ডা. ছাবিকুন নাহার

ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


০৭ মে, ২০১৮ ১১:০৬ এএম

অস্বাভাবিক গর্ভধারণ কেন হয়?

অস্বাভাবিক গর্ভধারণ কেন হয়?

আলহামদুলিল্লাহ্‌! আল্লাহ্‌র রহমতে একটা প্রাণ মনে হয় বেঁচে গেলো। রোগী খুব গরিব। বিবাহিত জীবন ১২ বছরের। কোন বাচ্চাকাচ্চা নেই। এক্টোপিক প্রেগনেন্সি নিয়ে লোকাল ক্লিনিকে ভর্তি ছিল তিন দিন।

আত্মীয়তার সূত্রধরে আমার কাছে এসেছে, সঙ্গে কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজ নেই। এমনকি ব্লাড গ্রুপ, হিমোগ্লুবিন % (রক্ত শূন্যতা পরিমাপক পরীক্ষা) ও না। সামান্য কয়টি টাকা সাথে। জানলাম হাতের মোবাইল আর ঘরের টুকিটাকি বিক্রি করে সংগ্রহ করা।

ভাবলাম ৩ দিন যেহেতু বেঁচে আছে আনরাপচার্ড হয়তো, কিন্তু ক্লিনিক্যাল কন্ডিশন তা বলে না। আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে টাকা লাগবে, তাছাড়া লাগবে সময়। অত সময় হাতে নেই। নিজেই প্রব ধরলাম। কোন এককালে শিখেছিলাম ভাগ্যিস! দেখব তো শুধু ফেটে গেছে কিনা। দেখি শুধু ফাটেই নাই, পুরো জরায়ু এবং আশপাশ রক্তের বন্যায় শাপলা গাছের মতো ভাসছে! কী করবো ভাবছি। রেফার করব? যদি পথেই... অথবা দালালের হাতে...

লোকবল বলতে স্বামী বেচারা একা। সহজ সরল রিক্সাচালক। সাহস করে সিদ্ধান্ত নিলাম, যা থাকে কপালে। কাউন্সিলিং করলাম। ল্যাপারোটমি, পেট কেটে অপারেশনের মাঝামাঝি রিপোর্ট এলো হিমোগ্লুবিন ৬ গ্রাম/ ডেসি. লিটার। যেখানে স্বাভাবিক মাত্রা ১১ থেকে ১৬ গ্রাম। রক্ত শূন্যতা ভয়াবহ। রক্ত পাব কোথায়? অন্তত চার ব্যাগ বি পজিটিভ রক্ত লাগবে। ভাবছি আর ঘামছি!

ডিউটি সিস্টার দিলো রক্ত। সার্জন টিম নিল খুবই মিনিমাম। থ্যাংকস হারিস ভাই, নিজ মেডিকেলের সিনিয়র, মাইনুল ভাই (এনেসথেসিয়া), সর্বোপরি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে যারা এখনও পুরোপুরি কর্পোরেট হয়ে ওঠেনি।

সবাই চেষ্টা করেছি অন্তঃপ্রাণে। অবশেষে বাসায় ফিরলাম। দেখি আমার ৪২ দিন বয়সী বাচ্চা (মিহন) আমার জন্য পাগল হয়ে আছে। কাল আবার ছুটতে হবে রক্তের জন্য। মিনিমাম দুই ব্যাগ। আমি জানি আজকের মতো কালকেও কোন না কোন ব্যবস্থা হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ...

প্রায় চার বছর আগের এ ঘটনা। মনে পড়লে এখনও ভালো লাগায় মনটা ভরে যায়!

ওহ্ বলতে ভুলে গেছি, অনেকেই আমার কাছে এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি সম্বন্ধে জানতে চেয়েছিলেন। আসুন একটু জেনে নেই। কে বলতে পারে কখন সে কার ঘরে হানা দেয়!

এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি বলতে কী বুঝি?

এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি মানে অস্বাভাবিক গর্ভধারণ। এখানে বাচ্চা জরায়ুতে না এসে পার্শ্ববর্তী টিউবে আসে। বাচ্থে সাথে টিউব স্ফিত হতে পারে না। ফলে অবধারিতভাবে ফেটে যায়। এতে বানের জলের মতো প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় এবং তৎক্ষনাৎ অপারেশন করে বন্ধ করতে না পারলে রোগী মারা যায়। এটা এটা মেডিকেল ইমার্জেন্সি।

কেন হয়?

- পিআইডি মানে জরায়ু, টিউবের ইনফেকশন
- টিউবের অপারেশন
- আগের এক্টোোপিকের হিস্ট্রি
- এন্ডোমেটরিওসিস নামক একধরনের রোগ
- আন এক্সপ্লেইনড

ইন্সিডেন্স:- ৩-৪ জন/ হাজার

রিকারেন্স রেট:- ১০-১৫%

উপসর্গ:-

- দেড় দুই মাস মাসিকবন্ধ 
- তলপেটে অসহ্য ব্যাথা
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া

ডায়াগনোসিস:-

- প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ
- আল্ট্রাসনোগ্রামে করলে দেখা যায় জরায়ু এম্পটি অর্থাৎ পাঁজি বাচ্চা জরায়ুতে না এসে আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে মনের আনন্দে। আর তার মাকে নিয়ে যমে ডাক্তারে টানাটানি। কখনো এ পক্ষ জয়ী তো কখনো ও পক্ষ।

চিকিৎসা:-

টিউব ফেটে গেলে বুঝবেন কপালও ফেটেছে। সাথে সাথে অপারেশন করে রক্ত বন্ধ করা, না হলে নিশ্চিত মৃত্যু। আর হ্যাঁ, টিউব ও কেটে ফেলা ছাড়া উপায় থাকে না অনেক সময়। রক্ত লাগে অনেক। এক রোগীর কথা জানি, তার লেগেছিলো একুশ ব্যাগ!
হরিবল কন্ডিশন! তবে যেখানে জীবনের প্রশ্ন, সেখানে বাকি সব গৌণ।

বেচারা গাইনি ডাক্তার এক্টোপিক রোগী তার জন্য দুঃস্বপ্ন। দোয়া দরুদ পড়ে বুকে ফুঁ দেয়। ভয়ে থাকে যেনো ফেইস করতে না হয়। বেচারা নারীকুল মা হতে গিয়ে কী অবলীলায় মরে যায়! আহারে মা! আহারে মাতৃত্ব!

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে