ডা. ছাবিকুন নাহার

ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


২৯ মার্চ, ২০১৮ ০৭:০৮ পিএম

মায়েরা ও মেয়েরা সাবধান! [শেষ পর্ব]

মায়েরা ও মেয়েরা সাবধান! [শেষ পর্ব]

[প্রথম পর্বের পর]

সিমির সাথে কথোপকথনের আগে আসুন সিমিদের প্রাথমিক কিছু তথ্য জেনে নেই।

সিমিরা দুই ভাইবোন। ভাই সেভেনে পড়ে। ওরা থাকে মায়ের সাথে। ঢাকায়। মা একটা স্কুলে চাকরি করেন। বাবা সৌদি আরব থাকেন। গত পাঁচ বছরে একবারও দেশে আসতে পারেননি। তবে ঠিকই টাকা পয়সা পাঠান। 

মা যে বাবাকে নিয়ে খুব একটা খুশি না, কিংবা বাবা মায়ের সাথে ঝামেলা চলছে, এটা সিমি বুঝে। বাবা নাকি সৌদি আরবে আরেকটা বিয়ে করেছেন! বাবা যদি এটা করে থাকেন, তাহলে খুব খারাপ করেছেন। মা কখনো বাবাকে মাফ করবেন না।

যদিও এটা সিমি কিংবা তার ভাই কেউই বিশ্বাস করে না যে, বাবা এটা করতে পারেন। তবে তার মাকে এ নিয়ে বিচলিত কিংবা রিলিফ কোনও দলে ফেলবে এটা ওরা বুঝতে পারে না। যাক সব বুঝে কাজও নাই। 

তবে তিনতলার নাবিদ ( ছদ্মনাম) আংকেল আসলে মা একটু যেনো ওদের সাথে সহজ হয়। পড়াশোনা নিয়ে রাগারাগি তেমন করেন না।

মা ভাবেন, সিমিটার বোধ বুদ্ধি ও হয়নি তেমন। তা না হলে, যখন তখন নাবিদের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে? বলতে দ্বিধা নেই এতে মা মনে মনে খুশিই হন। নাবিদকে তার সন্তানরা পছন্দ করুক এটা তিনি চান। একটু বেশিই চান।   নাবিদটাও হয়েছে এমন, সিমি সামিনকে চোখে হারায়।

নাবিদ আংকেল খুব ভালো। অবিবাহিত। বয়স ঊনত্রিশ। মায়ের চেয়ে এক বছরের ছোট। সুন্দর। ভদ্র। একটা বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। সময় অসময় ওদের বাসায় আসেন। প্রয়োজনীয় টুকিটাকি কাজ করে দেন। ওদের খুব খেয়াল করেন। 

কথায় বলে, কোনো মায়ের মনে ঢুকতে চাইলে তার সন্তানের প্রশংসা করো। নাবিদ আংকেল এই কথাটা মনে হয় ভালোই জানে। নাবিদের কর্মতৎপরতা আর অমায়িক ব্যবহার মাকে মুগ্ধ করে। 

মুগ্ধতা এমন পরিমাণ পৌঁছে যে, একসময় একটু একটু করে মায়ের মনে জায়গা করে নেয়। মা ও বাবার মধ্যে যে গ্যাপটুকু ছিলো, সেখান দিয়ে নাবিদ ঢুকে পড়ে। কথায় আছে প্রকৃতি শূন্যতা পছন্দ করে না। কোন না কোন উপায়ে শূন্যতা পূর্ণ হয়েই যায়।

৩. 
সিমি ও ডাক্তার নামিহার কথেপকথনে আসি এবার-

: সিমি ভয় নেই। সব বলো। কীভাবে এমনটা হলো?

: নাবিদ আংকেল আমাকে খুব আদর করেন। প্রথম প্রথম খুব ব্যাথা পেতাম। ব্যাথা হতো। হাঁটতে পারতাম না। কিন্তু নাবিদ আংকেল বলতেন, এমন করেই আদর করতে হয়।

: মাকে বলোনি কেনো?

আংকেল মানা করতেন। বললে মা নাকি কষ্ট পাবেন। তাছাড়া মা নাকি আমার কথা বিশ্বাস করবেন না। আমাকেই নাকি খারাপ বলবেন।

: কতদিন থেকে এমন?

তিন বছর ধরে। প্রায় প্রতিদিন। প্রথম প্রথম আমার খারাপ লাগত। পরে আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যায়।

একটা অন্যায় যখন দিনের পর দিন চলতে থাকে, তখন মানুষ এটাতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এটাকে স্বাভাবিক ধরে নেয়। যেটা সিমির ক্ষেত্রে হয়েছে।

হিসেব করে দেখলাম, প্রথম যখন শুরু। তখন সিমির বয়স সাত। কোলে নিয়ে আদর করার ছলে, তারপর...

যেহেতু নিয়মিত এই কাজ করা হতো, তাই হয়তো প্রথম ওভুলেশনেই বাচ্চা এসে যায়। মাসিক হওয়ার আগেই। আর ঔ লোক এমনি বেপরোয়া ছিলো যে, প্রেগন্যান্ট অবস্থায়ও ছাড়েনি। এই সেদিনও ছিল। তারপরই ব্যাথা উঠে যায়। প্রসব ব্যাথা।

৪.
তারপরের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত। পুলিশের কাছে অভিযুক্ত কালপ্রিট স্বীকার করেছে সব। মেয়েটার নাকি সম্মতি ছিল! একটা শিশুর সাথে তার সম্মতিতেও যদি শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়, এটা ধর্ষণ। তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয়, সিমির পেলভিস ডেভেলপড না। নরমাল ডেলিভারি করা যাবে না। তাই সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে সিমিনের বাচ্চাকে ডেলিভারি করা হয়েছে। একটা ফুটফুটে ছেলে হয়েছে। সৃষ্টিকর্তার এ এক অপার মহানুভবতা। জন্ম প্রক্রিয়ার ছাপ নবজাতক কপালে দেন না। তার দুনিয়ায় কোনো বিভেদ নাই। বিভেদ করি আমরা। মানুষেরা।

একে তো সিমি মাত্র বছর দশ এগারোর শিশু মা। তারপর সামাজিকতা, লোক লজ্জার ভয়, ভবিষ্যৎ সব চিন্তা করে বাচ্চাটার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে একটা সেফ হোমকে। খুবই গোপনীয়তার মাঝে। ডাক্তারি বিদ্যার ইথিক্স মেনে আমাকেও নাম ধাম পরিবর্তন করে দিতে হলো।

আহারে বাচ্চাটা! বড়দের পঙ্কিলতার জবাব তাকে কড়ায় গন্ডায় দিতে হবে। পদে পদে। অথচ এই জন্মে তার কোন হাতই নেই। থাকে না কোন কালে।

সিমিকে দেখে বোঝার উপায় নাই, সে কী একটা কনসিকোয়েন্সের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বরং একটু পুতুল খেলা টাইপ মনে হলো। এই খেললাম। আবার এই বাদ দিলাম টাইপ আরকি! একটা বাচ্চা ভয়াবহ একটা পরিস্থিতিকে খেলা হিসাবে নিচ্ছে! এই ব্যাপারটাই আমি নিতে পারছি না। অসুস্থ বোধ করছি।

৫.
সিমির মাকে প্রশ্ন করি। আপনি বুঝেননি? মহিলা কিছু বলেন না। কেবলি কাঁদছেন। কেঁদেই যাচ্ছেন। তারপরও কেনো যেনো এই কান্না আমার মন ছুঁয়ে গেলো না। বরং মহিলাকে প্রতারিত মনে হচ্ছিল। 

মহিলার চোখে মুখে একটা হাহাকারও যেনো লেগে আছে। তা যতটা না সিমির সর্বনাশের জন্য, তার চেয়ে বেশি নিজের জন্য। মহিলার চোখে অবিশ্বাস, রাগ, ঘৃণা, প্রতারণা এবং বঞ্চনার সবগুলো রঙ মিলেমিশে একাকার। কোনোমতেই হজম করতে পারছেন না, নাবিদ এই কাজ করেছে। এটা ও করতে পারল! 

তাহলে ও যে বলত, আমাকে ভালোবাসে। বিয়ে করবে। তা সব ফেইক ছিলো? তার সাথেও তো...

একটি কথা, প্রত্যেকটা মানুষ স্বতন্ত্র। প্রত্যেকেই তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে। তারপরও এই ঘটনায় আমি নাবিদের পাশাপাশি সিমির মাকে দায়ী করব। 

কারণ নাবিদের সাথে সিমির মায়ের আচরণ ছিল আপত্তিজনক, অগ্রহণযোগ্য। মহিলা জীবন যাপনে ছিলেন অসৎ। তার বৈবাহিক জীবনের অসম্পূর্ণতা সে অনৈতিকভাবে পূরণ করতে চেয়েছিল, কিংবা করে আসছিল। ফলে নিজের বিবেকের কাছে সে নত ছিলো।

এজন্য মেয়েকে সঠিক শিক্ষাটা দিতে পারেননি। ভালোমন্দ শেখাতে পারেনি; বরং উল্টোটা হয়েছে, মেয়ে তার কাছ থেকে শিখেছে। পরোক্ষভাবে। মেয়ের সাথে নাবিদের ঘনিষ্ঠতা সে সহজ করে দেখেছে। ভেবেছে, নাবিদ তাকে ভালোবাসে। কাজেই তার মেয়ে নাবিদের কাছে নিরাপদ। আর এই সুযোগে নাবিদ নামক কীটরা গাছেরও খায় আবার তলারও কুড়ায়। 

মানুষ কেনো বোঝে না, যে সম্পর্ক শুরু হয় অনৈতিকভাবে সেখানে নৈতিকতা আশা করা বাতুলতা মাত্র।

সিমির মা অবশ্য দায় চাপান সিমির বাবার ওপর। তিনি নাকি কখনোই এমন পথে যেতো না। স্বামীর ওপর প্রতিশোধ নিতেই নাকি সে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছে!

এ কেমন প্রতিশোধ পদ্ধতি? বিকৃত মানসিকতায় সমাজ কি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে? 

লেখক: ডা.ছাবিকুন নাহার, মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ।

 

আরও পড়ুন

► মেয়েরা ও মায়েরা সাবধান! [প্রথম পর্ব]

► ধর্ষণ প্রতিরোধ করার এখনই সময়

►ধর্ষণ কোনো যৌনতা নয়, এটি ক্রাইম

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত