০২ এপ্রিল, ২০১৮ ০৭:১৮ পিএম

স্রোতের বিপরীতে ডাক্তার আফরিন

স্রোতের বিপরীতে ডাক্তার আফরিন

মেডিক্যাল সাইন্সের সব শাখাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত সময় কাটে সার্জনদের। দিন নেই, রাত নেই সারাদিন শুধু অপারেশন (ওটি) এর কাজ। আর কাজটা সময়সাপেক্ষ ও প্রচুর শ্রম দিতে হয় বলে খুব কম মেয়ে এই পরিশ্রমের পেশাতে আসেন। ছেলে সার্জনদের মাঝে কিছু মেয়ে আছেন যারা এই চ্যালেঞ্জিং সার্জারিকেই ভালোবেসে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

এমন একজন সাহসী তরুণী সার্জন ডা. আফরিনের গল্প শোনাচ্ছেন আয়েশা আলম প্রান্তি

মেডিক্যাল পাস-এর পরবর্তী ধাপে ১১ মাস ইন্টার্নশিপ করতে হয়। এ সময় নব্য পাস করা চিকিত্সকরা সিনিয়র চিকিত্সকদের সাথে থেকে রোগী দেখা, রোগীর যাবতীয় চিকিত্সা ও ব্যবস্থাপনা, অপারেশন করে রোগীকে সুস্থ করে তোলা ইত্যাদি নানাবিধ কাজ হাতে কলমে হাসপাতালে শিখে। পুরো ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়ার পর মেলে সার্টিফিকেট আর তারপর চিকিত্সকরা যে যার পছন্দমতো বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার চেষ্টা করে।

আর এই ১১ মাসের ইন্টার্নশিপ-এর সময় থেকেই সার্জারি বিষয়টার প্রতি আমার ভালো লাগা শুরু। এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছিলেন ডা. আফরিন সুলতানা। আফরিন ২০০১ সালে চট্টগ্রামের সেইন্ট স্কলাস্টিকা গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও ২০০৩ সালে চিটাগাং কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এই মেধাবী ২০০৪ সালে চান্স পেয়ে ভর্তি হন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ২০০৯ সালে পাস করে চিকিত্সক হলেন ও ইন্টার্নশিপ শুরু করলেন।

‘রোগীরা ব্যথা, কষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতেন। হাঁটতে পারছেন না, ব্যথায় চিত্কার দিয়ে কাঁদছেন এমন রোগীকে একটা অপারেশন করার পর পরদিন গিয়ে দেখি তিনি সুস্থ। হালকা একটু অপারেশনের ব্যথা ছাড়া আর কোনো সমস্যা নেই। রোগীরা খুশি হয়ে যে দোয়া করে আর নিজের মধ্যে যে ভালোলাগা কাজ করে তা কোটি টাকা দিয়েও কেনা সম্ভব না। সার্জন হতে চেয়েছি কারণ একজন সার্জন হিরো। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করেন যাতে আমরা আমাদের সব জ্ঞান দিয়ে একজন মানুষকে সুস্থ করে তুলতে পারি, অপারেশন করে।’ এভাবেই নিজের ভালোলাগার কথাগুলো বলছিলেন ডা. আফরিন।

একজন মেয়ে সার্জন হিসেবে সব সময় আশে-পাশের ছেলে সার্জনদের মাঝে তিনি এমন একটা মানসিকতা দেখতেন, যে তুমি মেয়ে, তুমি আবার কিসের সার্জন হবা। কিন্তু সেই মেয়েই মাত্র ৩২ বছর বয়সে ডিগ্রিধারী সার্জন হয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন মেয়েরাও যোগ্যতাসম্পন্ন হতে পারেন যদি তারা সুযোগটা পান। ২০১৩ সালে বিএসএমএমইউ এর অধীনে রেসিডেন্সি কোর্সে (পেডিঅট্রিক সার্জারি) জয়েন করেন ডা. আফরিন। সেখানে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি।

২০১৪ সালে রয়েল কলেজ অব ইংল্যান্ড থেকে সার্জারিতে (এমআরসিএস) পাস করেন। ২০১৪ সাল থেকে সার্জারির রেজিস্টার চিকিত্সক হিসেবে কর্তব্যরত আছেন হলি ফ্যামিলি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। অর্থাৎ, ভালো সার্জন হওয়ার পাশাপাশি পড়াতেও পটু এই চিকিত্সক।

২০১৭ সালে বিসিপিএস এর অধীনে গৌরবের সাথে সার্জারিতে এফসিপিএস (পার্ট ১ ও পার্ট ২) পাস করেন। যেসব মেয়েরা সার্জন হতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘সার্জন হওয়ার পথটা সহজ নয়। সার্জারিকে ভালোবাসতে হবে, পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকতে হবে। বই পড়ে শেখার চেয়ে রোগী দেখে, অপারেশন করে শেখা জ্ঞান এক্ষেত্রে বেশি কাজে দেয়। আর আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। যোগ্যতা আর পরিশ্রম দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে প্রতিনিয়ত।’

বাংলাদেশের মেয়েরা অবহেলিত, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মহিলারা। টাকার কারণে অনেকে চিকিত্সকের কাছে যেতে পারেন না। এছাড়া ধর্মীয় গোড়ামির জন্যও গ্রামের মহিলারা নিজের শরীরের অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা ছেলে সার্জনকে দেখাবেন না, ছেলেদের হাতে অপারেশন তো দূরে কথা। তাই এসব মহিলাদের জন্য ডা. আফরিন এগিয়ে এসেছেন। তিনি সিটি হাসপাতালের সাথে মিলিতভাবে কাজ করছেন।

২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে তিনি আয়োজন করেন ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতা দিবস উপলক্ষে ফ্রি হেল্থ ক্যাম্প। যেখানে অনেক গরিব মহিলারা আসেন, তারা তাদের স্তন পরীক্ষা করান ও প্রয়োজনীয় টেস্ট করান তাও ডিসকাউন্টে। এ বছর কোলন ক্যান্সার সচেতনতা দিবস উপলক্ষে ডা. আফরিন আয়োজন করেন সিটি হাসপাতালের সাথে মিলিতভাবে ফ্রি হেল্থ ক্যাম্প।

ক্যাম্পে রোগীদের কোলন ক্যান্সার আছে কিনা পরীক্ষা, তাদের সচেতন করে তোলার চেষ্টা ও ডিসকাউন্ট দিয়ে কোলনস্কপি, এন্ডোসকপির সুবিধা। এছাড়া প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়।

ডা. আফরিনের ইচ্ছা শুধু ঢাকা শহরে না, সারা বাংলাদেশে নারীদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি। তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম করেছেন। উদ্দেশ্য একটাই বাংলাদেশের নারীদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি।

ডা. আফরিন বলেন, ‘নারীরা ব্রেস্ট ক্যান্সারসহ যে কোনো ক্যান্সারের ব্যাপারে সচেতন না। তারা একদম ক্যান্সারের শেষ স্টেজে চিকিত্সকের কাছে আসেন যখন চিকিত্সা করলেও আর বাঁচার আশা থাকে না। তাই দেশের নারীদের যদি সচেতন করে গড়ে তোলা হয়, তারা নিজেরাই ঘরে বসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারবে ও কোনো লক্ষণ দেখা মাত্র চিকিত্সকের কাছে চলে আসবে। তাহলে বহু নারীকে ক্যান্সারে অকাল মৃতু থেকে বাঁচানো সম্ভব শুধু একটু  সচেতনতার মাধ্যমে।’

ছবি: শ্রাবণ ইমতিয়াজ

সৌজন্যে: ইত্তেফাক

আরও পড়ুন
►সদ্য পাস করা এমবিবিএস ডাক্তারদের জন্য জরুরি কিছু পরামর্শ

►স্বল্প সময়ে বিসিএস প্রস্তুতি

►যেভাবে বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হলেন ডা. সুবর্ণা শামীম আলো

►এফসিপিএস ডিগ্রিধারী হতে চাইলে জেনে নিন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত