ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার,
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
প্যাথলজি বিভাগ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ।


০৫ মে, ২০১৮ ০১:০৬ পিএম
গল্পে গল্পে রোগের কথা

তামাক থেকে ক্যান্সার

তামাক থেকে ক্যান্সার

কায়েমুদ্দিন মিয়া। ৬৫ বছর বয়সের এ মানুষটিকে সারাজীবন খুব পরিশ্রম করতে হয়েছে। জমিজমা তেমন ছিল না। যা ছিল তার প্রায় সবটাই বিক্রি করে একমাত্র ছেলে রশিদ মিয়াকে দুবাই পাঠিয়েছিল।

রশিদ মিয়া দুবাই চাকরি করছে। বিয়ে করার ছয় মাস পরেই সে দুবাই গিয়েছিল ম্যানপাওয়ারের এজেন্ট ধরে। পাঁচ বছর পর রশিদ মিয়া দেশে এসেছিল দুই মাসের ছুটিতে। ওইবারই তার প্রথম সন্তান রোমেছার জন্ম হয়। রোমেছার বয়স যখন পাঁচ বছর তখন রশিদ মিয়া আবার দুইমাসের জন্য দেশে আসেন। সেবার তার ছোট মেয়ে নার্গিসের জন্ম হয়।

নার্গিসের বয়স যখন ৬/৭ বছর তখন রশিদ মিয়া আবার দুই মাসের জন্য দেশে এসে ঘুরে যান। শেষবার তার বউয়ের সন্তান ধরে নাই। বড় মেয়ে রোমেছা গত বছর ইন্টেরমেডিয়েট পাস করেছে।

এবার দুইমাসের ছুটিতে এসে রোমেছাকে বিয়ে দিয়ে চলে গেছে দুবাই। রশিদ মিয়া যৌবনকালের পুরোটাই বিদেশে কাটিয়ে দিলেন। টাকা-পয়সা মোটামুটি ভালোই পাঠিয়েছেন। রশিদ মিয়ার বাবা-মা বউ-সন্তান বেশ ভালভাবেই চলেন রশিদ মিয়ার কামাইয়ে।

রশিদ মিয়ার বউয়ের মাথায় কি যেন এক শূন্যতার জন্য রিম রিম করে।

পল্লী ডাক্তারের পরামর্শে ময়মনসিংহ থেকে ব্রেইনের সিটিস্ক্যান করিয়ে নিউরোলজিস্ট ডাক্তার দিয়ে প্রেস্ক্রিপশন করিয়ে এনেছেন। তাতে তেমন কাজ হচ্ছে না। রিম রিম করছেই। মোবাইলে রশিদ মিয়া বউকে বলে দিয়েছেন যত টাকা লাগুক চিকিৎসা করাও। টাকায়ই কি চিকিৎসা হয়? বউ ডাক্তার সাবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন

:সিটি স্ক্যান পরীক্ষায় আমার মাথায় কি রোগ ধরা পড়ল?

: সিটি স্ক্যান পরীক্ষায় সব রোগ ধরা পরে না। সাধারণত ব্রেইনে বা মাথার ভেতর কোনও রক্তক্ষরণ হলে বা কোন টিউমার হলে তা ধরা পরে।

: তাইলে এত দামি একটা পরীক্ষা করালেন কেন?

: পরীক্ষা তো আমি করাইনি। আপনারা আমাকে দেখানোর আগেই পরীক্ষা করে ফেলেছেন। তবে টিউমার হলেও মাথা রিম রিম করতে পারে। বেশিরভাগ সময়ই মানসিক চাপের কারনে মাথা রিম রিম করে। তার জন্য আমি ওষুধ লিখে দিয়েছি। ভাল হয়ে যাবেন।

রশিদ মিয়া যা বিদেশ থেকে উপার্জন করেছিলেন তার সবই প্রায় শেষ। বাড়িতে একটা হাফ বিল্ডিং করেছেন। ঘরের মেঝেতে টাইলস লাগিয়েছেন। বউ গ্যাসের সিলিন্ডারের চুলায় রান্না করেন। পাকা এটাচড বাথরুম। সাবমারসিবল টিউবওয়েলের সাথে ইলেকট্রিক মোটর লাগিয়ে স্ট্যান্ডের উপর রাখা ট্যাংকিতে পানি উঠান।

সেই পানি তার সব ঘরের রুমে সাপ্লাই হয়। এদিক থেকে বাড়ির সবাই মোটামুটি সুখেই আছেন। রশিদ মিয়ার বাবার এখনো সংসারের কাজ করার শক্তি সামর্থ্য আছে। কিন্তু তিনি কোন কাজ করেন না। কারণ, পাড়ার লোকজন বলাবলি করে "রশিদ মিয়া দুবাই থেকে অনেক টাকা পাঠায় তার বাবার এই বয়সে কাজ করার দরকার কী?"

তাই বেশিরভাগ সময় তিনি আবুল মিয়ার চায়ের স্টলে বসে চা পান করেন। সাথে জর্দা দিয়ে পান খান। আশপাশে যারা বসেন তাদেরকেও খাওয়ান। তারা পান সিগারেট খেয়ে খুব প্রশংসা করেন। তাতে কায়মুদ্দিনের উৎসাহ আরো বেড়ে যায়।

চায়ের সাথে টাও খাওয়ান।

রশিদ মিয়ার মেয়েরা স্কুল কলেজে ভর্তি থাকে ঠিকই কিন্তু ক্লাসে যায় না। অধিক টাকা খরচ করে কোচিং সেন্টারে পড়ে। তারপরও কয়েকলাখ টাকা ব্যাংকে জমা ছিল। সেই টাকা বড় মেয়ে রোমেছার বিয়ের সময় খরচ করেছেন।

ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছেন। মেয়ে জামাইকে ইটালি পাঠানোর জন্য কয়েক লাখ টাকা দিয়েছেন ম্যানপাওয়ারের এজেন্টকে। এখন হাত প্রায় শূন্য।

দুইমাস পরই মেয়ে জামাই রোস্তম ইটালি চলে যাবে। বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ইটালিতে চাকরি নিয়ে যাওয়া যায় না। তাকে প্রথমে বৈধ পথে দক্ষিণ আফ্রিকা পাঠানো হবে। সেখান থেকে চোরাই নৌপথে সাগর পাড়ি দিয়ে ইটালি যেতে হবে। এইপথে অনেক ঝুঁকি।

গত কয়েক বছরে শত শত যাত্রীর সলিল সমাধি হয়েছে সাগরে। তারপরও তাকে ইটালি যেতে হবে। কারণ, কোন রকমে সে বিএ পাস করেছে। এই দেশে এই পাস দিয়ে কী করা যাবে? না পারবে কোন ভাল চাকরি করতে, না পারবে কোন পরিশ্রমের কাজ করতে।

ইটালি একবার কোনমতে পৌঁছতে পারলে টাকা আর টাকা। রোস্তমের মা-বাবার বাড়িটা পাকা করতে হবে। কয়েকবছর ওখানে থেকে ওদেশের নাগরিকত্ব পেয়ে রোমেছাকেও নিয়ে যাবে ইটালি। তাই আগামী পাঁচ ছয় বছর হয়ত রুমেছার সাথে রোস্তমের দেখা হবে না। যাবার আগের সময়টা নিরিবিলিতে রুমেছার সাথে সময় কাটাতে চায় রোস্তম। তাই, আপাতত রোস্তম শ্বশুরালয়েই কাটাচ্ছে।

রোমেছার আশংকা হয় ইটালি গিয়ে রোস্তম আরেকটি বিয়ে করে কিনা। রোমেছা রোস্তমকে জিজ্ঞেস করে-

: ইটালি গিয়ে আমাকে ভুলে গিয়ে আরেকটা বিয়ে করবে না তো?

: দূর পাগল। আমি তোমাকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারি না। আমি তো শুধু তোমারই পাগল।

: পাগলে কি না করে, ছাগলে কি না খায়?

: আমি তোমার জন্য একটা দামি মোবাইল সেট পাঠাবো। আমরা মেসেঞ্জারে ভিডিও কল করে কথা বলব।

: বলা যাবে। দেখা যাবে। কিন্তু ছোয়া যাবে না তো। আচ্ছা, না গেলে হয় না?

: যেতে হবেই। টাকা তো সব দেয়া হয়ে গেছে। টাকাটা মাইর যাবে।

: মাইর যাক। তাও তুমি যাবে না।

 

এইভাবে সারাক্ষণ তারা আগামী দিনের বিরহের দিনগুলির কথা ভেবে নানা কথা বলে। বেশি সময়ই তারা কান্নার ভেতেই কাটায়।

রোমেছার দাদী পিড়িতে বসে মজা করে জর্দা দিয়ে পান বানিয়ে খান। নাতজামাইকেও পান সাধেন। রোস্তম বলে

: দাদী, আমি পান খাই না। আপনি যখন বলছেন, তাইলে একটা দেন। জর্দা ও চুন দিয়েন না। জর্দা খেলে আমার নাইক লাগে। চুন খেলে দাঁত মুখ লাল হয়ে যাবে। তাতে খারাপ দেখা যাবে।

: মুখ লাল না হলে কি পান খাওয়ার সৌন্দর্য লাগে? তোমার দাদা শ্বশুর তো কোন সময় আমাকে বলে না যে আমার মুখ খারাপ দেখা যায়।

: কোন স্বামী কি বলতে পারবে তার স্ত্রীকে তোমার মুখ খারাপ দেখা যায়? দাদাও তো পান খান, তাই বলেন না।

: জর্দা খেলে মুখের ক্যান্সার হয়।

: এটা একটা কথার কথা। আমরা সারাজীবন জর্দা খেলাম। কই ক্যান্সার তো হল না?

: আল্লাহ্‌ না করুন। হতেও তো পারে।

 

খোপে শুয়ে শুয়ে কায়মুদ্দিন মিয়া খুল্লুর কুল্লুর কাশছেন। রোস্তম মুচকি হাসে। রোমেছার দাদী ছড়া কাটে

: খুল্লুর খুল্লুর কাশে, নাতীন জামাই হাসে।

: দাদী, আমি আমি দাদার কাশির স্টাইল শুনে হাসি।

: অইছে, তোমার হাসতে অইব না। বুড়াকালে তুমিও ওইভাবে কাশবা। যাও তুমি আমার নাতনীর কাছে যাও। কয়েকদিন পর তো বিদেশ চইলা যাইতাছ। নাতনীটা আমার একা অইয়া যাইব।

কায়েমুদ্দিনের কাশি বেড়েই চলেছে। দানেশ কবিরাজের কাছ থেকে কয়েক ফাইল কাশির সিরাপ খাওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না।

তারা মিয়ার ফার্মেসি থেকে কয়েকটা দামি ক্যাপসুল ও দুই ফাইল সিরাপ খাওয়া শেষ। কিছুই হচ্ছে না। গতকাল থেকে কাশির সাথে বেশ রক্ত যাচ্ছে। কায়মুদিনের স্ত্রীর ধারণা যক্ষা হয়েছে। তার শ্বশুরও ফুসফুসের যক্ষ্মা হয়ে মারা গেছে। রোমেছার মা শাশুড়িকে বলেন

: আম্মা, আব্বাকে এখন উপজেলায় নিয়ে পাস করা ডাক্তার দেখানো দরকার।

: দেখান তো দরকারই। কিন্তু নিয়ে যাবে কে?

: ভ্যানে করে শুয়াইয়া নিয়ে যাবে।

: সাথে কে যাবে? আমাদের তো বেটা মানুষ কেউ নাই।

: রোস্তমকে সাথে নেয়া যায় না?

: যায়, নতুন জামাইকে ঝামেলায় ফেলবো? কয়েকদিন পরই সে বিদেশ চইলা যাইব।

: বিপদে একটু কষ্ট করলে অসুবিধা কি?

রোস্তম দাদীকে বলল

: দাদী, দাদাকে উপজেলায় নিয়ে এমবিবিএস ডাক্তার দেখানো দরকার।

: দেখানো তো দরকার। কিন্তু কে নিয়ে যাবে?

: আমিই নিয়ে যাব।

: তুমি দুইদিন পর বিদেশ চলে যাবে। এই সময় রুগী নিয়ে দৌড়াদৌড়ি পারবে?

: অসুবিধা নাই। চলেন আজই নিয়ে যাই।

একটা ভ্যান ভাড়া করে তার উপর একটা কাথা ও বালিশ বিছায়ে কায়মুদ্দিন মিয়াকে উপজেলায় নিয়ে এমবিবিএস ডাক্তার দেখানো হল। ডাক্তার সাব রুগী দেখে কয়েকটা ঔষধ ও কিছু পরীক্ষা করাতে উপদেশ দিলেন। কায়মুদ্দিনের স্ত্রী ডাক্তার সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলেন-

: ডাক্তার সাব, রুগীর রোগ হয়েছে?

: ফুসফুসে টিউবারকুলসিস বা যক্ষ্মা হয়েছে বলে সন্দেহ করছি।

: আমারও তাই সন্দেহ। আপনার সন্দেহ, আমার সন্দেহ মিলে গেছে। তয়, আপনি একজন এমবিবিবিএস ডাক্তার। আপনিও বলেন সন্দেহ। তাইলে, সন্দেহ দূর করব কিভাবে?

: সন্দেহ দূর করার জন্য কয়েকটা পরীক্ষা দিয়েছি। পরীক্ষাগুলি হল বুকের এক্স-রে, কফ ও রক্ত পরীক্ষা। আমার এসিস্টেন্ট আপনাদেরকে বুঝিয়ে দিবেন। পরীক্ষার রিপোর্টগুলি দেখায়ে ফাইনাল প্রেস্ক্রিপশন নিবেন।

 

ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে বুকের এক্স-রে, রক্তের ইএসআর, এমটি পরীক্ষা করাতে দিয়ে গেলেন। আরেকটা পরীক্ষা দিয়েছে কফের এএফবি। এর জন্য পরপর তিন দিনের সকালের প্রথম কফ জমা দিতে হবে। রোস্তম পরপর তিন দিন স্পুটাম অর্থাৎ কফ নিয়ে উপজেলায় যায়। তিন দিন পর সব পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে রোস্তম ডাক্তার সাহেবকে দেখালেন। ডাক্তার বললেন

: রোগী তোমার কি হয়?

: আমার দাদা শ্বশুর।

: ওনার ছেলে কই?

: আমার শ্বশুর একাই। তিনি দুবাই চাকরি করেন।

: রোগীর এক্স-রে রিপোর্টে লিখেছে ফুসফুসে ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা আছে। রক্তের ইএস আর বেশি। এটা যক্ষ্মা ও ক্যান্সার দুটাতেই বাড়ে। কফে যক্ষ্মা বা টিভির জীবানু পাওয়া যায়নি। কাজেই ক্যান্সার হবার সম্ভাবনাই বেশি।

: এখন কী করতে হবে?

: আমি ময়মনসিংহ জেলা শহরে একজন বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার্ড করছি। তিনি সিদ্ধান্ত দিবেন রোগীর ক্যান্সার হয়েছে কিনা।

: ক্যান্সারের কি কোন চিকিৎসা আছে আমাদের দেশে?

: চিকিৎসা অবশ্যই আছে। আগেই ক্যান্সার নিয়ে ভাববেন না। নাও তো হতে পারে? এক্স-রে হল এক প্রকার রোগের ছবি। সব সময় এটা দিয়ে সঠিক মন্তব্য করা যায় না।

: আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা করালে ধরা পরবে না?

: বুকের জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাম খুব একটা কার্যকর পরীক্ষা না।

: ঠিক আছে। আমরা ময়মনসিংহ যাব। আপনি লিখে দিন। আজ আপনার ফি কত দেব?

: আমি রিপোর্ট দেখতে টাকা নেই না। কেউ কেউ নেন।

: আপনি খুব ভাল মানুষ।

 

বাড়িতে এসে রোস্তম শাশুড়ি ও দাদীর কাছে বিস্তারিত বলল। পরের দিন সিএনজি অটোরিক্সা ভাড়া করে ময়মনসিংহ শহরের নাম করা বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. কে সি ভট্টাচার্যকে দেখালেন।

রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে, শরীর ভালভাবে পরীক্ষা করে এবং উপজেলার রিপোর্টগুলি দেখে এই ডাক্তারও সন্দেহ করলেন ক্যান্সার হয়েছে। ডাক্তার বাবু বললেন

: আমারও সন্দেহ হচ্ছে ক্যান্সার হয়েছে। একটা পরীক্ষা করতে দিলাম। পরীক্ষাটা প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ ডা. সাকীব সাহেবকে দিয়ে করাবেন।

রোস্তম বলল

: আমরা অন্য প্যাথলজিস্ট দিয়ে যদি করাই?

: কেন অন্য প্যাথলজিস্ট দিয়ে করাবে?

: মানে, যদি অন্য প্যাথলজিস্ট একটু কম খরচে করে দেন।

: সব প্যাথলজিস্ট সমান পারদর্শী না। ইনি আমার কাছে বেশী পারদর্শী বলে মনে হয় তাই পাঠালাম।

: ঠিক আছে। আমরা তা হলে পরীক্ষা করিয়ে নিয়ে আসি। ওটা কি কফ পরীক্ষা?

: কফ পরীক্ষা।

: কফ পরীক্ষা তো আগেই করেছি পরপর তিন দিন।

: আগে করেছেন টিবি বা যক্ষ্মার জীবাণু আছে কিনা দেখার জন্য। এবার করবেন ক্যান্সার সেল বা কোষ আছে কিনা দেখার জন্য। এটাও পরপর তিন দিন করতে হবে।

 

রোস্তমরা তিন রাত হোটেলে থেকে পরপর তিন দিন কফ পরীক্ষা করায়ে ডাক্তার বাবুকে রিপোর্ট দেখাতে নিয়ে গেল। টাকা ফুরিয়ে গিয়েছিল। মোবাইল ব্যাংকিং করে টাকা আনিয়েছে। রোমেছাই পাঠিয়েছে গ্রাম থেকে।

রোস্তম ডাক্তার বাবুর কাছে জানতে চাইল

: স্যার, ক্যান্সার পাওয়া গেছে?

: না, ক্যান্সার সেল পাওয়া যায়নি।

: আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ্‌ বাঁচাইছে। অযথা কতগুলি টাকা নষ্ট করলাম। সময়ও গেল। টাকাও গেল।

: এটাই শেষ না। সাধারণত ক্যান্সার ব্রংকাসে হয়। মনে কর, ক্যান্সার হয়েছে। কিন্তু ক্যান্সার সেল খসে খসে কফের সাথে মিশে নাই। এই ক্ষেত্রে ক্যান্সার কোস কফ পরীক্ষায় ধরা পরবে না।

: ব্রনকাস আবার কি?

: ব্রনকাস হল শ্বাসনালীর শাখা, যা ফুসফুসে প্রবেশ করেছে।

: তাহলে এখন কী করার আছে?

: আরেকটি পরীক্ষা করে নিয়ে আসো।

: আবার কয়দিন থাকতে হবে?

: না, আজই রিপোর্ট পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

: পরীক্ষাটার নাম কী?

: এফএনএসি। ফুল নেইম হল ফাইন নিডল এসপাইরেশন সাইটোলজি।

: এটা কী রকম পরীক্ষা?

: একটা অতি সরু লম্বা সুঁই দিয়ে লাংসের রোগাক্রান্ত স্থান থেকে সুঁই পরিমান রস এনে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখে প্যাথলজিস্ট রিপোর্ট দিবেন। রসের সাথে ক্যান্সার কোষ বা অন্য কোন রোগ থাকলে তার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কোষ চলে আসবে।

: এটাই কি শেষ পরীক্ষা?

: বেশিরভাগ সময়ই ক্যান্সার থাকলে এই পরীক্ষায় ধরা পরে। তবে ক্যান্সারের শ্রেণি বিন্যাস করার জন্য আরো জটিল পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। আগে এফ এন এসি পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে নেই, তারপর বিস্তারিত বলব।

 

রোস্তম রুগী নিয়ে ডা. সাকীব সাহেবের ল্যাবরেটরিতে গেল। ডা. সাকীব সিটি গাইডেড এফ এন এসি করলেন। সিটি স্ক্যান মেশিন দিয়ে দেখে সুঁই দিয়ে রোগের নমুনা নিয়ে তিন ঘন্টা পর রিপোর্ট দেয়া হল। সুঁই ঢুকানোর কথা শুনে কায়মুদ্দিন মিয়া প্রথমে ভয়ে থরথরি কাঁপছিলেন। যখন ডাক্তার সাব বললেন যে মাত্র পিঁপড়ার কামড়ের সমান ব্যাথা লাগবে তখন থেকে আর ভয় পাননি।

 

রিপোর্ট হাতে পেয়ে রোস্তম দাদা দাদীকে নিয়ে ডা. সাকীব সাহেবের চেম্বারে প্রবেশ করল।

: স্যার, এই পরীক্ষাটা আপনি নিজে করেছেন?

: জ্বী, করেছি।

: কেমন দেখলেন?

: রিপোর্ট একটু খারাপই।

: কেমন খারাপ?

: আমার রিপোর্ট নিয়ে ডা. ভট্টাচার্য বাবুকে দেখান। তিনি আপনাকে পরামর্শ দেবেন।

: আপনি তো দেখেছেন। আপনি আমাদেরকে বলুন যে ক্যান্সার হয়েছে কি না।

: আমি লিখে দিয়েছি যে পজিটিভ ফর ম্যালিগন্যান্ট সেল।

: তাতে কি ক্যান্সার বুঝায়?

: জ্বী। ওনার লাংসে স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা নামে এক প্রকার ক্যান্সার হয়েছে।

: শিউর?

: আমি নাইন্টি নাইন পারসেন্ট কনফিডেন্টলি বলছি।

: এই রোগ কি কারণে হইল?

: এই রোগ সাধারণত যারা ধুমপান করে তাদের হয় ।

কায়মুদ্দিন মিয়া বললেন

: আমি ধুমপান করি না।

: দাদা, আমি তো আপনাকে দেখি সিগারেট খান আর কাশেন।

: তা আপনি কত দিন হয় সিগারেট খান?

: এই তো অল্প কয়েক বছর। তার আগে বিড়ি খেতাম। তারও আগে হুক্কা খেতাম। আমি বুঝমান হইছি থেকেই হুক্কা খেতাম বাবার সাথে।

: এটাকেই বলা হয় ধুমপান করা। ক্যান্সারের কারন হল আসলে তামাক। এই তামাক মানুষ নানাভাবে গ্রহণ করে। কেউ কেউ পানের সাথে শুকনা তামাক চিবিয়ে খান। যাকে বলা হয় সাদা পাতা বা তলক পাতা। এই তামাক দিয়ে তৈরি হয় বিড়ি, সিগারেট ও জর্দা। এসব থেকে হতে পারে ক্যান্সার। তবে ধুমপান করলে হয় ফুসফুসের ক্যান্সার আর জর্দা পাতা খেলে হয় মুখ ও গলার ক্যান্সার।

দাদী বলেন

: আমি যে সারাজীবন জর্দা খাইলাম। আমার তো ক্যান্সার হল না। আমাদের পাড়ার প্রায় সবাই খায়। তাদেরও তো ক্যান্সার হল না? খালি আমার বাম গাইলচায় একটু খরখরা হইছে। একটু ব্যাথা করে। সহ্য করার মত। ডাক্তার দেখাব। রোমেছার দাদা ভাল হয়ে নিক।

: দেখি আপনার কোথায় সমস্যা? একি! আপনার এটা তাড়াতাড়ি পরীক্ষা করাতে হবে। লক্ষণ ভাল মনে হচ্ছে না। জায়গাটা ফুলকপির মত ফুটে আছে। শরীরের কোথাও ফুলকপির মত ঘা ফুটে উঠলে তাকে স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা নামে এক প্রকার ক্যান্সার সন্দেহ করতে হবে।

: আমি তো গাইলচায় সবসময় জর্দা দিয়াই রাখি। পোলা আমার বিদেশ থাকে। আমি দামি দামি জর্দা খাই।

: দামি সস্তা সব ধরনের জর্দাই হল তামাক। তামাক আছে যেখানে ক্যান্সার আছে সেখানে। আপনার উচিৎ হবে আজই এফ এন এ সি পরীক্ষাটা করে ফেলা।

: আরেকদিন এসে করব নি।

রোস্তম বলে

: দাদী, আজই করে ফেলি। এক সাথে দুই কাজ হয়ে যাবে। স্যার, আপনি পরীক্ষা করেন।

 

এক ঘন্টা পর রেজাল্ট পাওয়া গেল। যে কথা বলেছিলেনে সেই কথাই। ক্যান্সারই হয়েছে।

রোস্তম বলে

: স্যার, আমাদের এখন উপায় কী?

: যা হবার তা হয়ে গেছে। এখন চিকিৎসা করতে হবে দ্রুত। ডা. ভট্টাচার্য বাবুকে রিপোর্ট দেখালে তিনি হয়ত একজন ক্যান্সার রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাবেন। তিনিই আপনাদের জন্য কোন চিকিৎসা পদ্ধতিটি প্রযোজ্য তা নির্ধারণ করে দিবেন।

: স্যার, এই রোগটা কি ছোঁয়াচে? দাদা-দাদী-দুইজনেরই যে একসাথে হল?

: না ছোয়াচে না। দীর্ঘদিন ধুমপান করলে ফুসফুসের নালীর কোলাম্নার নরম মোলায়েম কোষগুলি পরিবর্তন হয়ে শক্ত স্কোয়ামাস সেলে রূপান্তরিত হয়। তামাকের ধুয়ার সাথে সে কণা প্রবেশ করে সেগুলি এই রূপান্তরিত কোষগুলিকে আরো রূপান্তরিত করে ক্যান্সার সেল তৈরি করে। অনুরূপভাবে জর্দাও মুখের আবরনে ক্যান্সার তৈরি করে।

: এই রোগের চিকিৎসা কী?

: ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা করেন সাধারণত অনকোলজিস্ট। আপনাদেরকে অনকোলজিস্টের কাছে পাঠানো হবে। তিনি সিদ্ধান্ত নিবেন কোন পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতে হবে। কোন কোন সময় সার্জারি করে ক্যান্সার অংশ ফেলে দেয়া হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে রেডিয়েশন দিয়ে ক্যান্সার কোষ মারা হয়। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি বা ঔষধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।

: কেমন খরচ পরবে চিকিৎসায়?

: চিকিৎসা খরচ কম বেশী হতে পারে।

: কম বেশী হয় কিভাবে?

: রোগীর সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়া হয়। ঔষধ দামিও আছে আবার কম দামীও আছে। আপনাদের আর্থিক অবস্থা ডাক্তারের কাছে খুলে বলবেন। তিনিই এটা ভাল বুঝবেন।

: আয়ুর্বেদী, ইউনানি বা হোমিওপ্যাথিতে চিকিৎসা খরচ কম। ঔষধে রিএকশনও কম করে। অনেকে গ্যারান্টি সহকারে চিকিৎসা করে থাকে। আমরা যদি তাদের কাছে যাই।

: দেখুন, আমি এলোপ্যাথি পদ্ধতির বিদ্যা অর্জন করেছি। অন্য পদ্ধতি সম্বন্ধে আমি বিদ্যা অর্জন করিনি। আমি এলোপ্যাথির কথাই আপনাদের বলব। এই পদ্ধতি সর্বাধুনিক, বেশী বিজ্ঞান সম্মত ও নির্ভরযোগ্য। বেশী ভাল পদ্ধতি হাতের নাগালে থাকলে কম ভাল পদ্ধতি নিবে কেন?

: স্যার, আজ আমাদের হাতের টাকা পয়সা শেষ হয়ে গেছে। বাড়িতে গিয়ে প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে।

: ঠিক আছে, তাই করো। যাই করবে তাড়াতাড়ি করবে। ক্যান্সার কিন্তু দ্রুত ছড়িয়ে পরে। ছড়িয়ে পরলে করার কিছু থাকবে না।

: তাহলে, আমরা আসি। ধন্যবাদ আপনাকে। অনেক বিরক্ত করলাম।

: ওকে।

 

রোস্তম দাদাকে বলেন

: আপনারা এখন কি খাবেন? চলেন হোটেলে যাই।

: হোটেলের খাবার ভালো লাগে না। একটা পাউরুটি, সাথে কলা আনো। রাস্তায় খাব নি।

 

পাড়ার দুই বখাটে ছেলে আছে। একজন খল্কু কাদের। আরেকজন মুরগী কাদের। খুল্লুর খুল্লুর কাশে বলে তার নাম হয়েছে খল্কু কাদের। মুরগী চুরি করে ধরা পরেছিল বলে তার নাম হয়েছে মুরগী কাদের। ওরা রাস্তার ধারে জয়না গাছ তলায় ঘোড়া কাঠে শার্টের বোতাম খুলে বসে থাকে আর মোবাইল টিপে। ফেন্সিডিল খায়। মেয়েরা স্কুলে যাওয়ার সময় উত্যক্ত করে। এর জন্য কয়েকবার মাইরও খেয়েছে।

তারা রোমেছাকেও উত্যক্ত করতো এটা রোস্তম জানে। তাই, সে এ নিয়ে একটু চিন্তিত। ওরাও অপেক্ষা করছে কবে রোস্তম বিদেশ চলে যায়। রোস্তম নিজ বাড়িতে গেল। তার মা তাকে তিরষ্কার করল এই বলে যে কয়দিন পর দেশ ছেড়ে চলে যাবে। মায়ের কাছে না থেকে শ্বশুরবাড়ি পরে আছে। তাই সে নিজ বাড়িতেই মায়ের কাছে থাকলো।

কায়েমুদ্দিন ও তার স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যাপারে কেউ আর চেষ্টা করল না। একদিন রোমেছার বমি বমি ভাব হল এবং বেশ দুর্বল হয়ে পরল। রোস্তমকে খবর দেয়া হল। মায়ের সন্দেহ হল সন্তান পেটে এসেছে। প্রশ্রাব পরীক্ষা করে কনফার্ম হল রোমেছা সন্তান সম্ভবা।

কয়েকদিন পর রোস্তম দক্ষিণ আফ্রিকা চলে গেল। সেদিন আকাশ কাল মেঘে ছেয়ে গিয়েছিল। বৈশাখের শেষের দিক। সকালেই মনে হল যেন সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

চলার সময় রোস্তম দেখল জয়না গাছ তলায় খল্কু কাদের আর মুরগী কাদের মোবাইল টিপছে। রোস্তমের বুকে ক্যাচ ক্যাচ করছিল।

আকাশে কালো মেঘ ও সাদা মেঘ তীব্র গতিতে উড়ছিল। মাঝে মাঝে বজ্রপাত। এখনি যেন আকাশ ভেঙে মাথায় পড়বে।

লম্বা লম্বা ইউকিলেপ্টাছ গাছগুলি যেন হেলে দুলে দুলছিল। আধা পাকা ধান খেতে বাতাসের ঢেউ বয়ে যাচ্ছিল। মুষলধারে বৃষ্টি হল প্রায় এক ঘন্টা।

বৃষ্টির পানি কলকলিয়ে নামছিল। কয়েকজন কিশোর মাথায় পলিথিনের ব্যাগ পরে ভিজে ভিজে ছিপ জাল দিয়ে ছোট মাছ ধরছিল। রোস্তমের অন্তরে এক ধরণের বেদনা অনুভূত হল।

 

দক্ষিণ আফ্রিকায় রোস্তমের নয় মাস কেটে গেল। দেশে টাকা পাঠাতে পারল না। রশিদ মিয়াও মালিকের কাছ থেকে কিছু অগ্রিম নিয়েছিল মেয়ে জামাইকে বিদেশ পাঠানোর জন্য। তাই গত নয় মাসে তিনিও টাকা পাঠাতে পারলেন না। রশিদ মিয়ার মা-বাবা বিনা চিকিৎসায় অতি কষ্টের মধ্যে কাটাতে লাগলেন।

কায়েমুদ্দিনের স্ত্রীর গালের ক্যান্সার বেড়ে গিয়ে গাল, জিহ্বা, চোয়াল ও গলার কিছু অংশ খসে পড়েছে।

কায়েমুদ্দিন বুকের ক্যান্সার ব্রেইনে ছড়িয়ে পরে প্যারালাইজড হয়ে ঘরে পড়ে আছেন। যে কোন সময় তাদের মৃত্যু হতে পারে।

রোমেছা সন্তান পেটে ধারণ করেছে। সন্তান ভুমিষ্ঠ হওয়ার সময় হয়েছে। সব শুনেও রশিদ মিয়া দেশে ফিরতে পারছেন না।

 

এক মঙ্গলবার সকালে কায়েমুদ্দিন মিয়া ইন্তেকাল করলেন। বিকালে গ্রামের লোকজন দাফন করে দিল। আর রাতেই মারা গেলেন কায়েমুদ্দিনের স্ত্রী। তাকেও পরদিন সকালে গ্রামের লোক দাফন করে দিল।

রোমেছার সন্তান প্রসবের ব্যাথা শুরু হয়েছে। টেলিভিশনে খবর স্ক্রল হচ্ছে আফ্রিকা থেকে নৌকা যোগে চোরাই পথে কিছু লোক ইটালি যাওয়ার সময় নৌকা ডুবিতে মারা গেছে। তার মধ্যে বাংলাদেশের সখিপুর উপজেলার রোস্তম আলীর পরিচয় পাওয়া গেছে। এই খবর বাড়ির আঙিনা কে যেন বলছিল।

শুনে ঘর থেকে রোমেছার একটা চিৎকার শোনা গিয়ে থেমে গেল। কিছুক্ষণ পর শোনা গেল নবজাতকের কান্না। রশিদ মিয়া স্ত্রী বারান্দায় বের হয়ে জানালো "রোমেছার ছেলে হয়েছে। আযান দেও। "

পাশ দিয়ে মসজিদের ইমাম যাচ্ছিলেন। তিনি আযান দিলেন "আল্লাহু আকবর.....। "

একই দিন তিনজন সদস্য ইহজগৎ ছেড়ে চলে গেলেন। আগমন করল এক নতুন মেহমান। বারান্দায় খামের সাথে ঝুলানো দেখা গেল কায়েমুদ্দিনের স্মৃতি বিজরিত ধুমপানের হুক্কাটি।

ঘরের কোণায় দেখা গেল কায়েমুদ্দিনের স্ত্রীর পানের বাটা ও জর্দার কৌটাটি।