ঢাকা      মঙ্গলবার ১৮, ডিসেম্বর ২০১৮ - ৪, পৌষ, ১৪২৫ - হিজরী



অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম

ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ


সিজার টাকার জন্য নয়, বেশিরভাগই বাচ্চার ভালোর জন্য

আমার অনেক কিছুই করতে ইচ্ছে করে। বয়স শেষ প্রায়। সময়ে কুলিয়ে উঠা যায় না। তোমরা যারা তরুণ বয়সী, এগিয়ে আসনা কেন? জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের চেয়ে আনন্দ আর কিছুতে নেই। এপিডুরাল দিয়ে ভ্যাজাইনাল ডেলিভারি করার জন্য একটি টিম তৈরি করো। অবশ্যই ইন্টেলিজেন্ট নার্স থাকতে হবে। একটি ডেডিকেটেড টিম করে লেবার ইউনিট তৈরি করো। পেশেন্টকে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ে রাখলে মিসহ্যাপ হবে না। 

হিসেব কষে সময় এবং খরচপাতি অনুযায়ী চার্জ হবে। সিজারে কনভার্ট হলে সব কার্যক্রম ইনক্লুড করে চার্জ হবে। মানুষের জন্য সুবিধা তৈরি করো। রিটার্ন কোথাও না কোথাও থেকে পাওয়া যাবে। বড় দু:সময় যাচ্ছে। নিজেদের সার্ভিসে পারফেক্ট থাকা অতীব জরুরি। ডকুমেন্ট থাকতে হবে পই পই করে। নো কম্প্রোমাইজ।

২০১৫ তে কোন এক প্রসঙ্গে লেখা।

ডাক্তাররা শুধু টাকার জন্য সিজার করে।

আমি তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। একদিন শখ করে দুধ সেমাই রান্না করলাম। প্রথম রান্নাতেই বাজিমাত। আব্বা বললেন, মা খুবই মজা হয়েছে। কিন্তু যে পরিমান দুধ দিয়েছ ভাবছি তোমাকে দুধওয়ালার সাথেই বিয়ে দিতে হবে। এত দুধের সাপ্লাই কে দেবে?

ওই প্রশংসা শুনে তারপর থেকে দুধের নাস্তা মানেই মুক্ত হস্তে দুধ ঢালতে থাকি। যদিও দুধওয়ালার সাথে আমার বিয়ে হয়নি।

মেডিকেলের এক বান্ধবীর সাথে গেলাম তার স্কুলের বান্ধবীর বাসায়। ওর নানী অসম্ভব সৌখিন একজন রাঁধুনি ছিলেন। রান্না বান্নার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল বলে আমার বান্ধবী নানীর রান্নাঘর দেখাতে নিয়ে গেলেন।

ওমা! ওনার থরে থরে মসল্লার ডিব্বা সাজানো দেখে মনে মনে ভাবছিলাম মজাদার রান্নার জন্য আমারও এমনটি করতে হবে।পেশাগত কারনে অতটা না হোলেও কাছাকাছি হয়েছে।

গল্প বলার উদ্দেশ্য প্রবচন আসলেই সত্যি।
 " যত গুড় তত মিষ্টি’।

ডাক্তারির সাথে সম্পর্ক কী? জনসাধারন তা বুঝবে না। আমাদের দেশে চিকিৎসার দায়িত্ত্ব চিকিৎসকদের।এভাবে বুঝতেই তারা অভ্যস্ত।

চিকিৎসা একটি টিম ওয়ার্ক।এই টিমের মূল কাজ কনসাল্ট্যান্ট চিকিৎসক করেন এবং আনুসাঙ্গিক কাজ সহকারী চিকিৎসক ও নার্স করে থাকেন। এছাড়া প্যাথলজিক্যাল দায় দায়িত্ত্ব প্যাথলজিস্টের। আর টাকা পয়সা? হয় সরকার দেবে নয় রোগী দেবে। রোগীর টাকা কত আছে সে হিসেব ডাক্তার করলে ডাক্তারি করবে কিভাবে?

বাচ্চা জন্মদান একটি ফিজিওলজিক্যাল পদ্বতি। স্বাভাবিক প্রসব রাস্তা দিয়ে ন্যুনতম সাহায্যের মাধ্যমে ঠিক গর্ভকালীন বয়সে বরাদ্দকৃত স্বল্প সময়ে কোন জটিলতা ছাড়া প্রসব হওয়াকেই বলে স্বাভাবিক প্রসব। যা যুগ যুগান্তর ধরে দাইরা করে এসেছেন। তাই স্বাভাবিক প্রসব যা দাইরা করতে পারে সেজন্য সিজারতো দূরের কথা ডাক্তারেরইতো প্রয়োজন পরে না। তাহলে শহরাঞ্চলে কেন এত সিজারিয়ান সেকশন? ডাক্তারের পকেট ভারি করার জন্য?

দাইরা স্বাভাবিক প্রসবের সময় শুধু বাচ্চাটিকে ধরেন। যখনই অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় তখন সে কিছুই করতে পারে না। ফলে প্রাণ হারান অনেক মা ও বাচ্চা। প্রাণ না হারালেও দেখা দেয় ভিভিএফ-এর মত দুঃসহ জটিলতা। গর্ভকালীন সময় থেকে বাচ্চা ভূমিষ্ট হবার পরে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত অনেক জটীলতা দেখা দিতে পারে। এই জটিলতাগুলো শনাক্ত করা এবং যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়াই ডাক্তারের কাজ। আর সেজন্য দরকার রেগুলার গর্ভকালীন পরিচর্যা, জন্ম পরিকল্পনা ইত্যাদি।

একজন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে যাতে কোন দুর্ঘটনা না ঘটে সেজন্য যে চিকিৎসক যত বেশি সেফটি প্রিকসন নিবেন তার রোগী তত বেশি নিরাপত্তা পাবে। অর্থাৎ যত গুড় তত মিষ্টি বা যত মসল্লা তত মজা।

মৃত্যুব্যথা কেমন এ কথা কোন মৃত ব্যক্তির কাছে আমরা শুনতে পাইনি। তবে একজন অবসটেট্রিসিয়ান বলেছেন, মৃত্যুযন্ত্রণার পরে যদি কোন যন্ত্রণা থাকে তা হল প্রসব বেদনা। চিকিৎসকরা চেষ্টা করেন ন্যুনতম ব্যাথার মাধ্যমে একটি সুস্থ বাচ্চা প্রদানের জন্য।

এজন্য যা দরকার
১। কনস্ট্যান্ট ফিটাল মনিটরিং। যাতে যে কোন মুহূর্তে বাচ্চা খারাপ অবস্থায় থাকলে ইমারজেন্সি সিদ্বান্ত নেয়া যায়। এই মনিটরিংয়ের দায়িত্ব একজন দক্ষ নার্সের। যে কনসালট্যান্টকে মুহূর্তে মুহূর্তে আপডেট দেবে। প্রথম এসেসমেন্ট এবং ডেলিভারির সময় শুধু কনসালট্যান্ট উপস্থিত থাকবেন।

২। এপিডুরাল এনেস্থেসিয়া বেদনানাশক হিসেবে। সেজন্য দরকার একজন এনেস্থেটিস্ট। যিনি টাইম টু টাইম মনিটরিং করবেন। 

এর ফলে মা কষ্ট অনুভব করবেন না এবং বাচ্চার অবস্থানও বোঝা যাবে। কাজেই যতই সময় লাগুক না কেন ভয় থাকে না। কিন্ত এই যে এতগুলো ইনভলবমেন্টের জন্য প্রয়োজন টাকা। মানে যত গুড় তত মিষ্টি।

আমাদের অবস্থান: 
১।  অবিরাম মনিটরিং এর মেশিন দু' একটি জায়গায় থাকলেও থাকতে পারে।
২। দক্ষ নার্সের অভাব।
৩। এপিডুরাল এর সিস্টেম নেই।(সংগত কারন আছে)

ফলে রোগী ব্যথায় অস্থির হয়ে যায়। মা স্বামী এবং রোগী তিনজনা মিলে কাঁদতে  থাকেন। ১২-১৬ ঘন্টার লেবারে একটু পর পর কনসালট্যান্টকে চান। যেটা ব্যস্ত কনসালট্যান্টের পক্ষে বিনা প্রয়োজনে এটেন্ড করা দুষ্কর। কোন সহকারী ডাক্তারকেও তাদের হয়ত পছন্দ নয়। কনসালট্যান্ট না গেলে গালাগালি করতে থাকেন। এর মধ্যে বাচ্চার অসুবিধে হলে তো কথাই নেই।

এই সামগ্রিক বিবেচনায় একটি ঝুঁকিহীন প্রসবের জন্য অনেকেই সিজারের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। রোগীর পক্ষের সহোযোগিতা এবং অবিরাম মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকলে আগেরবার সিজার হলেও স্বাভাবিক রাস্তায় চেষ্টা করা যায়। স্বাভাবিক প্রসবের রেটও বাড়ানো যায়।

অনৈতিকভাবে কেউ যে করে না তা নয়। দু' একজন ডাক্তারের কর্মকান্ড কখনও এক্সাম্পল হতে পারে না।

তাই শোন মা,  সিজার টাকার জন্য নয়, বেশিরভাগই তোমার বাচ্চার ভালর জন্য। কখনও কখনও তোমার কষ্ট লাঘবের জন্য বা তোমার ঝুঁকি এড়াবার জন্য করা হয়।

আশায় আছি উন্নত বিশ্বের মত একটি চটকদার লেবার রুমের, যেখানে হাত বাড়ালেই যা চাই তাই পাব। আর সে গুড়ের পে করার জন্য রোগীদের সুস্থ মানসিকতার। আজ না হোক কাল একদিন হবে ইনশাআল্লাহ্‌।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ছোটবেলায় ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হবো: শেখ হাসিনা

ছোটবেলায় ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হবো: শেখ হাসিনা

মেডিভয়েস রিপোর্ট:  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমার ছোটবেলায় ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হবো। এসএসসি পরীক্ষা…

তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া

তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া

মেডিভয়েস রিপোর্ট: একই সাথে তিন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন…

১০৭ চিকিৎসকের সাক্ষাৎকার শুরু ১৯ ডিসেম্বর

১০৭ চিকিৎসকের সাক্ষাৎকার শুরু ১৯ ডিসেম্বর

বিসিএস (স্বাস্থ) ক্যাডার/সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সিভিল সার্জন পদে পদায়নের জন্য ফিটলিস্ট প্রণয়নের…

বিএসএমএমইউতে ক্যান্সার আক্রান্ত শিক্ষিকার আত্মহত্যা

বিএসএমএমইউতে ক্যান্সার আক্রান্ত শিক্ষিকার আত্মহত্যা

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ক্যান্সার আক্রান্ত এক শিক্ষিকা…

ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে গুরুত্ব পাচ্ছে স্বাস্থ্যখাত

ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে গুরুত্ব পাচ্ছে স্বাস্থ্যখাত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাস্থ্যখাতকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও মূল বিষয়গুলোর…

হবু চিকিৎসকের পাশে দাড়ালেন চিকিৎসকরা

হবু চিকিৎসকের পাশে দাড়ালেন চিকিৎসকরা

মেডিভয়েস রিপোর্ট: সিরাজগঞ্জের বেলকুচির প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলে আরিফুল ইসলাম। বাবা একজন চা…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর