ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


০৭ মে, ২০১৮ ০১:০৬ পিএম

দানবীয় রোগ চিকুনগুনিয়া, হতে পারে মৃত্যু!

দানবীয় রোগ চিকুনগুনিয়া, হতে পারে মৃত্যু!

গতবছর ঢাকা শহরের প্রায় অর্ধেকের বেশি অধিবাসী চিকুনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্ত হন। আবাল-বৃদ্ধা-বনীতা সবাই, কেউ রেহাই পাননি। এর মূল কারণ হল- ঢাকা শহরের আনাচে-কানাচে স্থির হয়ে জমে থাকা নোংরা জল যা এই রোগের বাহক স্ত্রী এডিস মশার জন্যে অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ পরিবেশ। আমার এহেন কোন আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব বা পরিচিত জন নেই যে এ জ্বরে ভুগেননি।

ঢাকা শহরে রীতিমত মহামারী হিসেবে দেখা দেয়া এ রোগ এক পর্যায়ে দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বলা যায় সারা দেশ তখন চিকুনগুনিয়া জ্বরে ভুগতে থাকে। সরকার সদাশয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা এর প্রচারণা ও মোকাবেলায় যথেষ্ট নড়ে চড়ে বসে। ফলে প্রায় দুই মাস যাবৎ চলতে থাকা এ রোগ এক সময় তার তাণ্ডবলীলা চালিয়ে অবশেষে দয়া পরবশত চলে গেলেও কারো মৃত্যুর কথা তেমন শুনা যায়নি।

বিভিন্ন দেশের গবেষণায় দেখা গিয়েছে এ রোগে মৃত্যুর হার প্রতি দশ হাজারে একজন। আমাদের সচেতনতা বা গৃহীত পদক্ষেপে হয়তো সে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু এড়ানো গেছে। তবে অসহায় জ্বরাগ্রস্তদের নিয়ে আমাদের হা পিত্তেশ ছিল সত্যিই হৃদয় বিদারক।

এ জ্বর তেমন মারাত্মক না হলেও এতে যে অসহনীয় তাপমাত্রা ও হাড় ব্যাথা থাকে তা বোধকরি আর কোন ভাইরাস জ্বরে থাকেনা। একবার আমার কর্মস্থলের এক নির্বাহী কর্মকর্তা এ রোগে আক্রান্ত হলেন। মুহুর্তের ভিতরেই তার গায়ে খই ফোটা জ্বর। ভয়ে আমাকে ফোন দিলেন, ‘ইউএইচএফপি সাহেব, আপনি কোথায়?’

আমি তখন একটা স্কুলের স্বাস্থ্য বিষয়ক এক পোগ্রামে ছিলাম। তাৎক্ষণিক সব শুনে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি কি ঢাকায় গিয়েছিলেন?’ 

- তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, কেন?’

- বললাম, ‘ভাই আপনার চিকুনগুনিয়া হয়েছে নিশ্চিত। ভয় নেই এক সপ্তাহে লাগবে আর যদি বেশি ভয় পান, তাহলে সাত দিন লাগবে। তাই আপাতত প্যারাসিটামলই খেতে থাকুন, গা ঠান্ডা পানি দিয়ে স্পঞ্জ করুন, প্রচুর পানি খেতে থাকুন।’

পরে দেখা হলে তিনি তার প্রচণ্ড হাড় ব্যাথার কথা বললেন। এরকম ব্যাথা নাকি তার জীবনে কখনো হয়নি। প্রচন্ড ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে জিজ্ঞাস করলেন, ‘আর কিছু নাতো।’

- তার ভয় তাড়াতে আমি হেসে বললাম, ‘আলবৎ আর কিছু নয়, ও কিছুনা কমে যাবে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, শুধু পরামর্শ মতো চলুন।’
- তিনি বললেন, ‘আপনি হাসছেন ভাই, আল্লাহর কাছে দোয়া করি, আপনার যেনো একবার চিকুনগুনিয়া হয়, তখন বুঝবেন ব্যাথা কারে কয়।’

এরকম ফরিয়াদ আমার ঢাকার আরো ক'জন নিকট বন্ধুরাও সে সময় করেছিল। ভাগ্যিস আমার চিকনগুনিয়া জ্বর হয়নি সেবার। আসলে আমি খুব প্রিকোশন নিয়ে চলেছিলাম। এমনকি দুতিন মাস ঢাকায় যাইনি। কিছু প্রিকোশন নিলে এ জ্বর এড়ানো সম্ভব। আসুন সেটা জানার চেষ্টা করি।

দুই

চিকুনগুনিয়া শব্দের অর্থ ধনুকের মতো বেঁকে যাওয়া। এটা আফ্রিকার তাঞ্জানিয়ার অধিবাসীদের ব্যবহৃত শব্দ। সেখানেই প্রথমে রোগটি দেখা দেয়।ইমিউনোজেনিক রি-একসনের ফলে জোড়ায় জোড়ায় প্রচণ্ড ব্যথা হয় এবং এতে অনক সময় রোগী ধনুকের মতো বেঁকে যায়, এজন্যই এর এমন নাম। কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে এ ব্যথা কয়েকদিন থেকে কয়েক মাস, এমন কি বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

প্রথমে চিকুনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে মশা কামড় দেয়, পরে সেই মশাটি পরিবারের সুস্থ মানুষকে কামড় দিয়ে রোগটি ছড়ায়।

চিক ভাইরাস পেটে নিয়ে ঘুরতে থাকা মশার কামড় দেবার সপ্তাহ/দশ দিনের মধ্যেই সুস্থ দেহে এ রোগ দেখা দেয়। চিকনগুনিয়া রোগীর সংস্পর্শে আসলে বা হাঁচি, কাশিতে রোগটি ছড়ায় না। মায়ের দুধের মাধ্যমেও নবজাতকে এ রোগটি ছড়াতে দেখা যায়নি। এমন কি ব্লাড ট্রান্সফিউশনেও না।

শুরুতেই প্রচণ্ড জ্বর হয়, যা ১০৪/ ১০৫ ডিগ্রী ফারে. কে ছাড়িয়ে যায় এবং প্যারাসিটামল সেবনেও কমেনা তার পরও প্যারাসিটামল ছাড়া আর কিছু খাওয়া উচিৎ না। অনেকে এন্টিবায়োটিক সেবন করেন যার কোন প্রয়োজন নেই।

শিশু, বয়োবৃদ্ধ, ডায়াবেটিস, প্রেশার, ক্যান্সার ও গর্ভবতী মায়েরা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই পরিবারের কারো এ জ্বর দেখা দিলে অবশ্যই রোগী ও অন্যান্যদের যাতে মশা না কামড়ায় তার প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।

একবার এ রোগ হলে দ্বিতীয় বার আর হয়না। চিকুনগুনিয়া জ্বরে মৃত্যু হয় সাধারণত এনকাফালাইটিস এ। সাধারণত শিশু ও বয়োঃবৃদ্ধ ক্ষেত্রে এটা হয়। এনকেফালাইটিস হলো ব্রেইনের ইনফ্লামেশন, যা চিক ভাইরাস দিয়ে হয়। চিক ভাইরাস একটি আর এন এ ভাইরাস।

কেউ কেউ বলেন, আমার হয়নি কিন্তু আমার বাচ্চাদের হয়েছে। আবার কেউ বলেন, আমার হয়েছে কিন্তু বাচ্চাদের হয়নি। এ রকম কেন স্যার? আসলে অজান্তে অতীতে এ রোগটি হয়ত আপনার কিংবা আপনার পরিবারের কারো হয়ে গেছে যা সনাক্ত করন সম্ভব হয়নি তাই এমনটি হয়ে থাকে।

চিকুনগুনিয়া জ্বরের সাধারণ লক্ষণ

প্রচন্ড জ্বরই এই রোগের প্রধান লক্ষণ। এছাড়াও বমি বমি ভাব, মাথা ব্যাথা, হাড়ে ব্যাথা, জয়েন্ট গুলো ফুলে যেতে পারে। রোগী দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ত্বকে লালচে ঘামাচির মতো র‍্যাস দেখা দেয় এবং এতে চুলকানি হতে পারে। সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যেই জ্বর ও ব্যাথা ভাল হয়ে যায়। তবে ব্যাথাটা অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

উপরোক্ত লক্ষণগুলো যে একসাথে থাকবে এমন কোন কথা নেই। চিকুনগুনিয়া রোগীর রক্তে এন্টিবডি আইজিএম এর উপস্থিতি দেখে রোগটি নিশ্চিত করা হয়।

চিকনগুনিয়া জ্বর অনেকটা ডেংগু জরের মতো তবে ডেংগু জ্বরে চোখ, নাক, এমন কি প্রস্রাব পায়খানার সাথে ব্লিডিং থাকে যা চিকুনগুনিয়ায় হয়না।

চিকিৎসা

চিকুনগুনিয়ার অনেকটা ডেঙ্গু এবং জিকার ভাইরাস জ্বরের মতো। এর চিকিৎসায় অবহেলা করা উচিত নয়। কেবল প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেয়ে জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। প্রচুর পানি, ফলের রস, লেবুর সরবত উপকারী। তবে সবচেয়ে ভাল হলো খাবার স্যালাইন। এতে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিবেনা।

অ্যাসপিরিন, স্টেরয়েড, এন্টিবায়োটিক কখনো খাওয়া উচিত নয়। জ্বর শুরু হওয়া মাত্রই আপনার ডাক্তার বা নিকটস্থ জেনারেল ফিজিসিয়ান সাহেবের শরণাপন্ন হবে হতে।

চিকুনগুনিয়া রোগের মৃত্যুর ঘটনা বেশ বিরল। তবে নবজাতক, শিশু, বয়োবৃদ্ধ এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্ত যেমন হাইপ্রেশার, ডায়াবেটিস, এইডস, ক্যান্সার, যক্ষা রোগী দের বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।

নিয়ন্ত্রণ

এই রোগের বিরুদ্ধে কার্যকরী অনুমোদিত কোনো টিকা নেই। মশা নিয়ন্ত্রণ ও ঘুমানোর সময় মশারি টাঙিয়ে ঘুমানো, লম্বা হাতলযুক্ত জামা ও ট্রাউজার পরে থাকা, বাড়ির আশেপাশে পানি জমতে না দেয়া ইত্যাদি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

শুধু স্ত্রী এডিস মশা দিনের বেলা কামড়ায়। অনেকটা আলো-আধার অবস্থায় অর্থাৎ ভোর ও সন্ধ্যা বেলা এদের কামড়ানোর প্রবণতা বেশী। স্ত্রী মশাগুলো একবারে একের অধিক ব্যক্তিকে কামড়াতে পছন্দ করে। একবার রক্ত খাওয়া শেষে ডিম পাড়ার জন্য বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। এদের ডিমগুলো পানিতে এক বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। অল্প পরিমাণ জমে থাকা স্থীর পানি ডিম পরিস্ফুটনের জন্য যথেষ্ট সহায়ক।

এডিস মশা স্থির পানিতে ডিম পাড়ে তাই বালতি, ফুলের টব, গাড়ির টায়ার প্রভৃতি স্থানে যেন পানি জমতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

সচেতন হতে হবে এখন থেকেই। জুলাই আগস্ট মাস থেকে এই রোগের দেখা দিতে থাকে। মনে রাখতে হবে প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিওর।

একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার

অধ্যাপক প্রাণ গোপালকে বিজয়ী ঘোষণা করে রোববার বিজ্ঞপ্তি: রিটার্নিং কর্মকর্তা

একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার

অধ্যাপক প্রাণ গোপালকে বিজয়ী ঘোষণা করে রোববার বিজ্ঞপ্তি: রিটার্নিং কর্মকর্তা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে