ঢাকা      মঙ্গলবার ২২, মে ২০১৮ - ৮, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ - হিজরী



আয়েশা আলম প্রান্তী

শিক্ষার্থী, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ


মনজুরের ব্লাডম্যান

মনজুর হোসাইন চৌধুরী, ২০০৬ সালে এস এস সি ও ২০০৮ সালে এইচ এসসি পাশ করে ভর্তি হোন আনোয়ার খান মর্ডার্ন মেডিকেল কলেজে ২০০৯ সালে। ছোটবেলায় পাইলট হতে চাওয়া ছেলেটা, দাদীর মুখ দেখে শুনতো গ্রামের মনসুর ডাক্তারের কথা। কিভাবে মনসুর ডাক্তার বিনা টাকায় চিকিৎসা দিতেন, মানুষকে সাহায্য করতেন। দাদীর অনুপ্রেরনায় ডাক্তার  হতে আসা মন্জুরের।  

মেডিকেলে পড়ার ফাঁকে ২০১৪ সালে পরিচয় হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমআইএস পড়া বন্ধু জিসানের সাথে। টিএসসির মোড়ে আড্ডা মারতে মারতে দুই বন্ধুর মাথায় বুদ্ধি আসে তারা মানুষকে উপকার করতে চান। আর জরুরি প্রয়োজনে অসুস্থ রোগীর জন্য রক্ত জোগাড় করে দেওয়া অনেক বড় একটা উপকার। 

অতঃপর জিসান, মনজুর, সাগর, নিয়াজ, রফিক, ফাহিম, নাইম ও আরজে সালমান এই কয়েক বন্ধুর মিলিত প্রচেষ্ঠায় ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে পথ চলা শুরু হয় ‘ব্লাড ম্যান’ নামক প্রতিষ্ঠানের। মনজুর মনে করে কেউ চাইলেও সুপারম্যান অথবা স্পাইডারম্যান হতে পারবে না কিন্তু চাইলেই যে কেউ এক ব্যাগ রক্তদানের মাধ্যমে ব্লাডম্যান হয়ে একজন মুর্মূষু রোগীর জীবন বাচাতে পারবেন। এটাই ব্লাডম্যানের মূলমন্ত্র। যাদের নিজস্ব দক্ষ টিম আছে, সাথে আছে কল সেন্টার নাম্বার,এনড্রয়েড মোবাইল এ্যাপস (Bloodman) এবং ওয়েবসাইট (bloodman.org)। জরুরি রক্তের দরকারে আপনি ফোন করবেন ব্লাড ম্যানের হেল্প লাইন নাম্বার ০১৬২৭২৬০৯৩৩ আর সেখানে বিশাল ডাটা বেসের ডোনার থেকে ব্লাডম্যান আপনাকে রক্তের ডোনার খুঁজে দিবে। তাও বিনামূল্যে।

এভাবে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিনামূল্যে সেবা দেয়ার পর ২০১৬ সালে কতিপয় কুচক্রী মহলের প্রতারনার সম্মুখীন হোন তারা, যারা ব্লাড ম্যান থেকে ফ্রেস রক্ত অথবা ডোনার নিয়ে তা টাকার বিনিময়ে দিতো রোগীর আত্মীয়দের। এটা বুঝতে পারার পর ২০১৬ সালের শুরু  থেকেই তারা প্রতি ব্যাগ রক্তের জন্য ২৫০ টাকা সার্ভিস চার্জ নেয়। যেহেতু ফোন করে আগে সার্ভিস চার্জ বিকাশ করতে হয় তারপর রক্ত পাওয়া যায়। তাই এ উপায়ে প্রতারনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে জানালেন মন্জুর। 

এছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজে ব্লাড গ্রুপিং প্রোগাম, সেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি এবং মোটিভেশনাল প্রোগাম করতে সবসময় ফান্ড লাগে। কিন্তু ফান্ডটা আসবে কই থেকে? তাই সংগঠনকে স্বচ্ছল করার জন্য ২৫০ টাকা সার্ভিজ চার্জ যুক্ত করা। এই ২৫০টাকা থেকে কল সেন্টারে কাজ করা ছেলে অথবা মেয়েটিকে দেওয়া হয় ১০০টাকা, ১০০টাকা খরচ করা হয় ডোনার সম্মাননায় আর বাকি ৫০টাকা খরচ করা হয় ব্লাডম্যানের উন্নয়নে।

ভবিৎষতে সরকারি অথবা বৈদেশিক সহায়তা পেলে ব্লাডম্যান কোন চার্জ নিবেনা বলে জানান মনজুর।এছাড়া এখনও আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল রোগীদের বিনামূল্যে সার্ভিস দিয়ে থাকে ব্লাডম্যান।ফাউন্ডার জিসান ও কো ফাউন্ডার মনজুর, তাদের এই দক্ষ টিমের সফলতা অল্প সময়ে অনেক বেশী। 

২০১৬ সালে ব্রাক সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘ব্রাক আরবান চ্যালেন্জ’ নামক কম্পিটিশনে ব্লাডম্যানের সদস্যরা ‘আমাদের শহর, আমাদের সমাধান’ নামে এক মডেল প্রেজেন্ট করে। ৬১৫ টি আইডিয়ার মধ্যে তাদের আইডিয়া চ্যাম্পিয়ন হয়। এই আইডিয়াতে তারা ঢাকা শহরের যাতায়াত যোগাযোগ, জীবন ব্যবস্থা উন্নত করার যাবতীয় পন্থা তুলে ধরেন। ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী থেকে ২১ ফেব্রুয়ারী থাইল্যান্ডে গ্লোবাল লিডারশিপ এম্বেসেডর হিসেবে মন্জুর ও তার ব্লাডম্যান টিম যায়, ৪ দিনের ট্রেইনিংয়ে সাউথইস্ট এশিয়ার প্রায় ১০০ প্রতিযোগী অংশ নেন। 

২০১৬ সালে স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ভিয়েতনাম ইউথ ইন্টারন্যশনাল বুথ ক্যাম্পে ব্লাড ম্যান এর ফাউন্ডার জিসান সোশ্যাল চেন্জ মেকার হিসেবে ব্লাড ম্যান এর বিসনেস মডেল উপস্থাপন করেন ও পুরষ্কৃত হন। ২০১৬ সালে হংকং ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত ফিউচার সিটি সামিট এ বিশ্বের অনেক নামী দামী দেশের মধ্যেও ব্লাড ম্যান পুরষ্কৃত হয়। ব্লাড ম্যানের সবচেয়ে বড় অর্জন, হংকং ইউনিভার্সিটিতে দুই জন পিএইজডি রিসার্চার, রিসার্চের বিষয় ব্লাডম্যান! এটা যে কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক।  

ব্লাড ম্যানের কাজ শুধু পুরষ্কার জেতাতেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের জন্য কাজ করে চলেছেন তারা। এ বছর বন্যার হাওড় অঞ্চলে মানুষের জন্য সাহায্য নিয়ে যায় ব্লাড ম্যান সদস্যরা। ৩-৫ মে ব্লাডম্যান এবং তাদের ডাক্তার টিম ১৫০০+ শনির হাওরের মানুষকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং ৩২৯ জন মানুষকে এান পৌছে দেয়।গত বছর আগষ্ট মাসে ছিলো ব্লাডম্যানের সবচেয়ে বড় ইভেন্ট। গেল বছর আগষ্টের বন্যায় মনজুরের নেতৃত্বে একদল ডাক্তার রৌমারি, কুড়িগ্রামের ৩৫০০+ মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা এবু ১৫০০ মানুষকে এান দেওয়া হয়। উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি মন্জুর এগিয়ে চলেছেন। মেডিকেলের কঠিন পড়াশোনার জন্য অনেক সময় কোন কম্পিটিশনে যেতে পারি নাই, তা পুষিয়ে দিয়েছে বন্ধু জিসান। জিসান ছাড়া ব্লাডম্যান এত দূর আসতে পারতোনা, বলেন মনজুর। 

জাতীয় দূর্য়োগে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতে গিয়ে মনজুর উপল্বধি করল কেন শুধু জাতীয় দূর্যোগ? তৃনমূলে চিকিৎসা সেবা সারা বছরই লাগে।সেই চিন্তা থেকেই ‘আমাদের ডাক্তার’ এর যাএা শুরু ২০১৫ সালের ২৮ই ডিসেম্বর থেকে। এই পর্যন্ত আমাদের ডাক্তার ৫০০০+ মানুষকে ৬ টি ফ্রি ক্যাম্পের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা এবং ঔষুধ প্রদান করে।এখানেও মনজুর সাথে পেয়েছেন বন্ধু জিসানকে। মনজুর আমাদের ডাক্তার এর ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট আর জিসান কো-ফাউন্ডার হিসেবে কাজ করছে।

বিভিন্ন জেলায় জেলায় গিয়ে ফ্রি মেডিকেল চেক আপ দেয়া, বিনামূল্যে ঔষধ বিতরন এই কাজ গুলা মন্জুরকে অসাধারন আনন্দ দেয়। কিছু মানুষ বাবা মার পরেই অনেক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। প্রফেসর ডা. এম আলমগরীর চৌধুরী, প্রফেসর ডা. সেহরীন এফ সিদ্দিকা, ডা. মারুফ সিদ্দিকি, প্রফেসর ডা. তাহমিনুর রহমান, ডা. রুবায়েত শেখ, ডা. কুন্তল রয়, ডা. শারমিন আব্বাসি, ডা. শারমিন, ডা. মেহরান, ডা. কাফি, ডা. মেশকাত, ডা. ফারহানা এবং ডা. নিশি। আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের সার্বিক সহযোগীতা মনজুরের পথ চলা আরও সহজ করে দিয়েছে। 

সম্প্রতি ডাক্তার হলেন মনজুর। একদিকে চিকিৎসা পেশা অন্যদিকে উদ্যোক্তা, দুই কাজকে সমান ভালোবাসেন তিনি। এগিয়ে যান মনজুর ও তার ব্লাডম্যান। সেবা পাক হাজার হাজার মানুষ। 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিএসএমএমইউয়ে নাক ডাকা রোগীদের জন্য ঘুমের ল্যাবরেটরি

বিএসএমএমইউয়ে নাক ডাকা রোগীদের জন্য ঘুমের ল্যাবরেটরি

মেডিভয়েস রিপোর্ট: নাক ডাকলে বিছানার পাশের মানুষটির ঘুমাতে অসুবিধা হয়। এছাড়া নাক ডাকা…

রন্টজেনের এক্স-রে আবিষ্কারের ঘটনা ও নোবেল বিজয়

রন্টজেনের এক্স-রে আবিষ্কারের ঘটনা ও নোবেল বিজয়

১৮৯৫ সালের শীতকাল। নভেম্বর এর প্রথম সপ্তাহ শেষ হয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহ শুরু…

বৃহত্তম কিডনি সেবা চালু করেছে গণস্বাস্থ্য ডায়ালাইসিস সেন্টার

বৃহত্তম কিডনি সেবা চালু করেছে গণস্বাস্থ্য ডায়ালাইসিস সেন্টার

মেডিভয়েস ডেস্ক: দেশের বৃহত্তম কিডনী সেবা কেন্দ্র "গণস্বাস্থ্য ডায়ালাইসিস সেন্টার"  ১ম বর্ষপূর্তি…

আমাদের প্রথম কলেজ দিবস

আমাদের প্রথম কলেজ দিবস

আজ থেকে ছাব্বিশ বছর আগের কথা। আমি তখন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর