ঢাকা      মঙ্গলবার ২২, মে ২০১৮ - ৮, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. আজম ইকবাল খান

ইন্টার্ন ডাক্তার

টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল


মেডিকেলের বিষণ্ণতা ও আত্মহত্যা 

কেন এভাবে প্রতিনিয়ত ঘটছে হাজারো লালিত স্বপ্নের মৃত্যু?

বিজয়, আজ আর বাংলাদেশের একক কোন ব্যক্তিসত্তার নাম নয়। আজ বাংলাদেশের একটি ইতিহাসের নাম। মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে জীবনের কাছে হারমানা এক অভিযাত্রী দলের প্রতিনিধির নাম। বিজয়রা আজ নেই, অনেকের মনে বিজয়দের নাম আর হয়ত খুব বেশিদিন থাকবে না। এটাই স্বাভাবিক, দুনিয়ার এক কঠিন বাস্তবতা। এভাবে প্রতিদিন বেড়েই চলেছে দুনিয়া ত্যাগী অভিযাত্রী দলে বিজয়দের সারি। 

কিন্তু কেন? ছোট বেলার সেই অবুঝ মনে পরীক্ষার খাতায় লিখে আসা ‘My aim in life তথা আমার জীবনেরর লক্ষ’ যখন বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে পৌছায়, কেন তাদের দলে দলে দুনিয়া থেকে চলে যেতে হবে সারিবদ্ধভাবে? একটা ছেলে বা মেয়ে সারা জীবনের লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে এসে নিজেই হার মেনে যাচ্ছে সেই স্বপ্নের কাছে। কখনো ভেবে দেখেছি, কেন এই চলে যাওয়া? কেন এভাবে প্রতিনিয়ত ঘটছে হাজারো লালিত স্বপ্নের মৃত্যু?

জানি এসব কথার কোন সঠিক উত্তর কেউ দিতে পারবে না। উত্তর জানা থাকলেও দেওয়ার মত সৎসাহস কারোর নেই। এই যে এতমৃত্যু, স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে এসে কারোর নীরবে চলে যাওয়ার এই দ্বায়ভার জানি, কেউ নিবে না। নিতে চাইবে না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা, আমাদের সমাজব্যবস্থা, আমাদের বর্তমানের এই চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট জনেরা কি পারবেন এই দ্বায় এড়াতে। হয়ত কেউ স্বীকার না করলেও অনেকেই মন থেকে এই দ্বায় এড়াতে পারেন না।

একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, সারা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে কষ্টসাধ্য পড়াশুনা মেডিকেলে। এখানে মেধার চেয়ে পরিশ্রম, একনিষ্ঠতা আর নিয়মানুবর্তিতার মূল্য বেশি। একটা ছেলে বা মেয়ে হয়ত তার সারা জীবনে কোনদিন কোন ক্লাসে ফেল করা তো দূরের কথা, প্রথম বা দ্বিতীয় হওয়া ছাড়া তৃতীয় হয়নি। অথচ এই ছেলে বা মেয়েটি দেখা যাচ্ছে মেডিকেলে এসে একের পর এক কার্ড, টার্ম কিংবা প্রফে ফেল করে যাচ্ছে। অথচ দেখা যাবে তার জীবনে মেডিকেল এ ভর্তির আগে ফেল নামক শব্দ ছিল না। তখন স্বভাবতই সেই ছেলে বা মেয়েটি হতাশ হয়ে পড়বে। এই হতাশায় তার পরবর্তী ধাপগুলো পার হওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় বাধা। আর একজন যখন মেডিকেলে পিছিয়ে পড়ে, তাকে যে কতটা সংগ্রাম করতে হয় শুধু মাত্র ভুক্তভোগীরাই জানেন। 

মেডিকেল এ ফেল করাটা যে কতটা স্বাভাবিক, এটা প্রতিটা মেডিকেল ব্যক্তিই জানেন। এখানে পাশ আর ফেল দুইটাই সমান তালে প্রবাহিত হয়। কিন্তু যারা মেডিকেলের বাইরের কেউ, তারা অনেকেই এটা বুঝেন না। তাদের অনেকের ধারণা, পড়াশুনা না করলেতো ফেল হবেই। ফলে যেটা হয়, তাদের নিকটস্থ মেডিকেলের কেউ পরীক্ষায় খারাপ করলে তাদের পক্ষ থেকে সবার আগেই শুরু হয় কানা-ঘুষা আলোচলা সমালোচনা। এতে করে মেডিকেলে এসে ফেল করা স্কুল জীবনের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের হতাশা আর বিষণ্ণতা এগিয়ে যায় আরো একধাপ। এ যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালা। এভাবে শত চেষ্টা করে খারাপ করার পরেও যখন নিকটস্থ মানুষজনের কাছ থেকে যখন মানুষ একের পর এক নিন্দিত হতে থাকে, তখন একজনের মানষিক অবস্থান কোথায় যেতে পারে সহজেই অনুমেয়। এখানে আমি ব্যক্তিগত ভাবে কাওকে দোষারোপ করছি না, দোষারোপ করছি আমাদের পুরা ব্যবস্থার।

একজন ছাত্র কিংবা ছাত্রী যখন মেডিকেলে এসে বার বার ফেল করছে, আমাদের কয়জন তার খোজ নেয়। বরং কেউ খারাপ করলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা তাকে ঠেলে পাঠাচ্ছে আরো বিষন্নতার দিকে। রেজাল্ট খারাপ করার পর শিক্ষকদের বকাবকি, তাদের নিন্দাবাচক কথাবার্তা বিষণ্ণতাকে এগিয়ে দেয় আরো কয়েক ধাপ। একটা শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষায় খারাপ করে শিক্ষকরা সামান্য বকাঝকা করবেন এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এরও একটা লিমিট আছে। অনেকেও সেই লিমিটও অতিক্রম করে যান। আচ্ছা ধরে নিলাম, একজন শিক্ষক শাষন করতেই পারেন। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী কেন বার বার ফেল করছে, কয়জন শিক্ষক খোজ খবর নেন? কয়জন তাদের একান্তে ডেকে বুঝান? হয়ত অনেকেই আছেন কিন্তু তাদের সংখ্যা যে অতি নগণ্য। শাষক করার অধিকারতো তারই আছে, যে আদর করতে জানে।

আবার অনেক সময় দেখা যায়, কোন শিক্ষকের সাথে কারোর মনোমালিন্য থাকে সেটা যে কোন কারনেই হোক। পরবর্তীতে দেখা যায়, সেই শিক্ষকের কাছে ছাত্রটি বার বার ফেল ফেল করতে থাকে। একই সাবজেক্টে আট দশ বার পরীক্ষা দিয়ে পাশ না করতে পারার নজির ইতিহাসে অপ্রতুল নয়। এইভাবে সেই ছাত্র যখন বিষণ্ণতার শিখরে পৌছে যাচ্ছে, বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। তখন এই দ্বায়ভার কার? একটা ছাত্র যখন ফাইনাল প্রফে পর পর দুইবার ফেল করছে, তার মানে তার জীবন থেকে সম্পূর্ণ একটা বছর চলে যাচ্ছে। এই একটা বছর কিন্তু খুব কম সময় নয়। একটা বছরে কিন্তু মানুষের জীবনের কাছে অনেক কিছু। একজন ছাত্র যখন আট-দশবার পরীক্ষা দিয়ে পাশ না করতে পারায় যখন আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, তখন কি ওই সংশ্লিষ্ট শিক্ষক পারেন তার দ্বায় এড়াতে? অথচ এই সময়ে তার জীবনের কয়েক বছর চলে যায়। একটা মানুষের জীবনে বিষণ্ণতা কখন আসে, যখন যে জীবনের কাছে বার বার পরাজিত হয়, তখন!

এখন আসি মিডিয়ার কাছে। পরাজিত মানুষগুলোর সামনে যখন বিজয়ীরা উল্লাস করতে থাকে, স্বভাবতই খারাপ লাগার কথা। আজকে আমাদের সমস্ত চিন্তা, চেতনা, ব্যক্তিত্ববোধ, আনন্দ, অনুভূতি এক ফেসবুকে এসেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। কেউ যখন পাশ করার পরে ফেসবুকে স্টাটাস দেয়, সেগুলো দেখার পর ফেল করা ছাত্র ছাত্রীদের যে কেমন লাগে, ভুক্তভোগীরাই জানেন।

আমি জানি, কারন আমি নিজেই ভুক্তভোগী। এগুলো এমনই উত্তেজক যেন, জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালা। বিষণ্ণতা কে বাড়িয়ে দেয় বহুগুনে। চারিদিকে বিজয়ীদের উল্লাস, সবাই এটাকে সহজ ভাবে নিতেও পারে না। একজন পাশ করে চিকিৎসক হয়ে গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে যখন হাসপাতালে যায়, সারারাত-দিন পরিশ্রম করে ফেল করা কারোর কাছে এই দৃশ্য মেনে নেওয়া অনেক কঠিন।

এত কিছুর পরেও, মেডিকেলের ছেলে-মেয়েরা পরীক্ষায় ফেল করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মোটিভেশন এখানে অনেক বড় জিনিস। একজন কেন বার বার পরীক্ষায় ফেল করছে তার খোজ নেওয়ার দ্বায়িত্ববোধ থেকে আমরা কেউ এড়াতে পারিনা। শুধু তাই নয়, আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশও এর থেকে দ্বায়মুক্ত হতে পারে না।

আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা সবাইকে সমান মেধার অধিকারী করেও সৃষ্টি করেননি। কারোর যেখানে একবার পড়লে হয়ে যায়, অন্যদের হয়ত দশবার পড়া লাগে। এক্ষেত্রেও আসতে পারে হতাশা। তবে আসল কথা হচ্ছে লেগে থাকতে হবে। যারা আমাদের বন্ধু মহলের ভিতরে দূর্বল, আমাদেরও উচিৎ তাদের বুঝানো, মোটিভেশন করা।

বিশেষ করে এই মুহূর্ত গুলোতে পরিবার ও কাছের মানুষদের সহযোগীতা খুব প্রয়োজন। একটা মানুষ এমনি এমনি আত্মহননের পথ বেছে নেয়না। একটা দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্ণতা মানুষকে আত্মহত্যার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়, মানুষকে বাধ্য করে নিজের আত্মসম্মানবোধ রক্ষার্থে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে।

তবে কি আত্মহত্যাই এই বিষণ্ণতার একমাত্র সমাধান? আমরা কি পারিনা মোটিভেশনের মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনতে? একটা পরিবারের মধ্যমণি আর একটা মানুষ তার সারাজীবনের লালিত স্বপ্নের কাছে পরাজিত হয়ে চলে যাবে, এটা কখনই কাম্য হতে পারে না। পরিবর্তন দরকার আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার, আমাদের চিন্তাধারার। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পদক্ষেপ নিতে হবে আমাদের শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকদের।

একটা ছাত্র কেন বার বার ফেল করছে তার খোঁজখবর নেওয়া। বাসা থেকে খারাপ রেজাল্টের কারণে বকাবকি করলে প্রয়োজনে নিজে উদ্যোগ নিয়ে কথা বলতে হবে অভিভাবক দের সাথে, মেডিকেল এর সিস্টেম সম্পর্কে বুঝাতে হবে।

আবার ফিরে যায়, সেই বিজয়দের কাছে। জীবনের কাছে বার বার পরাজিত হয়ে যারা আত্মহত্যার পথে যাত্রা করে। আমরা চায় না, আর কোন বিজয় আর এভাবে চলে যাক নিজের লালিত স্বপ্ন আর বাবা মায়ের আজীবনের কষ্টকে নিরর্থক করে। পরিবর্তন হোক আমাদের চিন্তাধারা আর সমাজ ব্যবস্থার। ব্যর্থদের পাশে সবাই দাড়াক মোটিভেশন এর নিশান নিয়ে, বিজয়ীরা হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাক ক্ষনিক পরাজয়ী ভবিষ্যতের দিগ্বীজয়ী বীরদের।

আরও পড়ুন-

►আত্মহত্যা প্রসঙ্গ

►জীবনের কাছে এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষা মূল্যহীন

►রোগীর রোগ যারা সারাবেন তাদের রোগটা সারানো সময়ের দাবি

►একজন বিজয় সাহার মৃত্যু এবং কিছুকথা

►ফাইনাল প্রফে ফেল করায় মেডিকেল শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ফিলিস্তিনি তরুণ চিকিৎসক হাইসামের গল্প

ফিলিস্তিনি তরুণ চিকিৎসক হাইসামের গল্প

হাইসাম আবু সুলতান। ফিলিস্তিনের এক বোকাসোকা টাইপ আবেগী ছেলে। নিজের দেশ ছেড়ে…

মুমূর্ষু রোগীর পাশে এ কেমন অসভ্যতা?

মুমূর্ষু রোগীর পাশে এ কেমন অসভ্যতা?

সকাল সকাল হাসপাতালে ঢুকে ইমার্জেন্সি ডিউটির দায়িত্ব হাতে নিয়েই বিপদে পড়লাম। ইমার্জেন্সি…

ঘুষ, দুর্নীতির চেয়েও মাদক মারাত্মক!

ঘুষ, দুর্নীতির চেয়েও মাদক মারাত্মক!

মধ্যরাতে পুলিশ এক যুবককে ধরে নিয়ে এলো হাসপাতালে। দা দিয়ে নিজেই তার…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর