ঢাকা      বুধবার ১৮, জুলাই ২০১৮ - ৩, শ্রাবণ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. জামান অ্যালেক্স

বিসিএস মেডিকেল অফিসার


‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে’

 প্লট-১

চেম্বারে এক পেশেন্ট দেখছিলাম। Rheumatoid arthritis এর (এক ধরণের বাতব্যাথা) ক্লিন-কাট কেইস। চিকিৎসা স্টার্ট করার পূর্বে Evidence প্রয়োজন। কাজেই আমি ইনভেস্টিগেশন লেখা শেষ করলাম এবং পেশেন্টকে কাউন্সেলিং করা স্টার্ট করলাম।

রোগীকে লম্বা সময়ের জন্য MTX( generic:Methotrexate) নামে একটি ড্রাগ খেতে হতে পারে বলার পরপরই রোগীর হাজব্যান্ড বলে উঠলেন এই ওষুধ রোগী আগে খেতেন। BSMMU থেকে প্রেসক্রাইব করা হয়েছিল।

পেশেন্ট পার্টিকে জিজ্ঞেস করার পরও পূর্বে এই তথ্য উহ্য রেখেছিলেন, MTX এর নাম উচ্চারণ করাতে তথ্যটি প্রকাশ করলেন। BSMMU তে চিকিৎসা নেবার ব্যবস্থাপত্রটি বের করলেন। যা ভেবেছিলাম, তাই রোগী diagnosed case of Rheumatoid Arthritis.

জিজ্ঞেস করলাম, 'ওষুধ বন্ধ করেছেন কেন?' উত্তরটার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। ফার্মেসীর দোকানদার নাকি উনাকে বলেছেন-MTX ক্যান্সারের ওষুধ। এটা শোনার পর থেকে উনি MTX বন্ধ করে দিয়েছেন।

দোকানদারের কথাটা আংশিক সত্য। MTX বাতের ব্যাথা ছাড়াও ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। ফার্মেসীর দোকানদার ক্যান্সারের কথাটা জানে, বাতের ব্যাথাতে এটা ইউজ হয় সেটা জানে না।

প্লট-২

পেশেন্ট Migrain (মাথা ব্যাথার এক ধরণের রূপভেদ) এর। Prophylaxis (এক ধরণের টেকনিক, যাতে ভবিষ্যতে মাথা ব্যাথার পরিমাণ ও Frequency কমে আসে) হিসেবে Propranolol নামে একটি ড্রাগ প্রেসক্রাইব করলাম।

মাস তিনেক পর পেশেন্ট ফলো আপে আসলো, ব্যাথার Frequency আগের মতই আছে। চেক করে দেখলাম, Propranolol ড্রাগটি উনি আর খাচ্ছেন না। ফার্মেসীর দোকানদার বলেছে-এটা প্রেসারের ওষুধ, রোগীর প্রেসার নেই।

যে জ্ঞান ফার্মেসীর দোকানদারের আছে, সে জ্ঞান আমার নেই! তাই রোগী আমার উপর বেশ বিরক্ত। একই ওষুধ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে। Propranolol যে প্রেসার বাদে Migrain ও দেয়া যেতে পারে তা ফার্মেসীর দোকানদারের অজানা।

প্লট-৩

রোগীর মাসখানেক ধরে জ্বর ও কাশি। চিকিৎসক সহকারীর (SACMO) কাছে যাবার পর (রোগীর ভাষ্য অনুযায়ী ডাক্তার) উনি Tab. Moxifloxacin খেতে দিয়েছেন, জ্বর ও কাশি কমেনা বলে দুইদিন পর রোগী আউটডোরে আসল। রোগীটির পরবর্তী ডায়াগনোসিস ছিল Tuberculosis (যক্ষ্মা).

যেখানে যক্ষ্মা হবার ন্যূনতম সম্ভাবনা থাকে (মাসখানের জ্বর ও কাশি মানে যক্ষা হবার সম্ভাবনা প্রবল) সেখানে ডায়াগনোসিসের পূর্বে এই ভয়ঙ্কর ওষুধ দেবার কোন সুযোগ নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত যেখানে এই গ্রুপের First generation প্রেসক্রাইব করার সুযোগ নেই। সেখানে SACMO সাহেব Fourth generation দিয়ে বসে আছে।

আমি নিশ্চিত করছি, যদি এই ট্রেন্ড চলতে থাকে তবে, Get ready to fight with upsurge of Extensively drug resistant TB(XDR-TB).

আরো উদাহরণ দেয়া যায়, প্রয়োজন দেখছি না। অদ্ভুত এক জাতি আমরা। এদেশে হাত বাড়ালেই যেকোন ড্রাগ মেলে। Over the counter drug(OCT) বলে একটা কনসেপ্ট আছে যেখানে হাতে গণা কিছু ওষুধ প্রেসক্রিপশন ছাড়াই পাওয়া যেতে পারে। অবস্থাদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে আমাদের দেশে সব ড্রাগই Over the counter drug.

অন্যদেশের কথা বাদ দেই, ইন্ডিয়ার কথাই বলি। একবার এক ব্যক্তি আমাকে জানালেন Ketorolac (এক ধরণের পেইন কিলার) ওষুধটি সারাদিন ধরে ইন্ডিয়ার এক শহরে খোঁজার পরও মিললো না, প্রেসক্রিপশন ছাড়া এই ওষুধ কেউ দিবেনা। এদের পার্শ্ববর্তী দেশ হয়েও আমরা এই ধরণের উদাহরণ সেট করতে পারিনি।

কিছুদিন আগে CNN-এ দেখলাম USAতে চতুর্থ ব্যক্তিকে সনাক্ত করা হয়েছে যে Superbug (Escherechia coli এর এক ধরণের স্ট্রেইন) দ্বারা আক্রান্ত। Existing কোন Antibiotic দিয়ে এই Superbug কে মোকাবেলা করা যাচ্ছে না। আমাদের দেশে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় যেভাবে মূর্খ ফার্মেসীর দোকানদার, স্যাকমোরা Antibiotic প্রেসক্রাইব করে যাচ্ছে, তাতে যদি এই ধরণের Superbug আমাদের দেশে Mutation এর মাধ্যমে তৈরি হয়। তবে আপনি নিশ্চিত থাকুন, এদেশে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাতারে কাতারে রোগী মারা যাবে।

সব দায় অবশ্য ফার্মেসীর দোকানদার, স্যাকমো বা কর্তৃপক্ষের নয়। সাধারণ জনগণও দায়ী। স্পেশালিস্টদের কাছে চিকিৎসা নিয়ে সেটা তারা জাস্টিফাই করে ফার্মেসীর দোকানদার অথবা স্যাকমো দিয়ে, দিনশেষে এই গর্দভকুল এদের বিবেচনাকেই প্রাধান্য দেয়। MBBS বা FCPS বা MD বা MRCP করা উচ্চশিক্ষিত চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনকে এরা বিশ্বাস করতে পারে না! এই মূর্খের দল বিশ্বাস করে আরেক মূর্খের কথাকে। বলিহারি বটে!

গত কয়েক বছর যাবত লিভার ও কিডনী ডিজিজের পেশেন্ট বাড়ছে। আমি মোটামুটি নিশ্চিত এর পিছনে মুড়িমুরকির মত বিক্রি হওয়া ওষুধগুলো (বিশেষত পেইন কিলার) দায়ী। আমি বুঝিনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ করেটা কী? এদের দৃশ্যমান কোন মুভমেন্ট চোখে পড়ে না। মাঝে মাঝে কিছু কালপ্রিট ধরা হয় শুনি, সাজা হয় ৬ মাস। মানুষের জীবন নিয়ে যারা খেলছে তাদের ন্যূনতম সাজা হওয়া উচিত ১০ বছর, সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড। প্রহসনমূলক, লোকদেখানো সাজা দিয়ে এই ধরণের অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ বিক্রি বন্ধ করা যাবে না। "অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।" আমি স্পষ্ট করে বলছি, নীরবতার অপরাধে এর দায় নিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

আমার বক্তব্য স্পষ্টঃ

১. সাধারণ জনগণকে মূর্খদের কাছে গিয়ে ফ্রি চিকিৎসা নেয়ার ছাগলামি ত্যাগ করে ন্যূনতম MBBS ডাক্তারের কাছে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

২. ন্যূনতম MBBS ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ব্যতীত ড্রাগ বিক্রি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। এর অন্যথা হলে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

রাজা, কংসকে উদ্দ্যেশ্য করে যোগমায়া বলেছিল, ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।’ অযাচিত ও নিয়মবহির্ভূত ভাবে ওষুধ বিক্রির সাথে ডিরেক্টলি অথবা ইনডিরেক্টলি জড়িত থেকে যারা অসময়ে আমাদের মৃত্যুপুরীর দিকে যাত্রা নিশ্চিত করছে তাদেরকে ও তাদের গোকুল কে কী আমরা চিনতে পারছি? সময় কিন্তু ফুরিয়ে আসছে। 

আরও পড়ুন-

‘আমরা প্রভু নই, আমরা বন্ধু’

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

‘জান্নাতের পাখি হয়ে ভালো থাকুক রাফা’

‘জান্নাতের পাখি হয়ে ভালো থাকুক রাফা’

রাফা। এ দুই শব্দের নামের প্রতি মেডিকেল শিক্ষার্থী চিকিৎসকদের কী যে টান!…

বন্ধুকে হারাতে চাই না

বন্ধুকে হারাতে চাই না

স্বপ্নের জগতে বাস করে না কিংবা স্বপ্ন দেখে না এমন মানুষ পৃথিবীতে…

ডাক্তারদের শত্রু ডাক্তাররাই

ডাক্তারদের শত্রু ডাক্তাররাই

আমদের চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় শত্রু আমরা নিজেরাই। আমদের মাঝে পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধের তীব্র…

পারিবারিক কলহ যে কারণে বাড়ছে

পারিবারিক কলহ যে কারণে বাড়ছে

বিথী, বয়স ২৪। তার ভাষ্যমতে সে মা বাবার খুব আদুরে মেয়ে। অবাধ…

বাবা মার কাঁধে যেন সন্তানের লাশ না ওঠে

বাবা মার কাঁধে যেন সন্তানের লাশ না ওঠে

বড় মেয়ের বয়স তখন ৪-৫ বছর। স্কুল থেকে বাসায় এসে দুপুরে উঠল…

ভিটামিন বি১৭ এর অভাবে ক্যান্সার একটা গাঁজাখুরি কথা

ভিটামিন বি১৭ এর অভাবে ক্যান্সার একটা গাঁজাখুরি কথা

কয়েকদিন ধরে একটা ভুয়া খবর বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সেটা হলো- ‘ক্যান্সার কোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর