ডা. সুবর্ণ গোস্বামি

ডা. সুবর্ণ গোস্বামি

কলকাতা


০১ মে, ২০১৮ ০৫:৫২ পিএম

চিকিৎসা শ্রমিকদের ঐক্য মে দিবসের আহ্বান

চিকিৎসা শ্রমিকদের ঐক্য মে দিবসের আহ্বান

সব চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীই শ্রমিক, এমনকি সরকারী চিকিৎসকও। মেডিক্যাল অফিসার, গ্রুপ 'এ' অফিসার, আরো কতশত গালভরা ডেজিগনেশন সত্ত্বেও আমরা যে আসলে শ্রমিকই, যাকে বলে 'হোয়াইট কলার' শ্রমিক - এ'কথা ভুললে চলবে না। আমরা বৌদ্ধিক ও কায়িক দু'প্রকার শ্রমই দিই।

কর্পোরেট হাসপাতালের মালিক আমাদের শ্রম আর স্কিল বেচে 'সারপ্লাস ভ্যাল্যূ' বা উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরী করে, মুনাফা বাড়ায়। সরকার-ই বা কম যায় কিসে! সরকার তার সব নাগরিককে স্বাস্থ্যপরিষেবা দিতে বাধ্য সংবিধানমতে। যদি সরকারকে এই পরেষেবা আউটসোর্স করতে হ'ত, তাহলে কত খরচ করতে হ'ত ? সেই তুলনায় সামান্যই খরচ করে সরকার। তার একটা অংশ হ'ল চিকিৎসক ও অন্যান্য কর্মীদের বেতন-ভাতা ইত্যাদি। কর্পোরেট মালিকের মতই আমাদের ন্যায্য বেতন-ভাতা ফাঁকি দিয়ে সেই টাকায় মোচ্ছব আর খয়রাতি করে নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করছে সরকার। এও তো শোষণ! আমাদের শ্রম চুরি করে ভোটব্যাঙ্ক বাড়ানো। কিনে নেওয়া ভোটব্যাঙ্ক তো একধরণের মুনাফাই!

সামন্তপ্রভূদের সময় থেকেই উৎপাদনের উপকরণের (means of production) উপর শ্রমিকের কোনো মালিকানা ছিল না। পূঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় (capitalist mode of production) তা আরো পুঞ্জীভূত কর্পোরেট মালিকের হাতে। প্রশ্ন উঠতে পারে, চিকিৎসকরা কোন উৎপাদন-সম্পর্কে যুক্ত? অবশ্যই চিকিৎসকরা সমাজের উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ের মাধ্যমে শ্রমদিবস নষ্ট হওয়া আটকায়। সুস্থ, সবল শ্রমশক্তি গড়ে তোলার পিছনে বিরাট অবদান চিকিৎসকদের। গড় আয়ু বৃদ্ধির পিছনেও চিকিৎসকদের বিরাট অবদান। সরকারও কর্পোরেট সংস্থার মতই চিকিৎসা-শ্রমিককে শোষণ করে। যে সরকার যত বেশী পূঁজির স্বার্থবাহী, সেই সরকার তত বেশী শোষণ-বঞ্চনা করে শ্রমিককে, পে কমিশন তত অধরা হয়, বকেয়া DA-র ভল্যূম তত বাড়তে থাকে।

স্পার্টাকাসের সময় থেকে বিশ্বজুড়ে শ্রমিকের লড়াই কিছু বুনিয়াদি অধিকার ছিনিয়ে এনেছে। হে মার্কেটে শ্রমিকের লড়াই আট ঘন্টা কাজ, আট ঘন্টা বিনোদন ও আট ঘন্টা বিশ্রামের অধিকার নিশ্চিত করেছে। কিন্তু চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের এক বৃহদংশকে সরকার গড়ে দিনে দশ-বারো ঘন্টা খাটাচ্ছে, শনি-রবিবার সাপ্তাহিক অবসরটুকুও দেয় না। শূন্যপদ পূরণ না করে অর্ধেকেরও কম ডাক্তার ও কর্মী দিয়ে দ্বিগুণ কাজ করাচ্ছে, সপ্তায় কাজের সময় ৪০ ঘন্টা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ ঘন্টার ফরমান জারি করেছে, গ্রামীণ এলাকায় এক বা বড়জোর দু'জন চিকিৎসককে দিয়ে ২৪ ঘন্টা x ৭ দিন কাজ করানো হচ্ছে। এ নিয়ে কথা বললেই শোকজ/বদলী/সাসপেনশনের হুমকি। যাঁরা চুক্তিভিত্তিক কর্মী, তাঁদের ছাঁটাইয়ের হুমকি। এর উপর সরকারের পোষা গুন্ডাদের দিয়ে শারীরিক নিগ্রহ তো আছেই!

শ্রমিকের চোখে সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন-ব্যবস্থার তুলনায় পূঁজিবাদী ব্যবস্থা উন্নত, কেননা সামন্তপ্রভূদের জমিতে বাঁধা পরে থাকত শ্রমিক (bonded labour), পূঁজিবাদী ব্যবস্থায় সে মুক্ত (free labour)। এই যেমন কর্পোরেট মালিককে একমাসের নোটিশ দিয়ে আপনি কাজ ছেড়ে বেশী বেতন বা আয়ের সন্ধানে অন্য কাজে যোগ দিতে পারেন। কিন্তু এরাজ্যের সরকার তো কর্পোরেটের এক কাঠি উপরে। সরকারী চিকিৎসকরা আক্ষরিক অর্থেই bonded - একবার চাকরীতে ঢুকেছেন তো অভিমন্যূর মত চক্রব্যূহে ঢুকে পড়েছেন, বেরোনোর রাস্তা নেই। আপনি better scope পেলে লিয়েন পাবেন না, আপনার স্বেচ্ছাবসরের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে আইন করে, আপনার অবসরের বয়ঃসীমা ক্রমবর্ধমান, আপনার পদত্যাগপত্র গৃহীত হবে না। অর্থাৎ এই সরকার শুধু পূঁজির স্বার্থবাহীই নয়, সামন্ততান্ত্রিকও।

তাই অন্যান্য শ্রমিক-কর্মচারীর মতই আমাদের সংগঠিত লড়াই ছাড়া উপায় নেই। রাস্তায় নেমে সংঘবদ্ধ আন্দোলনের পাশাপাশি আইনী লড়াই জারি রাখতে হবে। আমাদের মধ্যে একটা অংশের ধারণা তাঁরা শ্রমিক নয়, তাঁরা শুধুই ডাক্তার এটাও তো সেই সামন্ততান্ত্রিক আর পূঁজিবাদী কৌশল ! শ্রমিক যত নিজেকে অফিসার ভেবে রাস্তার লড়াই থেকে দূরে থাকবে আর নিজেদের মধ্যে কোন্দল করবে, লাভ তাদের। সরকার বা কর্পোরেট মালিকের দালাল কিছু বরাবর ছিল, আছে, থাকবে - শ্রমিকদের মধ্যে যেমন চিরকাল মিশে থাকে কিছু দালাল, তারা চিহ্নিত, তাদের বিচ্ছিন্ন করতে হবে।

দুনিয়ার সব শ্রমিক মজদুর মেহনতী মানুষের সঙ্গে তাই আজ মে দিবসে চিকিৎসা-শ্রমিকদেরকেও ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে আহ্বান জানাই। সমস্ত ক্ষুদ্র বিভেদ ভুলে বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে সরকারী দালাল ছাড়া এরাজ্যের বাকী চিকিৎসকদের।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না