ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ২ মিনিট আগে
ডা. মো. কামরুজ্জামান

ডা. মো. কামরুজ্জামান

এফসিপিএস (হিমাটোলজি) 
সহকারী অধ্যাপক (হিমাটোলজি) 
ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।
 

 


০৮ মে, ২০১৮ ১০:৪৩

থ্যালাসেমিয়ার বাহক হতে পারে যে কেউ!

থ্যালাসেমিয়ার বাহক হতে পারে যে কেউ!

থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তস্বল্পতা জনিত রোগ। এটি কোন ছোঁয়াচে রোগ নয়। রক্তের ক্যান্সারও নয়।

বাবা ও মা দুইজনই থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার ঝুঁকি থাকে। থ্যালাসেমিয়া বাহক আর থ্যালাসেমিয়া রোগী এক কথা নয়।

থ্যালাসেমিয়ার বাহক স্বাভাবিক মানুষরূপে বেড়ে ওঠে। তাই কেউ থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না, তা বাহ্যিকভাবে বুঝার কোন উপায় নাই। আর থ্যালাসেমিয়া রোগী জন্মের পর ৬ মাস বয়স হতে ফ্যাকাসে হয়ে যায়, জন্ডিস দেখা দেয়। আস্তে আস্তে পেটের প্লীহা ও লিভার বড় হয়ে যায়।  ঠিকমতো শরীরের বৃদ্ধি হয় না।

রক্তস্বল্পতার জন্য প্রতি মাসে ১ থেকে ২ ব্যাগ রক্ত শরীরে নিতে হয়। ঘন ঘন রক্ত নেওয়ায় ও পরিপাক নালী থেকে আয়রনের শোষণ ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় শরীরে আয়রনের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে লিভার, হৃদপিন্ডসহ অন্যান্য অঙ্গের নানা রকম মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়। সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত রক্ত না নিলে থ্যালাসেমিয়া রোগী ৫ থেকে ৬ বছরের মধ্যে মারা যায়।

প্রতিবার রক্ত নেওয়া ও আয়রন কমানোর ঔষধসহ অন্যান্য খরচে একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসায় প্রতিমাসে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। নিয়মিত রক্ত দিয়ে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সঠিক চিকিৎসা করালে থ্যালাসেমিয়া রোগীকে ২০ থেকে ৩০ বছর বাচানো সম্ভব। সঠিক চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয় বহুল তাই সবার পক্ষে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না। অকালে ঝরে যায় হাজারও প্রাণ। পরিবারে আসে দরিদ্রতা।

থ্যালাসেমিয়া কেন হয়?

লোহিত রক্ত কনিকার মধ্যে হিমোগ্লোবিন ( হিম+ গ্লোবিন) থাকে বিধায় রক্ত লাল দেখায়।

স্বাভাবিক মানুষের লোহিত রক্ত কনিকার গড় আয়ু ১২০ দিন হলেও থ্যালাসেমিয়া রোগীর ত্রুটিপূর্ণ গ্লোবিনের কারণে লোহিত রক্ত কনিকার গড় আয়ু মাত্র ২০ থেকে ৬০ দিন। অপরিপক্ক অবস্থায় লোহিত রক্ত কনিকা ভেঙ্গে যায় বা মারা যায় তাই রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়।

মানব দেহে ১৬ নং ক্রোমোজোমে থাকে আলফা জীন আর ১১ নং ক্রোমোজোমে থাকে বিটা জীন। আলফা ও বিটা জীনদ্বয় আলফা ও বিটা গ্লোবিন নামক প্রোটিন তৈরি করে যা অনেক গুলো এমাইনো এসিডের সমষ্টি। জন্মগতভাবে ১৬ অথবা ১১ নং ক্রোমোজোমের আলফা অথবা বিটা জীন সঠিকভাবে এমাইনো এসিড তৈরি করতে না পারলে, আলফা অথবা বিটা গ্লোবিন নামক প্রোটিন ত্রুটিপূর্ণ হয়। আলফা অথবা বিটা গ্লোবিন চেইন ত্রুটিপূর্ণ থাকায় হিমোগ্লোবিন ত্রুটিপূর্ণ হয় বিধায় লোহিত রক্ত কনিকা দ্রুত ভেঙ্গে যায় বা মারা যায় এবং রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়।

বাংলাদেশে সমস্যা কোথায়?

থ্যালাসেমিয়া স্ক্রেনিং প্রোগ্রাম না থাকায়, অনেকেই জানেনা তিনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা। তাই অজান্তেই থ্যালাসেমিয়া বাহকের মধ্যে বিয়ে হচ্ছে এবং দিন দিন থ্যালাসেমিয়া রোগী বাড়ছেই।

বাবা-মা উভয়েই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে সন্তান থ্যালাসেমিয়ার রোগী হওয়ার সম্ভবনা শতকরা ২৫ ভাগ, বাহক হওয়ার সম্ভবনা শতকরা ২৫ ভাগ আর সুস্থ হওয়ার সম্ভবনা শতকরা ৫০ ভাগ।

বাবা-মা যেকোনো একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে সন্তানের বাহক হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৫০ ভাগ, সুস্থ হওয়ার সম্ভবনা শতকরা ৫০ ভাগ আর থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার সম্ভবনা নাই।

ভাইবোনের (চাচাতো, মামাতো, খালাতো, ফুফাতো) মধ্যে বিয়ে এবং পরিবারের কারো থ্যালাসেমিয়া থাকলে থ্যালাসেমিয়া বাহক হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

কিভাবে জানা যাবে আপনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না?

Haematology Autoanalyzer মেশিনে CBC পরীক্ষায় (মাত্র ২০০-৫০০ টাকায়) যদি Haemoglobin low, near normal or normal, RBC number normal or increased , MCV less than 80 fl, MCH less than 27 pgm, MCHC normal, RDW-CV normal (less than 15) হয়, তাহলে থ্যালাসেমিয়া বাহক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এরপর Haemoglobin Electrophoresis করে থ্যালাসেমিয়া বাহক কিনা নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে, ক্ষেত্রবিশেষ DNA analysis লাগে।

বাবা-মা থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে মায়ের পেটের বাচ্চা থ্যালাসেমিয়ার রোগী কিনা তা নিশ্চিত হয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ একটি অঘটন সারা জীবনের জন্য কান্না।

দুই জন থ্যালাসেমিয়া বাহকের মধ্যে বিয়ে বন্ধ করা গেলেই থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আসুন, বাধ্যতামূলক থ্যালাসেমিয়া স্ক্রেনিং চালু করি, বাহকের মধ্যে বিয়ে বন্ধ করি। পোলিওর মতো থ্যালাসেমিয়ামুক্ত বাংলাদেশ গড়ি।

আরও পড়ুন-

►থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টিকারী যোদ্ধারা

►‘বিয়ের আগে ওদের রক্ত পরীক্ষা করলে কোনো দুশ্চিন্তায়ই হতো না’

► অস্বাভাবিক গর্ভধারণ কেন হয়?

► বিয়ের আগে যে পরীক্ষাটি জরুরী

► রক্তশূন্যতা কি, কেন হয়, লক্ষণ ও করণীয়

►থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টিকারী যোদ্ধারা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত