ডা. শরীফ উদ্দিন

ডা. শরীফ উদ্দিন

রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ

 

 


২১ এপ্রিল, ২০১৮ ০৮:৫৫ পিএম

ডাক্তারদের ‘কসাই’ উপাধি এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা

ডাক্তারদের ‘কসাই’ উপাধি এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা

ডাক্তারদেরকে কসাই বলা বা হাসপাতালকে কসাইখানা বলার প্রচলন সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কমিশনখোর বা দুর্ব্যবহারকারি ডাক্তারদেরকে দেখে শুরু হয়নি।

১৮৪৫ সালের পূর্বে সার্জারি বা শল্য চিকিৎসার কোনো উন্নতিই সম্ভব হয়নি। এই সময়ে প্রথম এনেস্থেশিয়া আবিষ্কার হয়। এর আগে যেকোনো রকম অস্ত্রোপচার খুব কঠিন ছিলো। মাথা বা পেটের ভিতর কোনো ধরণের অস্ত্রোপচার কল্পনাতীত ছিলো। এই জায়গাগুলোকে বলা হতো No Go Area।

অন্যান্য অস্ত্রোপচারগুলোর প্রক্রিয়াগুলোও ছিলো খুবই মর্মান্তিক। বিখ্যাত সার্জন লিস্টন মুত্রাশয়ের পাথরে আক্রান্ত এক রোগীর অপারেশন করছিলেন। অপারেশনের এক পর্যায়ে রোগী ডাক্তারের সহকর্মীদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করে নিকটস্থ শৌচাগারে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে বহু কষ্টে রোগীকে বের করে অপারেশন করা হয়।

১৮৪৯ সালে নিউইয়র্কে পনেরো বছর বয়সী এক কিশোরের পায়ে একটি সাদা টিউমারের জন্য পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়। চিকিৎসক কিশোরের ফিমোরাল শিরা স্পর্শ করেন এবং পা উঁচু করে ধরেন যাতে রক্তপাত কম হয়। পায়ের টিউমারটি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছিলো। কিশোরের পিতা শক্ত করে তার মাথা এবং পা ধরে রাখেন। প্রফেসর বিশাল চকচকে ছুরি হাতে কিশোরের পায়ের হাড় স্পর্শ করেন। ছেলেটির ভয়ানক চিৎকার আর ধস্তাধস্তি পরিবেশকে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর করে তুলছিলো। তার বাবার গণ্ডদেশ বেয়ে অশ্রু গড়াচ্ছিলো। হেরাল্ড ট্রিবিউন পত্রিকায় এই ঘটনার অত্যন্ত মর্মান্তিক বর্ণনা প্রকাশিত হয়।

এই যে কসাইখানার পশুদের সাথে ধস্তাধস্তির মত করে সার্জনদের অস্ত্রোপচারের চেষ্টা- এটাই হাসপাতালকে কসাইখানা আর চিকিৎসকদের কসাই পরিচিতি এনে দেয়। এনেস্থেশিয়ার আবিস্কারের ফলে ব্যথাহীন সার্জারি উন্নত বিশ্বের ডাক্তারদের এই উপাধি থেকে মুক্তি দিলেও উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত বিশ্বের চিকিৎসকরা কসাই উপাধি থেকে মুক্তি পায়নি। তবে সেটা ভিন্ন কারণে।

আমাদের দেশের কথাই বলি। চিকিৎসাসেবা পৃথিবীর সব দেশেই ব্যয়বহুল। উন্নত বিশ্বের সরকার এবং জনসাধারণ এই বিষয়ে সচেতন। তাই সেসব দেশের সরকার এই বিষয়ে সর্বোচ্চ বরাদ্ধ দেয়। সরকারের প্রচেষ্টার পাশাপাশি জনগণকেও স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনে। এর ফলে চিকিৎসা তা যতই ব্যয়বহুল হোক, রোগীর উপর প্রভাব ফেলতে পারে কম। রোগী সুস্থ হওয়ার পর হাসতে হাসতে বাড়ি ফেরে।

কিন্তু আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাত হচ্ছে সবচেয়ে অবহেলিত খাতের একটি। এখানকার ডাক্তাররা অসুখী, সিস্টাররা দুর্বীনিত, কর্মচারীরা জোটবদ্ধ মাফিয়া আর সরকার হচ্ছে সব ঝামেলা থেকে গা বাঁচিয়ে চলা উজিরে খামোখা। স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যথা নাই। উপযুক্ত বরাদ্ধ নাই, যতটুকু আছে তাও রোগী পর্যন্ত পৌছার আগেই হাওয়া হয়ে যায়।

দেশে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর জন্য সরকারী আইসিউ বেড আছে তিনশোর মত, লাখ লাখ কিডনি রোগীর মধ্যে নিয়মিতভাবে ডায়ালাইসিস করার সরকারী ব্যবস্থা আছে কয়েক হাজারের, ক্যান্সারের রোগীদের কেমোথেরাপির জন্য সরকারি বরাদ্ধ আছে যৎসামান্য। ফলে রোগিদেরকে যাবতীয় চিকিৎসাসেবার জন্য নিজের খরচেই চলতে হয় এবং অধিকাংশ রোগীর সেই সামর্থ্য থাকেনা। একজন রোগীর বিপুল চিকিৎসা খরচের যাবতীয় দায় রোগী শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের ঘাড়েই চাপিয়ে নিঃস্ব হাতে ঘরে ফেরে। শত চেষ্টার পরেও চিকিৎসকের কপালে জুটে কসাই উপাধি।

অথচ এই বিপুল ব্যয়ে চিকিৎসকের পকেটে যায় সামান্যই। কমিশনভোগী এবং অমানবিক ডাক্তারদের কথা স্মরণে রেখেও এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, স্বাস্থ্যখাতের এ দুরবস্থায় একজন ডাক্তারের দায় অতি সামান্য।

তাই সচেতন নাগরিকদের উচিৎ চিকিৎসকের দিকে ছুরি না শানিয়ে এই রাষ্ট্রের মানবিক হওয়ার দিকে দাবী জানানো। একটা মানবিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব- তার নাগরিকদের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ উপায়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

বিশাল সেনাবাহিনী, বিপুল সামরিক অস্ত্রভান্ডার, ক্রিকেটারদের পুরস্কার, রাষ্ট্রীয় দিবস পালনের জন্য কোটি টাকা বরাদ্ধ, নিজস্ব সেটেলাইট, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা সংরক্ষণ; সবগুলো বিষয়ই এই দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে; দেশের বিপুল সংখ্যক প্রান্তিক আর মধ্যবিত্ত মানুষদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত