ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১ ঘন্টা আগে
০৩ মে, ২০১৮ ১২:২৮

মেডিসিন ক্লাব এবং থ্যালাসেমিয়া

মেডিসিন ক্লাব এবং থ্যালাসেমিয়া

অসময়ে ফোন বেজে উঠলো আসিফের।
- হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।
- ওয়ালাইকুম আসসালাম, আমি আশরাফের মা, ওই যে তোমাদের থেকে রক্ত নেই, বাচ্চাটারতো রক্ত লাগবো বাবা।
- ও আচ্ছা! আচ্ছা ঠিক আছে আগামী কাল আসেন, আমি ব্যবস্থা করে রাখবো।

এরকম ফোন মেডিকেল ছাত্র আসিফের নিত্য সংগী, পড়ালেখার পাশাপাশি সে মেডিসিন ক্লাব করে।
৪ বছরের ছোট শিশু আশরাফ, থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত।  প্রায় প্রতিমাসেই সে মেডিসিন ক্লাবে আসে রক্ত সংগ্রহের জন্য।
এরকম আরো হাজার হাজার আশরাফ আর শত শত আসিফের গল্প তৈরি করে যাচ্ছে মেডিসিন ক্লাব।

মানবতার ডাকে সাড়া দেয়ার আত্মোপলব্ধি থেকে নিজেদের ব্যস্ত সময়ের এতটুকু অবসর আর্তমানবতার জন্য বিলিয়ে দেয়ার মহৎ উদ্যোগ থেকে ১৯৮১ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের কতক উদ্যমী মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীর হাত ধরে যাত্রা শুরু করে মেডিসিন ক্লাব।  Academic Cum Social Organization -‘Medicine club’, শুরুটা ছিলো হাতেগোনা মাত্র ৩২ জন সদস্য নিয়ে, ২০১৮ তে এসে মেডিসিন ক্লাব পরিণত হয়েছে হাজারো মেডিসিনিয়ানের প্রাণের সংগঠন হিসেবে।

Learn And Let Others Learn To Serve The Humanity In The Best Possible Manner- এই মূলমন্ত্রকে পুঁজি করে গড়ে উঠা সংগঠন, শুধুমাত্র একটি সংগঠন নয়, হাজারো স্বপ্নের জন্মদাত্রী, তাদের লালনক্ষেত্র এবং বাস্তবায়নের অঙ্গন।

একটি শিক্ষা ও সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে দ্রুতই জনপ্রিয় হতে থাকে মেডিসিন ক্লাব, বিস্তৃত হতে থাকে এর সেবামূলক কার্যক্রমের পরিধি।  প্রথমে শিক্ষামূলক সামাজিক সংগঠন হিসেবে শুরু করলেও লাখো পীড়িত মানবতার জন্য মেডিসিনিয়ানরা শুরু করেছিলেন ‘দু:স্হ রোগী কল্যাণ কর্মসূচী’।  এরপর আর থেমে থাকেননি মেডিসিনিয়ানরা।

মেডিসিন ক্লাব  মেডিকেল এবং ডেন্টাল স্টুডেন্ট দ্বারা পরিচালিত একটি একাডেমিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।  স্বেচ্ছায় রক্ত দান কর্মসূচী, টিকাদান কর্মসূচী, থ্যালাসেমিয়া শিশুদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনাশর্তে রক্তদান, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, শীতবস্ত্র বিতরণ কর্মসূচি, হেলথ ক্যাম্প ও বিনামূল্যে ঔষধ বিতরণ সহ বিভিন্ন সচেতনতা মূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে মেডিসিন ক্লাব স্থান করে নিয়েছে আর্ত পীড়িত মানবতার অন্তরে।

দেশে প্রায় ৬০ হাজারের বেশি শিশু থ্যালাসেমিয়া রোগে ভুগছে।  প্রতি বছর প্রায় আড়াই হাজার শিশু নতুন করে যোগ হচ্ছে, যাদের নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ ও রক্ত গ্রহণ করতে হয়।  এর স্হায়ী চিকিৎসা বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যানটেশন অত্যন্ত ব্যয়বহুল।বাংলাদেশে আক্রান্ত অধিকাংশ পরিবারের পক্ষেই এর ভার বহন করা কঠিন।  তাই থ্যালাসেমিয়া রোগীর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত রক্ত আর রোগটির প্রতিকারের জন্য দরকার জনসচেতনতা।

এই লক্ষ্যে ২০০১ সালে মেডিসিন ক্লাব সকল কার্যক্রমের পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্ব বিবেচনায় শুরু করে ‘থ্যালাসেমিয়া প্রজেক্ট’।  সারাদেশে মেডিসিন ক্লাবের প্রায় ৩০ টি মেডিকেল কলেজে অবস্হিত শাখায় থ্যালাসেমিয়া রোগীদের এই বিশেষ প্রকল্পের আওতাধীন বিবেচনা করা হয়ে থাকে।  এর মধ্যে প্রায় ১২৬০ নিবন্ধিত থ্যালাসেমিয়া রোগী রয়েছে , তাদের বিনামূল্যে বিনাশর্তে রক্ত সরবরাহ করে থাকে মেডিসিন ক্লাব।  এছাড়া চিকিৎসা সংক্রান্ত সচেতনতা ও কাউন্সেলিং , প্রতিরোধের জন্য সচেতনতামূলক বিভিন্ন পোস্টার ও লিফলেট বিতরণ করা হয়।

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের জন্য স্ক্রিনিং টেস্ট এর মাধ্যমে আক্রান্ত ও বাহক শনাক্তকরণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে মেডিসিন ক্লাব সদা তৎপর।  ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সারাদেশে বিভিন্ন ইউনিটে অন্যান্য রোগীদের পাশাপাশি শুধুমাত্র থ্যালাসেমিয়া রোগীদের প্রায় ১৬ হাজার ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করেছে মেডিসিন ক্লাব।

বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অধীনে স্বাস্হ্য অধিদপ্তর থ্যালাসেমিয়াকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রতিকারের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, মেডিসিন ক্লাব নিজস্ব কর্মসূচীর পাশাপাশি সরকারী সকল কর্মসূচীর সাথে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। 

থ্যালাসেমিয়া নির্মূলে মেডিসিন ক্লাব দুটি ভাগে কাজ করছে।  এর মধ্যে রয়েছে থ্যালাসেমিয়া বাহকের বিয়ের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের শিশুদের আক্রান্তের  হার কমানোর জন্য প্রতিরোধমূলক কর্মসূচী ও বিদ্যমান বিশাল থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের জন্য নিয়মিত রক্তদান কর্মসূচী। মেডিসিন ক্লাব থ্যালাসেমিয়া প্রজেক্ট বর্তমানে থ্যালাসেমিয়া রোগ সম্পর্কে জনগনকে সচেতন করার লক্ষ্যে গনমাধ্যমকে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা ও দেশব্যাপী প্রচারনামূলক কর্মসূচীর আয়োজন, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের প্রয়োজনীয় রক্তের নিশ্চয়তা দানে স্বেচ্ছায় রক্তদান আন্দোলনকে আরও বেগবান করার জন্যে কাজ করে যাচ্ছে।

মেডিসিন ক্লাব মনে করে থ্যালাসেমিয়া নির্মূলে কিছু সময়ের দাবি এখনই বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।যেমন -দেশে জেলা পর্যায়ে সকল সরকারী হাসপাতালে থ্যালাসেমিয়া রোগ চিহ্নিত করার জন্য স্ক্রিনিং টেস্ট চালু করা এবং জেলাওয়ারী জরিপ পরিচালনা করা, বিবাহ রেজিস্ট্রেশনে থ্যালাসীমিয়া স্ক্রিনিং টেস্ট- এর ডাক্তারী সনদপত্রের সংযুক্তি বাধ্যতামূলক করা ও পাঠ্যসূচীতে থ্যালাসেমিয়া রোগ সম্পর্কিত তথ্য যোগ করা।

আসুন রক্তদান করি, আপনার এক ব্যাগ রক্ত থ্যালাসেমিয়া শিশুর হাসি ধরে রাখতে সহায়তা করবে।  আসুন জনসচেতনতা বাড়াই, বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করি।থ্যালাসেমিয়া নির্মূলে মেডিসিন ক্লাবের প্রচেষ্টা সফল হোক।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত