আশরাফুল আলম

আশরাফুল আলম

সহকারী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


০৩ এপ্রিল, ২০১৮ ০৭:৪১ পিএম

অটিজম : জানতে হবে, জানাতে হবে

অটিজম : জানতে হবে, জানাতে হবে

সরকারের নানা কর্মসূচি, প্রচার-প্রচারণা, শিক্ষা বিস্তারসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা আগের চেয়ে কিছুটা বাড়লেও অটিজম নামক প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে তেমন কোনো সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। আমাদের সমাজে এখনও এ ধরনের শিশুদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানসিক বা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বলা হয় কিংবা কোথাও হাবাগোবা বলে চিহ্নিত করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কিন্তু অটিজম আর বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা বা অন্য কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতা এক নয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অটিজমকে সিজোফ্রেনিয়া নামক এক ধরনের মানসিক রোগ বলে ভুল করা হয়। বাংলাদেশে এরূপ বাস্তবতায় প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও অটিজম সচেতনতা দিবস পালন করা হলো গতকাল। অটিজম বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখে জাতিসংঘের উদ্যোগে ২০০৮ সাল থেকে প্রতি বছর ২ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী অটিজম দিবস পালিত হয়ে আসছে।

 

অটিজম মূলত এক ধরনের নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার। অর্থাৎ এটি এক ধরনের স্নায়ুবিক বা মনোবিকাশগত সমস্যা যার লক্ষণ সাধারণত একটি শিশুর জন্মের পর থেকে তিন বছরের মধ্যে প্রকাশ পেয়ে থাকে। অটিজম শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন সুইচ মনোবিজ্ঞানী চিকিৎসক অয়গেন বয়লার (Eugen Blueler)। সিজোফ্রেনিয়ার কিছু উপসর্গ বোঝাতে ১৯১১ সালের দিকে তিনি অটিজম শব্দটি ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে ১৯৪৩ সালে জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লিও ক্যানার (Leo Kanner) বেশ কিছু শিশুর অসামাজিক আচরণের কারণ খুঁজতে গিয়ে এই অটিজম শব্দটি বেছে নেন এবং তিনি এর নাম দেন ইনফেনটাইল অটিজম। তিনি প্রমাণ করেন অটিজমে আক্রান্তরা মানসিক প্রতিবন্ধী বা পাগল নয়। 

 

অটিজম শব্দটি গ্রীক শব্দ ‘অটোস’ থেকে এসেছে যার অর্থ আত্ম, নিজ বা Locked Within অর্থাৎ নিজের মধ্যে আবদ্ধ থাকা। অটিজমে আক্রান্তদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এরা নিজেকে নিজের মধ্যে আবদ্ধ রাখে বা নিজের জগতে বিচরণ করে। অটিজমে আক্রান্তদের বৈশিষ্ট্য বা লক্ষণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এরা বাহ্যিকভাবে দেখতে অনেকটা অন্য সব স্বাভাবিক  শিশু-কিশোরদের মতই। কেননা শারীরিক গঠনে এদের তেমন কোনো সমস্যা থাকে না। মূলত সামাজিক সম্পর্ক, যোগাযোগ এবং আচরণগত সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটিই এদের ভিন্নতার মূল বিষয়। যেমন- সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেখা যায় এরা মেলামেশা বা অন্যের সাথে ভাব আদান প্রদান করতে পারে না। পিতা-মাতা বা অন্যের আদর-স্নেহের প্রতি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না, কথা বলার সময় চোখে চোখে তাকায় না। এরা অন্যের প্রতি আগ্রহী হয় না, বরং কোনো বস্তু বা অবজেক্টের প্রতি অধিক আগ্রহ প্রকাশ করে। এদের মাঝে পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ লক্ষ্য করা যায় এবং দৈনন্দিন রুটিনে সামান্য পরিবর্তন এরা সহজে মেনে নিতে পারে না। কখনও কখনও সামান্য কিছুতেই ভয় পেতে পারে। উদ্দেশ্যহীনভাবে কোনো কিছুতে তীব্র আসক্তি থাকতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে অটিজমের সাথে পাকস্থলী ও অন্ত্রের রোগ, মৃগীরোগ, ঘুমের ব্যাঘাত, শারীরিক অনুভূতির সমস্যাসহ নানাবিধ সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে সব অটিস্টিক শিশুই বোকা বা অমেধাবীও নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা অন্যদের চেয়ে বেশি মেধাবী। জানা যায়, প্রতি দশ জন অটিস্টিক শিশুর মধ্যে একজনের ছবি আঁকায়, গানে, গণিতে বা কম্পিউটারে প্রচণ্ড দক্ষতা থাকে। যেমন  অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা মহাবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনিস্টাইনের মাঝে মৃদু মাত্রার অটিজমের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল।

 

কারো কারো মতে, জেনেটিক ডিজঅর্ডার,  ভাইরাল ইনফেকশন, গর্ভকালীন জটিলতা এবং বায়ু দূষণকারী উপাদানসমূহ অটিজমের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে। আজও বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে কতজন অটিজমে আক্রান্ত তার কোনো সুনির্দিষ্ট বা সুস্পষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে  জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক ২০০৯ সালে ঢাকা বিভাগে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, দেশে প্রতি ১০০ শিশুর প্রায় একজনের অটিজমের সমস্যা রয়েছে যা উন্নত দেশগুলোর কাছাকাছি। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ জরিপ থেকে জানা যায়, দেশে মোট প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ২.৮৭ শতাংশ অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরে অটিস্টিক শিশুর হার তিন শতাংশ।

 

বর্তমান সরকার অটিস্টিক শিশুসহ সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় অনেক তত্পর। আমরা জানি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ বাংলাদেশ জাতীয় অটিজম উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান যিনি বিশ্বব্যাপী অটিজম নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর উদ্যোগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘অটিজম আক্রান্ত শিশু ও তাদের পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যসেবা এবং আর্থ-সামাজিক সহায়তা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রস্তাব গৃহীত হয়। অটিজম বিষয়ে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাঁকে ‘এক্সিলেন্স ইন পাবলিক হেলথ অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করেন। তাঁর উদ্যোগে বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। অটিজমে আক্রান্তদের বিনামূল্যে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে মিরপুরে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ক্যাম্পাসে ‘অটিজম রিসোর্স সেন্টার’ ও একটি ‘স্পেশাল স্কুল ফর চিলড্রেন উইথ অটিজম’ স্থাপন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হয়েছে ‘সেন্টার ফর নিউরোডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অটিজম ইন চিলড্রেন’। অটিজমসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের শনাক্তকরণ, বিনামূল্যে ফিজিওথেরাপি ও অন্যান্য চিকিত্সাসেবা প্রদানের জন্য দেশের ৬৪টি জেলায় ১০৩টি ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালু করা হয়েছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ৩২টি মোবাইল থেরাপি ভ্যান চালু রয়েছে। সরকার ২০১৩ সালে সব ধরনের নিউরোডেভেলপমেন্টালি ডিজেবলডদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্য ‘নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩’ নামে একটি আইন প্রণয়ন করেছে যেখানে অটিজমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়েও অটিজম বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সিলিং সাইকোলজি বিভাগ, যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগ, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট অটিজম ও প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক নানা কোর্চ চালুর মাধ্যমে এ বিষয়ে শিক্ষা প্রদান ও সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

 

শহরাঞ্চলে সচ্ছল, সচেতন অভিভাবকগণ নিজেরা বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সহযোগিতায় তাদের সন্তান অটিস্টিক কিনা তা নির্ণয় করতে পারছেন এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। কিন্তু যারা দরিদ্র, অসচেতন বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে যেখানে অজ্ঞতা, কুসংস্কারসহ নানা সামাজিক সমস্যা এখনও প্রকট, সেখানে অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা চরমভাবে অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার।  কেননা অটিজম নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে তার প্রায় সবই শহরকেন্দ্রিক বিশেষ করে ঢাকা শহরকেন্দ্রিক এবং সেখানে সেবা গ্রহণ ব্যয়বহুলও বটে। দেখা গেছে, মৃদু ও মধ্যম মাত্রার অটিজম শুরুতে নির্ণয় করা গেলে এবং সঠিকভাবে সেবা যত্ন, শিক্ষা ও চিকিত্সার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে এর উপসর্গ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কাজেই ব্যাপক প্রচার প্রচারণার মাধ্যমে সর্বস্তরের জনগণকে অটিজম বিষয়ে সচেতন করতে হবে । পাশাপাশি সঠিক পরিচর্যা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার মাধ্যমে তাদের সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

 

সৌজন্যে: ইত্তেফাক

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত