ডা. মোঃ এজাজ বারী চৌধুরী

ডা. মোঃ এজাজ বারী চৌধুরী

ডায়াবেটোলজিস্ট এবং হেড অব ডায়াবেটিস সেন্টার

মুন্নু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল


২০ এপ্রিল, ২০১৮ ০৬:০২ পিএম

ভালোবাসার পোষ্টমর্টেম

ভালোবাসার পোষ্টমর্টেম

এক: নাটক - সিনেমার কল্যাণে ছোটবেলা থেকেই ধারণা জন্মেছিলো, ‘‘ভালোবেসে” বিয়ে করতে পারলেই বোধহয় কেবল সুখী হওয়া যায়৷ তাই ঠিক করেছিলাম, ভালোবেসেই বিয়ে করবো এবং তারপর সারাটা জীবন সুখের সাগরে ভেসে বেড়াবো৷

যাইহোক, সৃষ্টিকর্তা আমার মনের ইচ্ছা একসময় পূরণ করেছিলেন — তবে আমার ইচ্ছে অনুযায়ী নয়... তাঁর ইচ্ছে অনুযায়ী!

দুই: আমার ভালো লেগেছিলো অপূর্ব সুন্দরী স্নিগ্ধা কে — যে দেখতে ছিল, আমার সবচেয়ে প্রিয় টিভি সিরিয়াল "The X Files" এর নায়িকার মতো, কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশী সুন্দর৷ 

মেয়েদের সাথে কখনো মিশিনি, তাদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তা জানিনা এমনকি তাদের মনও বুঝিনা ... তেমন সময়কার কথা এটা৷ তার উপর আমার যেই unsmart স্বভাব, সব কিছু সরাসরি বলা — তাই প্রথম যেদিন কথা বললাম, সেদিনই তাকে আমার ভালোলাগার কথা বলেছিলাম৷

ঢাকার সুন্দরী, স্মার্ট, অনেক ছেলে বন্ধুওয়ালা মেয়েটি খুব মজা পেয়েছিলো, প্রথম দেখাতেই আমার এমন আনস্মার্ট proposal শুনে! শুরুতেই সে আমাকে বোল্ড আউট করে দিলো, আমি তার সমবয়সী বলে৷ তার দর্শন ছিলো, সমবয়সীরা কেবলই বন্ধু হতে পারে ... জীবনসঙ্গী না৷

এরপরও সে নিজের থেকে মাঝে মধ্যে আমার সাথে কথা বলতো... এক কোচিং থেকে আরেক কোচিং পর্যন্ত আমরা কথা বলতে বলতে যেতাম৷  আমার অনেক কথাতেই সে খুব মজা পেতো, আর প্রাণ খুলে হাসতো! মনে হওয়া শুরু হলো, আমাকে বোধহয় তার অল্প অল্প ভালো লাগা শুরু হয়েছে৷ 

তাই আশায় আশায় আরেকদিন কথাটা বললাম৷ সে বললো, তুমি বন্ধু হিসেবে খুবই ভালো আর অসাধারণ একজন — তোমার বন্ধুত্ব আমি হারাতে চাইনা! বিরক্ত হয়ে আমি বললাম, আমি শুধু একজন মেয়েরই বন্ধু হবো ... যার সাথে সারাটা জীবন কাটাবো৷ আর অন্য কোন মেয়ের বন্ধু হতে আমি interested নই!

তিন: আমি ওই কোচিংয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম৷ মেস ছেড়ে দিয়ে এক আত্মীয়ের বাসায় উঠলাম... যেটুকু পিছিয়ে পড়েছি এই ভালোবাসা জোটানোর মরীচিকায়, সেটুকু কাভার করার জন্য সিরিয়াস পড়াশোনা শুরু করলাম৷ স্নিগ্ধা কে প্রায় ভুলে গেলাম৷

কিন্তু সে ঠিকই দু এক মাসের মধ্যেই আমার এক বন্ধুর সাহায্য নিয়ে আমাকে খুঁজে বের করলো... এবং আমার ওই আত্মীয়ের বাসায় ফোন করে, আমাকে বিস্ময়ে হতবাক করে দিলো৷ আমাকে তার বাসার ফোন নম্বর এবং কখন কখন ফোন করা যাবে সেটাও  বলে দিলো৷ এদিকে ভর্তি পরীক্ষার বেশী বাকী নেই... তাই ফোন নিয়মিত করা হতো না৷ তবে যখন করতাম, এক দেড় ঘন্টার আগে সে ফোন রাখতো না৷ আমি ধরেই নিলাম, আমি জিততে চলেছি৷

আবার একদিন ওই প্রসঙ্গ তুললাম ... এবং সে-ও একই উত্তর দিলো৷ শেষ চেষ্টা হিসেবে একটা চ্যালেন্জে ওকে রাজী করালাম৷ চুক্তি হলো, আমি যদি DMC তে চ্যান্স পাই, তবে আমিই জিতবো.... আর ওর Year mate theory হেরে যাবে৷

চ্যালেন্জে জিতলাম, কিন্তু সে তার কথা রাখলো না৷

চার: DMC তে প্রথম দিনই এমন কান্ড ঘটিয়ে ফেললাম যে, পুরো মেডিক্যাল কলেজ তো বটেই এমনকি বুয়েটেও আমার নাম (?) ছড়িয়ে পড়লো৷ সামান্য একটা পা এর dissection দেখতে গিয়ে, মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম৷ মাথার পেছনে তিনটি সেলাই দেয়া লাগলো! প্রথম দিন থেকেই গায়ের Apron এর পাশাপাশি, মাথায় ও ব্যান্ডেজের Apron জুটলো আমার!

৭ দিন পর সেলাই কেটে ব্যান্ডেজ মুক্ত হবার পর, আমাদের ব্যাচের একটি মেয়ে এসে আমার সাথে পরিচিত হলো এবং আমার সাথে তার পড়াশুনা করার ইচ্ছের কথা জানালো৷ কয়েকদিন পর থেকে, আমরা একসঙ্গে পড়া শুরু করলাম৷

তারও কয়েকদিন পর স্নিগ্ধা আসলো DMC তে, আবারো আমাকে অকল্পনীয় surprise দিয়ে! সেদিন ছিলো আমার Birthday. আমাকে নিয়ে সে একটা Fast food এর দোকানে গেলো এবং কেক কেটে আমাকে wish করলো৷ ঐদিন স্নিগ্ধা এতো সুন্দর ড্রেস পরে আর সেজে এসেছিলো যে, আমার মনে হচ্ছিলো... এই পুরো পৃথিবীতেই ওর থেকে সুন্দরী বোধহয় আর কেউ নেই! 

স্নিগ্ধার ভেতর একটু ঈর্ষা আনার জন্য সোমার কথা বললাম৷ এছাড়া ওকে যে ভুলেই গিয়েছিলাম, সেটাও বললাম৷ জবাবে ও বললো, এভাবে হা করে আমাকে দেখছো কেন ... গলায় মাছি ঢুকবে! 

আমি feel করলাম, এই মেয়ের মন পড়তে বা বুঝতে পারার চেষ্টার চেয়ে... গলায় মাছি আটকে মরে যাওয়াও সহজ!!!

পাঁচ: পড়ার ফাঁকে ফাঁকে সোমার সাথে স্নিগ্ধা কে নিয়ে গবেষণা করতাম৷ সে কেন এটা করলো, কেন ওটা বললো... এসবের ব্যাখা জানতে চাইতাম৷ কিন্তু আরেক নারী হৃদয়ের কাছেও তার এসব কাজের বেশীরভাগই The X-Files এর রহস্যই হয়ে থাকতো৷ এর মধ্যে স্নিগ্ধার কাছে শেষবারের মতো জানতে চাইলাম, সে তার Year mate theory নিয়েই থাকবে কিনা? যদি তা-ই থাকে, তাহলে আমি তার সাথে কোনো যোগাযোগই আর রাখবো না৷ সে দেখা করে জবাব দিতে চাইলো৷ আমি ভাবলাম, "অবশেষে উনাকে পাইলাম!"

দেখা করার দিন, সোমার কাছ থেকে অনেক Tips নিয়ে বের হলাম৷ কোন ড্রেস এ আমাকে সবচেয়ে হ্যান্ডসাম লাগবে.... সেটাও সোমা ঠিক করে দিয়েছিলো!

আমার দুরুদুরু মন, আনন্দে ঝলমল করে উঠলো স্নিগ্ধার কথা শুনে! বললো, সে  জীবনে যতো চিঠি পেয়েছে, তার সবই ফেলে দিয়েছে ... শুধু আমার গুলো ছাড়া৷ আমার চিঠিগুলো তার এতোই ভালো লাগে যে, সে বারবার পড়ে৷ সারা জীবন সেগুলো সে রেখে দেবে ... এমনকি তার নাতি নাতনীদেরকেও পড়াবে! আমাকে সে খুব পছন্দ করে, কোনোদিনও হারাতে চায়না ... তবে তা কেবল বন্ধু হিসেবে! 

ঐদিন স্নিগ্ধার কথাগুলো শুনে হয়তো বিধাতাও অট্টহাসি দিয়েছিলেন৷

ছয়: স্নিগ্ধার বিরক্তিকর কর্মকান্ড আর আমার reading partner সোমার মনের সৌন্দর্য... সুন্দর চেহারার প্রতি আমার মোহকে আস্তে আস্তে কাটিয়ে দিতে লাগলো৷

এরই মধ্যে একদিন, আমাদের ব্যাচের অন্য একটি ছেলে, যে ছিলো অনেক বেশী সুদর্শন ... সে সোমাকে propose করলো৷ ছেলেটি আমাকেই তার পোষ্টম্যান বানালো, তার চিঠিটি সোমাকে পৌঁছে দেবার জন্য! আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই মজা করতে করতে চিঠিটি সোমাকে দিলাম এবং congratulate ও করলাম! ধরেই নিলাম, এরপর থেকে আমাকে একা একাই পড়তে হবে৷

সাত: হোষ্টেলে ফেরার পর, বুকের ভেতরটা কেমন যেন করতে লাগলো! আমার প্রতি সোমার caring আর আমাকে ঘিরে ওর সুন্দর সুন্দর স্বপ্নগুলো বারবার মনের পর্দায় ভেসে উঠতে লাগলো৷ 

এরপর থেকে কেউ আর আমার রেজাল্ট খারাপ হলে, মন খারাপ করে বসে থাকবেনা! আমার পড়া শেষ হলো কিনা সেই টেনশনে থাকবে না! কোন ড্রেসটাতে আমাকে মানায় না সেটা নিয়ে মাথা ঘামাবে না! চুল বড় হলে ঠেলে ঠেলে আমায় চুল কাটতে পাঠাবে না! 

আমি সময়মতো খেলাম কিনা, আজ মাছ/মাংস না খেয়ে টাকা বাঁচালাম কেন, ২ কাপ চা না খেয়ে ১ প্যাকেট দুধ খেতে পারতাম ... ইত্যাদি বলে আমার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবেনা!!!

সোমাকে তো আমি ভালোবাসার কথা কল্পনাতেও আনিনি তখনো৷ ওর চেহারা তখনো আমায় মুগ্ধ করেনি৷ সে রিডিংরুমে বসে আছে জেনেও, আমার ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে হতোনা — অনেক সময় ২ - ৩ ঘন্টা পর যেতাম৷ এমনকি কোন occasion এ ওকে সামান্য কিছু উপহার দেবার কথাও কখনো মাথায় আসেনি আমার! 

কিন্তু আমার এত উদাসীনতাও আমার প্রতি তার মমত্বকে একটুও কমাতে পারেনি!

"আমাদের সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্খীও যে অনেক সময় মনের আড়ালেই রয়ে যায় এবং শুধুমাত্র তাকে হারানোর সময়ই আমরা সেটা বুঝতে পারি..." এই সত্যটাও হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করলাম!

নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, সবকিছু সবার ভাগ্যে থাকেনা৷ যাকে পেতে চাইতাম, সে আমাকে চায়নি৷ আর যে আমার জীবনটাকে সত্যিকারভাবে সাজিয়ে দিতে পারতো, তাকে পাবার কথা মাথায় ও আনি নি!

আট: এর পরের ঘটনাগুলো ছিলো আমার জন্য খুবই অপ্রত্যাশিত৷ আমাদের ব্যাচের সেই সুন্দর, হ্যান্ডসাম ছেলেটিকে সোমা "না" করে দিলো৷ আমাকে বললো, কারো সাথে প্রেম করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও ওর নেই — এমনকি সে বিয়েও করতে চায় না! সুতরাং আবার শুরু হলো আমাদের একসঙ্গে পড়া!

কিন্তু আমি উপলব্ধি করছিলাম, এমন একজনকে নিয়েই জীবনের পথ পাড়ি দিতে হবে, যে চলার পথে তার পুরোটা খেয়াল আমার দিকেই রাখবে৷ আমি পাথরে হোঁচট খেলে, আমাকে সাথে সাথে আঁকড়ে ধরবে! কিংবা পড়ে গেলেও সে সব কিছু ভুলে আমাকেই প্রথম উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করবে — আমার পড়ে যাওয়া নিয়ে উপহাস করবেনা৷ 

তাই এবার আমি সোমাকে reading partner থেকে ভবিষ্যত life partner হবার proposal দিলাম!

১৯ বছর আগের আমার সেই Reading partner একসময় তার বিয়ে না করার decision change করলো৷ এবং অবশেষে বিয়ে করলো — এই অপদার্থ আমাকে!

নিতান্ত গোবেচারা বলেই হয়তো, এখনো আমাকে নিয়েই সে হাসে — সুখের হাসি, প্রশান্তির হাসি!

সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না