ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১ ঘন্টা আগে
ডা. মুজিবুল হক

ডা. মুজিবুল হক

সহযোগী অধ্যাপক, শিশু বিভাগ
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।


০৮ মে, ২০১৮ ১২:২৯

থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধের উপায়

থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধের উপায়

আবু মিয়া, ১২ বছর বয়সের এক কিশোর। এই বয়সে তার স্কুলে যাওয়ার কথা, ফুটবল বা ক্রিকেট নিয়ে বন্ধুদের সাথে মেতে ওঠার কথা, স্বপ্নে বিভোর থাকার কথা; বড় হওয়ার স্বপ্ন, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। অথচ এসবের কিছুই সে করছে না। কারণ, তার শরীর খুব দুর্বল, তার পেটের দুটো চাকা (Mass) দিন দিন বেড়েই চলেছে। সে একজন থ্যালাসেমিয়া রোগী। ৩ বছর বয়সেই তার এ রোগ ধরা পড়ে। তার ছোট ভাইটিও একই রোগে আক্রান্ত।

ডাক্তার সাহেবরা বলেছিলেন, এক মাস পর পর নিয়মিত রক্ত দিলে সে সুস্থ থাকবে। কিন্তু রক্ত দেওয়ার জন্য হাসপাতালে যাওয়া-আসা আর নিয়মিত রক্ত যোগাড় করা তার দরিদ্র পিতার জন্য একটা কঠিন কাজ। তাই সে নিয়মিত রক্ত নিতে আসতে পারে না। যখন শরীরের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়, তখন তার পিতা তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। বেশ কিছু দিন ধরে ডাক্তার সাহেবরা লৌহ অপসারনকারী ওষুধের কথা বলছেন। কিন্তু এসব দামী ওষুধ কেনা তাদের পক্ষে দুঃসাধ্য। তাই সে আর স্বপ্ন দেখে না। সে এখন ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে। এই আবু মিয়া আমাদের শিশু বিভাগের একটি পরিচিত মুখ। বাংলাদেশে এরকম আবু মিয়ার সংখ্যা অনেক। এদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

থ্যালাসেমিয়া কি? 
থ্যালাসেমিয়া রক্তের এক ধরনের মারাত্মক রোগ। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুদের শরীরে রক্তের মূল্যবান উপাদান হিমোগ্লোবিন ঠিকমত গঠিত হয় না এবং রক্তের লোহিত কণিকা স্বাভাবিক সময়ের আগে ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে রোগী রক্ত শূন্যতায় ভোগে ও শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে অতিরিক্ত আয়রন জমা হয়ে নানা ধরনের জটিলতার সৃষ্টি করে।

থ্যালাসেমিয়া রোগ কিভাবে বিস্তার লাভ করে?
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রোগ। যে বংশে এ রোগ আছে, সেই বংশের লোকজনই বংশানুক্রমে এটা বহন করে। পিতা মাতা থেকে সন্তানদের মধ্যে এ রোগ জীন (Gene) এর মাধ্যমে প্রবেশ করে।

বাহক (Carrier) কি?
যাদের শরীরে থ্যালাসেমিয়া রোগের জীন আছে, কিন্তু রোগের কোন উপসর্গ প্রকাশ পায় না, তাদেরকে থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক বলা হয়। এরা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। তবে এরা এদের সন্তানদের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগের বিস্তার ঘটায়। পিতা-মাতা উভয়েই বাহক হলে থ্যালাসেমিয়া শিশুর জন্ম হবার সম্ভাভবনা থাকে, নতুবা নয়। যে কেউ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হতে পারে। কাজেই বিয়ের আগে সবারই জেনে নেওয়া দরকার, তিনি থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কি-না।

কেউ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কি-না তা কিভাবে জানা যাবে?
এটা জানতে হলে রক্তের বিশেষ ধরনের পরীক্ষা করাতে হবে। আমাদের দেশে যে পরীক্ষা দ্বারা এটা নির্ণয় করা হয়, তাকে ‘হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস’ বলা হয়। 

থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা 
থ্যালাসেমিয়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা। বাংলাদেশে গড়ে প্রতি বছর ৭৪৮৩ জন থ্যালাসেমিয়া শিশুর জন্ম হয়। সারা দেশে সম্ভাব্য থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা ৩,৭২,১৫৪ জন। (সূত্রঃ ঢাকা শিশু হাসপাতাল থ্যালাসেমিয়া সেন্টার) অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের সুবিধা না থাকায় নিয়মিত বিরতিতে রক্ত গ্রহণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তের লৌহ অপসারনকারী ওষুধ গ্রহণই আমাদের দেশে থ্যালাসেমিয়া রোগের প্রধান চিকিৎসা।

একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীকে প্রতি ৩-৪ সপ্তাহ অন্তর অন্তর রক্ত নিতে হয়। এই বিপুল সংখ্যক থ্যালাসেমিয়া রোগীর জন্য নিয়মিত রক্তের ব্যবস্থা করা একটি দুরূহ ব্যাপার।

যেহেতু এইসব রোগীকে নিয়মিত ভাবে রক্ত গ্রহণ করতে হয়, তাই তাদের রক্তে লৌহের পরিমান আস্তে আস্তে বেড়ে যায় এবং তা পরবর্তীতে শরীরের বিভিন্ন জায়গায়, যথা- হৃৎপিন্ড, যকৃত, প্লীহা, অগ্নাশয় ইত্যাদিতে জমা হয়ে নানা রকম ক্ষতি সাধন করে।

তাই এসব রোগীদের অবশ্যই লৌহ অপসারনকারী ওষুধ গ্রহণ করতে  হবে। এসব ওষুধ সহজলভ্য নয় এবং দাম অত্যন্ত বেশী। ফলে আমাদের দেশের থ্যালাসেমিয়া রোগীদের অধিকাংশই এসব লৌহ অপসারনকারী ওষুধ  গ্রহণ করতে পারে না।

সহজ কথায় বলতে হয়, থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কষ্ঠসাধ্য। আমাদের দরিদ্র শিশুরা চিকিৎসার অভাবে অকালেই প্রাণ হারায়।

একটি থ্যালাসেমিয়া শিশুর জন্ম শুধু তার পরিবারের উপর নয়, সমগ্র সমাজ ও দেশের স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক অবস্থার উপর বিশাল চাপ তৈরী করে। যেহেতু থ্যালাসেমিয়া রোগের কোন স্থায়ী চিকিৎসা নেই, তাই থ্যালাসেমিয়া শিশুর জন্ম প্রতিরোধ করাই থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা কমানোর একমাত্র উপায়।

থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধের উপায়
আধুনিক বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে অনেক রোগকে নিরাময় এবং অনেক রোগকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। এই থ্যালাসেমিয়া রোগও প্রতিরোধ করা সম্ভব। এই জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে হবে -

১. দেশের প্রতিটি নাগরিককে এই রোগ সম্বন্ধে সচেতন করে তুলতে  হবে। এজন্য বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম যথা- টেলিভিশন, রেডিও, খবরের কাগজ ইত্যাদিতে প্রচার কার্যক্রম চালাতে  হবে। তাছাড়া বিশেষ ক্রোড়পত্র, পোস্টার, লিফলেট ইত্যাদি নিয়মিত বিতরণ করতে হবে। কেননা সচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রচারের চেয়ে ভাল অন্য কোন বিকল্প নেই।
২. থ্যালাসেমিয়া মহামারি হতে নিস্কৃতি পাওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল, এ রোগের বাহকদের সনাক্ত করা। এজন্য ব্যাপক স্ক্রীনিং কর্মসূচী গ্রহন করতে হবে। বাহকদের চিহ্নিত করে তাদের প্রত্যেককে বংশ বিষয়ক পরামর্শ দিতে হবে। দুজন বাহক যদি একে অন্যকে বিয়ে না করে তাহলে কোন শিশুরই থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করা সম্ভব নয়।
৩. যদি কোন কারণে দুজন বাহকের মধ্যে বিয়ে হয়েও যায়, তাহলে সন্তান গর্ভধারণের অনতিবিলম্বে বিশেষ ধরনের পরীক্ষার দ্বারা নির্ণয় করা যায় গর্ভস্থিত সন্তান সুস্থ হবে, না-কি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হবে। এই পরীক্ষাকে ‘প্রি-নেটাল ডায়াগনোসিস’ বলে। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ঢাকা শিশু হাসপাতালে এই পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। এটা গর্ভাবস্থার ১৬ সপ্তাহ বা এর পর করা যায়। এই পরীক্ষার ফলে যদি দেখা যায়, সন্তান থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে তবে তারা আগত সন্তানের মারাত্মক পরিণতির কথা চিন্তা করে গর্ভপাত করানোর সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। এই ভাবে আক্রান্ত সন্তান প্রতিরোধ করা সম্ভব। 

যদি উপরোল্লিখিত পদক্ষেপ সমূহ আমাদের দেশে নেয়া হয়, তবে হয়তো একদিন আমাদের দেশ থেকে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে। উদহারণ স্বরূপ বলা যায়, সাইপ্রাসে এক সময় থ্যালাসেমিয়া খুব বেশী ছিল। উপযুক্ত প্রচার এবং প্রতিরোধের ফলে তা আজ প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।

উপদেশ এবং বংশ-বিষয়ক পরামর্শ
যে সমস্ত পরিবার থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কিংবা রোগে আক্রান্ত, তাদের নিম্নলিখিত পরামর্শগুলি অবশ্যই মনে রাখতে হবে এবং মেনে চলতে হবে।

১. থ্যালাসেমিয়া বংশগত রোগ। পিতা-মাতা থেকে সন্তানদের মধ্যে জিনের মাধ্যমে প্রবেশ করে। যে বংশে এই রোগ থাকে, সেই বংশের লোকজনই বংশানুক্রমে এটা বহন করে।
২. যে পরিবারে থ্যালাসেমিয়া রোগ আছে, সেই পরিবারের পিতা-মাতা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন সবাইকে হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস করার জন্যে পরামর্শ দিতে হবে। 
৩. যারা থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক, তাদের নিজের বংশের কাউকে, যেমন- চাচাত,ফুফাত, মামাত, খালাত ভাই-বোনকে জীবন সঙ্গী হিসাবে গ্রহণ করা উচিত হবে না। যাকে জীবনসঙ্গী হিসাবে বেছে নিবে সে ক্ষেত্রেও সাবধানতা অবলম্বন করা শ্রেয়। সম্ভব হলে বিবাহের পূর্বে রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে, তারা থ্যালাসেমিয়া রোগ থেকে মুক্ত কিনা।
৪. মনে রাখতে হবে, যারা থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক তারা যদি অন্য একজন থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহককে বিবাহ করেন তবে রোগাক্রান্ত সন্তান জন্ম হওয়ার আংশকা থাকে। এই কারণেই তাদের উচিত হবে বাহক নয় এমন কারো সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। তাহলে রোগাক্রন্ত সন্তান জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।
৫. যদি স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ই থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হয় এবং স্ত্রী যদি গর্ভবতী হয়,  ‘প্রি-নেটাল ডায়াগনোসিস’ করার পরামর্শ দিতে হবে।

যে কেউ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হতে পারেন। তাই আপনি বাহক কি-না, তা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে জেনে নিন। বাহক হওয়া কোন লজ্জার বিষয় নয়। থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে নিজে সতর্ক হোন, অন্যকে সচেতন করুন। আসুন, আপনি, আমি, সকলে মিলে থ্যালাসেমিয়া রোগের বিরুদ্ধে গড়ে তুলি সর্বময় প্রতিরোধ।

আরও পড়ুন

►  থ্যালাসেমিয়ার বাহক হতে পারে যে কেউ!

► ‘বিয়ের আগে ওদের রক্ত পরীক্ষা করলে কোনো দুশ্চিন্তায়ই হতো না’

► অস্বাভাবিক গর্ভধারণ কেন হয়?

► বিয়ের আগে যে পরীক্ষাটি জরুরী

► রক্তশূন্যতা কি, কেন হয়, লক্ষণ ও করণীয়

►থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টিকারী যোদ্ধারা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত