ঢাকা      মঙ্গলবার ২২, মে ২০১৮ - ৮, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. ঐন্দ্রিল ভৌমিক

মেডিকেল অফিসার, পানিহাটি স্টেট জেনারেল হসপিটাল, ভারত ।


বাঙালি ডাক্তারের বিদেশ যাত্রার গল্প

এইটাই বাকি ছিল। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী লন্ডনে হল ভর্তি লোকের সামনে বললেন ভারতীয় ডাক্তাররা ওষুধ কোম্পানির কাছে কমিশান খান। কমিশনের পয়সায় বৌ-বাচ্চা নিয়ে বিদেশ বেড়াতে যান।

এই কসাই ডাক্তারদের হাত থেকে দেশের মানুষকে বাঁচানোর জন্য তিনি জেনেরিক ওষুধের দোকান করেছেন। যেখানে একশ টাকার ওষুধ পনেরো টাকায় পাওয়া যায়।

শুনে সাহেবরা চটপট করে হাততালি দিল। ৫৬ ইঞ্চি ৬০ ইঞ্চি হল কিনা জানা নেই, কিন্তু আমি বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমিও তো টুকটাক প্র্যাকটিস করি, ওষুধও লিখি। কিন্তু এতদিনেও কেউ বিদেশ নিয়ে যেতে চাইল না কেন? আর যদি চায় তখন কী করব? আমার তো পাসপোর্টই নেই।

বছরে একবার বেড়াতে যাই। মোল্লার দৌড় শিলং, পুরি, দার্জিলিং এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। এবং বিশ্বাস করুন বা না করুন ওই বেড়ানোর পয়সা আমি নিজেই উপার্জন করি।

আমি যে কজন ডাক্তারকে চিনি, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই এখনও বিদেশ যাননি। যারা গেছেন তাঁরা বেশীর ভাগই জীবনের শেষ পর্যায়ে। সঞ্চিত টাকায় ভরসা করে অথবা সরকারি চাকরির সু্যোগ নিয়ে। সেমিনার বা কনফারেন্স এটেন্ড করতে কয়েকজন ডাক্তার বিদেশ যান বটে তবে ডাক্তার সংখ্যার তুলনায় সেটা অত্যন্ত নগণ্য। এবং তাঁদের মধ্যে কতজন নিজেদের পয়সায়, নিজেদের যোগ্যতায় আর কতজন কোম্পানির পয়সায় সেটা গবেষণা সাপেক্ষ।

যাই, হোক বিশ্বাস করুন বা না করুন, সেটা আপনাদের ব্যাপার। আমি বরং আপনাদের একটা গল্প শোনাই। গল্পে এক বাঙালি ডাক্তারের বিদেশ যাত্রার প্রসঙ্গ আসবে।

ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নাম আমি প্রথম শুনি ক্লাস ইলেভেনে পড়ার সময়। বাবার কাছে বায়োলজি রিপ্রোডাকটিভ সিস্টেম পড়ছিলাম। প্রসঙ্গত বলে রাখি আমার বাবাও ডাক্তার। তিনিও প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন। এবং সত্তর বছর বয়স হয়ে গেলেও তিনি বাংলাদেশ ছাড়া বিদেশের আর কোথাও যাননি। এবং যদ্দুর জানি বাংলাদেশ তিনি নিজের পয়সায় গেছেন। বনগাঁ অব্দি লোকাল ট্রেনে, সেখান থেকে পেট্রোপোল পার হয়ে সাতক্ষীরায় নিজের জন্মস্থান।

মায়ের খুব ইচ্ছা ছিল বিদেশ ঘুরে দেখার। তিনি স্কুল টিচার ছিলেন। তিল তিল করে পয়সা জমিয়েছিলেন। পাসপোর্টও বানিয়েছিলেন। কিন্তু আচমকা মৃত্যু এসে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। এখনও দুঃখের মধ্যেও মাঝে মাঝে মনে হয় ভাগ্যিস বাবা আর মা ইংল্যান্ড বা আমেরিকা ঘুরতে যাননি। তাহলে হয়ত এই শেষ বয়েসে এসে বাবাকে শুনতে হত, ওষুধ কোম্পানির পয়সায় বিদেশ ঘুরে এলেন।

যাই হোক গল্পে ফেরত আসি। বাবা পড়াতে পড়াতে বললেন, ‘জানিস ভারতবর্ষের ইনভিট্রো ফার্টিলাজেশন অর্থাৎ টেস্ট টিউব বেবির জনক আমার টিচার ছিলেন। তাঁর নাম ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন আমাদের এনআরএস হাসপাতালের ফিজিওলোজির প্রফেসর। তাছাড়া তিনি আমাদের স্টুডেণ্ট হোস্টেলের সুপারও ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর গবেষণার স্বীকৃতি পাননি। সেই দুঃখে শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মহত্যা করেন। এমনকি সরকার তাকে বিজ্ঞান সম্মেলনে যোগ দিতে বিদেশ পর্যন্ত যেতে অনুমতি দেননি।’

আজ হঠ্যাৎ কি খেয়াল হল, বিদেশে সেমিনারের কথায় ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায় নামে গুগুলে সার্চ মারলাম। উইকিপিডিয়াতে যা তথ্য পাচ্ছি হুবহু কপি পেস্ট করছি।

১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ অক্টোবর তিনি ভারতের প্রথম চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী হিসেবে এক নল-জাত শিশুর জন্ম দিয়ে ইতিহাস স্থাপন করেন। তিনি এই শিশুটির নাম রাখেন দুর্গা (কানুপ্রিয়া আগরওয়াল)। ব্রিটিশ বৈজ্ঞানিক প্যাট্রিক স্টেপটো ও রবার্ট জিওফ্রি এডওয়ার্ডস দ্বারা ওল্ডহ্যাম জেনারেল হসপিটালে পৃথিবীর প্রথম নল-জাত শিশু লুইস জন ব্রাউনের জন্ম দেওয়ার ৬৭ দিন পরে সুভাষের গবেষণার দ্বারা দুর্গার জন্ম হয়।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে তাঁর গবেষণার সম্বন্ধে বক্তৃতা দিতে চাইলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। এই গবেষণার স্বীকৃতি প্রদান না করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্যদপ্তর তাঁর গবেষণার সত্যতা সম্বন্ধেই সন্দেহ প্রকাশ করে ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই নভেম্বর পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সুভাষের সমস্ত গবেষণা মিথ্যা বলে এই কমিটি রায় দেয়।

শাস্তি স্বরূপ সুভাষকে রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অব অপথ্যালমোলজি নামক প্রতিষ্ঠানের চক্ষু বিভাগে স্থানান্তরিত করে দেওয়া হয়, যার ফলে প্রজনন শারীরবিদ্যা সমন্ধে সমস্ত গবেষণা তাঁকে বন্ধ করে দিতে হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আমলাতান্ত্রিকতা ও পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যদপ্তরের চিকিৎসক দ্বারা ক্রমাগত বিদ্রুপ ও অপমানে হতাশ হয়ে সুভাষ ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে জুন কলকাতায় নিজের বাসভবনে আত্মহত্যা করেন।

টি. সি. আনন্দ কুমারের গবেষণার ফলে ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই আগস্ট হর্ষবর্ধন রেড্ডি বুরি জন্মগ্রহণ করলে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম নলজাত শিশু বলে গণ্য করা হয়। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে আনন্দ কুমার কলকাতা শহরে অনুষ্ঠিত একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে যোগ দিতে এলে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণা নথিগুলি তাঁর হাতে আসে। এই সমস্ত নথিগুলি যাচাই করে ও দুর্গার পিতা-মাতার সাথে আলোচনা করে তিনি নিশ্চিত হন যে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ই ছিলেন প্রথম নল-জাত শিশুর স্রষ্টা।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তরকে পাঠানো গবেষণা সংক্রান্ত সুভাষের চিঠির কথা তিনি সংবাদমাদ্যমে প্রচার করেন। কানুপ্রিয়া আগরওয়ালা বা দুর্গা তাঁর ২৫তম জন্মদিনে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এক স্মৃতিসভায় নিজের পরিচয় সর্বসমক্ষে জানিয়ে ঘোষণা করেন যে, সুভাষের গবেষণা মিথ্যা ছিল না।

পরবর্তীকালে তপন সিনহা তাঁর জীবন ও মৃত্যু নিয়ে ‘এক ডক্টর কি মউত’ নামে একটি হিন্দি চলচিত্র তৈরী করেন।

আচ্ছা পাঠক আপনার কি মনে হয় না, একজন রাজনৈতিক নেতার বিদেশ যাওয়ার থেকে ওই ডাক্তার বাবুর বিদেশ যাওয়া অনেক বেশী দরকার ছিল।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য প্যাট্রিক স্টেপটো ও রবার্ট জিওফ্রি এডওয়ার্ডস তাঁদের কাজের জন্য নোবেল পুরষ্কার পান। তাঁদের চেয়ে অনেক প্রতিকূল পরিবেশে একই সময়ে একই কাজ করে এক বাঙালি ডাক্তার বাবুর কপালে জোটে শুধুই বিদ্রুপ আর সরকারি শাস্তির কোপ।

এদেশে মেধা নিয়ে জন্মানো অপরাধ! আরও বড় অপরাধ সেই মেধা নিয়ে বিদেশে না পালিয়ে এদেশেই পড়ে থাকা।

আরও একটা খবর জানাই, মোদীর এবারের বিদেশ সফর স্পন্সর করেছে যারা তাদের মধ্যে প্রথমেই আছে সান ফার্মাসিউটিক্যাল। সেটিও একটি নামকরা ওষুধ কোম্পনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আন্তর্জাতিক বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আহত ফিলিস্তিনিদের তুরস্কে চিকিৎসা দিবে এরদোগান

আহত ফিলিস্তিনিদের তুরস্কে চিকিৎসা দিবে এরদোগান

মেডিভয়েস ডেস্ক: ইসরাইলের সেনাদের গুলিতে আহত ফিলিস্তিনিদের চিকিৎসা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট…

ভারতে নিপাহ ভাইরাসে ৯ জনের মৃত্যু

ভারতে নিপাহ ভাইরাসে ৯ জনের মৃত্যু

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায় নিপাহ ভাইরাসে ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। মূলত…

জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন শুরু

জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন শুরু

মেডিভয়েস ডেস্ক: সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে আজ (সোমবার) থেকে শুরু হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর