ঢাকা বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৫ ঘন্টা আগে
আনিকা চৌধুরী

আনিকা চৌধুরী

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ 

 এসএইচ-০৯


০১ এপ্রিল, ২০১৮ ১৫:৫৬

মফস্বলের এক মেয়ের ডাক্তারি পড়ার গল্প

মফস্বলের এক মেয়ের ডাক্তারি পড়ার গল্প

আমার বেড়ে উঠা গাইবান্ধা জেলার মফস্বল শহর গোবিন্দগঞ্জে, যেখানে ছিলো না ভালো কোনো স্কুল কিংবা কলেজ। কিন্তু সেই ছোট্ট শহরে থেকেও আমার বাবা আমাকে নিয়ে বড় বড় স্বপ্ন দেখতেন। পঞ্চম শ্রেণীর বৃত্তি পরিক্ষার পর বাবা বলেছিলেন আমাকে ঢাকা শহর দেখাবেন। ঢাকায় ঘুরতে এসে বাবা আমাকে ভিকারুন্নেসা নুন স্কুলে ভর্তি পরিক্ষা দেওয়ান। আমি ভর্তি হই এবং কিছুদিন ক্লাসও করি। কিন্তু আবাসন ব্যাবস্থা না থাকায় বাবা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হন। আবারো শুরু হয় আমার মফস্বল জীবন। যে আমি কয়েকদিন আগেও ভিকারুন্নিসার ড্রেস পরে স্কুলে যেতাম সেই আমিই গোবিন্দগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ড্রেস পরা শুরু করলাম। আমি প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় কাঁদতাম। মেয়ের চোখের পানি বাবার বেশিদিন সহ্য হয়নি।

একদিন ভোরবেলা বাবা পেপার নিয়ে আসলেন যেখানে SSC পাশকৃত কিছু ক্যাডেট ভাইয়া-আপুদের ছবি ছিলো। সেই খাকি পোশাকের মধ্যে কি যাদু ছিলো আমার জানা নেই, কিন্তু সেদিন থেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম। বাবা আমাকে ক্যাডেট কোচিং এর জন্য সুদূর ময়মনসিংহে রেখে আসলেন।

তখন যাতায়াত ব্যাবস্থা তেমন ভালো ছিলোনা। রোজার ঈদে আমাকে বাসায় আনতে গিয়ে, বাসে সিট না পেয়ে প্রায় ১১ ঘন্টা বাবাকে দাঁড়িয়ে যেতে হয়। বাবার এই কষ্ট দেখে আমি কুরবানি ঈদে বাসায় আসিনি। হোস্টেলে ঈদ করেছি।

২০০৬ সালে আমি জয়পুরহাট গার্লস ক্যাডেট কলেজে চান্স পাই। তখনকার সময়ে আমাদের এলাকায় গার্লস ক্যাডেট তেমন ছিলো না। মানুষ ক্যাডেটের নামই শুনেনি। আমি যখন ছুটিতে বাসায় আসতাম, এলাকার লোকজন বাবাকে বলতো, "ভাই, এতো ছোট মেয়েকে পুলিশে দিছেন?!"

বাবা শিক্ষক হওয়ার কারণেই কি না জানিনা, পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষকতাও আমার রক্তের সাথে মিশে গেছে। শিক্ষকতায় হাতেখড়ি হয় অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন বগুড়া শাহীন ক্যাডেট কোচিং এ ক্লাস নেওয়ার মাধ্যমে। মেডিকেলে এসেও পড়ানোর এই অভ্যাসটা অব্যাহত আছে। নিজের সীমিত জ্ঞান থেকেই কাউকে কিছু জানাতে বা শিখাতে পারলে ভালো লাগে।

ক্যাডেট কলেজ থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি কুইজ, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা ইত্যাদি চর্চা শুরু করি। মেডিকেল কলেজে এসেও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়েছি। ব্যাক্তিগত অর্জন খুব বেশি না হলেও, মনের শান্তির জন্য এসব করি।

ছোট বেলা থেকে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিলো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস আমাকে খুব টানতো। কিন্তু ভাগ্য আমাকে মেডিকেলেই নিয়ে এসেছে। যখন পড়াশোনা করে ক্লান্ত হয়ে যাই তখন মনে হয় বাবা-মা যে পরিমাণ কষ্ট করে মফস্বল থেকে আমাকে দেশের সর্বোচ্চ একটা জায়গায় পৌছিয়ে দিয়েছেন, এখান থেকে ফিরে তাকাবার কোনো সুযোগ নেই আমার। আমার অনেক পড়তে হবে, জানতে হবে, শিখতে হবে।

আমার পরিবার আমার সব থেকে বড় শক্তি, বড় সম্পদ। যখন নারী দিবস বা কন্যা শিশু দিবসে সফল নারীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়, আমার মনে হয় তখন একই সাথে সেইসব বাবা-মাকেও পুরস্কৃত করা উচিৎ, যারা মেয়েদেরকে মেয়ে মনে না করে সন্তান হিসেবে গড়ে তুলেন। 

লিখেছেন: আনিকা চৌধুরি

এসএইচ ০৯

সৌজন্যে: হিউম্যানস অব সোহরাওয়ার্দী

আরও পড়ুন-

‘বাংলাদেশের গর্ব’ ডা. মারুফ

ভবিষ্যৎ ডা. মায়মুনার গল্প

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত