ঢাকা      বৃহস্পতিবার ২৬, এপ্রিল ২০১৮ - ১৩, বৈশাখ, ১৪২৫ - হিজরী

অধ্যাপক ডা. সেলিনা পারভিন

একজন সফল চিকিৎসক ও মা

সৎ এবং আদর্শনিষ্ঠ পিতার যোগ্য সন্তান অধ্যাপক ডা. সেলিনা পারভিন। পিতার সান্নিধ্যে অতি শৈশব থেকেই জীবনকে দেখেছেন বৈষয়িক সম্পদে প্রলুব্ধ হওয়া নয় বরং মানবিক ও মায়াঘনবোধে আত্মিক হয়ে মানুষের সেবা করে যাওয়া। সেই চেতনায় নিজেকে লালন করেছেন, লক্ষ্যে এগিয়েই শুধু যাননি সর্বশেষ অর্জন বলতে যা বোঝায় সবটাই পেয়েছেন। 

অধ্যাপক ডা. সেলিনা পারভিন বাগেরহাট জেলার বৈটপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মায়ের আট সন্তানের মধ্যে তিনি পঞ্চম। তিনি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মরহুম সামসুদ্দিন আহমেদ এবং রেসাতুন্নাহারের যোগ্য সন্তান। শিক্ষক পিতা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বদলি হয়ে তার পেশাগত জীবন অতিবাহিত করেন। শেষ অবধি তিনি ঢাকা জেলার মোহাম্মদপুর সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অবসরে যান। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল এ্যান্ড কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে শিক্ষকতার আরও কিছু সময় পার করেন।

সুতরাং সেলিনা পারভিনের অধ্যয়ন জীবনের সুবর্ণ সময় কাটে শিক্ষক পিতার ঘনিষ্ঠ সাহচর্যেই। তাই তিনি ঢাকার বিখ্যাত স্কুল ও কলেজে শিক্ষা অর্জন করার সুযোগ পান। আজিমপুর গার্লস হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং হলিক্রস কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষে ভর্তি পরীক্ষায় ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা তালিকায় ১২০তম হলেও সেটা ছিল নিতান্ত শখের বিষয়। অর্থাৎ তিনি প্রকৌশলী হতে চাননি, হতে চেয়েছেন একজন চিকিৎসক। তাই তিনি পরবর্তী বছর বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন।

মা-বাবা, ভাই-বোন অন্তঃপ্রাণ স্নেহময়ী সেলিনা পারভিনের অনেক কষ্ট হয়েছে সবাইকে ছেড়ে বরিশালে চিকিৎসা শাস্ত্র অর্জনের প্রয়োজনীয় সময়গুলো শেষ করতে। নিষ্ঠাবান এবং নিবেদিত ছাত্রীকে পরবর্তী সময়ে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। রাজনৈতিক সচেতন এই নারী শিক্ষার্থী জীবনে ছাত্র সংসদে নিজের প্রতিনিধিত্বও বজায় রাখেন।

কোন মানুষের ভিতরে যদি মনুষত্ববোধ থাকে তাহলে সেখানে সাধারণ মানুষের পক্ষে কাজ করতে তার কোন অসুবিধাই হয় না। এই সফল নারীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। একজন অভিজ্ঞ এবং সুচিকিৎসক হতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক অর্জনগুলো যেমন নিজের আয়ত্ত্বে আনতে হয় তেমনি সততা, দক্ষতা আর নিষ্ঠাকেও সম্বল করে সামনে এগিয়ে চলতে হয়। 

চিকিৎসক হওয়ার পর সহপাঠী শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আমিনুল হকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জন্মগ্রহণ করে তাঁদের দুই সন্তান, মেয়ে পরমা আমিনুল এবং ছেলে প্রমিত আমিনুল। এরপর আরও উচ্চতর ডিগ্রী নেয়ার অদম্য ইচ্ছা থেকে ১৯৯০ সালে এফসিপিএস, ডিজিও ডিগ্রী অর্জন করেন। ইতোমধ্যে ছোট ছেলে অপার আমিনুলের জন্ম। ফলে এফসিপিএস করতেও একটু দেরি হয়ে যায়। 

২০০২ সালে স্ত্রীরোগও প্রসূতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের এই ডিগ্রী তার পেশাগত জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখে। বরিশাল মেডিক্যালের স্ত্রীরোগও প্রসূতি বিভাগে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে (২০০৭-২০১৬) অবসরে যান। 

সরকারী চাকরি থেকে ছুটি মিললেও হাজার হাজার অসুস্থ ও অসহায় নারীর কাছ থেকে তিনি কখনও দূরে সরে সরে যাননি। এখনও তার অবসর কাটে দুস্থ, অনেকটা নির্বিত্ত, হতদরিদ্র গর্ভবতী নারীদের নিবিড় সান্নিধ্যে। 

ডা. সেলিনা পারভীন গল্প করতে করতে বলছিলেন আমাদের দেশের মেয়েরা যে কত পেছনে পড়ে আছে বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা গর্ভবতী নারীরা সঠিক সময়ে তাদের রোগ চিনতেও ভুল করে। এসব মেয়ের শারীরিক যন্ত্রণাও অনেক সময় চিকিৎসার বাইরে চলে যায়। ছাত্র বয়স থেকে রবীন্দ্রনাথ পড়া এই চিকিৎসকের মতে মৃত্যুশয্যায় কবির শেষ অপারেশনে কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি ছিল। এখনও রবীন্দ্রসঙ্গীতে বিভোর হয়ে যান। 
 
রবীন্দ্রপ্রেমিক সেলিনা পারভিন এখনও কবির কত কবিতা যে তার স্মরণ চেতনায় অম্লান করে রেখেছেন সত্যিই বিমুগ্ধ হওয়ার মতোই। বরিশাল মেডিক্যালের স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি একজন জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবেও নিজের অবস্থানকে শক্ত করেছেন।

পেশাগত জীবনের সর্বোচ্চ পদবি পূর্ণ অধ্যাপকের মর্যাদায়ও সাবলীলভাবে বিচরণ করেছেন। এসব করতে গিয়ে কোন ধরনের অন্যায় অবিচারকে আমলে নিতে দেখা যায়নি। তার নিজের ব্যক্তিগত রোগী আর চিকিৎসালয়ের রোগীর মধ্যে কখনও ফাঁরাক করেননি। ছাত্রছাত্রীর অতিপ্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক ডা. সেলিনা পারভিন আজও তাদের কাছে এক আদর্শনিষ্ঠ চিকিৎসক। হাজার হাজার গর্ভকালীন মায়ের চিকিৎসা সেবা দেয়া এই কৃতী অনন্য নারী একজন সফল মাও বটে।

বড় মেয়ে পরমা আমিনুল চিকিৎসাবিদ্যা শেষ করে পিজিতে এমডি কোর্সের উচ্চতর গবেষণায় নিয়োজিত। শুধু তাই নয়, প্রথমবারেই এফসিপিএসের ভর্তি পরীক্ষায় সফলকাম হওয়াও। বড় ছেলে প্রমিত আমিনুল আইনশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করে আরও উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশ গমনের অপেক্ষায়। ছোট ছেলে অপার বরিশাল মেডিক্যালের শেষ বর্ষের ছাত্র।

আরও পড়ুন-

প্রফের ভাইভা বোর্ডে যখন ‘মা’

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

অন্যরকম সরকারি হাসপাতাল

অন্যরকম সরকারি হাসপাতাল

সরকারি হাসপাতাল সম্পর্কে নেতিবাচক একটা ধারণা তৈরী হয়ে গেছে, যেভাবেই হোক। এর…

লাশ কেন হঠাৎ নড়ে উঠে?

লাশ কেন হঠাৎ নড়ে উঠে?

এক: তিন বছরের টুনটুন ছিলো বাবা মায়ের চোখের মনি। সারাদিন বাড়ির এ মাথা…

চলমান সকল নিয়োগে থাকছে কোটা

চলমান সকল নিয়োগে থাকছে কোটা

কোটা বাতিল হলেও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে চলমান সব নিয়োগে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি বহাল…

মানহীন মেডিকেল কলেজ বন্ধ করা যাচ্ছে না

মানহীন মেডিকেল কলেজ বন্ধ করা যাচ্ছে না

আমরা মানহীন মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দেয়ার পক্ষে। আর টাকার বিনিময়ে আইনজীবীরা আদালত থেকে…

ঢাবির হল থেকে ছাত্রীদের বের করে দেয়ার অভিযোগে বিক্ষোভ

ঢাবির হল থেকে ছাত্রীদের বের করে দেয়ার অভিযোগে বিক্ষোভ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হল থেকে মধ্যরাতে ছাত্রীদের বের করে দেয়ার প্রতিবাদে…

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করবে চাল!

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করবে চাল!

সোনালি মিনিকেট চাল খেলে রক্তে শর্করা এবং সুগার কমে যায়। ফলে ডায়াবেটিস…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর