আ্যনেসথেসিয়ার জন্ম কি ব্যাথা থেকে?


আঠারোশ চল্লিশ দশকের আগে রোগীরা দুশ্চিন্তা নিয়ে নয় কিন্তু প্রচণ্ড ভয়ে ভয়ে অপারেশন রুমে ঢুকত! কিন্তু কেন? কারণ রোগী যাতে ব্যথা অনুভব করতে না পারে সেই জন্য তাকে অনুভূতিহীন করার কোন উপায় তখন ছিল না।

ডেনিস ফ্র্যাডিন “আমরা ব্যথাকে জয় করেছি” (ইংরেজি) বইয়ে বলেন, “ডাক্তাররা দু’বোতল মদ নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকতেন। এক বোতল রোগীর জন্য আর অন্য বোতল তার নিজের জন্য, যাতে ব্যথায় কাতর রোগী যখন চিৎকার করে উঠবে তখন তা তিনি সইতে পারেন।”[page 2 & 19: Reproduced from Medicine and the Artist (Ars Medica) by permission of the Philadelphia Museum of Art/Carl Zigrosser/ Dover Publications, Inc.]

রোগীকে মাতাল অথবা নেশাচ্ছন্ন করা!

অপারেশনের সময় ব্যথা লাঘব করার জন্য ডাক্তার, দন্ত চিকিৎসকরা আর এমনকি রোগীরাও যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন। চীন ও ভারতের ডাক্তাররা গাঁজা ও হাশিস ব্যবহার করতেন। পৃথিবীর অনেক দেশে আফিম এবং মদও ব্যবহার করা হতো। প্রাচীন গ্রিক ডাক্তার ডায়োক্রোডিস নিদ্রাকর্ষক উদ্ভিদ ও মদ মিশিয়ে বানানো ওষুধকে অনুভূতিনাশক শক্তির উৎস বলে উল্লেখ করেছিলেন আর তিনিই সবচেয়ে প্রথমে “আ্যনেসথেসিয়া”বা অনুভূতিবিলোপ শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন বলে মনে করা হয়। এর পরে কিছু ডাক্তাররা এমনকি সম্মোহনবিদ্যা কাজে লাগিয়েও পরীক্ষা করে দেখেছেন।

কিন্তু তারপরেও ব্যথা থেকেই যেত, পুরোপুরি উপশম হতো না। তাই, ডাক্তার ও ডেনটিস্টরা চেষ্টা করতেন যাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপারেশন করে ফেলা যায় আর তারা কত তাড়াতাড়ি অপারেশন করতে পারেন তার ওপর ভিত্তি করে তাদের পদমর্যাদা দেওয়া হতো। কিন্তু তাড়াতাড়ি করে করলেও অনেক ব্যথা লাগত। আর তাই, লোকেরা অপারেশন করার বা দাঁত ওঠানোর সময়কার ব্যথার কথা ভেবে টিউমার অপারেশন করার বা নষ্ট দাঁত উঠিয়ে ফেলার কথা চিন্তাও করত না বরং সবরকমের অসুখের কষ্টই সহ্য করত।

সুইট ভিট্রিওল ও লাফিং গ্যাস

১২৭৫ সালে স্প্যানিশ ডাক্তার রেমন্ড লুলেস রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে পরীক্ষা করার সময় একরকমের তরল পদার্থ তৈরি করেন, যা উদ্বায়ী ও সহজে দাহ্য আর এটাকেই তিনি সুইট ভিট্রিওল নাম দিয়েছিলেন। প্যারাসেলসাস নামে সুপরিচিত সুইজারল্যান্ডের একজন ডাক্তার ষোড়শ শতকে কয়েকটা মুরগির নাকের কাছে সুইট ভিট্রিওল রাখেন এবং মুরগিগুলো যখন নিঃশ্বাসের মাধ্যমে তা গ্রহণ করে তখন তিনি লক্ষ্য করেন যে, সেগুলো শুধু ঘুমিয়েই পড়ছে না সেইসঙ্গে কোন ব্যথাও পায় না। লুলেসের মতো তিনিও মানুষের ওপর তা প্রয়োগ করে পরীক্ষা করেননি। ১৭৩০ সালে জার্মান রসায়নবিদ ফ্রবিনিয়াস এই তরল পদার্থকে ইথার নাম দেন, গ্রিক ভাষায় যেটার মানে হল স্বর্গীয় আর এই ইথার নামটা এখনও রয়ে গেছে। কিন্তু, প্রায় ১১২ বছরের বেশি সময় পরে পুরোপুরিভাবে বোঝা যায় যে ইথারের চেতনানাশক ক্ষমতা আছে।

এর মধ্যে ইংরেজ বিজ্ঞানী জোসেফ প্রিস্টলি ১৭৭২ সালে নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাস আবিষ্কার করেন। প্রথম প্রথম লোকেরা মনে করত, এই গ্যাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে সামান্য পরিমাণে নেওয়াও মারাত্মক। কিন্তু, এই গ্যাস আসলেই মারাত্মক কি না তা যাচাই করে দেখার জন্য ১৭৯৯ সালে ব্রিটিশ রসায়নবিদ ও উদ্ভাবক হামফ্রে ডেভি নিজেই তা নিয়ে দেখবেন বলে ঠিক করেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হল যে নাইট্রাস অক্সাইড গ্রহণ করার পর তার হাসি পেতে থাকে আর এইজন্যই তিনি এটাকে লাফিং গ্যাস নাম দেন। নাইট্রাস অক্সাইডের চেতনানাশক ধর্মগুলো সম্বন্ধে ডেভি লেখেন কিন্তু কেউই তার কথা বিশ্বাস করেননি।

বিভিন্ন পার্টিতে ইথার ও লাফিং গ্যাসের ব্যবহার

লাফিং গ্যাস নিয়ে কিছু সময় ধরে ডেভির হাস্যকর আচরণ করার কথা সবার মধ্যে জানাজানি হয়ে যায়। শীঘ্রিই অনেকে শুধু মজা করার জন্য এটাকে নিতে শুরু করে। এমনকি চিত্তবিনোদনকারী দলগুলো বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে অনুষ্ঠান করার সময় শ্রোতাদের মাঝ থেকে কিছু ব্যক্তিদের মঞ্চে আসার আমন্ত্রণ জানাতেন ও পালা করে তাদেরকে নাইট্রাস অক্সাইড দিতেন। গ্যাস গ্রহণ করার পর তাদের লজ্জা ও সংকোচের অনুভূতি দূর হয়ে যেত এবং শীঘ্রিই তারা মজার মজার কাণ্ড করতে শুরু করত আর তা দেখে শ্রোতারা হাসিতে ফেটে পড়ত।

ওই সময়ই বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে আনন্দ দেওয়ার জন্য ইথারও বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একবার ক্রফোর্ড ডব্লু. লং নামে আমেরিকার একজন ডাক্তার খেয়াল করেন, তার কয়েকজন বন্ধু ইথার গ্রহণ করে টালমাটাল অবস্থায় একজন আরেকজনকে আঘাত করছে অথচ তারা ব্যথা পাচ্ছে না। সঙ্গে সঙ্গে তিনি এটাকে অপারেশনে ব্যবহার করার বিষয়ে চিন্তা করেন। আর তিনি তা ব্যবহার করার একটা সুযোগও পেয়ে যান। জেমস ভেনেবেল নামে এক ছাত্র ওই “ইথার পার্টিতে” অংশ নিয়েছিলেন। তার ছোট ছোট দুটো টিউমার হয়েছিল যেগুলোকে তিনি কাটতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু, অপারেশনের সময় যে ব্যথা সহ্য করতে হয় তার ভয়ে ভেনেবেল অপারেশনের তারিখ শুধু পিছাতেই থাকেন। তাই, লং তাকে ইথার গ্রহণ করে অপারেশন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ভেনেবেল তাতে রাজি হন এবং ১৮৪২ সালের ৩০শে মার্চ ইথার প্রয়োগ করে তার অপারেশন করা হয় আর অপারেশনের সময় তিনি কোন ব্যথা অনুভব করেননি। কিন্তু, লং তার এই আবিষ্কারের বিষয়ে চুপচাপ থাকেন, ১৮৪৯ সালের আগে পর্যন্ত তিনি এই বিষয়ে ঘোষণা করেননি।

লেখক: অনির্বাণ আবরার