মোহাম্মেদ নাইম হাসান

মোহাম্মেদ নাইম হাসান

শিক্ষার্থী, ইউএসটিসি মেডিকেল কলেজ


১২ এপ্রিল, ২০১৮ ০২:১৮ পিএম

বাংলাদেশিদের ভারতীয় চিকিৎসার উপাখ্যান: পর্ব-১

বাংলাদেশিদের ভারতীয় চিকিৎসার উপাখ্যান: পর্ব-১

বাংলাদেশের রোগীদের কাছে ভারতীয় ডাক্তারদের চাহিদা বেশি। এক্ষেত্রে অনেকগুলো পয়েন্টকে একত্রিত করে বোঝানো যেতে পারে কেন তাদের কাছে ভারতীয় ডাক্তারদের গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা হলেও বেশি। এখানে আমি যা কিছু লিখতে চাই, সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে। বাংলাদেশি রোগীদের কাছে সবচেয়ে পপুলার দুটো হাসপাতালে যাবার এবং তাদের কার্যক্রম নিজের চোখে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। হাসপাতাল দুটোর নাম হল-

1. Narayana Hrudayalaya (দেবী শেঠীর হাসপাতাল নামেই বেশি পরিচিত), Institute of Cardiac Sciences, Bangalore, Karnataka
2. Christian Medical College (CMC নামেই অধিকতর পরিচিত), Vellore, Tamil Nadu

বাংলাদেশের যেসব রোগী ভারতগামী হন, তাদের অন্ততপক্ষে ৮০ ভাগ রোগীর গন্তব্য এই দুটি হাসপাতাল।

একজন মেডিকেল পড়ুয়া হিসেবে শুধুমাত্র তুলনার চেষ্টা করলাম লিখার মাধ্যমে, এক্ষেত্রে রোগী এবং ভারতীয়/বাংলাদেশি ডাক্তার, প্রত্যেকের ভালো-মন্দ দুই অবস্থাই তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

দুটো হাসপাতাল সম্পর্কেই বলার আগে কিছু কমন পয়েন্ট জানানো উচিত।

১। দুটোই প্রাইভেট হাসপাতাল, সরকারী নয়।

২। দুটোরই ব্যবস্থাপনা অসাধারণ। বলার অপেক্ষা রাখে না, সাধারণত প্রাইভেট হাসপাতাল গুলোর ব্যবস্থাপনার পেছনেই অনেক বেশি ব্যয় করা হয়, অতএব ব্যবস্থাপনা ভালো হবারই কথা।

৩। দুটো হাসপাতালই এমন এলাকায় যেখানে এই দুটো হাসপাতালই হয়তো একমাত্র ভরসা।

৪। এই হাসপাতালগুলোর আশে পাশে যথারীতি ব্যাঙের ছাতার মত অসংখ্য লজ, হোটেল, দোকানপাট সহ অনেক অনেক ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। রয়েছে সিম কার্ড, মানি এক্সচেঞ্জের মত ব্যবসার দোকানও। এই জায়গাগুলোতে যাওয়ার পূর্ব থেকেই বিদেশী রোগী হিসেবে আগত বাংলাদেশিরা ভিসা পাওয়া হতে শুরু করে, টিকেট (বিমান/ রেল), থাকার জন্য লজের ব্যবস্থা সহ আনুষঙ্গিক অনেক ক্ষেত্রেই বিড়ম্বনায় পড়েন যেটা বাংলাদেশে এসে তারা বেমালুম চেপে যান।

৫। দুটো হাসপাতালের মধ্যে CMC হল, একটি প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ, যাদের Undergraduate এবং মোটামুটি সব বিষয়ের PG course ও চালু আছে। অন্যদিকে Narayana Health হল, শুধুমাত্র চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। প্রথমে হার্ট হসপিটাল দিয়ে শুরু করলেও কালক্রমে চক্ষু হাসপাতাল (Narayana Nethralaya), দন্ত হাসপাতাল (Narayana Dental), দুর্ঘটনা কিংবা হাড়ের চিকিৎসার জন্য Sparsh Trauma & orthopedic Hospital শরীরের অন্যান্য অংশের চিকিৎসার জন্য Mazumdar Shaw Cancer Hospital নামের আলাদা আলাদা ভবন বিশিষ্ট হাসপাতাল রয়েছে। এই সবগুলো হাসপাতাল Narayana Health এর অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠাতা Dr Devi Shetty পরিচালনা করে থাকেন।

৬। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হল, এই দুই হাসপাতালের রোগীদের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগই হল, বাংলাদেশী রোগী। ভারতীয় রোগীর সংখ্যা ২০-২৫ ভাগ। বাকিগুলো অন্যান্য দেশীয় (মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, এশিয়ার অন্যান্য দেশ)।

৭। এখানকার সেবা প্রদানে সবচেয়ে আধুনিক টেকনোলোজি ব্যবহার উন্নত বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্য। বাংলাদেশে নতুন টেকনোলজি আনার জন্য অনেক বেশি চিন্তা ভাবনা, বাজেট ইত্যাদির চিন্তা করতে হয়।

৮। নার্সদের যোগ্যতা বাংলাদেশী নার্সদের চেয়ে অনেক বেশি এক কথায় স্বীকার করতে হয়।

৯। এই দুই হাসপাতালে যেসব বাঙালিরা যান, তারা সাধারণত, অর্ধশিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত পর্যায়ের মধ্যবিত্ত। যাদের কাছে ঘরের পাশে বেড়াতে যাওয়াটা অনেক দিনের স্বপ্ন, সেখানে টিভিতে দেখা ভারত গিয়ে ঘুরে আসাটা অনেক বড় কিছু। তাই ভারতের সুনামটাও তাদের মুখে একটু বেশি হয়।

আজকের পর্বে শুধুমাত্র দেবী শেঠীর হাসপাতাল নিয়ে লিখছি। পরের পর্বে CMC নিয়ে বিস্তারিত থাকবে।

Narayana Health এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সবার মুখে মুখে ছড়ানো একটি নাম হল, Narayana Hrudayalaya। হৃদয়ালয়া, একটি কন্নড় শব্দ, যার ব্যকরণিক অর্থ দাঁড়ায় হৃদয়। অর্থাৎ হার্ট বুঝাতে এই শব্দের ব্যবহার। অন্যদিকে নারায়ণা শব্দটি প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান / সিইও ডা. দেবী শঠীর বাবা, শ্রী নারায়ণ শেঠীর নাম থেকে উদ্ধৃত। কার্ডিয়াক সায়েন্সের জন্য এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা পায় ১৯৯৮ এর শেষদিকে। Heart Surgeon Dr Shetty তখন মাদার তেরেসার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন। কাজ করতেন কলকাতায়। পরবর্তীকালে ব্যাঙ্গালোরের আনেকাল তালুকের বোমাসান্দ্রা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়াতে তিনি এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। যাই হোক, মূল কথায় আসি। # এখানে রোগীরা দুইধাপ পেরিয়ে Dr Shetty কে সাক্ষাতের সুযোগ পান।

প্রথমত, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন শেষ করতে হয়, তারপর ভিজিট ফিসের মাধ্যমে পছন্দের কনসালটেন্ট এর সিরিয়াল নাম্বার এবং টাইমিং জেনে নিতে হয়। তারপর অপেক্ষা।

এখানে সরাসরি কন্সালটেন্ট এর দেখা পাওয়া যায়না। প্রথমে একজন জেনারেল ফিজিশিয়ান প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করে রিপোর্ট দেখে নিয়ে তারপর সেই পছন্দের কনসালটেন্ট কে রেফার করতে পারেন।

এখানে কয়েকটা বিষয় খেয়াল করার মতো। বাংলাদেশে রোগীরা সহজেই কন্সাল্টেন্টের নাগাল পায়, যেকারণে বাংলাদেশি প্রফেসরদের মূল্য দিতে চায় না যেটা ভারতে হয়না। আগে জিপি, পরে কন্সালটেন্ট।

জেনারেল ফিজিশিয়ান এর কি ডিগ্রি, শুধুই এমবিবিএস কিনা সেগুলোও কেউ খুঁজতে যায়না। যা কিছু টেস্ট করতে দিয়েছে, হোক শ খানেক, কোন ডিসকাউন্টের জন্য অনুরোধ করার সুযোগও নেই। কোন বাঙালি জিজ্ঞেসও করে না, এতো টেস্ট কেন। কিন্তু বাংলাদেশে হলে? যাই হোক, ডিসকাউন্ট এর অনুরোধ করতে গেলে খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়, এত কম খরচে ভারতে আর কোথাও এই টেস্ট করানো হয়না। তাছাড়া এটাও বলা হয়, এই টেস্ট গুলো পুরো শরীরের অবস্থা বুঝাবে। তাই ভারত ফেরত রোগীদের মুখে একটা কথা কমনলি শুনবেন, "আমি ফুল বডি টেস্ট করে এসেছি।" কারণ, ওটাই ওখানে বলা হয়েছে।

আগেই বলেছি, আশেপাশের ৩০-৪০ মাইলের ভিতর আর কোন হাসপাতাল নেই। আর থাকলে আপনি এইখানেই করানোর জন্য এসেছেন বলে অন্য হসপিটালে যাবার সম্ভাবনা ক্ষীণ সেটা ওরা বোঝে। তাই, যা বিল করা হয়, তাই দিতে হয় যেটা বাংলাদেশে হলে মারামারি লেগে যেতে পারে, কেন ডাক্তার ডিসকাউন্ট করে দিল না।

প্রতিটা স্টাফ হতে শুরু করে ডাক্তারসহ যে কেউই অন্য ডাক্তারের প্রশংসা এত বেশি করবে, আপনার বিশ্বাস অনেক বেশি বাড়বে। কারণ, আপনি বুঝেছেন, তারা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ধরুন, আপনি জিজ্ঞেস করলেন, ডাঃ বিজয় মাহেলা কিংবা ডাঃ বরেন্দ্র কুমার রাউত কেমন ডাক্তার। তারা এত সুন্দরভাবে তাদের সুনাম করবে, কোন রোগীকে রাজী করাতে এটা যথেষ্ট। তাছাড়া ওদের উপর নজরদারিও করা হয়। তাই, ওরা এসব নেগেটিভিটির ধার দিয়েও যায় না। কিন্তু বাংলাদেশে আমাদের স্টাফদের কাউন্সেলিং ভালো না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, দেশের কিছুসংখ্যক ডাক্তার একে অন্যের বদনামও করে থাকেন রোগী ধরে রাখার ধান্দায়। ভারতীয়দের সেই অসুবিধা নেই। হাসপাতাল অনেক মোটা অংকের বেতন দেয়। সেই হাসপাতালেই টেস্ট করা যায়। প্রাইভেট চেম্বারের টেনশন নেই। ডিউটিও ফিক্সড ১০-১২ ঘন্টা। বাকি সময় অন্য জায়গায় ডিউটি কিংবা পড়াশোনা সবই সম্ভব। জুনিয়রদের জন্যও সুযোগ আছে। বড় স্যাররা নিজেদের জিপি হিসেবে জুনিয়রদের সাথে রাখে। কেসগুলো ধরে ধরে শিখিয়ে নেয়। অনেক বেশি বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক থাকায় সিনিয়রদের সন্মানে এতটুকুও কার্পণ্য নেই জুনিয়রদের। মন প্রাণ দিয়ে সিনিয়রদের জন্য কাজ করে শিখে নিতে পারা যায়। আমি অনেকজনের সাথেই কথা বলেছি। এমনকি অনেকে ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্টেও আছে।

আরেকটা ব্যাপার হল, আমাদের রোগীরা সব কিছুর জন্য ডাক্তারকে খোঁজে। ধরুন, বসার চেয়ার নেই, ডাক্তারকে বল। ওয়ার্ডে ময়লা, ডাক্তারকে বল। নার্স কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা, ডাক্তারকে বল। হাসপাতালের বিল বেশি লিখছে কেন, ডাক্তারদের বল। বুঝার চেষ্টা করতে হবে, ডাক্তারদের কাজ শুধুই চিকিৎসা দেয়া। বাকিগুলোর দায়িত্ব অন্যদের।

আরো ব্যাপার হল, শুধু দুইজন ডাক্তারের রুমে যেতে পারে, একজন রোগী, আরেকজন রোগীর লোক। বাংলাদেশে মাশাল্লাহ পুরো ফ্যামিলিও একসাথে ঢুকে যেতে চায়। ডাক্তার কিন্তু বাঁধাও দিতে পারবেন না। কারণ অমুক ভাই আপনার জীবনবাতি নিভিয়ে দিবেন।

যাই হোক, এবার জিপি দেখানো শেষ, প্রায় ২ দিন ধরে। এবার কনসালটেন্ট এর জন্য অপেক্ষা।

বলে নিই, এই অপেক্ষা বাংলাদেশে ডাক্তারের চেম্বারে অপেক্ষার চেয়েও দীর্ঘ। ক্ষেত্রবিশেষে দিনের পর দিন। কিন্তু এই অপেক্ষার কষ্টের কথা কোন বাঙালি রোগী বলেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার নাম স্পীকারে আসবে না ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি কোন প্রকার উচ্চবাচ্য কিংবা কোন অপ্রীতিকর কিছু করতে পারবেন না। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা সাধারণত ৫-১০ মিনিট অপেক্ষার পরই রাজনৈতিক মামা, চাচা কিংবা খালুর পরিচয় দিয়ে হুমকি ধামকি সহ যাবতীয় পদ্ধতি প্রয়োগে সিদ্ধহস্ত। এছাড়াও ডাক্তারের এসিস্ট্যান্টকে কিছু ঘুষ দিয়ে সিরিয়াল নাম্বার এগিয়ে আনাও আমাদের মহান কাজকর্মের একটি ঊল্লেখ্য দিক, যেগুলো ভারতে গেলে বাংলাদেশী রোগীরা প্রয়োগ করতে না পেরে হাঁসফাঁস করেন। তবে এই বিষয়গুলো বেমালুম ভুলে যাবার জন্যও কিছু প্রভাবক আছে। আশে পাশে অনেকেই বাঙালি থাকেন যাদের সাথে পরিচিত হয়ে ভারতে আসার কারণ নিয়ে আলাপ হয়, ফলে দেরির বিষয়টা আর মাথায় থাকেনা। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পাশাপাশি বসে বাংলাদেশি ডাক্তারদের বদনাম করাটাই আলাপের মূল অংশ। সেটা ভারতীয়দের সাথে আলাপকালেও চলতে থাকে। অথচ একবারও চিন্তা করেন না, যে এখানে বাংলদেশের নামটাই খারাপ হচ্ছে।

তবে কিছু সত্য কথা হল, হাসপাতালের লোকেশন এবং ভিতরের অবস্থা, ম্যানেজমেন্ট সবকিছুই সুন্দর এবং আকর্ষণীয়। প্রত্যেক স্টাফের ব্যবহার অত্যন্ত মার্জিত এবং তাদের ধৈর্য্যও অনেক বেশি প্রশংসনীয়। সর্বোচ্চ পরিমাণে নিজেদের ব্যবহার, ভাষা সংযত রাখার চেষ্টা তাদের থাকে। প্রত্যেকেই কমবেশি দুই-তিনটি ভাষায় দক্ষ (ইংরেজি সহ)।
গেটের দারোয়ানরাও যদি ইংরেজী বলে, ভড়কে গিয়ে তাদের স্যার পর্যন্ত বলে বসেন আমাদের রোগীরা। এই স্মার্টনেসটাও একটা ফ্যাক্টর। আমাদের রোগীরা ইমপ্রেস হয়। এটা বাংলাদেশে হয়না।

হাসপাতালে ঢোকার পর থেকে বের হওয়া পর্যন্ত, সব জায়গায় নার্স সহ সবাই কে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ডাক্তারদের রুম গুলো আলাদা, তাদের আসা যাওয়া, মিটিংরুম, কনফারেন্স রুম আলাদা। ডাক্তার পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রতিটা ধাপে এত এত বার সিকিউরিটি ফেস করতে হয়, মনে হবে প্রধানমন্ত্রী গোছের কারো সাথে দেখা হতে যাচ্ছে। তাহলে বুঝুন, আপনি না চাইলেও আপনার মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে, ডাক্তার এত সহজলভ্য নয়। অবশ্যই এবং অবশ্যই অনেক সন্মানযোগ্য লোক। কোন উচ্চবাচ্য নেই। কোন সাড়াশব্দ নেই, শুধু ওয়ার্ডের মেশিনের আওয়াজ কিংবা অস্ফুটভাবে দুচারটা শব্দের আওয়াজ। সব স্টাফদের ডাক্তারদের রুম পর্যন্ত যাওয়ার পারমিশনও নেই। কিছু কিছু স্টাফরা যেতে পারে। ওরা ডাক্তারদের রুমের সামনে সবকিছু সেভাবেই মেইনটেইন করে থাকে, ঠিক যেমনটা কোন মন্ত্রীর কার্যালয়ে হয়। মোটামুটি ভিআইপি টাইপের অবস্থা। ঘড়ির কাঁটা কখন ৪-৫ ঘন্টা এগিয়ে গেছে খেয়ালও নেই। তবু অভিযোগ নেই।
ও হ্যা, ওখানে এপ্রণ শুধু ডাক্তাররাই পড়েন। বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোর মতো সবার জাতীয় পোশাক এপ্রণ নয়। তবে ডাক্তার সহ সবার আবশ্যিক আইডি কার্ড আছে।

এবার কন্সালটেন্টের রুমে প্রবেশ করা হল। যথারীতি কন্সালটেন্ট হিসেবে সবার পছন্দ ডা. শেঠী। বাঙালিরা উনাকেই বেশি প্রেফার করেন। উনার রুমের লোকেশনটা আলাদা। লম্বায় প্রায় ৬ ফুটের কিছু বেশি। সুন্দর ত্বক, সুঠাম দেহ। বয়স ৬৩-৬৪ ছুঁইছুঁই করলেও এখনো তারুণ্য আছে। বয়স্কতায় বুড়িয়ে যাননি। অসম্ভব মার্জিত এবং সৌজন্যতার অধিকারী ভদ্রলোক। চেম্বারের রুম আর ওয়েটিং রুমটাও বিশাল। ৩-৪ জন স্টাফ। রোগীর পর রোগী দেখছেন। ২০-২৫ জন দেখা শেষ করে অপারেশন থিয়েটারে যাচ্ছেন। আবার আসছেন। রোগী দেখছেন। কনফারেন্স, ফরেন ডেলেগেট সব জায়গাতেই তার উপস্থিতি আছে। ভারতের ৬-৭ টি প্রধান ভাষার সাথে বাংলাও বলতে পারেন অনর্গল। এটাই বাঙালিদের আকৃষ্ট করেছে বেশি। তার স্মিতহাস্য মুখাবয়ব আপনার ভালো লাগবে। তিনি সব কিছু দেখেশুনে রায় দিবেন। বেশিরভাগই অপারেশন লাগবে কি লাগবে না টাইপ। তারপর খরচের ব্যাপারে কথা বলতে যেতে হবে এক স্টাফের কাছে। সে একটি আনুমানিক খরচ জানিয়ে দিবে।

উল্লেখ্য ব্যাপার, ভারতীয় ডাক্তারদের কথা বলা, বোঝানো, কাউন্সেলিং নিঃসন্দেহে আমাদের চেয়ে ভালো। চিকিৎসা একই হলেও এই বিষয়গুলো আমাদের রোগীরা অনেক বেশি উপভোগ করেন। আমাদের দেশের অনেক প্রখ্যাত ডাক্তার, সময় বা ব্যক্তিগত কারণে হোক, ভালো কাউন্সেলিং করা কিংবা সময় দিয়ে দেখেন না। অনেকের আচরণ খুবই রূঢ়। আমি নিজেও আমাদের পরিবারের কাউকে নিয়ে গিয়ে কয়েকবার লজ্জিত হয়েছি পরিবারের কাছেই। তবে সত্যি কথা হল, বাংলাদেশের সব ডাক্তার এমন নন। এমন অনেকে আছেন যারা ভালো কাউন্সেলিং করেন, সময় দেন। কিন্তু তাদের প্রচার প্রসারে আমরা আগ্রহী নই। কারণ নেগেটিভ বিষয়গুলোই আমাদের বেশি পছন্দ।

চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এর বাইরে আপনি ডাক্তারদের দেখাও পাবেন না। হঠাৎ হঠাৎ পাবেন। কিন্তু আমাদের ডাক্তারদের হাতের কাছেই পাওয়া যায়। যেসব জিনিস সব সময় হাতের কাছে থাকে সেগুলোর মূল্য কমে যায়।

এখানে একটু ডা. শেঠীর কথা অবশ্যই বলতে হয়। তার সুনামটাও মিথ্যে না। দেবী শেঠীকে প্রত্যেকেই নিজ নিজ সামর্থ্যানুযায়ী অনুরোধ করে খরচটা কমিয়ে দিতে। উনিও যথাসাধ্য কমানোর ব্যবস্থা করেন। এমনও দেখেছি একদম বিনা পয়সায় হয়েছে। প্রি অপারেটিভ, অপারেটিভ, পোস্ট অপারেটিভ হাসপাতাল খরচ সব ফ্রি। ওষুধ, খাবার হাসপাতাল দেয়। এই লোকের সুনামের পেছনে মূলত গরীবদের প্রতি তার ভালোবাসার কারণে। উনার প্রতি কিছু ব্যক্তিগত কারণে আমার অনেক সন্মান রয়েছে।

কংগ্রেসের শাসনামলে উনি তৃতীয় সর্বোচ্চ ভারতীয় বেসামরিক সন্মাননা পদ্মভূষণ এ সন্মানিত হয়েছিলেন হার্টের চিকিৎসায় ভারতীয় ইতিহাসে বিপ্লব ঘটানোর জন্য। তিনি ভারতে প্রথম ব্যক্তি যিনি ৯ দিনের বাচ্চার সফল হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করেছিলেন। হার্টের চিকিৎসায় আরো অনেক কীর্তি রয়েছে তাঁর।

শেষ অংশে এসে বলি, ডা. দেবী শেঠীর হাসপাতাল প্রাইভেট। দেশের সব হাসপাতালে এমন সেবা চাওয়া হাস্যকর। আবার ডাঃ দেবী শেঠীর মতই সব ভারতীয় ডাক্তাররাও এত মহান নন। যদি তারাও মহান হতেন তারাও দেবী শেঠী হতেন। সব ভারতীয় ডাক্তারকে দেবী শেঠী ভাবা ভুল। সবাই এমন নয়। আবার গুটি কয়েক দেশী ডাক্তারের আচরণে ক্ষুণ্ণ হয়ে সবাইকে এই রকম ভাবাও বোকামি। একটু বিচার বুদ্ধি খরচ করে ভাবলে বোঝা যায়, দেশের রোগীরা ব্যাঙ্গালোরের এই হাসপাতাল ছাড়া অন্য কোথাও যান না। কারণ ওখানে দেবী শেঠী নেই। এটা যেমন সত্য, দেশের সব হাসপাতালের ডাক্তাররা কসাই, ডাকাত এমন ভাবাও মূর্খতা। ভালো ডাক্তার আছেন। আপনি যদি ভারতীয় মানের ভালো সেবা চান, আপনাকেও ভারতে গিয়ে যেভাবে ব্যবহার করেছেন, এখানেও সেরকম ব্যবহার করতে হবে। সব কিছুকে নিজ নিজ জায়গা থেকে বুদ্ধিমত্তার সাথে বিচার করার চেষ্টা করুন। আমেরিকা এবং কেনিয়া যেমন এক দন্ডে মাপা যাবেনা, ভারতের একটি হাসপাতালের সেবা দিয়ে পুরো ভারত এর স্বাস্থ্যখাত বিচার করা যায় না। করা গেলে আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার Ranking ভারতের চেয়ে এত আগে থাকতাম না।

আরও পড়ুন-

বাংলাদেশিদের ভারতীয় চিকিৎসার উপাখ্যান: পর্ব-২  প্রথম খণ্ড

বাংলাদেশিদের ভারতীয় চিকিৎসার উপাখ্যান: পর্ব-২   দ্বিতীয় খণ্ড

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত