ঢাকা      সোমবার ১৮, জুন ২০১৮ - ৪, আষাঢ়, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


মেডিকেলীয় ব্যাখ্যা

লাশ কেন হঠাৎ নড়ে উঠে?

এক: তিন বছরের টুনটুন ছিলো বাবা মায়ের চোখের মনি। সারাদিন বাড়ির এ মাথা থেকে ও মাথা ঘুরে বেড়াতো টু টু করে। ব্যস্ত রাখতো সবাইকে। কিন্তু আজ দুপুরে টুনটুন দের বাড়িতে কান্না আর আহাজারি। টুনটুন এর মা বিলাপ করছেন আর মুর্ছা যাচ্ছেন বার বার। একি হলো, কেনো হলো। বিধাতা তাকে কেন এমন কঠিন পরীক্ষায় ফেললেন।

বাবার অফিসে যাবার সময় বেশ খানিকটা দূর পর্যন্ত টুনটুন তার পিছু পিছু আসতো। তারপর বাবা তাকে শেষবার কোলে নিয়ে একটা চুম দিয়ে ঘরের দিকে ফিরিয়ে দেন। এটা প্রায় প্রতিদিনের রুটিন, আজও তার ব্যতিক্রম হয় নি।

বাবার অফিসে যাবার পর মায়ের খেয়াল হঠাৎ হয় টুনটুন আশেপাশে নেই। অফিসে যাবার পর সে'তো পাশেই খেলে। আজ একটু খালি খালি। টুনটুনটা কই। এ ঘর ও ঘর খুঁজাখুঁজি করে আঁতকে উঠে তার মন। টুনটনের বাবা কে ফোন দেন তিনি।
“সে আমার পিছু পিছু আসছিলো, আমিতো তাকে ঘরে ফিরিয়ে দিই, দ্যাখো ভালো করে ঘরে, উঠোনে কিনা...” তিনি বলেন

টুনটুনের মা আর কোন কথা নেই, এক দৌড়ে যান পুকুর ঘাঠে। টুনটনের পানির প্রতি খুব আকর্ষণ। হাটা শিখার পর থেকে সে সুযোগ পেলেই পুকুরপাড় যেতে চায়। একদিন দুপুরে সেখান থেকে উদ্ধার করেন মসজিদের ইমাম। সেদিন তিনি কড়া করে সতর্ক করেছিলেন, "এমন যেনো না হয়", আরো বলেছিলেন, "বাঁশের বেড় দিয়ে পুকুর ঘাট টি আলগ করে দিও তোমরা"। আজ দিচ্ছি কাল দিচ্ছি করে দেয়া হয়নি। চৌধুরী বাড়ী থেকে বের হয়েই রাস্তার বা'পাশে বিশাল এক পুকুর।

পুকুরঘাটে এসেই টুনটুনের মা চিৎকার দেয়ে অজ্ঞান। মাঝ পুকুরে টুনটুনের লাল জামাটা ভাসছে। চাচা মামারা ঝাপ দিয়ে পুকুরের গভীর থেকে তুলে নিয়ে আনেন টুনটুনের হিম শীতল দেহ।

টুনটুনকে নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে। না, টুনটুন আর নেই। ডাক্তার সাহেব বিমর্ষ হয়ে জানালেন। অত টুকুন একটা বাচ্চার নিথর দেহ দেখে তিনিও অশ্রু সংবরণ করতে পারেন নি। কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বললেন, "অনেক দেরী হয়ে গেছে"।

এবার ঘটলো আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘঠনা। বাড়ি ফিরতে যেয়ে টুনটুনের একটি হাত নড়ে উঠলো। মরদেহ নিয়ে আবার দৌড়ে সবাই হাসপাতালে। কেউ কেউ রেগেমেগে চড়াও হলেন ডাক্তারের উপর।

না, এবার ইসিজি ইকো সব করিয়ে কনফার্ম করা হলো। টুনটুন বেঁচে নেই।

এভাবে বাড়ির পুকুরে পড়ে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও শিশু মারা যাবার ঘটনা ঘটছে। বর্ষাকালে এসব খুব বেশি দেখা যায়। আমি সাব সেন্টার ও হেলথ কমপ্লেক্স এ থাকাকালে এগুলো পেয়েছি।

কচি মুখ দেখে ডেথ সার্টিফিকেট এ সাইন করতে সত্যি খুব খারাপ লাগতো তখন। শুধু ঘরের বাইরে, পুকুর বা কুয়োতে পড়ে শিশু মৃত্য হয়, তা কিন্তু না। এমনকি ঘরের ভিতর বাথরুমের বালতিতে জমিয়ে রাখা পানিতে পড়ে বাচ্চা মারা গিয়েছে সেটা ও পেয়েছি। অত্যন্ত মর্মান্তিক সে দৃশ্য।

দুই: একদিন খুব সকাল মেডিকেল এসিসট্যন্ট দিপংকর সাহেব খবর পাঠালেন। স্যার, একটু আসবেন। জরুরী। আমি তখন দুতলায় কেবল রাউন্ড শুরু করেছি। নীচে ইমার্জেন্সী রুমে ঢুকতেই দেখি প্রচণ্ড ভীড় আর কান্নার আহাজারি। দলে দলে লোকজন ইমার্জেন্সী তে ছুটছে। সে এক করুন দৃশ্য।

মা ছেলেকে ড্রইং রুমে রেখে রান্না ঘরে কাজ করছিলেন। একটু পরে খেয়াল হলো বাবু পাশে খেলছিলো, কিছুক্ষণ হলো সাড়াশব্দ নাই, কই যে গেলো। শুরু হলো তন্ন তন্ন করে খুঁজা আর এদিক ওদিক ফোন। বাড়ী তে, পুকুর ঘাটে। নেই নেই নেই। কোথাও নেই।খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ পাওয়া গেলো ঘরের মধ্যেই, বাথরুমের ভিতর বালতিতে উপুর পড়ে রয়েছে নিথর দেহ। বালতি ভর্তি রাখা ছিলো পানি।

হাসপাতালে নেওয়ার পর বলা হয়ে ছিলো বেঁচে নেই। কিন্ত শেষকৃত্য অনুস্টান করতে যেয়ে দেখা গেলো বাবুটির একটি আংগুল হঠাৎ কেঁপে উঠছে। বরফ শিতল নিথর দেহকে আবারো ভালো করে এক্সামিন করে বলা হলো, নাহ, বেঁচে নেই। সে অনেক আগেই মারা গিয়েছে। ইসিজি করিয়েও দেখানো হলো।

হৃদয় বিদারক এই দুটি ঘটনার অবতারণা করেছি দুটো বিষয় নিয়ে বলতে,

এক. সচেতন করতে এভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত শিশু মৃত্যু,

দুই.হঠাৎ করে কোন মৃতদেহের হঠাৎ কেঁপে উঠা নিয়ে।

মৃতদেহের হঠাৎ নড়া চড়া নিয়ে অনেক ভুল বুঝাবুঝি হতে দেখা যায়। এইতো ক'দিন আগে জানাজার প্রস্তুতিকালে মৃতের কেঁপে উঠা নিয়ে পত্রিকায় খুব লেখালেখি হলো। হৈ চৈ কান্ড। সকল দোষ চাপে ডাক্তারের উপর। তিনি ভালো করে পরীক্ষা না করেই ডেথ ডিক্লারেশন করেছেন। ঘটনাটা এরকম, এক নবজাতক (প্রি ম্যাচিউর বেবি) প্রসবের পর ডাক্তার দেখেন শিশুটির অবস্থা খুবই খারাপ। কান্না নেই শ্বাস ও নেই। সিভেয়ার বার্থ এস্পেক্সিয়া। অনেক চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত শ্বাস প্রশ্বাস নেয়নি নবজাতক।

ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু কবর দিতে গিয়ে দেখা গেলো সেই প্রে-ম্যাচিউর এন্ড প্রি-টার্ম বেবী নাকি কান্না করেছে, নড়াচড়া করেছে। পরে হেলিকপ্টারে করে তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে আনা হয়। আই সি ইউ তে রাখা হয়। তারপরের খবর আর জানা যায়নি।

এভাবে হঠাৎ মৃত্যু, হাসপাতালে, আই সি ইউ'তে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর মৃত্যু, হঠাৎ সড়ক দুর্ঘটনা বা কার্ডিয়াক কার্ডিয়াক এরেস্ট এ মৃত্যু কিংবা অন্য কোন কারনে আপনার কোন স্বজন মৃত্যু বরন করার পর শেষ অনুস্টান করতে যেয়েই দেখা গেলো আপনার মৃত স্বজনের দেহটি হঠাৎ একটা ছোট কাঁপুনি দিয়ে নড়ে চড়ে উঠলো!! হঠাৎ নড়ে উঠা লাশ টিকে নিয়ে আবার ছুটাছুটি। আবার পরীক্ষা নিরীক্ষা। ই সি জি, ইকো। না তিনি মৃত। 
তাহলে কেনো এই মৃতদেহ ওভাবে নড়ে উঠলো। মনে জাগে বিশাল প্রশ্ন।

আসলে চিকিৎসা বিজ্ঞানে মৃত্যুর পর কদাচিৎ নড়ে ঊঠা, এই ধরনের ঘঠনা কে বলা হয় "লেজারস ফেনমেনন ( Lazarus phenomenon) বা "লেজারস সিনড্রোম /সিমটম ( Lazarus symptom)।

শেষ করি লেজারাস ফেনোমিনন নিয়ে সামান্য আলোচনা করে।

লেজারাস শব্দটি কিভাবে এলো? একবার যিশুখ্রীস্ট সেন্ট লেজারাস নামের এক ব্যক্তি কে তার মৃত্যুর চার দিন পর পুনরায় তাকে জীবিত করেন। পরে লেজারাস কে পবিত্র আত্মার অধিকারী ধরা হয়। পবিত্র বাইবেলের ১১তম খন্ডে এ ব্যাপারে বর্ণনা আছে। সেখান থেকেই এই ‘লেজারাস’ শব্দটি এসেছে।

পৃথিবী তে লেজারাস ফেনোমেনন বা মৃত্যুর পর নড়ে উঠার ঘটনার উদাহরণ খুবই কম। তিরিশ কি পঁয়ত্রিশটি হবে। সবই ইউরোপ, আমেরিকায়। সবই ছিলো মৃত, প্রানের অস্তিত্ব সনাক্ত হয়নি। ব্যতিক্রমী দু একটা কেইস লাইফ সাপোর্ট ও নেওয়া হয়েছিলো। তেমন ফল পাওয়া যায়নি। আমাদের দেশে এগুলো একেবারেই বিরল।

‘লেজারাস ফেনোমেনন’ এর কারণ ব্যাখ্যা করা কিছুটা কঠিন। তবে কিছু হাইপোথিসিস আছে যেমন,

১) পজিটিভ এন্ড এক্সপিরেটরি প্রেশার বা পি ই ই পি (সি পি আর দেবার সময় ফুসফুসের ভিতর জমে থাকা অত্যাধিক বহিঃমূখি বায়ুর চাপ),

২) মায়োকার্ডিয়াল স্টানিং (MYOCARDIAL STUNNING) বা হার্টের কিছু অংশ সাময়িক কাজ না করা,

৩) ট্রানজিয়েন্ট এসিস্টল (TRANSIENT ASYSTOLE) বা সাময়িক ভাবে হার্ট বন্ধ থাকা,

৪) পি. ই.এ (P E A) বা পালস লেস ইলেক্ট্রিক্যাল একটিভিটি,

৫) হাইপারকেলিমিয়া (HYPERKALAEMIA) ববা অতিরিক্ত ইন্ট্রা সেলুলার পটাসিয়াম,

৬) ডিলেইড একশন অব ড্রাগ (DELAYED ACTION OF DRUG) অর্থাৎ শেষ মুহুর্তে ডাক্তার জীবন রক্ষাকারী যে ঔষধ পুশ করেছিলেন তা দেহে কাজ করতে দেরী হওয়া, ইত্যাদির ফলেই এমন দৈবিক ঘটনার সুত্রপাত হয়।

আর এমন ঘটনায় যদি কেউ ফিরেও আসেন তবে ফিরে আসা মানুষ টির প্রচণ্ড রকমের নিউরোলজিক্যাল ডিসএবিলিটি সহ নানান জটিলতা নিয়ে জীবন্মৃত হয়ে কটা দিন বেঁচে থাকা খুবই অস্বাভাবিক কিছু নয়। এতে চিকিৎসকের ডেথ ডিক্লেয়ারেশন এ কোন গাফলতি নেই। কারন একজন ডেথ ডিক্লেয়ারেশন করেন পাঁচটি ভাইটাল সাইন আধাঘণ্টা ব্যাপী পরীক্ষা করে অনুপস্থিত পেলে।

লেখক: এমবিবিএস ( ডিএমসি কে- ৫২) এম ফিল (সাইকিয়াট্রি)

সাইকিয়াট্রিস্ট ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট। 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে প্রথম হওয়া উর্মিতার গল্প

বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে প্রথম হওয়া উর্মিতার গল্প

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ৩৭তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে প্রথম হয়েছেন উর্মিতা দত্ত। তিনি ঢাকা মেডিকেল…

থাইরোটক্সিকোসিস চিকিৎসায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা!

থাইরোটক্সিকোসিস চিকিৎসায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা!

এক বছর ধরে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী থাইরোটক্সিকোসিস (Thyroitoxicosis) আক্রান্ত। সঠিকমাত্রায় carbimazole দিয়ে…

জাতিসংঘ মিশনে যাচ্ছেন ১২ চিকিৎসক

জাতিসংঘ মিশনে যাচ্ছেন ১২ চিকিৎসক

মেডিভয়েস রিপোর্ট: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর Formed Police (FPU) মিশনে মেডিকেল অফিসার হিসেবে গমনের…

৩২৩ জনকে স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ  

৩২৩ জনকে স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ  

মেডিভয়েস রিপোর্ট : ৩৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম…

চ্যানেল নাইন আলোকিত জ্ঞানী ২০১৮ চ্যাম্পিয়ন মেডিকেল ছাত্র যুবায়ের

চ্যানেল নাইন আলোকিত জ্ঞানী ২০১৮ চ্যাম্পিয়ন মেডিকেল ছাত্র যুবায়ের

মেডিভয়েস রিপোর্টঃ ইসলামী জ্ঞানের মেগা রিয়েলিটি শো চ্যানেল নাইন আলোকিত জ্ঞানী ২০১৮…

ব্লাড ক্যান্সার কেন হয়?

ব্লাড ক্যান্সার কেন হয়?

ব্লাড ক্যান্সার ও তার চিকিৎসা নিয়ে অনেকের অনেক রকম জিজ্ঞাসা থাকে। অনেক…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর