ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


২১ এপ্রিল, ২০১৮ ০৬:০৫ পিএম
অ-মেডিকেলীয় গল্প

ভালোবাসা অধরা

ভালোবাসা অধরা

রহিম সাহেব অত্যন্ত সুখী মানুষ। স্ত্রী সন্তান ব্যবসা বানিজ্য সব নিয়ে আসলেই সুখী। এলাকার অত্যন্ত প্রভাবশালী দাপুটে মানুষ। কিন্ত গতকাল হঠাৎ করেই তিনি হার্ট এট্যাক করেছেন। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। চার পাচটি যন্ত্র তার হাতে পায়ে বুকে লাগানো। ডাক্তার বলেছেন খুব মারাত্মক না। তবে মারাত্মক হতে পারতো। তিনি সঠিক সময়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েছেন। সেখানে চিকিৎসক তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে একটা এম্বুলেন্স দিয়ে সোজা সিসিইউ তে পাঠিয়েছেন।

রহিম সাহেব শুয়ে শুয়ে চোখের জ্বল ফেলছেন, কারন তিনি আসার আগে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের লেডি ডাক্তারের সাথে দূর্ব্যবহার করে এসেছেন। কিছু হলেই নাকি তারা সদরে রেফার করেন, এই অভিযোগে। কাজটি তার ঠিক হয়নি। ভাবছেন সুস্থ হয়ে ফিরে তার কাছে ক্ষমা চাইবেন।

তার স্ত্রী হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে তসবিহ। চোখে অবারিত জল। দুটো বাচ্চা তাদের একজন দেশের বাহিরে আরেকজন ঢাকায় থাকে। তাদের খবর দেওয়া হয়েছে। তারা রওনা হয়েছে। তিনি মাঝেমধ্যে জানালার গ্লাস দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখছেন স্বামীকে। করোনারী কেয়ার ইউনিটে স্বামীর পাশে কাউকে থাকতে নেই। কারন কথাবার্তা গল্প গুজবে হার্টের উপর প্রেশার পড়ে খারাপ কিছু হয়ে যেতে পারে।

স্ত্রী চম্পার কান্না থামছেই না। লোকটির সাথে সংসার বিশ বছরের। তার একে একে সব মনে পড়ছে। হঠাৎ বিয়ে, সেই সাথে তার নিজের শৈশব দুরন্ত কৈশোর। ক্লাস নাইনে পড়া কালীন সময়ে চোখে পড়েন এক মধ্যবয়সী পুরুষের। নাছোড় বান্দা সেই লোকটি তার প্রভাব প্রতিপত্তি খাটিয়ে, একরকম জোর করেই তাকে ঘরে তুলে আনেন।

নিতান্তই কিশোরী চম্পা কিছুই বুঝতে পারে না। তার অসহায় বাবা মা হার মানেন রহিম সাহেবের দাপটের কাছে। প্রথম কয়েকদিন ঘরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতো। বারান্দার গ্রীল ধরে কেবল কাঁদতো আর কাঁদতো। এভাবেই দিন থেকে মাস তার পর বছর। গুনে গুনে বিশটি বছর। সেদিনের সেই বোবা কান্না, চোখের জল আর আজকের কান্না আর চোখের জলে অনেক তফাৎ।

বয়সের তফাৎ হলেও রহিম সাহেব তাকে সম্মানের সাথেই রেখেছিলেন। না চাইতেই অনেক কিছু তার চোখের সামনে এনে হাজির করা হতো। চম্পার সেসবে তেমনে একটা আগ্রহ হতোনা। তার মন ব্যাকুল থাকতো ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে। কি মুক্ত আকাশ। পাখিরা ডানা মেলে উড়ছে অসীম আকাশে। তার খুব উড়তে ইচ্ছে করতো। কিন্তু রহিম সাহেব তাকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলে দেখলে ক্ষেপে যেতেন। ধমকে বলতেন, কার অপেক্ষায় ওদিক যাও।

আজো সে কাঁদছে, আর পাখিদের উড়াউড়ি দেখছে। আজ তার আর উড়তে ইচ্ছে করছেনা। কিন্তু সে আগ্রহ নিয়ে তাদের উড়াউড়ি গুলো দেখছে। একটু পর পর চোখের জল মুছছে। রহিম সাহেব আজ আর ধমকাচ্ছেন না। বলছেন না কার দিকে তাকাও। 

সে বুঝতে পারেনা তার আজ তার চোখের জল স্বামীর জন্যে নাকি ডানা মেলে স্বাধীন হয়ে পাখির মতো মুক্ত আকাশে উড়তে না পারার জন্যে।

হঠাৎ একজন নার্সের ডাকে তার সম্বিৎ ফিরে আসে। হাতে তাসবীহ টা ব্যগে রেখে বলে, 

কি হয়েছে?

আপনার স্বামীর অবস্থা হঠাৎ করে খারাপ করেছে। আসুন..

চম্পা ধীর পায়ে এগিয়ে যায় স্বামীর কাছে।

তার খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ইশারায় পাশে বসালেন। হাতটি ধরে বুকের কাছে নেন রহিম সাহেব। তার চোখে বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আস্তে আস্তে বললেন, 
আমাকে মাফ করো। নাকে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো থাকায় চম্পা বুঝতে পারলো না কথা গুলো।

চম্পা দেখলো তার রহিম সাহেবের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। চোখ গুলো স্থীর হয়ে যাচ্ছে। চম্পার স্মৃতিতে ভাসছে, এরকম তারও শ্বাস বন্ধ হয়েছে, চোখ দুটো ও স্থীর হয়েছে বার বার গত বিশটি বছর। বার বার মরে গিয়েও সে বেঁচে উঠেছে। সে রহিম সাহেবের চোখের জল মুছে দেয়। স্থির চোখ দুটো বুজে দেয় এক সময়। রহিম সাহেব যে ভাবে মাঝেমাঝে তার চোখ দুটো মুছে দিতেন, বুজে দিতেন ভালোবাসা হীন শীতল পরশে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে