ঢাকা      মঙ্গলবার ২৪, এপ্রিল ২০১৮ - ১১, বৈশাখ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. শামসুল আলম

অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী চিকিৎসক,

সাবেক শিক্ষার্থী, ওসমানী মেডিকেল কলেজ, সিলেট। 


গল্প

‘স্বপ্নপূরণ’ 

১৬/০৮ /২০০৩ 
আগের রাতের দুঃস্বপ্নই বলে দিয়েছে এবারো পাশ হবেনা তবুও একটু ক্ষীণ আশা নিয়ে নোটিশ বোর্ডে আরিফ খুঁজে ফিরছে তার নামটা। মেডিসিন, সার্জারি ক্লিয়ার কিন্তু এই নিয়ে পাঁচবার শুধু গাইনি অবস ফাইনাল প্রফ। হার্টটা এতো জোরে লাফাচ্ছে যেন বুক থেকে বের হয়ে আসবে। একবার মনে হলো আসলে তার রেজাল্ট দেখতে আসাই উচিত হয়নি।  

তারপর একসময় বুকটা শূন্য হয়ে গেলো, চোখদুটো কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে, শেষবারের মত আরেকবার পাশের লিষ্টটা দেখলো আরিফ কিন্তু না, নামটা নেই। আরিফ হোসেন বলে কেউ নেই।

এখন কি? কি করবে? একটু ভেবে কি মনে করে ছাদের দিকে হাঁটা দিলো, খুব মন খারাপ হলে আরিফ হোস্টেলের ছাদে গিয়ে বসে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, আকাশের বিশালতা তার মন ভালো করে দেয়। এই একটা জিনিস অনেক সুন্দর, সে শুনেছে আকাশের ওপারে নাকি আরো আকাশ আছে কিন্তু আজ আর আরিফের কিছুতেই মন ভালো নেই। আকাশেরও কি আজ মন খারাপ? কেমন মেঘলা হয়ে আছে। কাল রাতে দেখা দুঃস্বপ্নটি আবারো মনে পড়লো, সে বিছানা থেকে মাটিতে পড়ে গিয়েছে। এই স্বপ্ন কি কোনো ইঙ্গিত?

এক মূহুর্তেই আরিফ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, আর নয়, অনেক হয়েছে। কাজটা হলো শুধু ছাদের শেষ কিনারে গিয়ে শূন্যে একটা স্টেপ দেয়া, তারপর শুধু চোখ বন্ধ করে অন্ধকারে ঘুমিয়ে পড়া। তার আর কোনো ভয় নেই। আর কোনো সাপ্লি নেই। সে পারবে, তার সময় হয়ে গেছে।

আরিফ ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। যে পাশে ছাদটার কোনো রেলিং নেই শুধু সেই দিকে সোজা হেঁটে যেতে হবে এতটুকুই কাজ। আরিফ হাঁটছে, খুব ধীরে হাঁটছে, জীবনের এই শেষ মুহূর্তে এসে তার আজ আর কোনো তাড়া নেই। এইতো সব যন্ত্রণার শেষ। একটু সময় নিয়ে হাঁটলে কি আর এমন ক্ষতি। সে এগিয়ে যাচ্ছে তবে খুব ধীরে।

হঠাৎ মায়ের মুখটা চোখে ভেসে উঠল। মা খুব কাঁদবেন কিন্তু কি আর করা, আমি আর পারছিনা মাগো, মানুষের একটা সীমা থাকে সেটা সে অতিক্রম করতে পারে না। 

বাবা বোধ হয় স্কুল থেকে মাত্র ফিরেছেন, ক্লান্ত বাবা বিশ্রাম নাও, আর তোমার কাছে টাকা চাইবোনা। বড় আপুটা গত বার আসার সময় পকেটে একহাজার টাকার একটা নোট দিয়ে কি যেন বলেছিল, কিছুতেই আর এখন মনে পড়ছে না। কেমন মন! আচ্ছা ঢুলির কি খুব অভিমান হবে? ঢুলি আরিফের ছোট বোন আসল নাম মারুফা আক্তার। সারাদিন গুন্ গুন্ করে খালি গান গায় তাই সে নাম দিয়েছে ঢুলি।  

আচ্ছা, এই সময় কেন সবার কথা এইভাবে মনে পড়ছে, ব্যাপারটা কি? অনেকটা মনে মনে বিদায় নেয়ার মত। আরিফ আরো ভেবে অবাক হলো কারণ তার নীলার মুখটাও মনে ভেসে উঠলো। কি আজব মানুষের মন, সে যাচ্ছে মরতে আর তার কিনা মনে পড়ল নীলার কথা। পরক্ষণে মনে হলো আসলে সেতো আর নিজেকে কন্ট্রোল করছে না। মন আর তার নিয়ন্ত্রনে নেই। এখন তার বিদায়ী আত্মা নিজের মত করে সব ভেবে নিচ্ছে। নীলার ব্যাপারটাও তাই। তার ইয়ারমেট মেয়েটাকে সে থার্ড ইয়ার থেকে মনে মনে ভালোবেসেছে কিন্তু মুখ ফুটে কোনদিন বলতে পারেনি।

এখানেই তার সব দুর্বলতা, সে অনেক কিছুই পারেনা, নীলা সেই কবে ইন্টার্নি শেষ করে ক্যাম্পাস থেকে চলে গিয়েছে। হয়তো বিয়েও করেছে এতদিনে। গাইনি অবসের মত নারীও কিনা তার ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু কেন এমন হলো? আরিফ ভেবে অবাক হয় সেতো নারী সম্পর্কে সব জানে। রবি ঠাকুরের ‘লাবণ্য’,শরতের ‘বিজয়া’ কিংবা সমরেশের ‘মাধবীলতা’ কোন চরিত্রটা তার অজানা। সে সব বলে দিতে পারবে। তার বিশ্বাস কোনো নারীকে দেখলেই সে তার মনটাকে পড়ে ফেলতে পারে কিন্তু এই গাইনি বিষয়টা সে কেন পড়ে ফেলতে পারলো না। এমনিওটিক ফ্লুইড নামটা মনে পড়লেই কেন তার ভীষণ বমি পায়। গতবার ভাইভা বোর্ডে দিলারা ম্যাডাম এই ফ্লুইডের কালার জানতে চেয়েছেন। সে জানে এটা স্বচ্ছ কিন্তু চুপ করে ছিল। বলেনি কিংবা বলতে পারেনি।

আরিফ ছাদের প্রায় শেষ প্রান্তে চলে এসেছে আর হয়তো দুই একটা স্টেপ। ঠিক সে সময় তার মনে হলো আচ্ছা, দিলারা ম্যাডামের কাছে গিয়ে একবার ক্ষমা চেয়ে আসলে কেমন হয়। শুধু গিয়ে বলবে, ‘ম্যাডাম আমাকে ক্ষমা করে দিবেন’ তারপর ম্যাডাম যখন তার আত্মহত্যার খবর পাবেন নিশ্চয়ই একটু কষ্ট পাবেন। ভাববেন, কেনো ছেলেটাকে... ভালো হবে, এতটুকু কষ্ট উনার প্রাপ্তি।

আরিফ থামলো। এই দিলারা ম্যাডাম তাকে থামিয়ে দিলো। ফিরে নীচের দিকে তাকালো, আরেকটা স্টেপ বাকি ছিলো।

সোজা হেঁটে চলে আসলো হসপিটালে। দিলারা ম্যাডামের রুমে উঁকি দিয়ে দেখলো ম্যাডাম নেই। ফিরে আসবে এমন সময় পথে দেখা গাইনি রেজিস্ট্রার মিতু আপার সাথে। তিনি দেখেই একটু হাসি দিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কি আরিফ পাশ করেছো, ম্যাডামের সাথে দেখা করতে এসেছো?
-না আপা, হয়নি।
-আমি দঃখিত আরিফ। আচ্ছা, তুমি কি গাইনিকে খুব ভয় পাও?
-জানি না। 
-তুমি কি কখনো সামনে দাঁড়িয়ে থেকে একটা কমপ্লিট ডেলিভারি দেখেছো?
-না আপা, লেবার ওয়ার্ডে গিয়েছি কিন্তু কারো ডেলিভারি দেখার ইচ্ছে করেনি। আমার এসব দেখতে ভালো লাগে না।
-অলরাইট, আজ আমি তোমাকে আর ছাড়ছিনা। আসো আমার সাথে লেবার ওয়ার্ডে। আজ তোমাকে দেখতেই হবে। আমি তোমার কোনো কথা শুনবোনা। 

মিতু আপা হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন লেবার ওয়ার্ডে। 

এই সেই লেবার ওয়ার্ড। অনেক দিন পর আবার ফিরে আসা। এক একটা বিছানায় এক একটা মা। এখানে এক অন্যরকম শক্তি পরীক্ষা। পেটের-পিঠের সমস্ত মাংস পেশির শক্তি দিয়ে এক দুর্বল নারী বের করতে চেষ্টা করছে আরেক মানব শিশু। আর সেই সাথে আল্লারে...বাবারে...মা গো ...ও...বিলুর বাপ। ডাক্তার আপা গো। কত বিচিত্র সব শব্দ আর কান্না।

আরিফ অবাক হয়ে দেখছে। মিতু আপা নিয়ে গেলেন এক বিছানায় সেখানে একটা বাচ্চা উল্টা দিক থেকে এসেছে। হাত পা সব বের হয়ে এখন শুধু মাথাটা আটকে আছে। মা টা চিৎকার করছেন আর পুশ করেছেন মাথাটা বের করে দিতে। আরিফ বুজতে পারছে তার শরীর কাঁপছে অথচ মিতু আপা কেমন নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে বলে যাচ্ছেন ‘দেখেছো এটা হলো ব্রিচ প্রেজেন্টেশন, শেষে এসে মাথা আটকে পড়েছে, বেশিক্ষন রাখা যাবে না, বাচ্চাটা মরে যাবে, টানাটানি করা যাবে না, কর্ড ছিঁড়ে যাবে, দেখো আমরা কিভাবে বের করি’।

মিতু অপার অনেক চেষ্টার পর যখন বাচ্চাটা বের হয়ে চিৎকার দিলো। আরিফ মায়ের মুখে দেখলো কেমন প্রশান্তির হাসি। মনে হলো এভাবেই মা তাকে জন্ম দিয়েছেন। এতটা কষ্ট করেই কি তাহলে মায়েরা সন্তান জন্ম দেয়। 
মিতু আপার শেষ কথাটা ‘বুঝলে আরিফ মানুষ সবই পারে, শুধু ধরে থাকতে হয়’।

হাসপাতাল থেকে আরিফ যখন বের হলো তখন সে অন্য মানুষ। নতুন করে জন্ম নিয়েছে সে। মনে মনে শপথ করেছে, যদি দশ বছরও লাগে সে চেষ্টা করে যাবে। গাইনি সে পাশ করবে, ইন্টার্নি করবে। প্রথম মাসের বেতন থেকে মাকে একটা শাড়ি কিনে দিবে। কানে কানে বলবে ‘মাগো, আমার জন্মের সময় তুমি হাল ছাড়োনি,আমিও ছাড়িনি মা’।

১২/০৫ /২০০৭
রাত নয়টায় একটা ইমার্জেন্সি সিজার করছেন ডাক্তার মিলি। স্পাইনাল দিয়েছেন ডিএ কোর্সের ছাত্র ডাক্তার আরিফ। মিলি যখন ইউটেরাস থেকে বাচ্চাটা বের করলেন,সাথে সাথে আরিফ বলল; 
-ইট'স বিউটিফুল 
-কি বিউটিফুল আরিফ ভাই? মিলির প্রশ্ন। 
-এই যে তোমরা মায়ের পেট কেটে আটকে পড়া বাচ্চাগুলো বের কর, এই দৃশ্যটা আসলেই সুন্দর।
-রোজ রোজ এই দৃশ্য দেখার জন্যই কি এনেস্থেসিয়া ক্যরিয়ার করছেন?
-সম্ভবত, তবে বুঝলে মিলি মানুষের জন্মই সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। কি পবিত্র, কি নিষ্পাপ মানুষের আগমন, আমি দেখে মুগ্ধ হই।
এই কথা গুলো মিলির কেনো এত ভালো লাগলো সে জানে না। শুধু এই লোকটার সাথে আরেকটু কথা বলার জন্য সিজার শেষে বলল;
-চলুন আরিফ ভাই কেন্টিনে গিয়ে একটু চা খেয়ে আসি।

সেই চা খাওয়া আর থামেনি। আরিফ আর মিলি এখনো প্রায় রোজ দুজনে একই ঘরে বসে চা খায়। বিয়ের প্রায় ছয় বছর হয়ে গেলো।

২০/০২/২০১৫
প্রায় দশ বছর পর আরিফ এসেছে ক্যাম্পাসে। ব্যাচের পূর্ণমিলনী সাথে মিলিও। সেই হোস্টেল, সেই ছাদ আর আকাশ। আরিফ মিলিকে নিয়ে একটু ছাদে আসল তারপর কি মনে করে বলে ফেলল; 
-জান মিলি, আমি একদিন এই ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম।
-ও মা, বলো কি? তুমি না আসলেই একটা পাগল।
-কিন্তু আমি যে পাগলের মত ভালবাসতে পারি সেটা জানতো?(আরিফের হাসি মুখে প্রশ্ন)

প্রশ্ন শুনে মিলি আরিফের আরো একটু কাছে এসে দুহাত দিয়ে আরিফের বাম হাতটাকে শক্ত করে ধরে শুধু আস্তে করে বললো; 
-হ্যাঁ, জানি। 

আজ আর আরিফের কোনো ভয় নেই। কোনো পিছুটান নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মানসিক বিকাশহীন অসুস্থ প্রজন্ম তৈরির জন্য কারা দায়ী?

মানসিক বিকাশহীন অসুস্থ প্রজন্ম তৈরির জন্য কারা দায়ী?

দশ বছরের মেয়ে রাত ১টায় হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে আসল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম,…

বাঙালি ডাক্তারের বিদেশ যাত্রার গল্প

বাঙালি ডাক্তারের বিদেশ যাত্রার গল্প

এইটাই বাকি ছিল। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী লন্ডনে হল ভর্তি লোকের সামনে বললেন ভারতীয়…

সেদিন বৃষ্টি ছিল

সেদিন বৃষ্টি ছিল

হাসপাতালে আমি পারত পক্ষে রোগী ভর্তি দেই না। হাসপাতাল কোন মধুজগত না…

ভালো থাকুক ওপারের নতুন ডাক্তাররা

ভালো থাকুক ওপারের নতুন ডাক্তাররা

গতকাল সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এর অধীন মেডিকেল কলেজগুলোর এমবিবিএস…

বড় স্যাররা আসলে সবদিক দিয়েই বড়!

বড় স্যাররা আসলে সবদিক দিয়েই বড়!

ফার্স্ট ইয়ারে এনাটমীর প্রফেসর ডা. ওয়ালী স্যার ক্লাসে পুরোনো একটা কথা স্মরণ…

ঢাকা শিশু হাসপাতালকে বদলে দিয়েছে শিশু কানন 

ঢাকা শিশু হাসপাতালকে বদলে দিয়েছে শিশু কানন 

নতুন কিছু, ভাল কিছু ও ব্যতিক্রম কিছু করতে না চাওয়ার অজুহাত হিসেবে…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর