ডা. মনিরুল ইসলাম

ডা. মনিরুল ইসলাম

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল


১৯ এপ্রিল, ২০১৮ ১০:৫১ এএম

‘উটপাখির দেশে একটি ডান হাতের গল্প’

‘উটপাখির দেশে একটি ডান হাতের গল্প’

বিবেকের কাছে হেরে যাওয়ার চাইতে মৃত্যুর কাছে হেরে যাওয়া কি বেশি ভালো? এত মানুষের ভিড়ে একজন রাজিব না থাকলে কী হবে? সে নেই তাতে কি হয়েছে! আমিতো বেশ আছি, আমরাও ভাল আছি। এ কি মৃত্যু নাকি হত্যা? 

আমাদের সময়ে খুব সাধারণ ঘটনা। রাজিবের মৃত্যুর জন্য রাজিব নিজেই দায়ী? একটা হাত না থাকা এমন কিছু নয়। রাজিবের মত হতভাগাদের অভিমানী হতে নেই। যে অভিমান স্পর্শ করেনা। যে অভিমানের অর্থ বোঝার ক্ষমতা আমাদের নেই। অভিমানী রাজিবের চলে যাওয়াটাই নিয়তি ছিল। কিছু যুদ্ধ অসমাপ্ত থেকে যায়। হায়েনার থাবায় ক্ষতবিক্ষত হয় একটা সাধারণ জীবন।

ক্ষতবিক্ষত হয় বৃষ্টিস্নাত কোনো এক দিনে কদম ফুল হাতে নিয়ে প্রিয়তমাকে বলবে ভালোবাসি। মানুষের মৃত্যুর চাইতে স্বপ্নের মৃত্যু বড় বেশি বেদনাদায়ক। বাবা নেই, মা নেই, একান্ত আপনজন ছিল তাঁর শরীর। খুব প্রিয় সে ডান হাত, যে হাতে প্রিয়তমাকে বুকে জড়িয়ে একদিন বিজয়ের গল্প বলবে। হয়না কিছুই। রাজিবেরা হেরে যায়, হেরে যায় সভ্যতার কাছে, হেরে যায় জীবনের কাছে। হেরে যায় আইনের ভাষায়। দায় এড়িয়ে যায় ঘাতকেরা। কোনো দায় থাকেনা রাষ্ট্র, সরকার ও তাঁর সংবিধানের উপর। দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতায় আমি, তুমি ও আমরা।

হাইকোর্ট জানতে চায় কেন দেওয়া হবেনা এক কোটি টাকার ক্ষতিপুরণ। মন্ত্রী গিয়ে চাকরির আশ্বাস দেয়। বেঁচে থাকলে হয়ত আরো কিছু প্রতিশ্রুতি আসত। খুনি শহরের ট্রাফিক সিগনালে ভিক্ষুক হিসাবে চাহিদাটাও বেশ ওপরেই থাকত। কিন্তু রাজিবেরা খুব আদর্শবাদী, মধ্যবিত্তের সেটাই সম্বল। অভিমানটাও এদের বেশি, ওরা অপেক্ষা করেনা হাইকোর্টের আদেশের জবাবের, অপেক্ষা করেনা কাটা হাতের বিনিময়ে একটা চাকরির। বোকার মত চলে যায় মাটির ঠিকানায়, যেখানে বাশুরিয়া বাজায় বাঁশি সপ্নহীন গেঁয়ো সুরের সাজানো জলসায়।

স্থিরচিত্রের মহাসামুদ্রিক রাজিবের চোখজোড়া কী যেনো বলতে চায়, খুব শান্ত ধিরস্থির সে চাহনি। সেদিন কাটা হাত আর রাজিবের পথ দুটো দুদিকে বেঁকে গিয়েছিল। হয়ত অভিমানী প্রেমিকের মত অভিমান করেছিল মস্তিষ্ক,  অভিমান করেছিল হৃদয়। খুনের শহর সীমান্তের কাঁটাতার হয়ে বিচ্ছিন্ন করেছিল সাদাচোখে সামান্য হয়ে যাওয়া একটা হাত। আজ তাঁদের মিলন হল, কাটা হাত আর রাজিবের জীবনের। মিলন হল বাংলা সিনেমার অবধারিত শেষ দৃশ্যের মত অথবা ‘অতঃপর সুখে শান্তিতেই তাহাদের দিন কাটিতে লাগিল।’

কিন্তু না, কোথাও ওরা  শান্তি পায়না। কারণ জন্মই ওদের আজন্ম পাপ। আজন্ম পাপীরা ওপারেও ভাল থাকেনা। ভাল থাকার বাধ্যবাধকতার পূজা দেয়ার অভ্যাস ওদের নেই। ওরা জানে নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা পায়না। শুধু একবুক পরাজিত অভিমান নিয়ে চলে যায় না ফেরার দেশে, বরাবরের মত মেধাবী ছাত্র হয়ে। 

উটপাখি আর বালুহীন একটা দেশে। রাষ্ট্র, সরকার, সুশীল আর বুদ্ধিজীবীর অভাবে হাহাকার করতে থাকা একটা দেশে। শত সহস্র রাজিবের কাটা হাতের আলিঙ্গন হয় সে দেশে। প্রগাঢ় এক ভালোবাসার আগুন থাকে হৃদয়ের উপকূলে। 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত