ঢাকা      মঙ্গলবার ২২, মে ২০১৮ - ৮, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ - হিজরী

কমেক হাসপাতালে ইন্টার্ন আন্দোলন: বাস্তবতা বনাম অপপ্রচার

সাম্প্রতিক কালে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কক্সবাজার সদর হাসপাতাল) এ ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে অপপ্রচারে নেমেছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। চিকিৎসকরা যে কঠোর পরিশ্রম করে চিকিৎসা সেবা দিয়ে হাসপাতালের সুনাম  অর্জন করেছেন, সেটাকে ব্যর্থ করাই এসব অপপ্রচারের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন ভর্তি থাকেন ৭৫০ এরও অধিক রোগী। বহির্বিভাগে সেবা নেন আরও প্রায় ১০০০ রোগী। নামমাত্র জনবল ও অপ্রতুল অবকাঠামো নিয়ে এই বিশাল জনসংখ্যাকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। 

এরই মধ্যে গত ১৭ এপ্রিল দূর্ঘটনার ফলে গালে কাটা নিয়ে হাসপাতালে আসেন এক রোগী। জরুরী বিভাগে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাকি চিকিৎসার জন্য ৫ম তলায় সার্জারি বিভাগে পাঠানো হয়। সেখানে তাকে দেখার পরে অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়, কিন্তু সেদিন অর্থোপেডিক্স বিভাগের রুটিন অপারেশনের জন্য তিনতলার অপারেশন থিয়েটার ফাঁকা না থাকায় তাকে নিয়ে ২ তলায় যেতে বলা হয়।

এর মধ্যে একজন লোক অভিযোগ করেন তার রোগীর রক্তপাত হচ্ছে। একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক গিয়ে দেখে আসেন কোন ধরনের রক্তপাত হচ্ছে না। অথচ রোগী তার সাথে থাকা লোকদের বিভিন্নভাবে উস্কানি দিয়ে যাচ্ছে। তিনি রোগীকে ২য় তলায় তাড়াতাড়ি নিতে বলেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী রেজিস্টারকে বিষয়টি জানান।

তখন মাত্র সকালবেলার রাউন্ড শেষ হয়েছে, চিকিৎসকরা বসে ঠিক করছেন কোন রোগীটি জরুরী ভিত্তিতে অপারেশন করতে হবে এবং কোন রোগীর অপারেশন পরে হবে। কাজের ফাঁকে তারা নাস্তাও করে নিচ্ছিলেন। কারণ নাস্তার জন্য আলাদা সময়ের বিলাসিতা করার কোন সুযোগ নেই।

হঠাৎ করে এক লোক চিকিৎসক রুমে ঢুকে পড়েন এবং বলতে থাকেন, ‘তোরা নাস্তা কেন করবি? ডাক্তারের নাস্তা করার দরকার কি? তোরা রোগী দেখবি শুধু!’ এবং উপস্থিত সহকারী রেজিস্টারের গায়ে হাত তুলতে উদ্যত হয়। তখন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তাকে রুম থেকে বের করে দেয়।

কিছু সময় পরে ওই রোগীর অপারেশন করার প্রস্তুতি নিয়ে ২য় তলায় গেলে দেখা যায় ওই রোগীকে রোগীর লোক নিয়ে গেছে। এর কিছুক্ষন পরে অন্য এক রোগীর x-ray রিপোর্ট করানোর জন্য ডা. শাফায়েত হোসেন নিচে গেলে যেটা তার দায়িত্বের বাইরে মানবিকতার খাতিরেই করা। আকস্মিকভাবে উক্ত রোগীর লোক আরও ১০/১৫ লোক নিয়ে এসে তাকে এলোপাথাড়ি মারতে থাকে। তখন সাথে থাকা ডা. তাওহিদ এবং অন্য এক নারী চিকিৎসক সাহায্যের জন্য হাসপাতালের ভিতরে ছুটে যান।

খবর পেয়ে অন্য ইন্টার্ন চিকিৎসকরা আসার আগেই সিনেমা স্টাইলে সুপরিকল্পিত হামলা শেষ করে সন্ত্রাসীরা বেরিয়ে যায়। ভীত চিকিৎসকরা নিজেদের ও অন্য রোগীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সব গেটে তালা লাগিয়ে দেয়। কিন্তু এর মাঝেও তারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শুধু জরুরী রোগীদের চিকিৎসা চালু রাখে। জরুরী বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসকের সাথে কথা বলে জানা যায়, সেই মুহুর্তেও তিনি নিজে গেট খুলে অজ্ঞান রোগীকে ভিতরে এনে চিকিৎসা দিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী হামলার ভয়ে গেট খোলা রাখতে সাহস করেননি। পরে ওসি পুলিশ নিয়ে হাজির হলে জরুরী বিভাগের গেট খুলে দেয়া হয়।

এই ঘটনার প্রতিবাদের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি ঘোষনা করে, যদিও তখন কর্তব্যরত অন্যান্য চিকিৎসকরা হাসপাতালের সব ধরনের সেবা অব্যাহত রেখেছিলেন।

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সাত দফা দাবি
১. হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা।
২. হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষনিক আনসার মোতায়ন।
৩. হাসপাতালে সিসি টিভি ক্যামরা স্থাপন।
৪. নাইট শিফটে দায়িত্ব পালন করা চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৫. হাসাপাতালের ওয়ার্ডে আগত দর্শনার্থীদের নিয়ন্ত্রন করা।
৬. হাসপাতালের কেবিন জন্য আলাদা নীতিমালা করা। 
৭. হাসপাতালে ডিউটি ডাক্তারদের রুমে জরুরী নিরাপত্তা ঘন্টা চালু করা।

এখানে চিকিৎসকদের চরম নিরাপত্তাহীনতার মাঝে কাজ করতে হয়। নেই কোন সিসিটিভি কিংবা পর্যাপ্ত নিরাপত্তারক্ষীর ব্যবস্থা। যখন তখন চিকিৎসককে হুমকি দেয়া হয় হাসপাতালের বাইরে বের হলে দেখে নেয়া হবে বলে। গায়ে হাত তোলার ঘটনা অহরহ ঘটছে। বেশিরভাগ সময়ে চিকিৎসকরা ব্যাপারটা এড়িয়ে যান, কারণ একজনের জন্য বাকিদের সেবা থেকে বঞ্চিত করতে চান না তারা। কিন্তু ইন্টার্ন চিকিৎসকরা যখন নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা ঠিক রেখে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কর্মবিরতির মাধ্যমে নিরাপত্তার জন্য আন্দোলন করছেন তখন একে বানচাল করার জন্য যুদ্ধে নামা এরা কারা?

অথচ একটি কুচক্রী মহল আসল ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে মূল আসামীকে বাঁচানোর জন্য চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নেমেছে। হাসপাতালের নিরাপত্তা তাদের কাছে কোন গুরুত্বই পাচ্ছে না। তারা সব দায়ভার ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওপর চাপিয়ে সবার দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে ব্যস্ত।

কক্সবাজার সদর হাসপাতাল যখন চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মানিত হচ্ছে ঠিক তখনই এ ধরনের পরিকল্পিত হামলা এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো কোন বড় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মনে করা হচ্ছে। 

উল্লেখ্য, কয়েকদিন আগে সৌদি যুবরাজ কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আসেন এবং এত কম সুযোগ সুবিধা নিয়ে এত বড় পরিসরে সেবা দেয়ার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

আরও পড়ুন-

জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে বিএমএ কক্সবাজার

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ক্ষমতা নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ক্ষমতা নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি

মেডিভয়েস রিপোর্ট: উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও জনগণকে অধিকতর…

তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর হাতে সরকারি হাসপাতাল জিম্মি

তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর হাতে সরকারি হাসপাতাল জিম্মি

এক রোগীকে আমরা ছুটি দিলাম। সে যাবে না, বেড নাকি সে কিনেছে…

ওএসডি চিকিৎসকদের বেতন বন্ধ করা হবে!

ওএসডি চিকিৎসকদের বেতন বন্ধ করা হবে!

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ওএসডি (অফিসার্স অন স্পেশাল ডিউটি) হয়ে রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন…

হাসপাতালের ওষুধ পাচারের সময় স্টোরকিপার আটক

হাসপাতালের ওষুধ পাচারের সময় স্টোরকিপার আটক

মেডিভয়েস ডেস্ক: পটুয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের স্টোররুম থেকে ওষুধ পাচার করার সময়…

বালিকা বিদ্যালয়ে পড়েছেন ডাক্তার শ্রী বাবুল দাস!

বালিকা বিদ্যালয়ে পড়েছেন ডাক্তার শ্রী বাবুল দাস!

চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার খিলাবাজার এলাকার শ্রী বাবুল চন্দ্র দাস। ভি.ডি.আর.এম.পি-এল.এম.এফ ডিগ্রি ব্যবহার করে…

ভুয়া ডাক্তার দ্বারা ফার্মেসীতে অপারেশন, যুবকের মৃত্যু

ভুয়া ডাক্তার দ্বারা ফার্মেসীতে অপারেশন, যুবকের মৃত্যু

ভুয়া ডাক্তার কতৃক ফার্মেসীতে অপারেশনের পর এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে৷ ঘটনাটি ঘটেছে…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর