরাটা এসে তার গলা চেপে ধরবে।

অন্য ছোকরারা এসে তাকে দ্রাম করে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে বুকের ওপর উপর্যুপরি হাটু দিয়ে আগাত করবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত। এরপর কেউ একজন রিক্সায় তুলে নিয়ে উল্টা দিকের সরকারি হাসপাতালের ইমার্জেন্সি রুমে চিকিৎসার জন্য।

মেডিকেল অফিসার ঘোষণা দিবেন "অনেক আগেই রোগীর মৃত্যু হয়েছে। আমাদের করার কিছু নেই।" মহল্লায় মুহুর্তের মধ্যে খবর হয়ে যাবে। সাংবাদিকরা পেপারে খবর লিখবে। টেলিভিশনে শওকত সাহেবের শহীদ হওয়ার কথা স্ক্রল হবে। মানববন্ধন হবে, ইত্যাদি।

ধীরে ধীরে শওকত সাহেব সাউন্ড বক্সের দিকে এগুলেন। ড্রামের শব্দে যেন কানের পর্দা ফেটে যাবে। মৃত্যু নিশ্চিত। দোয়া কালাম কিছু পড়ে নিলেন। একটু ভেতরে প্রবেশ করলেন। দুইটি ছেলে বসে আছে টুলের ওপর। বয়স সাত আট বছর হবে।
: সাউন্ড একটু কমাও তো বাবু।
: কিছু বলবেন, আংকেল?
: এই গান কে বাজায়?
: আমরাই বাজাই।
: তোমরা গান বাজাও কেন। আজ তো ঈদ না।
: আমাদের পাড়ার ভাইয়ারা গত রাতে গান বাজিয়ে ডান্স করেছে। তারা সবাই এখন বাসায় ঘুমিয়ে আছে। সকাল আটটার পর সাউন্ড সিস্টেম ফেরৎ নিবে। তাই আমরা দুইজনে গান বাজিয়ে ব্যাটারি ক্ষয় করে দিচ্ছি। চুক্তি ছিল সকাল আটটা পর্যন্ত। এখন বাজে সাতটা। আরো এক ঘন্টা গান বাজাতে পারব।

: তোমাদের গানের শব্দে আশে পাশের রুগীরা আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছে। পাড়ার মানুষ ঘুমুতে পারছে না। কাজেই, সোনামণিরা, এখবন গান বাজানো বন্ধ রাখো। তোমরা খুব ভাল ছেলে।
: আচ্ছা, আংকেল। আমরা গান বন্ধ করে সব গুছিয়ে ফেলব এক্ষুনি।

শওকত সাহেব হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। সোজা চলে গেলেন বাসায়। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে যেন রক্ষা পেলেন। হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা করলেন। চিনিছাড়া লাল চায়ের সাথে কয়েকটি তাজা পুদিনাপাতা মিশিয়ে এক কাপ চা খেয়ে অনেকক্ষণ চাঙ্গা থাকলেন।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে