ইমরান হোসেন

ইমরান হোসেন

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ 


০৫ মে, ২০১৮ ১২:১৯ পিএম

রোগীর রোগ যারা সারাবেন তাদের রোগটা সারানো সময়ের দাবি

রোগীর রোগ যারা সারাবেন তাদের রোগটা সারানো সময়ের দাবি

মৃত্যু কত সহজ হয়ে গেছে। পরীক্ষা যাচ্ছে, রেজাল্ট বের হচ্ছে আর ঝরে পড়ছে একটি করে তাজা প্রাণ। প্রশ্ন হচ্ছে কেন? দুঃখজনক হলেও সত্য। এই কেন’র উত্তর এক অজানা কারণে আমরা পাচ্ছি না। পরীক্ষা খারাপ কিংবা ভাল হতেই পারে। ফলাফলও ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক হতে পারে কিন্তু মৃত্যু কেন? মৃত্যুই কি নেতিবাচকতার সমাধান?

হতে পারে পরীক্ষাটা ভাল হয়নি। পরীক্ষা ভালই হয়েছে কিন্তু শিক্ষকের মূল্যায়ন যথাযথ হয়নি। হয়তোবা পড়ার পরও প্রয়োগ ঠিকমতো হয়নি। কিন্তু তাই বলে মৃত্যু? মনে রাখা উচিৎ, চিকিৎসা বিজ্ঞানের একজন ছাত্রের মৃত্যু মানে একজন ভবিষ্যৎ চিকিৎসকের মৃত্যু। একজন চিকিৎসকের মৃত্যু মানে ওই চিকিৎসক পরিবারের মৃত্যু।

আজ যখন আপনি মৃত্যুর কথা ভাবছেন, তখন আপনার পরিবার কিংবা ছয় মাস পরবর্তী অবস্থার কথা ভাবুন। আজ আপনি ছাত্র কিন্তু ছয় মাস পরের সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার পরে আপনি ডাক্তার।  ধরে নিলাম ছয় মাস পরেও আপনার ফলাফল নেতিবাচক, তার ছয় মাস পরে কিন্তু আপনি ডাক্তার! আজ আপনার যে বন্ধু ডাক্তার, হতে পারে ঠিক পাঁচ বছর পরে আপনার আর আপনার বন্ধুর মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান।

আমরা যারা চিকিৎসা বিজ্ঞানে আছি, সবারই কিন্তু ভবিষ্যৎ ইচ্ছে ডাক্তারি প্র্যাকটিস করা। এমনো হতে পারে আপনার পাশ করা বন্ধুটি চেম্বারে মশা মাছি মারবে, আর আপনার চেম্বারের বাইরে সিরিয়াল নিয়ে রোগীরা মারামারি করবে।

হতাশা আসতেই পারে, তাই বলে এমন এক অমিত সম্ভবনার মৃত্যু ঘটাবেন! আশা রাখুন সুন্দর আগামীর জন্য। যে দিনটি হবে শুধু এবং শুধুই আপনার!

চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষকদের একটি খুব বাজে অভ্যাস আছে, কোনো ছাত্র একটি বিষয় না জানলেই সেটি বেসিক। আর সেই বেসিকের ওপর নির্ভর করেই ওই ছাত্রের পাশ ফেইল নির্ধারণ! এক্ষেত্রে একজন মেডিকেল ছাত্র পুরোপুরি অসহায়। আর আমার মতো যারা নিজ ব্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে তাদেরতো মরার উপর খাড়ার ঘা। যেন ডিফল্ডার কেউ পড়াশোনাই করে না। ব্যাপারটা এমন যেন পড়াশোনা না করেই এরা মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।

শিক্ষকেরা ভুলে যান, সাময়িক অকৃতকার্য এসব ছাত্র জীবনে কোনোদিন অকৃতকার্য হয়নি। এদের প্রত্যেকের রয়েছে সোনালী ছাত্রজীবন। কিন্তু কেন, কোন কারণে এরা আজ পারছে না, একবারো না ভেবে ফেলের সনদপত্র হাতে ধরিয়ে দেন।

সমস্যাটা আসলে মানসিক। অনেকটা সিস্টেমও দায়ী। দীর্ঘমেয়াদী পড়াশোনা আর দীর্ঘতম পরীক্ষার শিডিউল অনেক ছাত্রকেই তার ট্র্যাক থেকে বিচ্যুত করে ফেলে। অনেক সময় নিজের অজান্তে।  তা না হলে, ১০ বার কিংবা ৩ বার পরীক্ষা দিয়েও এমন মেধাবী একজন ছাত্রের অকৃতকার্যতা! ঐ ছাত্রের সাথে সাথে কম করে হলেও শিক্ষক দায়ী।

আসলে চিকিৎসা বিজ্ঞান শুধু পুস্তক নির্ভর বিজ্ঞান নয়। এমন অনেক ছাত্রই আছে যারা পুস্তক পাঠ করে মহাজ্ঞানী কিন্তু রোগী ধরলে তথৈবচ। এর মানে এ নয়, পুস্তক মুখস্থ করাটা অপরাধ।

আমাদের এনাটমির শিক্ষক ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় পরলোকগত ডা. মনসুর খলিল স্যার। এনাটমির এমন শিক্ষক বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। তাঁর একটি কথা কানে আজো বাজে, ‘বাবারা তোমরা যদি বলতে পারো লিভারটা পেটের ডান পাশে তবেই পাশ।’

কারণ কি জানেন, তুলনামূলম এনাটমি পড়া এ মহান মানুষটি জানতেন, লিভারের এমব্রায়োলজি জানার আগে লিভারের অবস্থান জানাটা জরুরি। আজ যে বিজয় পরলোকগত হলো, বেঁচে থাকলে এমন হতে পারতো গাইনিতে অকৃতকার্য সেই বিজয় দেশ কাঁপানো গাইনিকোলোজিস্ট। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র ও শিক্ষক, এই দুই সম্প্রদায়ের কাছেই অনুরোধ, আসুন আর একটি প্রাণও অকালে অকারণে ঝরতে না দেই।

মনে রাখবেন সোনার এ দেশেই এইচএসসি পাশ করা কেউ খোদ রাজধানীর বুকে স্পেশালিস্ট সাইনবোর্ড লাগিয়ে চিকিৎসা করতেন, এমনো হতে পারে কেউ কেউ করেন।

রোগীর রোগ যারা সারাবেন তাদের রোগটা সবার আগে সারানো সময়ের দাবী।

আরও পড়ুন-

►আত্মহত্যা প্রসঙ্গ

►একজন বিজয় সাহার মৃত্যু এবং কিছুকথা

►ফাইনাল প্রফে ফেল করায় মেডিকেল শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না